প্রতিবেদনসাক্ষাৎকার

পৃথিবীতে টিকে থাকতে দক্ষতার বিকল্প নেই

প্রকৌশলী আবুবকর হানিপ ম্যানেজিং ডিরেক্টর, পিপল এন টেক, আমেরিকা

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : এনামুল হক এনাম

ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী। সত্যিই তাই। প্রতিভাবান মেধাবী উদ্যোক্তাদের কাছে পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। তেমনই একজন প্রতিভাবান মেধাবী উদ্যোক্তা ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের কৃতী প্রকৌশলী আবুবকর হানিপ। যিনি নিজেই একটি ইন্ডাস্ট্রি অর্থাৎ তার দক্ষতা ও মেধাস্বত্বই তাকে শিল্পে পরিণত করেছে। তিনি তার অভিজ্ঞতা দিয়ে একজন মানুষকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলে ইন্ডাস্ট্রিতে রূপ দিচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস করেন মানুষের দক্ষতা ও পরিশ্রম তার আয়ের পরিমাণ আকাশ উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিপ এই লক্ষ ও উদ্দেশ্য নিয়েই প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘পিপল এন টেক’ নামে একটি দক্ষতা ও প্রযুক্তি উন্নয়ন বিষয়ক ইনস্টিটিউট। এটি শুরুতে আমেরিকায় প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও তিনি এর বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন ভারত ও বাংলাদেশে।
আমেরিকায় গিয়ে এদেশের অধিকাংশ উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিকেও অড জব করতে হয়। যেখানে একদিকে যেমন আয় খুব কম, অন্যদিকে সামাজিক সম্মানের প্রশ্নও দেখা দেয়। তিনি তার পিপল এন টেক-এর মাধ্যমে এই অড জবের পরিবর্তে আমেরিকায় মূলধারার চাকরির সুযোগ করে দিয়েছেন প্রায় ৬০০০ বাংলাদেশিকে। এর মাধ্যমে প্রকৌশলী আবুবকর হানিপ নিজেকে প্রমাণ করেছেন একজন চেঞ্জ মেকার হিসেবে।
প্রকৌশলী আবুবকর হানিপ এর জন্ম কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার চিওড়া গ্রামে। তার পিতা মরহুম আবুল হোসেন (হাশেম) এবং মাতা বিলকিস আরা বেগম। তার শৈশব কেটেছে পিতার বড় ভাই মরহুম সিরাজুল ইসলাম খান মিয়ার চাকরিস্থল চট্টগ্রামের মীরসরাইতে। তার স্কুল ও কলেজ জীবন সেখানেই কেটেছে। ছাত্র হিসেবে মেধাবী আবুবকর হানিপ চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্রিপল ইতে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাসের পর ডিভি লটারি জিতে ১৯৮৩ সালে আমেরিকা যান।
মেধাবী ও প্রত্যয়ী তরুণ প্রকৌশলী আবুবকর হানিপ এক পর্যায়ে মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন ‘পিপল এন টেক’। এর মাধ্যমে তিনি চাকরি প্রত্যাশীদের যোগ্য করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তার সাফল্যের ধারাবাহিক প্রমাণ ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৬ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি মূলধারার চাকরি লাভে সক্ষম হয়েছেন। উদ্যমী ও বিশ্বজয়ী তরুণ প্রকৌশলী আবুবকর হানিপ এর একটি সাক্ষাৎকার এখানে উপস্থাপন করা হলো।

অর্থকণ্ঠ : আপনি দীর্ঘদিন ধরে অনেকের স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় বসবাস করেন। আবার মাতৃভূমির টানে বিভিন্ন সময় দেশেও আসেন। বর্তমানে বাংলাদেশে আপনি কি ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন।
আবুবকর হানিপ : বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকলেও এর মধ্যে বেশ উন্নয়ন লক্ষ্য করছি। বিশেষকরে অবকাঠামোগত খাতে অনেক উন্নয়ন হয়েছে এবং এই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে অভাবনীয় উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। লোড শেডিং খুব একটা দেখা যায় না। ঢাকার বাইরের সড়কগুলোর ব্যাপক উন্নয়ন চলছে। ফোর লেন, সিক্স লেনের কাজ চলছে। পদ্মা সেতুর কাজ এগিয়ে চলেছে। ১০০টি অর্থনৈতিক জোন হচ্ছে যা দেশের শিল্পায়নে বিশাল ভূমিকা রাখবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে আইটি পার্ক প্রতিষ্ঠারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমার মতে, আগের তুলনায় বাংলাদেশ অতি দ্রুততার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান ব্যবস্থা হচ্ছে, যেখানে ২০০৬ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ৬০০ ইউএস ডলার সেখানে ২০১৯ সালের শেষ দিকে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ১৯০০ ডলারেরও বেশি।
অর্থকণ্ঠ : আপনি বলছেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে; দেশের উন্নয়ন হচ্ছে- তাহলে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ হচ্ছে না কেন- এমনকি দেশীয় বিনিয়োগও আশাব্যঞ্জক নয় এর মূল কারণ কি?
আবুবকর হানিপ : একটি দেশের শিল্প-বাণিজ্য প্রসারের ক্ষেত্রে অনেকগুলো টায়ার থাকে। তবে এর মধ্যে যেটি গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে অবকাঠামোগত খাত। অবকাঠামোগত খাতে আমরা বেশ পিছিয়ে আছি বিশেষ করে গ্যাস, বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট, পানি ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমাদের অবকাঠামো বেশ দুর্বল। যদিও বর্তমান সরকারের উদ্যোগে এসব বিষয়ে বেশ উন্নয়ন সাধিত হয়েছে তারপরও তা চাহিদার তুলনায় বেশ অপ্রতুল। এছাড়া ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরের রাস্তাঘাটে যানজটও দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের উৎসাহ ভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থকণ্ঠ : আপনি একজন প্রকৌশলী। বর্তমানে আপনাকে অনেকেই চেঞ্জ মেকার কিংবা কর্মজীবীদের ভাগ্যোন্নয়নের কারিগর বলে অভিহিত করেন। যখন প্রথম আমেরিকায় যান তখন আপনি কি কাজে যোগদান করেছিলেন?
আবুবকর হানিপ : সে এক দুঃখজনক অভিজ্ঞতা। আমি চুয়েট থেকে ট্রিপল ই-তে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে উচ্চ শিক্ষার্থে ও ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় আমেরিকা যাই। কিন্তু স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় বেশ কষ্ট পেলাম। কারণ, সেখানে আমার ইঞ্জিনিয়ারিং সার্টিফিকেটের মূল্যই পাইনি; অন্য অনেকের মতোই আমাকেও অডজব করতে হয়েছে। সপ্তাহে ৬দিন, প্রতিদিন ১০ ঘন্টা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়েছে। অনেকদিন রুমে ফিরে বাথরুমের দরোজা বন্ধ করে চোখের পানি ফেলেছি। কারণ, আমার মনে হয়েছে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দেশে চাকরি করলেও সম্মানজনক ভাবে বাঁচা যেতো। আর এখানে আমার ডিগ্রি মূল্যহীন! অডজব তাও ঘণ্টায় মাত্র ৫ ডলার। খোঁজ নিয়ে দেখলাম আমার চারপাশের বাংলাদেশিদের অনেকেই বিএ, এমএ পাস করে, এমনকি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়াররাও অডজব করছেন। কেউ শপিং মলে, কেউবা রেস্টুরেন্টে। অনেকে আবার ট্যাক্সি চালাচ্ছেন। আমি ভাবলাম এদেশেও অফিস আদালত আছে, ভালো দামী চাকরি আছে কিভাবে সে সব চাকরি পাওয়া যায়, সেই চিন্তা মাথায় ঢুকলো। ভাবলাম, জানতে হবে বুঝতে হবে কি সেই ঘাটতি যার জন্যে উচ্চ শিক্ষা নিয়েও আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েদের অডজব করতে হয়। নিজেই খোঁজখবর করতে লাগলাম। বুঝলাম, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সব সময় যথাযথ কাজে লাগানো যায় না। এর বাইরেও শেখার আছে যা শিখতে পারলে পেশাজীবনে ভালো চাকরির সুযোগ পাওয়া যাবে। আমি আবার পেশাজীবনের সাথে সম্পর্কিত বিষয়ে অর্থাৎ কম্পিউটার সায়েন্স পড়াশোনা শুরু করলাম। অনেক ভালো রেজাল্ট করলাম। কিন্তু তারপরও ভালো চাকরির অফার পেলাম না। অনেকটা হতাশ হয়ে পড়লাম।
অর্থকণ্ঠ : এ অবস্থায় আপনি কি সিদ্ধান্ত নিলেন? দেশে ফেরার
আবুবকর হানিপ : প্রশ্নই ওঠে না। ছোটবেলা থেকেই আমি অনেক আত্মবিশ্বাসী। আমি সেই দেশের সন্তান যে দেশের মানুষ প্রাথমিক পর্যায়ে খালি হাতেই শুরুর মোকাবিলা করতে পিছপা হয়নি। ভাবলাম এটা আমার জীবন যুদ্ধ। এখানে হেরে গেলে চলবে না। আমি তখন ভাবলাম ভেন্ডারস সার্টিফিকেশন পাওয়া যায় কি না? যেমন মাইক্রোসফট, ওরাকল, সিস্টেম এডমিন ইত্যাদি। যদি নিজেকে ডেভেলপ করা যায় তাহলে বোধ হয় সম্ভব। এক্ষেত্রে বাংলাদেশি যারা ভালো চাকরি করছেন, সেই বড় ভাইদের সহযোগিতাও নিলাম। এসব বিষয়ে পড়াশোনা করে সার্টিফিকেট লাভ করলাম। নিজের দক্ষতা বৃদ্ধি করলাম এরপর বেশ সিনিয়র লেভেলে একটি চাকরি পেলাম। যেখানে ৪০ হাজার ডলার বেতন পেলেই খুশি হতাম সেখানে আমি বছরে ৭৫ হাজার ডলারের চাকরি পেলাম। আমি সেই কাজে যোগদান করলাম। কিন্তু একটি ভালো কাজ পেয়েই আমি সন্তষ্ট ছিলাম না আমার মাথায় তখন চিন্তা ঢুকে গেছে যে, আমাদের দেশের সম্ভাবনাময় চাকরিজীবীদের ভাগ্যেরও পরিবর্তন ঘটাতে সহযোগিতা করতে হবে। বিষয়টি অনেকের সঙ্গে শেয়ার করলাম। অনেকেই বললেন এটা কি সম্ভব?
অর্থকণ্ঠ : বেশ ইন্টারেস্টিং। তারপর আপনি কি করলেন? আপনি কখন পিপল এন টেক শুরু করলেন?
আবুবকর হানিপ : আমি অনেককেই অফার দিলাম, কিন্তু তাদের মধ্যে একজন যিনি কম্পিউটার সায়েন্সে গ্রাজুয়েশন করেছেন তিনি আমার প্রস্তাবে রাজি হলেন। তিনি গাড়ি চালাতেন এবং একটা ওয়ার্কশপ দিয়েছিলেন তার ভাইয়ের সাথে। আমি তখন ভার্জিনিয়ায় থাকি। উনি আমার অ্যাপার্টমেন্টেই ৭/৮ সপ্তাহ থাকলেন। আমি ৫ দিন কাজ করতাম। অফিস থেকে ফিরে শার্ট প্যান্ট পরিবর্তন না করেই তাকে পড়াতে বসতাম। রাত ১০/১১টা পর্যন্ত পড়াতাম। এরপর উনি বেশ ক’জায়গায় ইন্টারভিউ দিলেন। এক জাগায় চাকরি পেলেন, বেতন বছরে এক লাখ ডলার যা ছিল তার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। এই বেতন ছিল আমার বেতনের চেয়েও ২৫ হাজার ডলার বেশি।
মূলত তার এই সাফল্য আমাকে ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করলো। আমার ভাবনাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমি সাহস পেলাম। বুঝতে পারলাম, এদেশে চাকরি পাওয়া সহজ কিন্তু আমরা নিজেদের সেভাবে তুলে ধরতে পারি না এবং মূলধারায় চাকরি পাবার জন্যে বাড়তি যে যোগ্যতা দরকার তা গ্রহণ করি না। এটি ভেবেই শুরু করলাম পিপল এন টেক। উপলব্ধি করলাম, এর মাধ্যমে যেমন চাকরি প্রার্থীরা লাভবান এবং ভালো আয় করতে সক্ষম হবে তেমনি দেশের ভাবমূর্তিও অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে। আমার মূল চিন্তাধারা ছিল বাংলাদেশিদের আইটি খাতে দক্ষ করা, আমি তখন ভার্জিনিয়ায় থাকতাম সেখানে সে সময় বাঙালি খুব একটা থাকতেন না। কিন্তু দেখুন আমার মাধ্যমেই এখন সেখানে ৩ হাজারের বেশি বাঙালি থাকছেন ভালো চাকরি নিয়ে। অতীতে অধিকাংশ শিক্ষিত বাঙালি ট্যাক্সি চালাতেন। কিন্তু আমার কথা, এখন প্রতিটি বাঙালি পরিবারেই অন্তত একজন আইটি অভিজ্ঞ লোক রয়েছেন। যারা এদেশে কাজ করে ভালো বেতন পাচ্ছেন। আমাদের পিপল এন টেক এক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে চলেছে।
অর্থকণ্ঠ : সরকারি সিনিয়র লেভেলে চাকরি পাওয়া যথেষ্ট কঠিন হলেও তা কীভাবে সম্ভব করলেন?
আবুবকর হানিপ : যে কোনো প্রতিষ্ঠানই দক্ষ লোক খোঁজে, বিষয়টি বয়স কিংবা সিনিয়র-জুনিয়রের ওপর নির্ভর করে না। একজন লোক যদি বেশি বয়সের হয়, কিন্তু কাজ না জানে তাকে কেউ নেবে না। কিন্তু একজন তরুণও যদি কাজটা জানে তাকে আগ্রহের সাথে নেবে।
সিনিয়র লেভেলে কিংবা মিড লেভেলে জব পেতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল নলেজ ও দক্ষতা লাগে, কর্পোরেট এনভায়রনমেন্ট সম্পর্কে তার ধারণা থাকতে হবে, কাজটি করার আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। যেহেতু সাধারণ একজনের এটি থাকে না, তাই এন্ট্রি লেভেলে খুব কম বেতনে চাকরিতে যোগদান করতে হয়। আমি বিষয়টি উপলব্ধি করেই সে অনুযায়ী চাকরি প্রত্যাশীদের ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলি। ফলে তারা প্রত্যাশিত চাকরি লাভের সকল যোগ্যতা লাভ করে। আমি মনে করি, একাডেমিক শিক্ষার শেষ বছরে যদি তাকে ৬ মাস হাতে কলমে ট্রেনিং দেওয়া হয় তবে সে প্রাথমিক পর্যায়ে চাকরি না খুঁজে সরকারি মিড লেভেল-এর চাকরি খুঁজবে। দেখা যায়, যে লোকটি এন্ট্রি লেভেলে কাজে যোগদান করে মিড লেভেলে যেতে তার ৫/৭ কিংবা ১০ বছর লেগে যায়। কিন্তু মাত্র ৬ মাসের ট্রেনিংয়েই সে সেখান থেকেই শুরু করতে পারছে। এতে তার বেতন-ভাতাও বৃদ্ধি পেলো। এবং দ্রুতই সে শীর্ষ পর্যায়ে পদে উন্নীত হতে পারবে। আমি মনে করি, ব্যক্তির একাডেমিক শিক্ষার সাথে দক্ষতা অর্জনের ট্রেনিংটিও অত্যন্ত জরুরি।
অর্থকণ্ঠ : আপনার পিপল এন টেক যে কাজটি করছে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান আরও গড়ে উঠেছে?
আবুবকর হানিপ : আমরাই শুরু করেছি। তবে আমাদের মেথড ফলো করে ইতোমধ্যে আরও প্রায় ৩০ জন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মাধ্যমেও এখন প্রায় ৩/৪ হাজার বাংলাদেশি আমেরিকায় মূলধারার চাকরি পেয়েছে।
অর্থকণ্ঠ : শুধু ব্যবসা নয়, এ ধরনের একটি কাজ করতে পেরে আপনার মানসিক প্রশান্তি কতোটা?
আবুবকর হানিপ : আগেই বলেছি, আমি নিজে ‘অড জব’ করতে গিয়ে কতখানি কষ্ট পেয়েছি। সেই কষ্ট লাঘব করতেই প্রথমে নিজেকে তৈরি করেছি। এরপর যখন সফল হয়েছি, তারপর একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছি অন্যরাও যাতে সুযোগ পান। এক্ষেত্রে আমি সবসময় নিজের দেশের সম্মানের বিষয়টি ভেবেছি। ভাবতাম, আমরা বাংলাদেশিরা যদি মূলধারার চাকরিতে যোগদান করতে পারি- তবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সমুজ্জ্বল হবে।
আমার মুক্তিযুদ্ধ করার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু আমি যখন রক্তঋণে অর্জিত বাংলাদেশের উন্নয়নে দেশের মানুষের উন্নয়নে কিছু করতে পারি, তখন আমার ভেতর এক ধরনের তৃপ্তি খুঁজে পাই। মনে হয়, আমি সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরই একজন যারা দেশের জন্যে যুদ্ধ করেছেন।
অর্থকণ্ঠ : আপনার কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা যদি বলেন?
আবুবকর হানিপ : আমার দেশে প্রায় ১৪৫টি সরকারি-বেসরকারি ইউনিভার্সিটিসহ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এখান থেকে প্রতি বছর ৫০ থেকে ৬০ হাজার ছেলে-মেয়ে শুধু কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছে। সবাই কি চাকরি পাচ্ছে? না। এর মূল কারণ হলো তারা একাডেমিক শিক্ষা পেয়েছে, সার্টিফিকেট লাভ করেছে কিন্তু তা শুধুই সার্টিফিকেটসর্বস্ব। কিছুদিন আগে ৪ জন ছেলে-মেয়ের সাক্ষাৎকার নিলাম চাকরির জন্যে। একজনকে খুব কষ্ট করে নির্বাচিত করলাম। বাকি ৩ জনকে সাধারণ প্রশ্ন করলাম কিছুই পারলো না। অথচ তারা কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রি লাভ করেছে। অর্থাৎ শুধু সার্টিফিকেট লাভ করেছে, কিন্তু শিক্ষা পায়নি। এখন তারা যদি কাজ পেতে চায় তবে তাদের প্রশিক্ষণ নিতে হবে।
অর্থকণ্ঠ : বিশ্বজুড়ে আইটি খাতের আয় এখন ব্যাপক। আমরা কতটুকু করছি?
আবুবকর হানিপ : আমরা যথেষ্ট পিছিয়ে আছি। প্রতিবেশি ভারতের কথাই ধরুন। তারা ২০১৭ সালে আইটি খাতে আয় করেছে ১০০ বিলিয়ন ডলার। আউট সোর্স থেকে এই আয় করেছে। বাংলাদেশ আয় করেছে ৮০০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ১ বিলিয়নও নয়। আমি ভারতের খুরগাঁও ও নয়গড় আইটি পার্কগুলোতে অফিস করেছি। প্রত্যেকটাতেই মাইক্রোসফট, ওরাকল, অ্যাপেল, সিসকো এসব কোম্পানি আছে। তারা ওখানে কেন যাচ্ছে। কারণ তারা সেখানে ট্যালেন্টদের পাচ্ছে। যোগ্য লোক পাচ্ছে বলেই যাচ্ছে।
এদেশে সরকার আইটি পার্ক করছে, কিন্তু দক্ষ লোক যদি না থাকে তবে এ পার্কে কারা আসবে? তারা কোথায় লোক পাবে! এসব চিন্তা করেই আমি নিজ দেশে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। ছেলে মেয়েদের কম্পিউটার ট্রেনিং দিচ্ছি- তারা আইটি পার্কে কাজ করার সুযোগ পাবে। তারা সেখানে বসেও আউট সোর্সিংয়ের কাজ করতে পারবে। এটি এদেশের জন্যে একটি বড় অপরচুনিটি বলে আমি মনে করি।
অর্থকণ্ঠ : আপনার প্রতিষ্ঠান ‘পিপল এন টেক’ এর মাধ্যমে প্রায় ৬০০০ বাংলাদেশিকে মূলধারার চাকরি পেতে সহযোগিতা করেছেনÑ এতে দেশের অর্থনীতিতে কতটুকু প্রভাব পড়ছে বলে আপনি মনে করেন?
আবুবকর হানিপ : অনেক প্রভাব পড়ছে। কারণ, ‘অডজব’ করে খুব একটা বেশি আয় করা সম্ভব হয় না। সেই অর্থ সংসার নির্বাহেই ব্যয় হয়ে যায়। আর এই যে ৬ হাজার লোক মূলধারার চাকরি করছে তাদের অনেকেই ১/২ লাখ ডলারেরও বেশি অর্থ আয় করছেন। এই টাকার একটা বড় অংশ তারা দেশে রেমিট্যান্স হিসেবে পাঠাচ্ছেন। আমি মনে করি, এই রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করছে। এই সংখ্যা যত বৃদ্ধি পাবে, আমাদের আয় ততই বাড়বে।
অর্থকণ্ঠ : পিপল এন টেক মেধাবী ও দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের কোনো বিশেষ সুবিধা দেয় কি?
আবুবকর হানিপ : অবশ্যই দিয়ে থাকি। ঢাকায় গ্রীন রোডের পান্থপথে পিপল এন টেক এর ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করেছি। ৪ মাসের একেকটি কোর্সে প্রায় ৫২টি আইটি বিষয়ে ৫০টির মতো ব্যাচে সহ¯্রাধিক ছাত্র-ছাত্রী অংশ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির নিকটবর্তী ভার্জিনিয়াতে পিপল এন টেক ইনস্টিটিউট এর প্রধান কার্যালয়। নিউ ইয়র্ক, নিউজার্সি, পেনসিলভানিয়া, কানাডা এবং ভারতেও এর শাখা রয়েছে। আমেরিকায় ৪ মাসের একটি কোর্সের ফি ৪ হাজার ডলার করে। কিন্তু অনেক উদ্যমী ও মেধাবী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্যে ১ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি চালু রেখেছি। ২৫০ জন উদ্যমী বাংলাদেশি প্রশিক্ষণার্থী এই সুযোগ পায় প্রতিবছর। ৪ মাসের কোর্স তারা বিনা ফিতে শিখবেন এবং উচ্চ বেতনের চাকরির জন্যে প্রস্তুত হতে পারবেন। এছাড়া টেস্টিং পেশাজীবী প্রস্তুতেও পিপল এন টেক প্রতি বছর ২০০ জনকে বৃত্তি দেবে বাংলাদেশে। প্রযুক্তিগত খাতে দক্ষ পেশাজীবী তৈরিতে ১০০ জন অভিবাসন প্রত্যাশী এবং ১০০ জন স্থানীয় শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে।
অর্থকণ্ঠ : পেশাজীবী উদ্যোক্তা হিসেবে আপনি একজন সফল ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার আশাবাদ কি?
আবুবকর হানিপ : যে কোনো জাতির উন্নয়নের সোপান হচ্ছে শিক্ষা, নৈতিকতা ও পরিশ্রম। আবার সেই শিক্ষা হতে হবে সময়োপযোগী। আপনি কেরানি তৈরির শিক্ষা দিয়ে উন্নয়ন ধারার সাথে সম্পৃক্ত হতে পারবেন না। আপনাকে বুঝতে হবে এখন আইটির যুগ। আইটি খাতে যে দেশের উন্নয়ন ও আয় বেশি সে দেশ তত এগিয়ে যাবে। আশার কথা, বর্তমান সরকার বেশ কিছু আইটি পার্ক স্থাপন করছে। এতে করে এখানেও সেই সুযোগ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।
আগেই বলেছি, ভারত যেখানে আইটি খাত থেকে আয় করছে ১০০ বিলিয়ন ডলার, সেখানে বাংলাদেশ ১ বিলিয়ন ডলারও আয় করছে না। আমরা করছি মাত্র ৮০০ মিলিয়ন ডলার। আমি মনে করি, এই আয় ৮০০ বিলিয়ন করতে হবে এবং এদেশে এটি সম্ভব। কারণ আমাদের জনশক্তি আছে, তাদেরকে দক্ষ করতে পারলে এটি অসম্ভব কিছু নয়। আমি আশা করছি, আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে আইটি খাতের উন্নত বাংলাদেশ। লাখ লাখ বিলিয়ন ডলার আয় করার সুযোগ পাবো। বাংলাদেশ হবে বিশ্বের উন্নত দেশের একটি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button