প্রতিবেদন

মানবিক উন্নয়ন এবং কল্যাণকর্মে নিবেদিত কামরুন নেছা মিরা’র স্বপ্ন ও সাফল্য

অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক

কামরুন নেছা মিরা

চেয়ারম্যান, অল ফর ওয়ান ফাউন্ডেশন

উদ্যোক্তা, চাষীবন ফার্ম

তারুণ্যে উদ্দীপ্ত এক আত্মপ্রত্যয়ী উদ্যোক্তা কামরুন নেছা মিরা। তিনি দেশের কল্যাণ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে নিরলস ভূমিকা ও অবদান রেখে চলেছেন। তিনি অল ফর ওয়ান ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং চাষীবন ফার্মের উদ্যোক্তা। তার জন্ম ১৯৯৫ সালে ঢাকায়। পিতা মো. সেকান্দর আলী দেশের অন্যতম ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, মা কোহিনুর জোয়ার্দার। পৈতৃক গ্রামের বাড়ি নাটোরের পটুয়াপাড়ায়। ছোটবেলা থেকে মেধাবী ও সৃজনশীল কামরুন নেছা মিরা ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ থেকে মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজমে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছেন ২০১৮ সালে। তার মূল বিষয় ছিল পাবলিক রিলেশন।

উদ্যমী কামরুন নেছা মিরা বেশ কিছু প্রফেশনাল ট্রেনিং নিয়েছেন। এর মধ্যে Gender Based Violence in UNDP, Professional Training in Managing gender based violence in emergencies in UNFPA, Professional training in gender mainstreaming and Sustainable Development at ITCLO and Professional training in Confronting gender-based violence at WHO.

কামরুন নেছা মিরা একদিকে যেমন উদ্যোক্তা, তেমনি তার ক্যারিয়ারে যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু কনসালটেন্সি করার অভিজ্ঞতা। তিনি ঢাকা নর্থ সিটি কর্পোরেশনের Slum Development and Social Welfare Department এর কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি Kites Communications, চাষীবন ফার্ম এবং Armira Group এর উদ্যোক্তা-স্বত্বাধিকারী। তিনি মানবিক কল্যাণধর্মী স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ‘All for One Foundation’ এর প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারপার্সন।

সমাজের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ কামরুন নেছা মিরা মাত্র ২৫ বছর বয়সে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে কৃষি ক্ষেত্রে নতুন ধরনের উদ্যোগ নিয়ে সামাজিক কল্যাণকে সম্প্রসারিত করেছেন। তিনি এক্ষেত্রে ‘চাষীবন’ এর মাধ্যমে নতুন ধারণার জন্ম দিয়েছেন- যা কৃষকদের সরাসরি লাভবান এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য হ্রাস করেছে। এতে সফল উৎপাদনকারী কৃষক ও ক্রেতাদের সরাসরি পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় তারা লাভবান হচ্ছেন।

স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর কামরুন নেছা মিরা ‘অল ফর ওয়ান ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেন। তিনি কয়েকশ’ নারীকে বাল্য বিবাহের অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছেন। নারীদের সহিংসতা থেকে বেরিয়ে আসতে পরামর্শ সহায়তা এবং তাদেরকে স্বাবলম্বী হওয়ার কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন। নাটোরের কয়েকটি গ্রামে সামাজিক এসব কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করলেন যে, এদেশের কৃষকরা রক্ত ঘাম ঝরিয়ে ফসল উৎপাদন করছেন ঠিকই কিন্তু তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। তিনি ভাবলেন এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার যাতে কৃষকরা ন্যায্যদাম লাভের সুযোগ পান। কারণ এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষক মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালদের কারণে কৃষি পণ্যের সঠিক মূল্য হতে বঞ্চিত। এটি উপলব্ধি করেই তিনি গ্রামীণ কৃষকদের জন্য এমন একটি মডেল তৈরি করেছেন যার মাধ্যমে তারা এই বঞ্চনা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হচ্ছেন। তিনি চাষীবন-এর উদ্যোগে নাটোর জেলার একটি এলাকায় এই ব্যবস্থা চালু করেছেন। তিনি কৃষকদের স্মার্ট কৃষি ফসল সংগ্রহ ও বিপণন সম্পর্কে শিখিয়ে দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন। তিনি নিজেও সেখানে একটি কৃষি ফার্ম গড়ে তুলেছেন এবং এভাবে পণ্য ভোক্তাদের কাছে সরাসরি বিক্রির ব্যবস্থা করেছেন।

কৃষকদের সাথে কাজ করতে গিয়ে কামরুন নেছা মিরা বেশ কিছু সমস্যা সম্পর্কে বুঝতে পারেন এবং সে সব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন। এটি ছিল তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি দেখেন কৃষকদের মূলধনের ঘাটতি এবং বিমা সুবিধার অভাব রয়েছে, প্রত্যক্ষ বাজারের সাথে কার্যকর সম্পর্কের অভাব অর্থাৎ দুর্বল সম্পর্ক, জলবায়ু অভিযোজনে চ্যালেঞ্জ এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে কিভাবে ফসল রক্ষা করা যায় এসব বিষয়। এসব সমস্যা সমাধানে তিনি একটি কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন যেখানে কৃষি বিষয়ক কর্মকর্তা, প্রশিক্ষক ও বিজ্ঞানীরা তাদের কৃষি কার্যক্রম উন্নয়নের জন্য পোকামাকড় দমন এবং উর্বরতা সম্পর্কে নতুন জ্ঞান সরবরাহের জন্য কৃষকদের বিনামূল্যে অনলাইনে এবং অফলাইনে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। তার চাষীবন ফার্ম কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ এবং সরাসরি শহরে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে। বিনিয়োগ, বিমা, চাহিদা এবং ক্রয়ের আশ্বাস বিবেচনা করে কামরুন নেছা প্রাক-অর্ডার ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা চালু করেছেন। এখানে কৃষক এবং ক্রেতাদের সাথে সংযোগের সময় তিনি মোট অর্থের ষাট শতাংশ দিয়ে পণ্যগুলোর জন্য প্রাক বুকিং নেন। তার এই উদ্যোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকরা জানতে পারেন যে তাদের পণ্যগুলো কোথায় বাজারজাত হচ্ছে এবং তারা পণ্য বিক্রির কেমন দাম পাচ্ছেন। এতে তারা কোনো ধরনের উদ্বেগ অথবা চিন্তা ছাড়া কৃষি কাজে মনোযোগী হতে পারছেন। এই প্রক্রিয়ায় অনেক কৃষক ফসল উৎপাদন করতে পর্যাপ্ত অর্থ পাচ্ছেন। এতে করে কৃষকরা মহাজনি ঋণ বা দালাল ফড়িয়াদের মধ্যস্বত্ব ভোগের সুবিধার যাঁতাকলে পড়ছেন না। তারা ঋণ মুক্ত অবস্থায় স্বচ্ছন্দে কাজ করতে পারছেন।

তার এই ‘চাষীবন’ উদ্যোগের বেশ সাড়া মিলেছে এবং ইতোমধ্যে ১৪৮ জন কৃষক এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হয়েছেন। 

উদ্যমী কামরুন নেছা কৃষকদের জন্য একটি বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র চালু করেছেন যেখানে তারা বিনা পয়সায় স্বাক্ষরতাসহ মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছেন। কামরুন নেছা তার সংগঠনের মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত করছেন।

চৌকস, মানবিক উন্নয়ন কর্মী এবং কল্যাণকর্মে নিবেদিত কামরুন নেছা মিরা তার উদ্যোগ এবং কার্যক্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে জয়বাংলা ইয়থ অ্যাওয়ার্ড এবং ২০১৯ সালে প্রিন্সেস ডায়না অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন।

অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button