অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আপসহীন ও রাজপথের লড়াকু নেত্রী হিসেবে পরিচিত আইভি রহমান ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন রাজনীতি সচেতন। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা অর্জনের প্রতিটি পর্যায়েই তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব ও সোচ্চার। তিনি স্বাধিকার থেকে দেশের স্বাধীনতার আন্দোলন-সংগ্রাম এবং প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। স্বাধীনতার আগে স্বৈরাচারী আইয়ুব এবং ইয়াহিয়া খানের অপশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি অসম সাহসী ভূমিকা রাখেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আইভি রহমান পালন করেছিলেন অনন্য ভূমিকা। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আইভি রহমান ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক। নারী উন্নয়নেও তাঁর অবদান ও ভূমিকা ছিল সমাজের জন্য অনুকরণীয়। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে স্বেচ্ছাসেবী নারী সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা সমিতি সংগঠিত হয়। এই সংগঠনের সভানেত্রী হিসেবে তিনি এর পুনর্গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। আমৃত্যু তিনি এই সমিতির সকল উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের সাথে জড়িত ছিলেন। মহিলা সমিতির নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তিনি বরাবরই নির্দলীয় ও ন্যায়নিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।
আইভি রহমান ১৯৯৬ সালে জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারপারসন হিসেবে বাংলাদেশের অবহেলিত নারী সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক নারী অঙ্গনেও তাঁর অবদান ও ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারী আন্দোলনকারী নেতৃবৃন্দের সাথে তাঁর ছিল গভীর সম্পর্ক। তিনি আন্তর্জাতিক নারী আন্দোলনের নেত্রী হিসেবেও স্বীকৃতি অর্জন করেন। এ দেশের রাজনীতিকে যাঁরা তাঁদের মেধা, শ্রম, প্রজ্ঞা ও সততা দিয়ে আলোকিত করেছেন আইভি রহমান তাঁদের অন্যতম। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। কৈশোরের চাঞ্চল্য দিয়ে যে রাজনীতির শুরু, মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তা কখনো থামেনি। শত ঝড়ঝঞ্ঝাকে উপেক্ষা করে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করতেন। ১৯৬২-এর কুখ্যাত হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বিরোধী আন্দোলন, ’৬৬ সালের ৬ দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামেই তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ইডেন কলেজে অধ্যয়নকালে তাঁর ছাত্ররাজনীতির বিকাশ সূচিত হতে থাকে। বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর সমর্থনে, বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক, অসা¤প্রদায়িক আন্দোলনে আইভি রহমান একজন সুযোগ্য কর্মী হয়ে ওঠেন। ছাত্ররাজনীতি করতে গিয়ে সবার মতো তাঁকেও অনেক বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু আইভি রহমান কোমলমতি হয়েও প্রয়োজনে কঠোর কঠিন রূপ ধারণ করে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম জোরদার করেন। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকার মূল্যায়ন করে এবং সাংগঠনিক যোগ্যতায় মুগ্ধ হয়েই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেন। তিনি উত্তাল সময়ে মহিলা আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন এবং সফলও হন। ওই সময়ে একটি নারী সংগঠনকে সুশৃঙ্খলভাবে গোছানো খুবই কঠিন ছিল। বিশেষ করে অসম আদর্শের নারীদেরকে একই সংগঠনে আনা এবং কাজ করানো। সেই দায়িত্ব তিনি চমৎকারভাবে পালন করে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। কারণ তাঁর ছিল সহমর্মী মন। যা তাঁকে মানুষের বিপদ-আপদে সহযোগিতা প্রদানে অনুপ্রাণিত করতো। আর তাই তিনি মানুষের অন্তরে স্থান করে নিতে পেরেছিলেন খুব সহজে। জাতীয় পর্যায়ের নেত্রী হয়েও তিনি কখনো মঞ্চে বসতেন না। বসতেন সাধারণ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মঞ্চের সামনে। শুধু সাংগঠনিক কার্যক্রমই নয়, একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও তিনি অনেক দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৭১ সালে রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, অন্যদিকে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রূষা করেছেন।
আইভি রহমানের বিয়ে হয় অল্প বয়সে। তাঁর স্বামী মো: জিল্লুর রহমান ছিলেন আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা। তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি। জিল্লুর রহমান ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে মহান ভাষা আন্দোলনে লড়াকু ভূমিকা পালন করেন। তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিকবার অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জাতীয় নেতার মর্যাদা অর্জন করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: জিল্লুর রহমান পেশায় ছিলেন একজন আইনজীবী। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে কারাগারে নেওয়া হলে তাঁর মুক্তির জন্য জিল্লুর রহমান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে আইনি লড়াই করেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসে। ২০০৯ সালে সংসদ উপনেতা জিল্লুর রহমান সংসদ সদস্যদের বিপুল সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি ২০১৩ সালে গুরুতর অসুস্থ হবার পর তাঁকে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তিনি ২০ মার্চ ২০১৩ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।
আইভি রহমান ঘর-সংসারের কাজ গুছিয়েই রাজনীতি করেছেন। তাঁর ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষিত। বড় ছেলে নাজমুল হাসান পাপন বর্তমানে জাতীয় সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড-বিসিবি’র প্রেসিডেন্ট। আইভি রহমান ছাত্রলীগের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে রাজনীতি শুরু করে আপন কর্মপ্রচেষ্টা, সাংগঠনিক সেবা ও দক্ষতা দিয়ে দেশের বৃহত্তম দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক ও মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হয়েছিলেন। এটি তিনি তাঁর স্বামী জিল্লুর রহমানের প্রভাবে পাননি, পেয়েছেন নিজ কর্মতৎপরতায় এবং দলের প্রতি বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখায়। একইসাথে তিনি ছিলেন জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান, মহিলা সমবায় সমিতির সভানেত্রী, বাংলাদেশ মহিলা সমিতির চেয়ারম্যান। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এই সংগ্রামী নারী ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের মিছিল-পূর্ব সমাবেশে নৃশংস গ্রেনেড হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হন এবং দীর্ঘ ৫৭ ঘন্টা মৃত্যুর সাথে লড়াই করে ২৪ আগস্ট ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ঘৃণ্য ওই গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। বক্তৃতা মঞ্চে যিনি ছিলেন অনলবর্ষী বক্তা, রাজপথের আন্দোলনে যিনি ছিলেন অকুতোভয় লড়াকু সেনানী- সেই নেত্রী হারিয়ে গেলেন এ দেশের মানুষের মাঝ থেকে। রাজপথের নেত্রী জীবন দান করলেন রাজপথেই। কিন্তু বাস্তবে আইভি রহমান হারিয়ে যাননি। তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়ে। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তিনি অনুকরণীয় নেতৃত্ব হয়ে থাকবেন এ দেশের সকল মত ও পথের মানুষের মাঝে। বাংলাদেশের মানুষের মনে চির জাগরুক অনন্যসাধারণ এক নেত্রী হিসেবে।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন মূল্যায়ন করলে দেখা যায়- নেতা হওয়ার আকাক্সক্ষা তাঁর তেমন ছিল না। তাই সভা-সমাবেশে সবসময়ই মঞ্চে না বসে সাধারণ কর্মীদের মাঝে বসতেন তিনি। দুর্লভ প্রতিভাধর রাজনীতিক আইভি রহমান সারাজীবন বঙ্গবন্ধুর দর্শন সৎ, সুস্থ ও স্বচ্ছ রাজনীতির প্রবক্তা ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনা ধারণ করতে যে কঠিন অনুশীলন প্রয়োজন তা তিনি কর্মীদের অনুধাবন করার পরামর্শ দিতেন।


