বঙ্গবন্ধু : বাঙালির চেতনার বাতিঘর
তির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্ম নিয়েছিলেন বলেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান এবং মা সায়েরা খাতুন। আগামী ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ১০২তম জন্মদিন। তাঁর জন্মদিনে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। তিনি ঔপনিবেশিক ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এবং দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার, প্রবল প্রতিবাদী। বাঙালি জাতিকে শোষণের নাগপাশ থেকে মুক্ত করার জন্যে দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থেকেছেন। জেল-জুলুম নির্যাতন কোনো কিছুই বঙ্গবন্ধুকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন। তাঁর উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলার জনগণ সংগঠিত হয় এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর নৃশংস ও বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। বঙ্গবন্ধু এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের জবাব দিতে ২৬ মার্চ বাঙালি জাতিকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জোরালো আহ্বান জানান। তাঁর ডাকে মুক্তিকামী মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বাংলার লড়াকু ছাত্র-কৃষক-শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী এ লড়াইয়ে শামিল হন। ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ মানুষ শহিদ হয়েছেন। দুই লক্ষাধিক মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ। রক্ত স্রোতে ভাসা এক অসম যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সহায়তায় বাঙালি জাতি বিজয় অর্জন করে।
স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত করেন। কিন্তু পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট কুচক্রী ও সেনাবাহিনীর বিপথগামী কতিপয় সদস্যের নৃশংস বুলেটে সপরিবারে নিহত হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একটি জাতির আর্থসামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় অটল প্রাণপুরুষ, জনদরদি ও মানবতাবাদী বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো নৃশংসভাবে- যাঁর রক্তের ঋণ এ জাতি কোনো দিন শোধ করতে পারবে না। স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার মহান কারিগর বঙ্গবন্ধু এ জাতির জন্যে নিজ জীবন উৎসর্গ করেছেন। বিশ্বে এমন ঘটনা দৃষ্টান্ত বিরল। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বছরের পর বছর এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর অবদান মুছে ফেলার প্রক্রিয়াও নানাভাবে চালানো হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসে যাঁর স্থান সুনির্দিষ্ট ও স্বীয় মহিমায় সমুজ্জ্বল- তাঁকে অস্বীকার করার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। শহীদ বঙ্গবন্ধু দিনের পর দিন হয়ে উঠেছেন আরও দীপ্যমান।
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। মাত্র ৫৫ বছরের জীবনে প্রিয় মাতৃৃভূমি ও বাঙালি জাতির জন্য যে আদর্শ তিনি রেখে গেছেন- তা আমাদের পাথেয়। বঙ্গবন্ধু এ জাতির অনন্য আলোকিত মহান ব্যক্তিত্ব। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে- বঙ্গবন্ধু ততদিন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জাগরুক থাকবেন চেতনায়-মননে। বঙ্গবন্ধু নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে গেছেন বাঙালি জাতির কল্যাণে। জাতির প্রতি বঙ্গবন্ধুর এ টান, মমতা ও ভালোবাসা তাঁকে আন্তর্জাতিকতায় উত্তীর্ণ করে তুলেছিল। বঙ্গবন্ধু একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিবাদী ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেছেন আমৃৃত্যু।
স্বাধীনতার মহান স্থপতি, সার্বভৌম ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক পুরুষ, বাঙালি জাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপন করছি আমরা। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মের শতবর্ষ পূর্তি হয়। বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারির অভিঘাতে তাঁর জন্মশতবর্ষের অনেক অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়। ২০২১ সালে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম নিয়ে বিস্তৃত আকারে উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতিও সীমিত করা হয় করোনা মহামারির কারণে। তারপরও গত বছরের শেষ দিকে বেশকিছু আয়োজন সম্পন্ন হয়। একটি জাতি-রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জনে মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর যে অবদানÑ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা অম্লান করে রাখার জন্য তাঁর জন্ম-শৈশব-কৈশোর, রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে উন্নয়ন দর্শন, মানবতাবোধ সর্বোপরি সোনার বাংলা বিনির্মাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করার বিষয় নিয়ে সাম্প্র্রতিক কালে দেশে এবং বিদেশে প্রচুর গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব গ্রন্থ থেকে মানুষ জানতে পারবে মহান নেতার জীবন সম্পর্কে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে অকুন্ঠ শ্রদ্ধা জানাই। এই মহান নেতা বাঙালির চেতনার বাতিঘর। তাঁর কাছে ঋণের শেষ নেই বাঙালি তথা বিশ্বের শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের। বঙ্গবন্ধু চিরভাস্বর হয়ে আছেন বাঙালির ইতিহাসে। যে ইতিহাস কখনও ম্লান হবে না।


