
বাংলাদেশি আমেরিকান ডা. ইফতিখার মাহমুদ এমন এক আলোকিত ব্যক্তিত্ব যিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, চিন্তাচেতনা যদি সৎ এবং উদ্দেশ্য যদি মহৎ হয় তবে কোনো কাজই দুঃসাধ্য কিংবা ব্যর্থ হতে পারে না। তাঁঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত Hope Foundation এর বড়ো উদাহরণ। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ইফতিখার মাহমুদ ১৯৯৯ সালে Hope Foundation প্রতিষ্ঠা করেন যা শুরুতে ছিল একটি ছোট্ট ক্লিনিক। ২০০৭ সালে ১৮টি শাখায় বিস্ততি লাভ করে। অল্প দিনেই হোপ ফাউন্ডেশন মানবতার বন্ধু হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনে সক্ষম হয়। ১৯৯৯ সালে ক্ষুদ্র পরিসরে উদ্যোগ নিলেও ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে Hope Hospital । এরপর ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বেশ কয়েকটি Hope Birth Centers. ডা. ইফতিখার মাহমুদ ২০১০ সালে Obstetric Fistula প্রোগ্রাম শুরু করেন যা এখন Hope বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কর্মসূচি। তিনি ২০১০ সালে Hope Training Center প্রতিষ্ঠা করেন এবং ২০১২ সালে Midwifery Training Program চালু করেন। এই প্রোগ্রাম ছিল বাংলাদেশের জন্যে মিডওয়াইফারী বিষয়ক প্রথম শিক্ষা কর্মসূচি।
ডা. ইফতিখার মাহমুদ তাঁর Hope Foundation-কে আরও বিস্তৃত করার পদক্ষেপ হিসেবে ২০১৮ সালে রোহিঙ্গা নারীদের সুচিকিৎসার জন্যে প্রতিষ্ঠা করেন Hope Field Hospital। তিনি ২০১৯ সালে Cervical Cancer Program শুরু করেন। একই সালে তিনি টেলিমেডিসিন প্রোগ্রাম ও মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম চালু করেন।
হোপ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা
ডা. ইফতিখার মাহমুদের জীবন বৃত্তান্ত
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গর্ব ডা. ইফতিখার মাহমুদ এর জন্ম কক্সবাজারের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর পিতার নাম মরহুম জহির উদ্দিন আহমদ এবং মা মরহুম আছিয়া খাতুন। ছোটবেলা থেকেই ছাত্র হিসেবে মেধাবী ইফতিখার মাহমুদ ১৯৭৮ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পাশের পর চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। ১৯৮০ সালে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের পর তিনি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৮৭ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।
উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণের লক্ষ্যে তিনি আমেরিকায় পাড়ি জমান। তিনি Brooklyn Hospital এ Residency Training গ্রহণ করেন। তিনি Cornell University Medical College থেকে Pediatric Endocrinology তে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। তিনি শিক্ষকতা পেশার সাথে জড়িত হন, তিনি ইউএসএ’র College of public Health, University of Nebraska এর অধ্যাপক। একই সাথে ম্যাচাচুয়েটস এর বোস্টনের Tufts University Medical College এর ফ্যাকাল্টি। তাঁর স্ত্রী আঞ্জুমানারা মাহমুদ। সুখী এই দম্পতি তিন ছেলে ইরফান মাহমুদ, আরমান মাহমুদ, এবং ইউসুফ মাহমুদ এর গর্বিত জনক-জননী। সমাজের এই মেধাবী চিকিৎসক Miami Florida তে পেডিয়াট্রিক প্র্যাকটিস করে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছেন। তিনি মাতৃস্বাস্থ্য, সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর স্বাস্থ্য, অবস্টেট্রিক ফিস্টুলা এবং নিরাপদ জন্মদান বিষয়ে বেশ কিছু রিসার্চ ওয়ার্ক করেছেন। তিনি আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, জাতিসংঘ (UN) এবং ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) এর অনেক সেমিনার ও ইভেন্টসে অংশ নিয়েছেন।
চিকিৎসা ও সেবা অঙ্গনের এই মহান ব্যক্তিত্ব ২০২০ সালে Hope Foundation-এর মাধ্যমে বিশ্বের ভয়াবহ মহামারির প্রেক্ষিতে কোভিড আইসোলেশন সেন্টার চালু করেন। তিনি বাংলাদেশ সরকার এবং UNFPA এর যৌথ সহায়তায় চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলায় Fistula Program চালু করেছেন। Hope Foundation বাংলাদেশের গ্রামীণ নারী ও শিশুদের জীবন রক্ষায় স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করছে। গ্রামীণ অসহায় নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য সেবায় কাজে লাগানোর লক্ষ্যে প্রায় ১০০০ স্বাস্থ্যকর্মী ও ৭০ জন নার্সকে প্রশিক্ষণ ও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই ফাউন্ডেশন এ পর্যন্ত ১২ লাখেরও বেশি নারী ও শিশুর গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করেছে। হোপ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ডা. ইফতিখার মাহমুদ তাঁর এই কর্মসূচিকে দেশব্যাপী বিস্তৃত করার চিন্তাভাবনা করছেন। তাঁর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- মায়েরা যেন নিরাপদ থাকে এবং জন্মমুহূর্তে বা জন্মের পর কোনো শিশুর অপমৃত্যু না ঘটে।

কোভিড এর জন্যে আইসোলেশন সেন্টার
২০২০ সালে যখন কোভিড-১৯ এর তা-ব শুরু হলো তখন বিশ্ব এ বিষয়ে অপ্রস্তুত ছিল। মরণঘাতি এ বিষয়টি ছিল খুবই ভয়াবহ ও আতঙ্কের। সে সময় Hope Foundation সাহসিকতার সাথে এই দুর্যোগ মোকাবিলায় এগিয়ে এসেছে। তারা তাদের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। একই সাথে কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদেরকে পিপিই দিয়েছে। পাশাপাশি হোপ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে একটি হোপ আইসোলেশন সেন্টার খুলেছে। হোপ মোট ১০০ শয্যার ধারণক্ষমতাসহ চিকিৎসা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে। মহামারি থাকা সত্ত্বেও হোপ টিম কখনোই তাদের সেবা ও পরিষেবা দেয়া বন্ধ করেনি।
হোপ-এ রয়েছে মাতৃস্বাস্থ্য কর্মসূচি, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্যে মানবিক সেবা, প্রসবজনিত ফিস্টুলা প্রোগ্রাম, কাটা ঠোঁট ও তালু সার্জারি এবং বার্ন সার্জিক্যাল নিরাময় কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। হোপ ফাউন্ডেশন ২০২০ সালে ১৯৮ জন স্বাস্থ্য পেশাদারকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, ৩৮৪৪টি নিরাপদ ডেলিভারি সম্পন্ন করেছে, ২১৬৮২৯ জন রোগীকে সেবা প্রদান করেছে, তাদের উদ্যোগে ২৩ জন মিডওয়াইফারী স্নাতক হয়েছেন, ৫টি নতুন জন্মকেন্দ্র খোলা হয়েছে। ২০২০ সালে প্রত্যন্ত দ্বীপেও হোপের কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
সেবা ক্ষেত্রে হোপ আলোর বাতিঘর
কোভিড-১৯ মহামারির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে হোপ ফাউন্ডেশন অন্যান্য সংগঠন এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিলে কাজ করে চলেছে। হোপ মনে করে- সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কোভিড-১৯ কে ঠেকানো যাবে। এজন্যে প্রতিষ্ঠানটি ২০২০ সালে দাতা প্রতিষ্ঠান, অংশীদার এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে কোভিড-১৯ প্রতিহত এবং নিরাময়ের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করে। তারা রোগীদের পরিপূর্ণ সেবা প্রদান করেছে। একটি মারাত্মক ভাইরাসের মোকাবিলা করার ব্যাপারে শুরুতে তাদের তেমন ধারণা ছিল না। কিন্তু সাহস ছিল এবং সেবার মানসিকতা ছিল বলেই তারা এই ভাইরাসকে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। এই কার্যক্রম পরিচালনা করতে করতেই তারা এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতা অর্জন এবং সুষ্ঠুভাবে কর্ম পরিচালনা করেছে।
হোপ ফাউন্ডেশন মূলত যে ভূমিকা পালন করেছে তাতে বলা যায়- এটি হচ্ছে ‘আলোর বাতিঘর’। তারা কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চ্যালেঞ্জ নিয়েই কাজ করেছে। মা এবং নবজাতকদের সেবা-পরিষেবা প্রদান করেছে। এ ক্ষেত্রে তাদের কর্মীরা সহানুভূতিশীলতার সাথে সেবা দিয়ে রোগাক্রান্তদের সুস্থ করে তুলেছে। নিজেরা কখনো আতঙ্কিত হয়ে পড়েনি। বিশ্বব্যাপী মহামারির সংক্রমণকালে হোপ তাদের কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও কর্মে সজ্জিত করেছে। তাদের নিরাপত্তা, সুস্থতা নিশ্চিত করতে অস্থায়ী আলাদা ইউনিট তৈরি করেছে। গর্ভবতী মহিলারা যাতে নিরাপদভাবে সেবা পান এবং সম্মানজনক ভাবে প্রসূতি যত্ন পেতে পারেন সেই ব্যবস্থা অত্যন্ত সুন্দরভাবে করেছে হোপ ফাউন্ডেশন।

প্রসবজনিত ফিস্টুলা প্রোগ্রাম
প্রসবজনিত ফিস্টুলা হলো নবজাতকের জন্মের মুহূর্তে একটি ছিদ্র যা বাধাগ্রস্ত প্রসবের কারণে হয়ে থাকে। শিশুর জন্মের সময় এটি হচ্ছে সবচেয়ে গুরুতর আঘাত। এই সমস্যা মোকাবিলার লক্ষ্যে হোপ ফাউন্ডেশন বেশ প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ২০২০ সালে হোপ ফাউন্ডেশন প্রসবজনিত ফিস্টুলা রিপেয়ার সার্জিক্যাল টিম সফলভাবে ৬৫টি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছে। নিম্ন আর্থসামাজিক অবস্থানের যে সকল নারী এই দুরবস্থার শিকার তাদের জরুরি প্রসূতি সেবার সুযোগ নেই। এই নারীদের প্রায় সকলেই দরিদ্র ও অশিক্ষিত; তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা থাকে না। তারা সামাজিকভাবে বঞ্চিত, অবহেলিত। যাদের অধিকাংশই শারীরিকভাবে দুর্বল, স্বাস্থ্যহীন এবং মানসিকভাবেও দুর্বলতার শিকার থাকে। এসব ভাগ্যবঞ্চিত অসহায় নারীদের হোপ ফাউন্ডেশন, ফিস্টুলা ফাউন্ডেশন দীর্ঘস্থায়ী সহায়তার মাধ্যমে ফিস্টুলা সংক্রান্ত সার্জারি ও সুচিকিৎসা প্রদান করে। হোপ ফাউন্ডেশন তৃণমূল পর্যায়ে এসব নারীকে এ বিষয়ে সচেতন ও তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে। এজন্যে ‘হোপ’ এর একটি টিম ও অস্ত্রোপচার দল তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা তথ্য এবং যতœ প্রদান করে থাকে। এসব ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা হয়। এক্ষেত্রে টঘঋচঅ, গ্লোবাল এফেয়ার্স কানাডা এবং অন্যান্য দাতারা সহায়তা দিয়ে থাকে। মূলত প্রসবজনিত ফিস্টুলা সার্জারি একটি জীবন পরিবর্তন পদ্ধতি যা নারী ও শিশুদের সুস্থতার জন্যে একান্ত জরুরি। হোপ ফাউন্ডেশন এ ব্যাপারে আন্তরিকতার সাথে কাজ করে চলেছে।
বাংলাদেশে প্রায় ২০০০০ নারী এই ‘ফিস্টুলায়’ আক্রান্ত। কিন্তু এর চিকিৎসার জন্যে খুব বেশি হাসপাতাল ও ফিস্টুলা সার্জন নেই। ফলে ফিস্টুলা নিরাময় করা এদেশের জন্যে বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘ফিস্টুলা’ মুক্ত বাংলাদেশ গড়া। এটি সম্ভব, তবে এর জন্যে প্রতি বছর অন্তত: তিন হাজার-ফিস্টুলা সার্জারি করতে হবে। এজন্যে ট্রেনিং দিয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক ফিস্টুলা সার্জন তৈরি করা দরকার।
এই লক্ষ্য অর্জনে Hope Foundation চট্টগ্রামের ১১টি জেলায় সরকারের সাথে ফিস্টুলা নির্মূল কাজে অংশ নিচ্ছে। এ জন্যে উপজেলা মাঠকর্মী তৈরি, জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম সহ এনজিওদের মাধ্যমে এই কার্যক্রমকে বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে Hope Foundation এর উদ্যোগে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ফিস্টুলা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে এবং আরও একটি বৃহৎ হাসপাতালেরও নির্মাণ কাজ চলছে। এখানে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলায় এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। হোপ ফাউন্ডেশন পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলাতেই এই কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

নিরাপদ মাতৃত্ব ও বার্থ সেন্টার
হোপ ফাউন্ডেশন নিরাপদ মাতৃত্বকে অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করে। এই ফাউন্ডেশনের লক্ষ্যই হচ্ছে গর্ভবতী মহিলারা নিরাপদ মাতৃত্বের সুযোগ লাভ করবে। কারণ, পৃথিবীতে ‘মা’-ই হচ্ছে বড় সম্পদ। একজন সুস্থ মা সুস্থ সন্তানের জন্মদানের মাধ্যমেই সেই শিশুটিকে যোগ্য হবার সুযোগ করে দিতে সক্ষম। বাংলাদেশে এখনও মাতৃমৃত্যু ও প্রসব মহূর্তে শিশু মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। প্রসবকালীন সময়ে ১ লাখের মধ্যে প্রায় ১৭৬ জন মায়ের মৃত্যু ঘটে। বাংলাদেশ যে টেকসই উন্নয়নের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হয়েছে সেখানে এর সংখ্যা ১৪০ এর নিচে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। Hope এ জন্যে কক্সবাজারে একটি পাইলট প্রজেক্ট নিয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে কক্সবাজার জেলায় প্রসূতি মায়েরা নিরাপদ সন্তান জন্মদানে সক্ষম হবে। এমনকি অপারেশন বা সিজারিয়ানের যাতে প্রয়োজন না হয় সেই কাজটিও তারা করছেন। প্রয়োজন হলে নিজেদের ব্যবস্থাপনায় প্রসূতিকে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া হবে। এজন্যে তারা ‘গোল্ডেন চেইন প্রোগ্রাম’ চালু করেছে। ঠিক গোল্ডেন চেইনের মতো প্রসূতির গর্ভ থেকে শুরু করে জন্মদান পর্যন্ত চিকিৎসা বা সেবার কোনো গ্যাপ থাকবে না। কারণ গ্যাপ থাকলেই মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থাও তারাই করবেন। এ লক্ষ্যে কক্সবাজারের ৬টি উপজেলায় বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা এবং দ্বীপে হোপ ইতোমধ্যে ১৫টি বার্থ সেন্টার স্থাপন করেছে। এর মধ্যে মহেশখালী, কুতুবদিয়া দ্বীপও রয়েছে। উল্লেখ্য, পাশাপাশি UNFPA এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় হোপ ফাউন্ডেশন জেলায় ৪৪টি সরকারি পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র্রে মিডওয়াইফ দিয়ে সার্বক্ষণিক সেবা প্রদান করে যাচ্ছে।
হোপ রুরাল মাদার্স ক্লাব
হোপ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গ্রাম পর্যায়ে গঠিত হয়েছে হোপ রুরাল মাদার্স ক্লাব। এই ক্লাবগুলো গ্রামীণ মায়েদের ক্লাব হিসেবে কাজ করে। তারা মায়েদের স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে। বর্তমানে Hope এর ৬৫টি মায়েদের ক্লাব রয়েছে। প্রতিটি ক্লাব ৩০ থেকে ৫০ জন নারী নিয়ে গঠিত। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে মায়েদের সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষা প্রদান এবং পারস্পরিক সংযোগ স্থাপনসহ স্বাস্থ্য পরিষেবার সুবিধা দেয়া। নিরাপদ মাতৃত্ব কর্মসূচিসহ ব্যাপক মাতৃস্বাস্থ্যের চিকিৎসা, প্রসবপূর্ব যত্ন, নিরাপদ প্রসবসহ পরিষেবা, প্রসবোত্তর যত্ন, পুষ্টি পরামর্শ এবং পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন পরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। মাদার্স ক্লাব ২০২০ সালে কোভিড মহামারির বিরুদ্ধে মা ও নারীদের সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেছিল এবং এখনো তা অব্যাহত রয়েছে।
বার্ন ইনজুরি সমস্যার সমাধানে
বাংলাদেশে বার্ন ইনজুরির সংখ্যা অনেক। বাসাবাড়িতে আগুন লাগাসহ রান্নার গ্যাস, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, রাসায়নিক ও বৈদ্যুতিক কাজে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের অনেকেই পুড়ে আহত হন। এই পোড়া আঘাতের চিকিৎসার ব্যবস্থা দেশে খুব একটা নেই। ঢাকা ও চট্টগ্রামে সরকারি দুটি বার্ন ইউনিট ছাড়া এর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা দুষ্কর। হোপ ফাউন্ডেশন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা হওয়ায় তাদের সাথে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক বিদ্যমান। ফলে Hope ফাউন্ডেশন বার্ন ইনজুরির চিকিৎসা, তাদের পুনর্বাসন এবং আগুনে পোড়া অঙ্গকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছে।

কাটা ঠোঁট ও তালুর চিকিৎসা
এদেশে অসংখ্য শিশু নানা কারণেই কাটা ঠোঁট ও তালুতে অসুবিধা নিয়ে জন্ম গ্রহন করে। তাদের অনেকেই অভাবজনিত কারণে কাটা ঠোঁট ও তালুর চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়। তালুতে অসুবিধার জন্যে অনেক শিশু স্বাভাবিক উচ্চারণে কথা বলতে পারে না। এ ব্যাপারে হোপ ফাউন্ডেশন তাদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে। গর্ভাবস্থায় মায়েদের প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে ভূমিষ্ঠ সন্তানদের এই সমস্যা হয়ে থাকে। ফলে, হোপ ফাউন্ডেশন প্রসূতি মায়েদের ফলিক এসিড ও ভিটামিন প্রদান করে। Smile Train এর সাথে Hope অংশীদারত্বের ভিত্তিতে শিশুদের প্রতিকারমূলক অস্ত্রোপচার করে। ২০২০ সালে এ ধরনের ৪৯টি সার্জারি করেছে হোপ।
মিডওয়াইফারি ট্রেনিং প্রোগ্রাম
হোপ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে মিডওয়াইফদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ২০১২ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি মিডওয়াইফদের উন্নতমানের প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। মা ও শিশুদের মৃত্যুহার কমানোর ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে। মূলত এখনো দেশে অদক্ষ ধাত্রীরাই প্রচুর শিশুর জন্ম সহযোগিতা করে থাকে। সে ক্ষেত্রে দেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গরফরিভব (ধাত্রী) এর প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক। মিডওয়াইফের হাতে শিশু জন্ম নিরাপদ হয়ে থাকে। মাতৃত্বকালীন এবং নবজাতকের নিরাপদ জন্মের লক্ষ্যে Hope Foundation ৩ বছরের ডিপ্লোমা মিডওয়াইফারি ট্রেনিং প্রোগ্রাম চালু করেছে। এতে প্রতিবছর বেশ কিছু দক্ষ মিডওয়াইফ প্রশিক্ষণ লাভ করেছেন। এভাবে দেশে প্রসূতি মা ও নবজাতক শিশুর মৃত্যুর হার কমে আসছে। Hope বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্থানীয় ছাত্রীদের ভর্তি প্রদান করে। তাদেরকে ডেলিভারি, ল্যাব টেস্টিং, ভ্রুণের মূল্যায়ন, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণের লক্ষণ, জন্মগত জটিলতা এবং রোগ নির্ণয়ের ট্রেনিং দেয়া হয়। তাদের অনেককে Hope-এর জন্মদান ক্লিনিকে নিয়োগ দেয়া হয়। তারা মানসম্পন্ন মাতৃত্ব এবং নবজাতকের সেবা নিশ্চিত করে। তাদের অনেককে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের Hope হাসপাতালেও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তারা হোপের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে শুরু থেকেই রোহিঙ্গা শিবিরে মা, শিশু ও অসহায়দের স্বাস্থ্য উন্নয়নে কাজ করছে। এই শরণার্থীদের প্রায় ৫৫ থেকে ৫৮ শতাংশই শিশু।
মহিলাদের ৫০ শয্যার হোপ ফিল্ড
হাসপাতাল
মহিলাদের জন্য Hope Foundation ৫০ শয্যার একটি ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছে। সপ্তাহের ৭ দিন ২৪ ঘন্টাই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সেবা, জরুরি পরিবহন, জরুরি প্রসূতি এবং শিশু স্বাস্থ্য সেবা, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করছে। Hope প্রয়োজনীয়তার নিরিখে প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী প্রদান করে। এর মধ্যে ওষুধ, পানি বিশুদ্ধকরণ প্যাক এবং ভিটামিন রয়েছে। সপ্তাহের ৭ দিন যে সেবা দেয়া হয় সেগুলো হচ্ছে জরুরি প্রসূতি যত্ন, সাধারণ ডেলিভারি, সিজারিয়ান ডেলিভারি, নবজাতকের যত্ন, মাতৃত্বের যত্ন, গর্ভকালীন যত্ন, জরুরি সেবা, ফিস্টুলা সার্জারি, প্রসব পরবর্তী যত্ন, পরিবার পরিকল্পনা পরিষেবা, ল্যাবরেটরি ইনভেস্টিগেশন, ইসিজি, আল্ট্রাসাউ-, ফার্মেসি, বহির্বিভাগের রোগীদের যত্ন, মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা, চর্মরোগ চিকিৎসা, শারীরিক থেরাপি এবং পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং পরিষেবা, ব্রেস্ট সার্জারি ইত্যাদি।
প্রজনন স্বাস্থ্য কেন্দ্র
হোপ ফাউন্ডেশন মহিলাদের প্রজনন চিকিৎসার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। তারা প্রতিষ্ঠা করেছে প্রজনন স্বাস্থ্য কেন্দ্র। ইতোমধ্যে তারা ৯টি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে এবং আরও ক’টি কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের নারীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা হচ্ছে এই কেন্দ্রের মাধ্যমে। এই কেন্দ্রগুলোতে নিরাপদ প্রসবের ব্যবস্থাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মসূচি রয়েছে। ২০২০ সালে উল্লেখযোগ্য সেবার মধ্যে রয়েছে প্রসব-পূর্ব সেবা ২৪,২০২, পরিবার পরিকল্পনা সেবা ১৯,৬৮৫, নরমাল ডেলিভারি ১,০২৭, Cervical Cancer স্ক্রিনিং ৯৩৭। জরুরি সেবার জন্য রেফারেল ৯১ জন। এছাড়া অধিকতর জটিল রোগের উন্নত চিকিৎসার জন্যে অন্যত্র রেফার করা হয়।
টেলিমেডিসিন প্রোগ্রাম
উন্নত বিশ্বে এখন অনেক কিছুর মতো মেডিসিনের ক্ষেত্রেও ইন্টারনেট সুবিধার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। হোপ ফাউন্ডেশনও বিভিন্ন রোগের বিষয়ে টেলিমেডিসিন ব্যবস্থা চালু করেছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সেবা গ্রহণ ব্যয়বহুল হওয়ায় Hope চালু করেছে একটি টেলিমেডিসিন প্রোগ্রাম-যাতে রোগীরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের চিকিৎসা বিষয়ক মতামত জানতে পারে। হোপ-এর দু’টি টেলিহেলথ ডিভাইস রয়েছে এর দু’টি হাসপাতালে। এগুলো উন্নত প্রযুক্তি দ্বারা পরিচালনা করা হয়। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই Telemedicine সেবা প্রদান করা হয়।
ওয়ার্ল্ড টেলিহেলথ ইনিশিয়েটিভ (WTI) এর সহযোগিতায় বিভিন্ন অসুখের জন্যে আলাদা আলাদা চিকিৎসকের বিনামূল্যে পরামর্শ নেয়া যায়। স্বেচ্ছাসেবক চিকিৎসকরা একাজে যুক্ত রয়েছেন।
মানসিক স্বাস্থ্য প্রোগ্রাম
কক্সবাজারের স্থানীয় এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্যে Hope চালু করেছে মানসিক স্বাস্থ্য প্রোগ্রাম। ফাউন্ডেশনের মানসিক স্বাস্থ্য দল সরাসরি মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করছে এবং ব্যক্তিগত কাউন্সেলিং সহায়তা গোষ্ঠীর মাধ্যমে উপকার-ভোগীদের মধ্যে সামাজিক সমর্থন, সম্প্রদায় সংহতি এবং সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম ও সেবা প্রদান করে। হোপ হাসপাতাল, হোপ ফিল্ড হাসপাতাল ফর উইমেন এবং হোপ বার্থ সেন্টার এর মানসিক স্বাস্থ্য দলটি WHO প্রশিক্ষণ লাভ করেছে। এরা আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সহায়তা পায় বিশেষ করে টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে ক্লিনিক্যাল পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ লাভ করে। ২০২০ সালে ১১০৬ জন এই পরিষেবা পেয়েছে।
হোপ ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম (HERT)
বর্তমান বিশ্বে উন্নত ব্যবস্থায় মোবাইল টিমের স্বাস্থ্য সেবা চালু হয়েছে। Hope এর কল্যাণে বাংলাদেশের জনগণও এ সেবা গ্রহণ করতে পারছে। হোপ ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম (HERT) ২০১৮ সালের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়। কক্সবাজার জেলার জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলাকরণ, সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে এলাকাটিতে একই স্তরের জরুরি পরিষেবার সুযোগ রয়েছে যেগুলোকে দ্রুত সরবরাহ করা হয়। মৌসুমী বর্ষায়, বন্যার সময় ২০১৮ সালে জরুরি ভিত্তিতে মোবাইল টিম মোতায়েন করা হয়। এই দল প্রয়োজনীয় খাদ্য, জল পরিশোধন ট্যাবলেট, প্রয়োজনীয় ঔষধ, ছাতা এবং এলইডি লাইট প্রদান করে। বিভিন্ন স্থানে যেখানে চিকিৎসার প্রয়োজন সেখানেই এই টিম কাজ করছে।
২০২০ সালে এই কর্মসূচির মাধ্যমে ৫৯৮ জন মানসিক স্বাস্থ্য সেবা ও ২৯৮টি শিশু নবজাতকের যত্ন পেয়েছে। HERT যে সকল কাজ করে তার মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং সরবরাহের সাথে সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোকে দুর্যোগ এলাকায় দ্রুত মোতায়েন করা, সরকারি সংস্থাগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে কাজ করা। তারা স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। রোগীদের দুর্যোগপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগও এই গ্রুপ নিয়ে থাকে।
হোপ আইসোলেশন এবং ট্র্রিটমেন্ট ইউনিট- ১০০ শয্যা
হোপ ফাউন্ডেশনের বড়ো চ্যালেঞ্জ গুলির মধ্যে একটি ছিল কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রন ও প্রতিরোধ। অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাসকারী ১০ লাখ রোহিঙ্গাদের মধ্যে এই মহামারি ছড়িয়ে পড়ার ভয় ছিল বেশি। হোপ উপলব্ধি করেছে, তাদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি, স্যানিটেশন, খাদ্য সরবরাহ দ্রুত করতে হবে। এ জন্যে দুটো আইসোলেশন এবং ট্রিটমেন্ট ইউনিট প্রতিটিতে ৫০ শয্যার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একটি স্থাপন করা হয় রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে এবং আরেকটি কক্সবাজার শহরে। ইউনিটগুলো অক্সিজেন এবং উচ্চ প্রবাহসহ শ্বাসযন্ত্রের যত্ন প্রদানের জন্যে আনুষঙ্গিক ক্যানোলার (HFNC) ব্যবস্থা করেছে।
কোভিড-১৯ প্রতিরোধে রোগীদের সাধারণ চিকিৎসা, ডায়াগনস্টিক সহায়তা প্রদান করা হয়। স্বাস্থ্য সেবা কর্মীদের জন্যে PPE প্রদান করা হয়েছে। রোগীদের মাস্ক এবং অন্যান্য সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ আইটেম প্রদান করা হয়েছে। কোভিড রোগীদের ক্ষেত্রে ৩২,৪০৩ রোগীকে সেবা প্রদান করেছে এবং ৯৪৬২ জন মায়ের সেবা-কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। Hope কর্মীরা দৃঢ়তার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
হোপ মেটারনিটি অ্যান্ড ফিস্টুলা সেন্টার
বাংলাদেশে আনুমানিক ২০ হাজার নারী ফিস্টুলায় ভুগছেন। তারা নিজেরাও এ ব্যাপারে সচেতন নন। কারণ তারা দরিদ্র ও অশিক্ষিত। তারা মনে করেন, এটা স্রষ্টার দেয়া রোগ। তাদেরকে Hope সচেতন করে তুলছে এবং চিকিৎসা সুবিধা প্রদান করছে। কক্সবাজারে ফিস্টুলার প্রকোপ অনেক বেশি। দেশের চিকিৎসকদের এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্যে প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। Hope এর প্রতিষ্ঠিত ম্যাটারনিটি অ্যান্ড ফিস্টুলা সেন্টার সেই চাহিদা পূরণ করবে।
একজন হোপ রোগীর গল্প
ডাক্তারদের সহায়তায় সুস্থ সন্তান প্রসব করেছেন নূর বেগম। কিন্তু তার অবস্থা ছিল বেশ জটিল। হোপ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ এবং ডাক্তারদের সহযোগিতায় তার সন্তান সুস্থ হয়ে জন্ম নেয় Hope ফিল্ড হাসপাতালে। নূর বেগম বলেন, ‘সেই সকালে আমার ব্যথা শুরু হলো, রক্তপাত শুরু হলো। আমি মনে করেছিলাম আমার গর্ভের সন্তানকে হারাতে হবে, নিজেও মরে যেতে পারি। আমার দু’ বছরের একটি বাচ্চাও রয়েছে। আমার মৃত্যু ঘটলে তাদের কি অবস্থা হবে? আমার সিজারিয়ান হলো। এরপর বুঝতে পারলাম ডাক্তারদের প্রচেষ্টায় আমি ও আমার সন্তান সুস্থ আছি। আমার রক্তের প্রয়োজনে তরুণ বাংলাদেশিরা এগিয়ে এসেছে।
নূর বেগমের চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ডাক্তার আকাশ মজুমদার জানান, হোপ ফাউন্ডেশন সবচেয়ে প্রান্তিকদের মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করেছে। হোপ ফাউন্ডেশনের বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রসূতি মা ও নবজাতকদের নিরাপদ ও সুস্থ রাখা। তারা প্রসূতি যত্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। হোপ ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্ষদ যেমন সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে তেমনই হোপের কার্যক্রম ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেশ তৎপর রয়েছে। তাদের সেবাধর্মী কার্যক্রমে সন্তুষ্ট বলেই দাতা সংস্থাগুলো হোপ ফাউন্ডেশনকে উদার সহযোগিতা প্রদান করছে। হোপ-এর ম্যাটারনিটি অ্যান্ড ফিস্টুলা সেন্টার প্রতিষ্ঠা প্রায় শেষ পর্যায়ে। এর ফলে দেশের বিশেষ করে কক্সবাজার ও রোহিঙ্গা শিবিরের শরণার্থী মায়েরা নিরাপদে সুস্থ শিশু জন্মদানের সুযোগ পাবেন।
হোপ ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্যদের সদস্য মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, হোপ ফাউন্ডেশন ধীরে ধীরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মসূচি বিস্তৃত করবে। তিনি বলেন, এদেশের স্বাস্থ্য খাতে হোপ ফাউন্ডেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

হোপ ফাউন্ডেশন বিন্দু থেকে বৃত্ত
একজন মানবতাবাদী, আলোকিত চিকিৎসক ব্যক্তিত্ব ডা. ইফতিখার মাহমুদ প্রায় শূন্য হাতে একটি ছোট ক্লিনিক দিয়ে শুরু করেছিলেন হোপ ফাউন্ডেশন। কালের ঘূর্ণমান চাকায় ১৯৯৯ সালের সেই ক্লিনিকটি এখন বিশ্বব্যাপী পরিচিতি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে ডা. ইফতিখার মাহমুদের মানবকেন্দ্রিক উন্নয়নের কারণে। তিনি ভালোবাসেন তাঁর জন্মভূমি বাংলাদেশকে, দেশের মানুষকে, ভালোবাসেন মানবতাকে। তিনি সুদূর আমেরিকায় বাস করলেও নিজ জন্মস্থান বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য সেবার লক্ষ্যে Hope Foundation-কে বিস্তৃত করেছেন কক্সবাজার জেলা সহ দেশের অন্যান্য জেলায়। শুধু এখানেই থেমে যাননি তিনি- প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার থেকে আগত বিপদগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য সেবায় হোপ ফাউন্ডেশনকে কাজে লাগিয়েছেন। তাদেরকে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করছেন নিরলসভাবে। সত্যিই মানুষ হিসেবে তিনি মহান। মানব কল্যাণের অন্যতম উদ্যোক্তা ডা. ইফতিখার মাহমুদ রোগমুক্ত বাংলাদেশের যে স্বপ্ন দেখছেন- তার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটলেই তিনি তৃপ্তি পাবেন একথা নিশ্চিত করে বলা যায়।
বিশ্বের স্বাস্থ্য সেবা খাতে Hope Foundation এবং ডা. ইফতিখার মাহমুদ এখন এতোটাই সম্পৃক্ত যে- একজন ছাড়া আরেকজনের পরিচিতি অপূর্ণ। বাংলাদেশ তার এই কৃতী সন্তান বাংলাদেশি আমেরিকান ডা. ইফতিখার মাহমুদের জন্যে গর্বিত। তিনি তাঁর মানবিক কর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে তুলেছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা ডা. ইফতিখার মাহমুদকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করেছে ২০১৯ সালের New Orlean’s সম্মেলনে। ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অর্গানাইজেশন অব নর্থ আমেরিকা আজীবন সম্মাননা প্রদান করেছে ২০০৭ সালে মায়ামি শহরের সম্মেলনে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমন্বিত সাহায্যে হোপ ফাউন্ডেশন আজকের অবস্থানে এসেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমন্বয়ে একটি পরিচালনা পরিষদের সহায়তায় ডা. ইফতিখার মাহমুদ এই সংগঠন কে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।


