আমেরিকার মূলধারার রাজনীতিবিদ বাংলাদেশি আমেরিকান শেখ রহমান (চন্দন) ইতোমধ্যেই নিজের মেধা, মনন, অধ্যবসায় দ্বারা ‘জর্জিয়া স্টেট সিনেট’ হবার গৌরব অর্জনে সক্ষম হয়েছেন। তিনি ২০২১ সালের ১৪ জানুয়ারি ৫ম ডিস্ট্রিক্ট হতে জর্জিয়া স্টেট সিনেটের সদস্য অর্থাৎ সিনেটর পদে নির্বাচিত হয়েছেন। জর্জিয়ার রাজনীতিতে তিনিই প্রথম মুসলিম ‘ল মেকার’।
তিনি ২০১৯ সালেও স্টেট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছিলেন। একজন সিনেটর হিসেবে যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলেই এবারও তিনি মানুষের সমর্থন লাভ করেছেন।

তার এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশকেও গর্বিত হবার সুযোগ এনে দিয়েছে। তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির একজন বিশিষ্ট নেতা। আলোচিত, আলোকিত এবং কৃতী এই প্রতিভাবান জনপ্রিয় রাজনীতিবিদের জন্ম ১৯৬০ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুরের সরারচরের এক বিশিষ্ট রাজনৈতিক পরিবারে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ১১ বছরের বালক। তার পিতা নজিবর রহমান কিশোরগঞ্জের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এর প্রতিশোধ হিসেবে পাকিস্তানি হানাদাররা তার বালক পুত্র শেখ রহমানকে বন্দি করে এবং মুক্তিযুদ্ধকালের পুরো সময় শেখ রহমান ঘাতক পাকিস্তান বাহিনীর কারাগারে আটক ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধার পুত্র হিসেবে তার প্রতি নির্মম আচরণ করা হয়। স্বাধীনতার পর তিনি কারামুক্ত হন। তার পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা নজিবর রহমান বাংলাদেশ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। শেখ রহমান উচ্চশিক্ষা লাভে বিদেশে যাওয়ার আবেদন করেন। এই সুযোগ লাভের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এবং ১৯৮১ সালের জানুয়ারি মাসে North Carolina-র Piedmont Community College-এ ভর্তি হন। তিনি কলেজের টিউশন ফি’র অর্থ যোগাতে ‘ডিশ ওয়াশার’ (থালাবাসন পরিষ্কারক) হিসেবে কাজ নেন- সেখানে তিনি প্রতি ঘণ্টায় ৩.৩৫ ডলার পারিশ্রমিক পেতেন। সে সময় ইরানিয়ান অধিবাসী কর্তৃক আমেরিকানরা আক্রান্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলে একজন মুসলমান হিসেবে শেখ রহমানকেও বেশ জটিলতার মধ্যে পড়তে হয়। তিনি হতোদ্যম হননি এবং ভেঙে পড়েননি। বরং সমস্যাকে বিশ্লেষণ করে সে অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করেছেন। তিনি আমেরিকান কালচার রপ্ত করেছেন- যা তার শঙ্কামুক্ত থাকার ব্যাপারে সহায়ক হয়েছে।

Piedmont Community College থেকে শিক্ষা অর্জন শেষে শেখ রহমান University of Georgia-তে ভর্তি হন। বুদ্ধিদীপ্ত রহমান এখানে একজন স্টুডেন্ট সিনেটর নির্বাচিত হন এবং Global Studies Association এর প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৯৫ সালে বিবিএ ডিগ্রি লাভের পর শেখ রহমান আমেরিকার নাগরিকত্ব পান। ডিশ ওয়াশার থেকে তিনি একটি রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার এবং Pizza Hut এর কর্পোরেট নির্বাহী হন। সেখান থেকে তিনি এক পর্যায়ে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত হন। বর্তমানে তিনি ব্যবসার মধ্যেই আছেন।
শেখ রহমানের ভাই শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল বাংলাদেশের ১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার বোন নাদিয়া আখতার বাংলাদেশ কমিউনিটি, জর্জিয়ার ৫ বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
২০০৮ সালে বারাক ওবামা ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হলে শেখ রহমান তার দ্বারা বেশ অনুপ্রাণিত হন এবং তিনি রাজনীতিতে অংশ নেন। তিনি National Association for the Advanced Colored People (NAACP), National Action Network, American Civil Liberties Union (ACLU) এবং জর্জিয়ার ডেমোক্রেটিক পার্টিতে যোগদান করেন। তিনি South Asian American Labor এর জাতীয় উপদেষ্টা।
শেখ রহমান বলেন, মানুষের প্রতি তার দরদ, ভালোবাসা এবং কাজের আগ্রহের ফলেই তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি নির্বাচিত হয়েছেন Gwinnett County থেকে, যেখানে অশ্বেতাঙ্গরাই দ্রুত উন্নয়ন করতে সক্ষম হচ্ছে। তিনি জর্জিয়ার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করছেন এবং এখানকার অধিবাসী বিশেষ করে অভিবাসীদের উন্নয়নে কাজ করতে সক্ষম হবেন বলে আশাবাদী। এশিয়ান-আমেরিকান শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে সহযোগিতার ব্যাপারে তিনি বরাবরই আন্তরিক।
তিনি ২০১৯-২০ সালে সিনেটর হিসেবে জর্জিয়া স্টেট সিনেটের কৃষি এবং ভোক্তা বিষয়ক কমিটি, গভর্নমেন্ট ওভারসাইট কমিটি, আরবান অ্যাফেয়ার্স কমিটি, স্টেট ইনস্টিটিউশনস অ্যান্ড প্রোপার্টি কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২০ সালের নির্বাচনেও তিনি বিপুল ভোটে সিনেটর নির্বাচিত হন।
গত ১৪ জানুয়ারি পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শেখ মোজাহিদুর রহমান চন্দন ওরফে শেখ রহমান স্টেট সিনেটর হিসেবে শপথ নেন। এই স্টেট সিনেটর হওয়াটা মোটেই সহজ ছিল না। একজন অভিবাসী হিসেবে তাকে মূলধারার রাজনীতিতে টিকে থাকতেই অন্যদের থেকে বেশি লড়াই করতে হয়েছে। তিনি বাংলাদেশি ও মুসলমান পরিচয়টি ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। অবশ্য দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি এখন আর শুধু বাংলাদেশি বা মুসলমান বা অভিবাসীও নন, তিনি আমেরিকার নাগরিক এবং জর্জিয়ার ডিস্ট্রিক্ট ৫ এর সব মানুষের প্রতিনিধি। তিনি মনে করেন মানুষের এই আস্থা অক্ষণœ রাখতে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং তাতে করে মূলধারায় বাংলাদেশি আমেরিকানদের ভিত শক্ত হবে।
দক্ষ রাজনীতিবিদ ও সিনেটর শেখ রহমানের স্ত্রীর নাম Shamie (Nee Afrose) এবং তাদের দুই সন্তানের মধ্যে বড় হচ্ছে মেয়ে Rawda এবং ছেলে Anzar।
শেখ রহমান একজন গর্বিত বাংলাদেশি আমেরিকান যিনি মূলধারার রাজনীতিতে সফল নেতাদের অন্যতম।
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক



