বাংলাদেশের স্বপ্নদর্শী যে সকল উচ্চশিক্ষিত তরুণ নিজেদের যোগ্যতার মাধ্যমে পৃথিবীর উন্নত দেশে প্রতিষ্ঠা লাভের অভিপ্রায়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন তাদেরই একজন মো. মাহমুদুর রহমান খান শাহীন। যিনি এখন হংকং এর বিজনেস ওয়ার্ল্ডে M.R. Khan Shaheen নামেই সমধিক পরিচিত। এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অগ্রগতিতে এম আর খান শাহীন তার উদ্যোগ ও গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রেখে চলেছেন।
এম আর খান শাহীন দেশের এক মেধাবী সন্তান। তার জন্ম ১৯৬৮ সালে নোয়াখালীর এক শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত পরিবারে। পিতা মরহুম এ এস খান এবং মা সালেমা খাতুন। পিতা ছিলেন রেলওয়ে কর্মকর্তা। সে সুবাদে তার পড়াশোনার অনেকটাই চট্টগ্রামে। তিনি চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ স্কুল থেকে মেধাবী ফলাফল নিয়ে ১৯৮৫ সালে এসএসসি এবং ১৯৮৭ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেন। এইচএসসিতে তিনি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে কমার্স গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। মেধাবী শাহীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিকম অনার্সসহ ১৯৯৩ সালে এমকম ডিগ্রি অর্জন করেন।

ওই সময় দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসমূহে সরাসরি সিনিয়র অফিসার/ফিন্যান্সিয়াল এনালিস্ট পদে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ চলছিল। ১৯৯৪ সালে তিনি সোনালী ব্যাংকে ফিন্যান্সিয়াল এনালিস্ট হিসেবে নিয়োগপত্র লাভ করেন। কিন্তু সোনালী ব্যাংকে যোগদান করা হয়নি। দেশের অন্যান্য শিক্ষিত তরুণ আমেরিকা এবং ইউরোপিয়ান কান্ট্রিতে যাবার উদ্যোগ নিলেও এম আর খান শাহীন ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ১৯৯৪ সালের শেষের দিকে চলে আসেন হংকং। হংকংয়ে বাংলাদেশি দূরের কথা বাঙালির সংখ্যাই ছিল হাতে গোনা। তিনি তার দক্ষতা ও মেধার সমন্বয়ে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরির সুযোগ লাভ করেন। দু’বছর প্রাইভেট কোম্পানিতে মোটা বেতনের চাকরিতেই কাটিয়ে দেন। তিনি ভাবলেন, চাকরি করলে বেতনের কোনো ঝুঁকি নেই; কিন্তু এতে শুধু নিজের ভাগ্যই গড়ে তোলা হবে। দেশ এবং দেশের মানুষের জন্যে কিছুই করার সুযোগ থাকবে না। এই চিন্তা থেকেই তিনি ১৯৯৬ সালে গার্মেন্টস সেক্টরের ব্যবসা শুরু করলেন। অফিস নিলেন ঢাকার নিউ ডিওএইচএসে। হংকংয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাঙালিদের মধ্যে এম আর খান শাহীনরাই প্রথম ব্যাচ।

বুদ্ধিদীপ্ত, স্মার্ট এবং আত্মপ্রত্যয়ী এম আর খান শাহীন যে কোনো উদ্যোগ গ্রহণের পূর্বে হিসাব-নিকাশ করেন, সম্ভাব্যতা যাচাই করেন। তিনি ১৯৯৬ সালে গার্মেন্টস খাতের ব্যবসা সংশ্লিষ্ট বায়িং হাউজ, এক্সপোর্ট, ইমপোর্ট এবং র’ ম্যাটারিয়াল বাংলাদেশে রপ্তানির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন RK Resources Comp. Ltd। একই নামের প্রতিষ্ঠান হংকংয়েও, নামের শেষে ওহপ. লেখা। তিনি এ প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড সিইও।
আর কে রিসোর্সেস কোম্পানি ইনক. এর মাধ্যমে এম আর খান শাহীন হংকং থেকে প্রতি বছরই প্রচুর পরিমাণ বিদেশি অর্থ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে সক্ষম হচ্ছেন। বাংলাদেশে যেখানে ব্যাংকিং সুদ হার ১০% এর উপরে, হংকংয়ে সেক্ষেত্রে .০১% থেকে ২% মাত্র। সরকার টু সরকারের মাধ্যমে তার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে হংকং থেকে এই ফান্ড এনে এখানকার বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে সহায়তা করেন। দেশে বিদেশি ফান্ড সোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে তিনি একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব।
এম আর খান শাহীন এনআরবি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে ভ‚মিকা রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার তাকে কমার্শিয়ালি ইম্পোর্টেন্ট পার্সন-সিআইপি হিসেবে সম্মাননা প্রদান করেছে।
সিআইপি এম আর খান শাহীন জানান, সরকার এবং উদ্যোক্তারা বিদেশি ফান্ড সোর্সিংয়ের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিলে বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে দ্রুত উন্নয়ন ঘটবে। তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকগুলো থেকে একজন উদ্যোক্তা যখন উচ্চহারে সুদের মাধ্যমে ঋণ নেন, তা কাজে লাগিয়ে ব্যবসাখাতে টিকে থাকাটা নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, বর্তমান বিশ্ব প্রতিযোগিতার। অনেক দেশের উদ্যোক্তাই মাত্র ২% বা তারও কম সুদে ঋণ সহায়তা নিয়ে পণ্য উৎপাদন করছে এবং এতে সে তার পণ্যমূল্য কম রাখতে পারছে- সেক্ষেত্রে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা দেশের ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে পণ্য উৎপাদন করলে সেই পণ্যের মূল্য বেশি রাখতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে তার পক্ষে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। আবার দেশেও যে পণ্য আমদানি হয়ে আসছে, সে পণ্যের মূল্য কম হওয়ায় বিদেশি পণ্যের কাছে দেশীয় পণ্য মার খেয়ে যাচ্ছে। এ জন্যে তিনি উদ্যোক্তাদের সোর্সিংয়ের মাধ্যমে বিদেশি ফান্ড এনে ব্যবহারের পক্ষপাতি। তার মতে, ব্যাংকগুলোও এই ফান্ড সংগ্রহ করে বিনিয়োগকারীদের স্বল্প সুদ হারে ঋণ দিতে পারে।
বর্তমান সরকারকে তিনি ‘ব্যবসা-বান্ধব’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান সরকার এনআরবি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের দেশে বিনিয়োগের অনেক সুযোগ দিয়েছে। দেশে এনআরবি ব্যাংকও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
ঋণ খেলাপি প্রশ্নে এম আর খান শাহীন বলেন, দেশে ব্যাংক ঋণ পেতে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্নীতি এবং অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা ও প্রস্তাবিত শিল্প কিংবা ব্যবসা সঠিকভাবে যাচাই না করে ঋণ প্রদানের ফলেই এটি ঘটে।
নিষ্ঠাবান ব্যবসায়ী এম আর খান শাহীন বলেন, প্রত্যেক ব্যাংকেই ‘Asset Manager’ প্রয়োজন যারা সোর্সিং এর সাথে সম্পর্ক রেখে ব্যাংক ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করবেন। তিনি NRB CIP Association এর যুগ্ম মহাসচিব।
সুদর্শন এমআর খান শাহীনের স্ত্রীর নাম শাহনাজ মাহমুদ। তাদের এক মেয়ে এবং দুই ছেলে। এক ছেলে ইউএসএর পেনসেলভেনিয়ার একটি মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়ন করছে। অন্য দু’সন্তান হংকংয়েই অধ্যয়নরত।
এম আর খান শাহীনের মতে, সন্তানরা শুধু পিতা-মাতার কাছেই সম্পদ নয়, তারা দেশেরও সম্পদ; তাদেরকে যথাযথ সুন্দর ও দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে।
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক


