আন্তর্জাতিকসাক্ষাৎকার

বিশ্ববাসী যত জ্ঞানালোকিত হবার সুযোগ পাবে- উন্নয়ন ধারা ততই গতিশীল হবে

সালমান আমিন খান, বিশ্বখ্যাত শিক্ষা উদ্যোক্তা

বিশ্বের আলোকিত ব্যক্তিদের একজন ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের জরিপে যিনি এ সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের তালিকায় ঠাঁই করে নিতে সক্ষম হয়েছেন- সেই মানুষটির জন্ম শেকড় যদি হয় বাংলাদেশে তখন যে কোনো বাংলাদেশির মনের মধ্যেই অহংকারের ঢেউ দোলা দেওয়া স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে- কে এমন তারকা ব্যক্তিত্ব যাকে নিয়ে ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনের কভার পাতায় ফিচার হয়েছে? তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান সালমান আমিন খান। অনলাইনভিত্তিক শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট ‘খান একাডেমি’র তিনি উদ্যোক্তা এবং প্রতিষ্ঠাতা। খান একাডেমি’র বিস্তৃতি এখন দেশে দেশে- কোটি কোটি মানুষ পাচ্ছেন শিক্ষার আলো; জানতে পারছেন অজানাকে। কর্মক্ষেত্রে পাচ্ছেন উন্নয়নের হাতছানি। সহজেই পাচ্ছেন বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা।
সালমান আমিন খান সংক্ষেপে যিনি এখন সালমান নামেই অধিক পরিচিত- তিনি বিশ্বেব্যাপী জ্ঞান বিস্তারের ক্ষেত্রে এক কিংবদন্তি; যার দিগ্দর্শন হচ্ছে- ‘সকলের জন্যে সব জায়গায় বিনামূল্যে বিশ্বমানের শিক্ষাদান’। সেই মানুষটি যখন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তখন তার পরিচয়ে স্বদেশভূমিও গর্বিত হয়ে ওঠে। তার স্বীকৃতিতে প্রতিটি বাংলাদেশির মধ্যে আনন্দের ঢেউ জাগে।


‘সিএনএন’ তাকে নিয়ে শিরোনাম করেছে ‘শিক্ষায় নতুনত্ব’ ‘বিল গেটস এর প্রিয় শিক্ষক’। আর ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে নিয়ে লিখেছে- ‘একজন মানুষ, একটি কম্পিউটার এবং দশ মিলিয়ন শিক্ষার্থী’। আবার অনেক মিডিয়া বলছে- তিনিই বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক। এখানে পাওয়া যায় সব ধরনের জটিল গণিতের সমাধানসহ বিজ্ঞানের সব কঠিন প্রশ্নের উত্তরও।
সালমান আমিন খান ২০০৪ সালের শুরুর দিকে ইন্টারনেটে ‘ইয়াহু ডুডল’ ইমেজের মাধ্যমে তার চাচাতো ভাইবোনদের পড়াতেন। তার লেকচারের ধরন দেখে অন্যেরাও তার কাছে পড়তে আগ্রহ দেখায়। তার পড়ানোর প্রতি অন্যদেরও এমন আগ্রহ তাকে বিমোহিত করে- তার মধ্যে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস এবং আকাক্সক্ষার জন্ম দেয়। ভাবনা শুরু হয় কীভাবে ঘরে বসেই সারা বিশ্বের অনেক শিক্ষার্থীকে একযোগে পড়াতে পারেন। গণিতের সূত্রে সমাধান করা যায় পৃথিবীর সব জটিল সমস্যার। এরকম একটি মহৎ চিন্তা থেকেই শুরু হলো সালমানের পথচলা। ‘সকলের জন্যে সব জায়গায় বিনামূল্যে বিশ্বমানের শিক্ষাদান’- এই সেøাগানে খান একাডেমি নামে একটি অনলাইনভিত্তিক শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট চালু করলেন সালমান আমিন খান। যেখানে তিনি গণিত ও বিজ্ঞানের জটিল সব সূত্র, সমস্যা এবং প্রশ্নের উত্তর অনেক সুন্দর করে ক্যামেরার সামনে উপস্থাপন করে একাডেমির ওয়েব সাইটে আপলোড করতে থাকেন। শুরু হয় প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন শিক্ষা বিপ্লব।বিশ্বের সকল প্রান্তের সব ভাষার মানুষ উপলব্ধি করে নতুন এক শিক্ষালয় ‘খান একাডেমি’- যা বিশ্ব শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে ওঠে অচিরেই। এ পর্যন্ত খান একাডেমির অ্যালবামে ৬ হাজার ৫শ ভিডিওর মাধ্যমে প্রায় ১ বিলিয়ন লেসন আপলোড করা হয়েছে, যেখানে প্রতি মাসে বিশ্বের প্রায় ৪০ মিলিয়ন শিক্ষার্থী এবং দুই মিলিয়ন শিক্ষক তাদের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। শুরুর মুহূর্তে খান একাডেমির কনটেন্টগুলো শুধু ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হতো; কিন্তু বর্তমানে বাংলা, ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, পর্তুগিজ, তুর্কি এবং হিন্দি ভাষায়ও প্রকাশিত হচ্ছে। একই সাথে অনুবাদ হচ্ছে- ফার্সি, আরবি, জার্মান, পোলিশ, কোরিয়ানসহ ৩৬টি ভাষায়। শিক্ষা ক্ষেত্রে এ এক অন্যরকম প্রাপ্তি, অন্যরকম বিস্ময়!
এ প্রতিষ্ঠানের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- তারা শুধু শিক্ষার্থীদের জন্যেই তাদের লেসনগুলো তৈরি করে না, যে কেউ এখান থেকে পাঠ গ্রহণ করতে পারেন। বিশ্বের দেশে দেশে প্রতিভাবান শিক্ষকরাও এখান থেকে তাদের প্রয়োজনীয় পাঠটি গ্রহণ করে নিজেদের আরও চৌকস ও গুণী শিক্ষকে পরিণত করার সুযোগ পাচ্ছেন। খান একাডেমির অ্যালবাম সবার জন্যেই উন্মুক্ত। প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে আপনি কোন বিষয়ে জানতে চান- এমনকি যে কোনো সমস্যার বিষয়ে খান একাডেমিকে লিখিত আকারেও জানানো যায়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কাক্সিক্ষত সমাধান জানিয়ে দেয় খান একাডেমি।
খান একাডেমি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এতে প্রায় ১০৫ জন সুদক্ষ কর্মী আছেন যারা প্রতিনিয়ত বিশ্ববাসীকে সময়োপযোগী, আধুনিক, বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে নিবিড়ভাবে কাজ করে চলেছেন। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ‘লাভ করা নয়’ সেহেতু এ পর্যন্ত আয়ের চেয়ে প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় হয়েছে খান একাডেমির। তিনি যে বিশ্বেকে শিক্ষিত ও জ্ঞানদান কর্মে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন- তার এসব বিষয় মূল্যায়ন করে কিছু কিছু আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান এই একাডেমিকে বড় অঙ্কের অনুদান দিচ্ছে। গুগল অনুদান দিয়েছে ২ মিলিয়ন ইউএস ডলার, এটিএন্ডটি দিয়েছে ২.২৫ মিলিয়ন ডলার, আয়ারল্যান্ড-ভিত্তিক সংগঠন ও. সালিভাবন ফাউন্ডেশন দিয়েছে ৫ মিলিয়ন গ্রান্ট, যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা মন্ত্রণালয় দিয়েছে ২.২ মিলিয়ন ডলারসহ বেশ কিছু সহায়তা।

দূরদর্শী ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষাবিদ সালমান আমিন খান ছাত্র হিসেবেও প্রখর মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি এমআইটির মতো বিশ্বেখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে গণিত, কম্পিউটার সায়েন্স এবং ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ¯œাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে এখান থেকেই কম্পিউটার সায়েন্স ও ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এই বিশ্ব শিক্ষক হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ করেছেন। এভাবেই নিজেকে অ্যাকাডেমিকভাবেও যোগ্য করে গড়ে তুলেছেন। পড়াশোনা শেষে প্রথমে তিনি চাকরির চিন্তাভাবনা করেন এবং ‘পার্ক’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। তিনি এখানে বিশ্লেষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু চাচাতো ভাইবোনদের জন্যে ভার্চুয়াল শিক্ষকতা করতে গিয়ে উপলব্ধি করলেন শিক্ষক হিসেবে তার রয়েছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা। ভাবলেন, কাজের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সেবা করার সুযোগ রয়েছে- কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার মধ্যে রয়েছে বিশ্বব্যাপী সেবার সুযোগ। সময়োপযোগী সেই সিদ্ধান্ত তাকে আজ মেধাবী ও নন্দিত বিশ্ব শিক্ষকে পরিণত করেছে। ২০১২ সালে ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের জরিপে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন হিসেবে তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন। ইতোমধ্যে কর্ম সাফল্যের স্বীকৃতিতে জিতে নিয়েছেন ‘পদ্মশ্রী’ ও ‘হেইঞ্চ’ অ্যাওয়ার্ডের মতো বিশ্বখ্যাত পুরস্কার। তার প্রতিষ্ঠান খান একাডেমিও অর্জন করেছে ‘মাইক্রোসফট টেক অ্যাওয়ার্ডে’র মতো পুরস্কারসহ আন্তর্জাতিক অনেক সম্মাননা।
সালমান আমিন খানের পিতা ফখরুল আমিন খান বরিশালের সন্তান। বাংলাদেশের শেকড়-ঘনিষ্ঠ এই তরুণ আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, বিশ্বের মানুষ যত জ্ঞানোলোকিত হবার সুযোগ পাবে- উন্নয়নের ধারা ততই গতিশীল হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই সম্ভাবনাময় একটি দেশ।
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button