ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারি অবকাঠামো উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান ‘গ্যারান্টকো’ যৌথভাবে আয়োজিত স্থানীয় পুঁজিবাজার অবকাঠামো অর্থায়ন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ২৮ এপ্রিল রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রাইভেট ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট গ্রæপের (পিআইডিজি) চেয়ারম্যান অ্যান্ড্রু বেইনব্রিজ গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সালমান এফ রহমান বলেন, বেসরকারি খাতের উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা আবশ্যক। তিনি বলেন, আমরা যেকোন ধরনের অর্থায়নের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল; কিন্তু এটা আমরা অনুধাবন করতে সক্ষম হইনি যে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক যথোপযুক্ত উৎস নয়। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে অতীতে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও সেগুলো সাফল্য নিয়ে আসতে পারেনি। এ জন্য তিনি পুঁজিবাজারে শক্তিশালী ও কার্যকর বন্ড মার্কেট চালু করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। উপদেষ্টা মনে করেন, এর মাধ্যমে অবকাঠামো খাতের পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পখাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তিনি ডিসিসিআই আয়োজিত এ সম্মেলনকে অত্যন্ত সময়োপযোগী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এই কনফারেন্স থেকে প্রাপ্ত সুপারিশমালা একটি কার্যকর বন্ড মার্কেট প্রবর্তনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে বলে আমি আশা রাখি। তিনি পুঁজিবাজার বিষয়ে বলেন, পুঁজিবাজারের সূচকের উঠা-নামা স্বাভাবিক একটি ধর্ম। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারকে সচেতন থাকার আহ ন জানান সালমান এফ রহমান। তিনি বলেন, গতিশীল বন্ড মার্কেট বিকাশের জন্য আমাদের পুঁজিবাজারকে অবশ্যই কার্যকর রাখতে হবে। উপদেষ্টা আরো বলেন, বর্তমানে আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে রয়েছি। আমাদের বেসরকারিখাতকে এ বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে এবং কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সভাপতি ওসামা তাসীর বলেন, ‘বিগত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন সবার কাছে উদাহরণস্বরূপ। এ দেশ এখন দ্রæততম সময়ে বিকাশমান অর্থনীতির ৫টি দেশের মধ্যে অন্যতম। এই ধারা বজায় রেখে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৮.১৩%। উন্নতির এই ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে বাংলাদেশের আধুনিক সময়ের ইকোনমিক পাওয়ারহাউজে পরিণত হওয়ার সক্ষমতা আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে অবকাঠামো খাতের উন্নয়নের ওপর বিশেষ জোর দেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি। ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, আমাদের দেশে অবকাঠামো খাতের উন্নয়নের বিষয়গুলো অনেকটাই বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা (এডিপি) তথা সরকারি খাতের অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। দ্রুততম সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অভিষ্ট লক্ষ্যে যেতে হলে প্রয়োজন অবকাঠামোর সময়োপযোগী উন্নয়ন। আর এ কারণেই বেসরকারি খাতকে অবকাঠামো উন্নয়নের সাথে যথার্থভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন বলে ডিসিসিআই মনে করে। ওসামা তাসীর বলেন, ঢাকা চেম্বার মনে করে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে অবকাঠামো খাতের উন্নয়নের জন্য এ খাতে ৩২০ বিলিয়ন ইউএস ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। আমাদের জাতীয় বাজেটের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং বেসরকারি খাতকে অবকাঠামো উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন ডিসিসিআই সভাপতি। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি বলেন, বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের উন্নয়নের জন্য ব্যাংকখাত যথোপযুক্ত উৎস নয়; বরং পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড এবং পেনশন ফান্ডের মতো বিবিধ উৎস এ ক্ষেত্রে মুখ্য চালিকাশক্তির ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। তিনি বলেন, পুঁজিবাজার এবং সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন করা প্রয়োজন যাতে করে সকলের সমন্বয়ে অবকাঠামো খাতের অর্থায়ন সহজে করা যায়। এ বিষয়ে এই আন্তর্জাতিক সেমিনারটি থেকে অভিনব এবং সময়োপযোগী চিন্তা এবং পথ নির্দেশিত হবে বলে তিনি আশাবাদ করেন।
প্রাইভেট ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান অ্যান্ড্রু বেইনব্রিজ বলেন, পরিণত এবং উন্নত বাজারে পুঁজিবাজার, বিশেষ করে বন্ড মার্কেট বিষয়টি অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থায়নের অন্যতম উৎস। গ্যারান্টকো বাংলাদেশের বন্ড মার্কেটের উন্নয়নের বিষয়ে নজির স্থাপনকারী গবেষণা ও কাজের মাধ্যমে অবকাঠামো খাতে অর্থায়নের জন্য একে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।
গ্যারান্টকো’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লাসিথা পেরেরা সম্মেলনের একটি সেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, যে কোনো দেশের জন্য একটি টেকসই এবং যথাযথ অবকাঠামো থেকে উপকৃত হওয়ার রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সেই অবকাঠামোর জন্য অর্থায়নটিও যেন যথাযথ হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গত কয়েক দশকে অগ্রগামী পুঁজিবাজারগুলোর উন্নয়নের জন্য সহায়তার কাজে আমাদের অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, দেশের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের ও পরিসরের উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারীর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামোর অর্থায়ন ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। এই বন্ড স্টাডির মাধ্যমে এক উন্নয়নের যাত্রায় প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া হলো। বাংলাদেশের নীতি নির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থাসমূহ, বিনিয়োগকারী এবং স্পন্সরগণ গ্যারান্টকোর সাথে যৌথভাবে কাজের মাধ্যমে এই দেশের পুঁজিবাজারের প্রকৃত সক্ষমতা বুঝতে এবং অবকাঠামোর উন্নয়নের জন্য যথার্থতা নিরুপণ করবেন বলে আশা রাখা যায়।
কনফারেন্সে উন্মোচিত বাংলাদেশ বন্ড মার্কেট বিষয়ক রিপোর্টে বলা হয়, ২০১৬ সাল থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে অবকাঠামোর উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের ৬০০ বিলিয়ন ইউএস ডলারেরও বেশি অর্থ প্রয়োজন। পানি, জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, নদীবন্দর, বিমানবন্দর, রেল ও সড়কপথের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য এ অর্থ প্রয়োজন। যদিও বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে, এই প্রয়োজনীয় অর্থের মধ্যে ৪০০ বিলিয়ন ইউএস ডলারের ব্যবস্থা করা যাবে, বাকি ২০০ বিলিয়ন ইউএস ডলারের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ফ্যাসিলিটির (টিএএফ) অর্থায়নে সম্পাদিত ‘বন্ড স্টাডি’ অবকাঠামো খাতের উন্নয়নের জন্য বন্ড মার্কেটের করণীয় বিষয়গুলো তুলে আনবে। একই সাথে, বন্ড মার্কেটের উন্নয়নের জন্য এই গবেষণা যথাযথ দিক নির্দেশনা তুলে ধরবে।
ডিসিসিআই সহ-সভাপতি জনাব ওয়াকার আহমেদ চৌধুরী অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্যায়ে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। ডিসিসিআই সহ-সভাপতি ইমরান আহমেদ, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ, প্রাক্তন সভাপতিবৃন্দ, সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিবৃন্দসহ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিবৃন্দ এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্যায়ে ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার পলিসি’ এবং ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্সিং’ শীর্ষক দুটি ব্রেকআউট সেশন অনুষ্ঠিত হয়। ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার পলিসি’ সেশনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব মোঃ নজিবুর রহমান সেশন চেয়ার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন; যেখানে ঢাকা চেম্বারের পরিচালক আশরাফ আহমেদ, আব্দুল মোনেম লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর এ এস এম মাঈনুদ্দিন মোনেম, আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের সিইও আরিফ খান এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের ব্যবস্থপনা পরিচালক কে এ এম মাজেদুর রহমান নির্ধারিত আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। এই সেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গ্যারান্টকো’র আঞ্চলিক পরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া) নিশান্ত কুমার।
‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্সিং’ শীর্ষক সেশনটি সঞ্চালনা করেন গ্যারান্টকো’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লাসিথা পেরেরা; যেখানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা চেম্বারের পরিচালক নূহের লতিফ খান, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার নাসের এজাজ বিজয় এবং ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের সিইও এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। এই সেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনফ্রাকো এশিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যালার্ড নুয়ী।
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক


