মোহাম্মদ ইদ্রিস ফরাজী, সিআইপি
চেয়ারম্যান, ন্যাশনাল এক্সচেঞ্জ কোম্পানি লিঃ
ডিরেক্টর, এনআরবি ব্যাংক
চেয়ারম্যান, পপুলার ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুর, রোম, ইতালি
পরিচালক, ফরাজী হাসপাতাল লিমিটেড
রেমিট্যান্স যুগের বিস্ময়কর প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল এক্সচেঞ্জ কোম্পানি লিমিটেডের উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইদ্রিস ফরাজী সেই মানুষদেরই একজন- যারা শুধু মেধাবীই নন, দূরদর্শীও। এই আত্মপ্রত্যয়ী ব্যবসায়ীর উদ্যোগ ও অধ্যবসায়েই গড়ে উঠেছে বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত ও সুবিস্তৃত মানি ট্রান্সফার এবং এক্সচেঞ্জ কোম্পানি ‘ন্যাশনাল এক্সচেঞ্জ কোম্পানি লিমিটেড’।

এই কৃতী উদ্যমী মানুষটির জন্ম ১ জানুয়ারি, ১৯৬৯ সালে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার সেনেরচরের আফাজউদ্দিন মুন্সির কান্দি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। পিতা হাজী আবুল হাশেম ফরাজী এবং মা হাজী উজালা বেগম। ইদ্রিস ফরাজী বি কে নগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে এসএসসি, ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে ১৯৮৬ সালে এইচএসসি এবং মাদারীপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে ১৯৮৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
পড়াশোনা শেষে মোহাম্মদ ইদ্রিস ফরাজী ভাগ্যোন্নয়নে মধ্যপ্রাচ্যের বাহরাইনে যান। এখানে কয়েক বছর থাকার পর ১৯৯২ সালে তিনি ইতালিতে যান। পরিশ্রমী ইদ্রিস ফরাজী সব সময়েই মনের মধ্যে ব্যবসায়ী হবার ইচ্ছা পোষণ করতেন। এই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে দৈনন্দিন কাজ শেষে রাস্তায় ফেরি করে জিনিসপত্র বিক্রি করতেন। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। ১৯৯৮ সালে তিনি রোমে একটি ‘গ্রোসারি শপ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগে ১৯৯৬ সালে তিনি ইমিগ্রেশন কার্ড লাভ করেন। একই বছর তিনি দেশে এসে নারায়ণগঞ্জের তাহমিনা আক্তার মিশুর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। গ্রোসারি শপের পর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পপুলার ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস। এর মাধ্যমে ইতালির অনেক বাংলাদেশি ও অন্যান্য দেশের প্রবাসীদের সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি লক্ষ করলেন যে, ইতালিতে ব্যাংকের বাইরে সেদেশের কারেন্সি লিরাকে ডলারে কনভার্ট করার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এমনকি কোনো বিদেশিও এ ধরনের প্রতিষ্ঠান চালু করেনি। তিনি তার ছোট দুই ভাই এবং ভগ্নিপতিকে সাথে নিয়ে ইতালির সেন্ট্রাল ব্যাংকের অনুমোদন পাবার পর ‘পপুলার এক্সচেঞ্জ হাউজ অ্যান্ড ট্রাভেলস’ প্রতিষ্ঠা করলেন। এতে তার ব্যবসা বেশ জমজমাট হলো। শুধু বাংলাদেশিরাই নয়, বিদেশিরাও এখানে লিরা কনভার্ট করতেন এবং বিমান টিকিটও কাটতেন এ এজেন্সি থেকেই। ট্যুরিস্টরাও এই সুবিধা নিতেন কারণ তখন এটিই ছিল একমাত্র এক্সচেঞ্জ হাউজ।

২০০৪ সালে স্বপ্নদর্শী ইদ্রিস এই এক্সচেঞ্জ হাউজের বিজনেসকে আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিলেন। তখন ইউরো কারেন্সি এসেছে। তিনি ভাবলেন, ব্যাংকের বাইরে আইনসম্মতভাবে যাতে দেশে মানুষ টাকা পাঠাতে পারেন সেই ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তিনি ইতালির সেন্ট্রাল ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান National Exchange Companay S.R.L। এ জন্যে ৬ লাখ ইউরো ক্যাপিটাল হিসেবে রাখতে হয়েছে। তিনি এ কোম্পানির চেয়ারম্যান এবং দুই ভাই ও ভগ্নিপতি এর পরিচালক। ইতালিতে এটিই প্রথম একজন বিদেশির গড়ে তোলা মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান অনেকটা বাংলাদেশের লিজিং কোম্পানির মতো গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা জমা ও ঋণ প্রদান করতে পারে। উদ্যমী এই ব্যক্তির প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান এখন ৪৫টি দেশের রেমিট্যান্স দেশে আনয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এটি সত্যিই আনন্দের ব্যাপার যে, প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের অনেক নামকরা মানি ট্রান্সফার এজেন্সির সাথে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায় উত্তরোত্তর বিস্তৃতি ও উন্নয়ন করতে সক্ষম হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে National Exchange Company S.R.L এর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ ইদ্রিস ফরাজী বলেন, ২০০৪ সালে এ প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের তখনকার রাষ্ট্রদূতসহ ইতালির সেন্ট্রাল ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। আমি আমার বক্তব্যে আশাবাদ প্রকাশ করেছিলাম উপযুক্ত পরিবেশ পেলে এই কোম্পানি অন্যান্য দেশেও কার্যক্রম পরিচালনা করে বাংলাদেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে- আজ তা প্রমাণিত হয়েছে। এখন ইতালিতেই ৪৫০টি শাখা ও এজেন্টদের মাধ্যমে এ কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যেখানেই বাংলাদেশির সংখ্যা বেশি সেখানেই শাখা ও এজেন্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক একাধিকবার অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছে। তিনিও সিআইপি হবার গৌরব অর্জন করেছেন। বাংলাদেশেও কোম্পানিটির কার্যক্রম রয়েছে। এই বিজনেস ছাড়াও তিনি ইতালিতে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরসহ বেশ কিছু স্থায়ী অ্যাসেট গড়েছেন। তিনি এসব অ্যাপার্টমেন্ট ও বাড়ি ভাড়া দেন।
ইদ্রিস ফরাজী ও তাহমিনা আক্তার দম্পতির বড় মেয়ে ইম্পা ফরাজী বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সমাপনী বর্ষের শিক্ষার্থী, ছেলে ইফাত ফরাজী ‘এ’ লেভেল শেষ করে ব্রিটেনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এবং ছোট ছেলে ইউসুফ ইসমান ফরাজী রোমে গ্রেড-VIII এ পড়ছে।
উদ্যোক্তা ব্যক্তিত্ব ইদ্রিস ফরাজীরা ৬ ভাই, ২ বোন। তারা নিজ এলাকায় মায়ের নামে একটি দারুসসুুন্নাহ হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা এবং একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার এক ভাই ইংল্যান্ডে Nek Money Ltd. নামের Money Transfer এজেন্সির চেয়ারম্যান। আরেক ভাই ডা. আনোয়ার ফরাজী ঢাকার বনশ্রীতে প্রতিষ্ঠিত ফরাজী হাসপাতালের চেয়ারম্যান। আরেক ভাই জাহাঙ্গীর ফরাজী ন্যাশনাল এক্সচেঞ্জ কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান।
মোহাম্মদ ইদ্রিস ফরাজী দেশে এনআরবিদের উদ্যোগে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা মুহূর্তে উদ্যোগী ভূমিকা রাখেন এবং NRB Bankএর স্পন্সর ডিরেক্টর হন। তিনি মনে করেন, এসব ব্যাংক জাতীয় উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে।
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক


