প্রতিবেদন

‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লিখতে মূল্য সংযোজন হতে হবে ৫০%

অর্থকণ্ঠ ডেস্ক

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার জন্য দ্বিতীয় দফায় জাতিসংঘের সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে প্রস্তুতিকাল হিসেবে পাঁচ বছর সময় পাওয়া গেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ কার্যকর হবে। তবে উত্তরণের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য বেশকিছু সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা থাকছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হলো পণ্যে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখার জন্য অর্থাৎ পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্ক সুবিধা পেতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন কমপক্ষে ৫০ শতাংশ হতে হবে। বর্তমানে মূল্য সংযোজন ৩০ শতাংশ হলেই এ সুবিধা পাওয়া যায়। সুতরাং এ সময়ের মধ্যে মূল্য সংযোজন বাড়াতে না পারলে দেশের শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে গঠিত ইন্টারন্যাল রিসোর্স মোবিলাইজেশন অ্যান্ড ট্যারিফ রেশনালাইজেশন সংক্রান্ত উপকমিটির সভাপতি ও অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদারের সভাপতিত্বে সম্প্রতি এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই এ চ্যালেঞ্জের বিষয়টি আলোচিত হয়। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় চামড়া ও জাহাজ শিল্পসহ স্থানীয় মূল্য সংযোজন বেশি এমন অন্যান্য শিল্পের দিকে বিশেষ নজর দেয়ার সুপারিশও এসেছে। বৈঠকের কার্যপত্র সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
কাঁচামাল আমদানি করে কোনো পণ্য উৎপাদনের পর তা রপ্তানি করা হলে কাঁচামাল আমদানি থেকে রপ্তানি মূল্য বাদ দিলে যা থাকে তা-ই স্থানীয় মূল্য সংযোজন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মাধ্যমে শুধু এলডিসির দেশগুলো ২৬ ধরনের সুবিধা পায়। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে স্থানীয় মূল্য সংযোজন কমপক্ষে ৩০ শতাংশ হলেই পণ্য রপ্তানি বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যায়। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণ হয়ে গেলে বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী পণ্য রপ্তানি বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কমপক্ষে স্থানীয় মূল্য সংযোজন ৫০ শতাংশ হতে হবে।
বৈঠকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমানে রুলস অব অরিজিনের শর্ত অনুসারে এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে ২০২৬ সালের পর থেকে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখার জন্য স্থানীয় মূল্য সংযোজন কমপক্ষে ৫০ শতাংশ হতে হবে। তাই স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়াতে না পারলে স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়। তবে বৈঠকের আলোচনায় চামড়া ও জাহাজ শিল্পে শতভাগ স্থানীয় মূল্য সংযোজন করা সম্ভবের কথাও উঠে আসে। তাই এসব শিল্পসহ যেসব দেশীয় শিল্পে স্থানীয় মূল্য সংযোজন বেশি করা সম্ভব, সেসব শিল্পের দিকে বিশেষভাবে নজর দেয়ার সুপারিশ করা হয়।
এ প্রসঙ্গে শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ হয়ে গেলে সব দেশের জন্যই শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে হলে স্থানীয় মূল্য সংযোজন কমপক্ষে ৫০ শতাংশ হতে হয়। উত্তরণের পর এ ধরনের যতগুলো চ্যালেঞ্জ আসার সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো মোকাবিলা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সরকারের অন্যান্য সংস্থা কাজ করছে। আমরা এখন সার্বিক বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করছি। এ পরিকল্পনার আওতায় এখন থেকে কোন কোন জায়গায় সুযোগ ও সমস্যা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করছি। সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত হয়ে গেলে সরকার সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি, পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও তদারকির (মনিটরিং) জন্য এরই মধ্যে কমিটি গঠন করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসকে সভাপতি করে গত ২৬ এপ্রিল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিনিধিদের নিয়ে ২২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে টেকসই উত্তরণের ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তা পর্যালোচনা করবে। কমিটির অধীনে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে খাত ও বিষয়ভিত্তিক ছয়টি উপকমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ইন্টারনাল রিসোর্স মোবিলাইজেশন অ্যান্ড ট্যারিফ রেশনালাইজেশন সংক্রান্ত উপকমিটি।
এ কমিটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে শুল্ক, করসংক্রান্ত যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলো সমাধানে কাজ করছে। এজন্য আমদানি শুল্ক বা অন্যান্য যে ট্যাক্স আরোপ রয়েছে, সেগুলো আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবর্তনেও কাজ করা হচ্ছে। বিশেষ করে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিদ্যমান ট্যাক্স আইন ও বিধি ডব্লিউটিওর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমন্বয় করা এ উপকমিটির অন্যতম প্রধান কাজ।
উপকমিটির সদস্য বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ বৈঠকে বলেন, ২০২৬ সালের পর এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার উত্তরণের পর শুল্কহার যৌক্তিকীকরণের কারণে একদিকে সরকারের রাজস্ব আয় কমবে, অন্যদিকে দেশীয় শিল্পকে রক্ষা করার বিষয়টি চিন্তায় রাখতে হবে। আমদানি শুল্ক কমানোর ফলে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আমাদের মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ও প্রত্যক্ষ করজাল বাড়াতে হবে। রপ্তানিমুখী সব শিল্পে জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পোশাক শিল্পের পাশাপাশি অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পকেও বিশেষ বন্ডেড ওয়্যারহাউজিং সুবিধা দিতে হবে। তাছাড়া আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
এদিকে বাণিজ্য সচিবের নেতৃত্বে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা ও বাণিজ্য চুক্তিসংক্রান্ত একটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণ ও ট্রানজিশন পিরিয়ড বাড়িয়ে ১২ বছর করার যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কর্মকৌশল নির্ধারণমূলক কাজ করছে এ উপকমিটি। উত্তরণের পরও যেন অন্যান্য এলডিসি দেশের মতো বাংলাদেশও ১২ বছর ডব্লিউটিওর ২৬ ধরনের সুবিধা পায় তা বহাল রাখতে আবেদন জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০২৯ সালের পরে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার জন্যও কাজ চলছে। বর্তমানে যেসব দেশে শুল্কমুক্ত, কোটামুক্ত সুবিধা রয়েছে, এসব সুবিধা আগামীতে অব্যাহত রাখতে কাজ করছে এ উপকমিটি। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ), মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) করাসহ সাত ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ শুরু করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
এদিকে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠায় দেশে ভারী শিল্পের বিকাশে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে শর্ত সাপেক্ষে ১০ বছর মেয়াদে কর অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এবারের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, দেশে মেগা শিল্পের বিকাশ ও আমদানি বিকল্প শিল্পোৎপাদনকে ত্বরান্বিত করার স্বার্থে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠায় সরকার বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশে অটোমোবাইল-থ্রি হুইলার ও ফোর হুইলার উৎপাদনকারী কোম্পানিকে শর্তসাপেক্ষে ১০ বছর মেয়াদে কর অব্যাহতি দেয়া হয়। এছাড়া আলাদা কিছু শর্তসাপেক্ষে আরো ১০ বছর কর অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মোটরগাড়ি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা আরো পাঁচ বছরের জন্য বাড়ানো হয়। পাশাপাশি গৃহস্থালি পণ্য ও হালকা প্রকৌশল শিল্পের পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিকেও শর্তসাপেক্ষে ১০ বছর মেয়াদি কর অব্যাহতি দেয়া হয়। এছাড়া কিছু আইটি হার্ডওয়্যার বাংলাদেশে উৎপাদন করলে শর্ত সাপেক্ষে ১০ বছরের কর অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

অর্থকণ্ঠ ডেস্ক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button