স্বপ্নদর্শী একজন মানুষকে স্বপ্ন শুধু হাঁটতে শেখায় না, দৌড়াতেও শেখায়। তার বড় উদাহরণ বাংলাদেশের প্রযুক্তিখাতের বিশিষ্ট উদ্যোক্তা ব্যক্তিত্ব জাহেদ আজম সায়েম। বাংলাদেশি আমেরিকান হলেও বাংলাদেশকে ঘিরেই তার অধিক স্বপ্ন। তিনি বাংলাদেশের প্রযুক্তিখাতের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান 3S Group of Companies এবং 3S Technologis Ltd. এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর। এটি প্রযুক্তিগতভাবে দেশের বৃহত্তম নজরদারি কাজের অংশ যার মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ, সেনাবাহিনী, এনএসআইসহ সকল ধরনের গোয়েন্দা সংস্থার কাজে সহায়ক হচ্ছে। এই কোম্পানির বাংলাদেশে ৩০০-র অধিক খুচরা বিক্রেতা রয়েছে। বিশ্বের উন্নত মানের পণ্য লিলিন (তাইওয়ান), ইয়ালিংক (চায়না), নাইটজেন বায়োমেট্রিক্স (কোরিয়া), ভিডিও ও নেটিক্সসহ বিশ্বজুড়ে পরিচিত অনেক পণ্যের দেশব্যাপী পরিবেশক এই কোম্পানি। এই কোম্পানি সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা বিষয়ক কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ একটি সুনির্দিষ্ট এলাকায় এই কোম্পানির স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরায় নির্দিষ্ট অপরাধী কিংবা তার গাড়িসহ অন্যান্য কিছুর খোঁজ পাওয়া যায় খুব সহজেই। সংস্থাটি বিশ্বের উন্নত ও বৃহত্তম পর্যায়ের প্রযুক্তির সাথেও যুক্ত হয়েছে। যেমন ‘ইলোলজি’ যা রাজধানীর গুলশান, বনানী, নিকেতনকে পান্থপথ পর্যন্ত ১৫০০ প্লাস মিলিটারি গ্রেড ক্যামেরা এবং কন্ট্রোলরুমের সাথে যুক্ত করে।

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হলেও উদ্যোক্তা ব্যক্তিত্ব জাহেদ আজম সায়েম ঠিক সেখানে থেমে যাননি। তিনি এখানে বিশ্বমানের নজরদারি ব্যবস্থা ও সরঞ্জাম সরবরাহ করেছেন। এর ফলে প্রায় ৩০% অপরাধের হার হ্রাস পেয়েছে। এটি ঘটছে থ্রি এস টেকনোলজিস লি. এর মাধ্যমে নতুন নতুন প্রযুক্তি, অ্যানালিটিক্স এবং অন্যান্য প্রযুক্তি পণ্য বাংলাদেশে ব্যাপক আকারে প্রয়োগ হয়েছে বলেই। এটি নিঃসন্দেহে শুধু বাংলাদেশ নয়, উন্নত বিশ্বের জন্যেও অবাক করার বিষয়।
তাইওয়ানের ‘মেরিট লিলিন’ আইপি ক্যামেরাকে বিশ্বের অন্যতম পরিশীলিত ব্র্যান্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদের পণ্যগুলো ভোক্তাভিত্তিক পণ্য সাইকেল স্যামসাং বা হুয়াওয়ে নয়, সে কারণেই এটি মিডিয়া বা অন্য কোথাও দেখা যায় না। কিন্তু এই ব্র্যান্ড বিশ্বের অগ্রসর প্রযুক্তি দিয়ে গঠিত। প্রযুক্তি বিষয়ক আত্মপ্রত্যয়ী উদ্যোক্তা জাহেদ আজম সায়েম তাইওয়ানকে প্রস্তাব দিয়েছেন যে, তারা বাংলাদেশে এই ব্র্যান্ড পণ্যগুলো তৈরি করতে চান। প্রাথমিকভাবে তাইওয়ান অনেকটা তাচ্ছিল্য করে বলেছিল এটি আপনার স্বপ্নমাত্র এবং প্রযুক্তিকে ভাগ করে নেওয়া যায় না। তারা 3S গ্রুপকে প্রস্তাব দিয়েছিল দেশব্যাপী পরিবেশক নিয়োগ করে তাদের প্রযুক্তি পণ্য আমদানি করার। কারণ বাংলাদেশে এই প্রযুক্তি বোঝার মতো সংস্থা বা পর্যাপ্ত প্রকৌশলী নেই। কিন্তু জাহেদ আজম সায়েম কঠোর পরিশ্রম, ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালির দিক নির্দেশনা ইত্যাদি মেনে এটি উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেন যাতে তিনি প্রমাণ করেছেন তারা এক্ষেত্রে বিশ্বমানের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছেন যে তাইওয়ানিজ সুপার ব্র্যান্ডের পণ্য নিজেরা তৈরি করতে সক্ষম। আজ লিলিন 3S গ্রুপ এবং জাহেদ আজমকে বিশ্বমানের আইপি ক্যামেরা তৈরির জন্যে স্থানীয়ভাবে নয়, পুরো মার্কেটে রপ্তানি করার জন্যে অনুমতি এবং প্রযুক্তি দিয়েছে। এটি নিশ্চিত করে বলা যায়, শিগগিরই বাংলাদেশের তৈরি এই পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করবে।
জাহেদ আজম সায়েম প্রমাণ করে দিয়েছেন একজন বাংলাদেশি আমেরিকান তার আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নকে অধ্যবসায় দ্বারা বাস্তবায়ন করতে পারে।

জাহেদ আজম সায়েম রাজনীতি করেন না, কোনো প্রভাব বলয়েও তার অবস্থান নয়; কিন্তু আত্মপ্রত্যয়ী এই যুবক তার কর্মের মাধ্যমে নিজের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষকে প্রমাণ করে দিয়েছেন- তিনি বাংলাদেশের এক গর্বিত সন্তান। যার চিন্তা-চেতনায় বাংলাদেশের উন্নয়ন ও কল্যাণ যেমন নিহিত, তেমনি আমেরিকার জন্যেও তিনি ভাবেন।
প্রযুক্তিখাতের এই সুযোগ্য উদ্যোক্তার জীবনও বেশ চ্যালেঞ্জিং। তিনি যখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়েন তখনই তার মধ্যে ‘উদ্যোক্তা’ ও ‘অনন্য’ হবার ইচ্ছে স্থান পায়। ১৯৮৮ সালে তাদের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এবং তার পিতা ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের জন্যে ভর্তি হন। অধ্যয়ন শেষে তার পিতা ৯০ দশকের মধ্যভাগে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
এ পর্যায়ে জাহেদ আজম সায়েম মাত্র ১২ বছর বয়সে নিজের চেষ্টায় কানাডা চলে যান। ১৫ বছর বয়সে তিনি সেখানকার একটি প্রাইভেট স্কুল থেকে অধ্যয়ন শেষ করে Mc Master University-তে ভর্তি হন এবং কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করেন।
১৬ বছর বয়সে তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন এবং সে থেকে একটি দিনও কর্মহীন সময় কাটাননি। অত্যন্ত দৃঢ় মনের কাজ পাগল মানুষ বলেই যখন যেখানে কাজ করেছেন সফল হয়েছেন। জাহেদ আজম সায়েম বলেন, দৃঢ় মনে কাজ করলে সফলতা আসবেই।
তিনি নিজের ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্যোগ নেওয়ার আগে কানাডার দু’টি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান AIG এবং Bell Canadaতে কাজ করেছেন। তিনি ২০১২ সালে কানাডা ছেড়ে আমেরিকায় একটি ভালো চাকরির অফার পান। কিন্তু কানাডিয়ান কোম্পানির উদ্যোক্তা মালিক তাকে যেতে দেননি।
জাহেদ আজম সায়েম ২০১৪ সালে মাতৃভ‚মি বাংলাদেশে তার কয়েকজন পারিবারিক পর্যায়ের বন্ধুর সাথে বিনিয়োগ করেন এবং এ কোম্পানিকে কানাডা ও আমেরিকান কালচারে গড়ে তোলেন। শুরুতে একটি ছোট রেস্টুরেন্ট এবং ছোট একটি আইটি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। সেটাই বর্তমানে 3S Technologies Limited নামের মহীরুহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বলা যায়, বাংলাদেশে এটিই এখন বৃহত্তম আইটি ফার্ম।
একজন জাহেদ আজম সায়েম এদেশের স্বর্ণ সন্তান- যার হাতে রয়েছে পরশ পাথর। তিনি যেখানেই স্পর্শ করেন তাই সোনা হয়ে যায়। মাতৃভ‚মি বাংলাদেশ আজ তার জন্যে গর্বিত।৩
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক


