বাংলাদেশের অনেক নারী ব্যক্তিত্ব পরিবার- পরিজনসহ প্রবাসে শুধু ঘরকন্নার কাজেই ব্যস্ত নন, তারা দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার কথা ভেবে বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে ইচ্ছুক তাদেরই একজন ফ্লোরিডার স্থায়ী বাসিন্দা বাংলাদেশি আমেরিকান তামান্না আহমেদ। শিল্প ও বন্দর নগরী এবং প্রাচ্যের ড্যান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান তামান্না আহমেদ নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজ থেকে তিনি গ্র্যাজুয়েশন সমাপ্ত করেন। বিয়ে হয় এক বাংলাদেশি আমেরিকান, অত্যন্ত মেধাবী আরিফ আহমেদ আশরাফের সঙ্গে।

আশরাফ একজন স্বাধীনচেতা উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী যিনি ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি আমেরিকায় বাংলাদেশিদের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তিনি তার কর্মগুণে ফ্লোরিডায় বাংলাদেশ কমিউনিটিতে ব্যাপক পরিচিত। তিনি বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ফ্লোরিডার জেনারেল সেক্রেটারি। সুযোগ্য স্বামীর ততোধিক যোগ্য সহধর্মিণী তামান্না আহমেদ স্বামীর সহযোগিতা পেয়েই নানাবিধ সামাজিক কর্মকা-ে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। ফেডারেশন অব বাংলাদেশি এসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা ফোবানা’র সাথে সংশ্লিষ্ট তামান্না আহমেদ ২০১৭ সালে ফোবানার রেজিস্ট্রেশন কমিটির চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ কমিউনিটির প্রিয় মুখ তামান্না আহমেদ মনে করেন, আমাদের শেকড় বাংলাদেশ। আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বাস করলেও এখনো তারা দেশ বলতে বাংলাদেশকেই বোঝেন। এখানেই তাদের স্বজন সমাবেশ। দরোজা খুলে রাস্তায় নামলেই নিজেদের মানুষ দেখতে পান যারা তাদের আত্মীয়। স্বাভাবিকভাবে তারা আমেরিকায় বাংলাদেশ কমিউনিটিকে একখ- বাংলাদেশ হিসেবেই ভাবেন। এই নারী সংগঠক মনে করেন, আমেরিকা হচ্ছে একটা বিশ্ব- যেখানে সব দেশের লোকের সমারোহ। এখানে নিজেদের সংস্কৃতিকে বেগবান না করতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের বাঙালি সত্তাকে হারিয়ে ফেলবে। সেই চিন্তা থেকেই তিনি শুধু নিজের সন্তানদেরই বাংলা চর্চা ও সংস্কৃতির সাথেই পরিচয় করিয়ে দেননি, ফ্লোরিডার সকল বাংলাদেশির মাঝে এই চেতনা ছড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, বাঙালি অনেক গর্বিত জাতি যাদের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবস আছে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ যাদের অহংকারের ইতিহাস। তিনি উদ্যোগী হয়ে ওখানেও পহেলা বৈশাখ উদযাপন করেন। ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।

অগ্রবর্তী চিন্তার আলোকিত নারী ব্যক্তিত্ব তামান্না আহমেদ বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশ একদিন বিশ্বে উন্নত রাষ্ট্র ও জাতির মর্যাদা পাবে, এজন্যে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা। তিনি মনে করেন, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে- অনেক উন্নয়ন হচ্ছে; কিন্তু দুঃখ পান যখন দেখেন দেশে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও ধর্ষণ বাড়ছে। তিনি বলেন, সরকারকে এ ব্যাপারে আরও কঠোর হতে হবে। অনেক প্রবাসীই দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী কিন্তু এসব অনাচার অনিয়ম তাদেরকে নিরুৎসাহিত করে দেয়।
মানবিক গুণসম্পন্ন তামান্না আহমেদ এর ইচ্ছা বাংলাদেশে একটি বৃদ্ধনিবাস প্রতিষ্ঠা করবেন। ছোট বেলা থেকেই অন্যের দারিদ্র্য অবস্থা তাকে পীড়া দেয়। তখন থেকেই তিনি মনে মনে এটি করার উদ্যোগ গ্রহণ করছেন।
তামান্না আহমেদ এর মানবিক গুণাবলি তার সন্তানদের মধ্যেও প্রবাহিত। দুখী, দরিদ্র মানুষের কান্নায় তাদের হৃদয়ও কেঁদে ওঠে । তার একটি বড় উদাহরণ- তাদের একমাত্র মেয়ের বয়স যখন ৫ বছর তখন তারা বাংলাদেশে বেড়াতে আসেন। ঢাকা এয়ারপোর্টে নামার পর যখন গাড়িতে উঠবেন তখন চারদিক থেকে দরিদ্র অসহায় মানুষগুলো ঘিরে ধরে বলে, ‘আম্মা কিছু টাকা দেন, ভাত খাবো’। তখন তার মেয়ের মনে একটাই প্রশ্ন ছিল- কত মানুষ তার মাকে আম্মা ডাকছে, কেন টাকা চাচ্ছে, কেন তাদের গায়ে ময়লা ছেঁড়া কাপড়? উত্তরে তিনি তার মেয়েকে বলেছিলেন, ওদের টাকা নেই, ভালো কাপড় কিনে দেওয়ার জন্যে ওদের মা নেই; তাই ওরা তাকে আম্মা ডেকেছে। ছোট্ট মেয়ে তখন বললো- দ্যাটস গুড। তারপর ওর বয়স যখন ৮, তারা আবার দেশে আসেন। দেশে আসার কথা শুনে মেয়ে তাকে বলে, ‘আম্মু তুমি কি আমার ঈদের সালামির টাকা খরচ করে ফেলেছো?’ মা বললেন, না তো- কেন? সে বললো- ‘আমার টাকাগুলো কি সেই গরিব মানুষদের দিতে পারি!’ মা খুশি হয়ে বললেন- অবশ্যই দিতে পারবে। মেয়ে মহাখুশি- দেশে নামার সাথে সাথেই সে গাড়ির ভেতর থেকে জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে সবাইকে ১ টাকা করে দিয়ে যাচ্ছিল। ৮ বছরের শিশুর মুখের সেই হাসি আজও তার মায়ের চোখে ভাসে।
তামান্না আহমেদ জানান, ‘১ টাকায় আহার’ ফেসবুকে এই বিজ্ঞাপন দেখে তিনি চোখের পানি আটকাতে পারছিলেন না। তার মনে হলো- এখনো এ পৃথিবীতে ভালো মানুষ আছে, যারা গরিব দুঃখীদের পাশে আছে। তিনি এটা জানাতেই তার মেয়ে- এই ১ টাকার আহারের অংশীদার হলেন।
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক


