প্রচ্ছদ প্রতিবেদনপ্রতিবেদন

বাজেটে জীবন ও জীবিকার প্রাধান্য উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ

ফেরদৌস সালাম

ফেরদৌস সালাম

বিশ্বব্যাপী চলছে করোনা ভাইরাসের মহামারি। দেশে দেশে মানুষ আতঙ্কিত, মৃত্যুভয়ের মাঝে অজানা বিপদের আশঙ্কায় সবই তটস্থ। কিন্তু তারপরও থেমে নেই কোনো কার্যক্রম। মানব জীবন যেমন বেঁচে থাকার প্রয়োজনের ব্যাপ্তি মেটাতেই প্রথম যে বিষয়টি প্রয়োজন তা হচ্ছে অর্থ। খাদ্য-দ্রব্য, জামাকাপড়, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাড়ি-ঘর তৈরি অথবা বাসা ভাড়া সবকিছুর জন্যেই প্রয়োজন অর্থ। ফসল ফলাতেও টাকা ছাড়া সার, বীজ-কীটনাশক কিছুই পাওয়া যায় না। এই যে ব্যক্তিজীবন- তেমনই রাষ্ট্র পরিচালনায়ও প্রয়োজন অর্থ। সেবা পেতে হলে তার জন্য টাকা লাগবেই। রাষ্ট্রের অভিভাবক সরকারকে এই টাকা আয়-ব্যয় করতে হয়। যে সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব যত পরিকল্পিত ও স্বচ্ছ সে সরকারের কার্যক্রম তত বেশি অর্থবহ ও ফলপ্রসূ হয়। অর্থাৎ সরকারের বাজেটের উপর সেই দেশ ও জনগণের জীবন-ধারা ও উন্নয়ন কেমন হবে তা উপলব্ধি করা যায়। তবে বাজেট শুধু পেশ করার বিষয় নয়, তা বাস্তবায়নের মধ্যেই কার্যকর ফল নির্ভরশীল। বাংলাদেশের এবারের বাজেট নানা দিক থেকেই তাৎপর্যময়। ১৯৭১ সালে অর্জিত স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রম করছে জাতি। এটি দেশের ৫০তম বাজেট। ১৯৭২ সালে যে বাজেটের শুরু হয়েছিল মাত্র ৮৬৫ কোটি টাকায় এই ২০২১-২২ অর্থবছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকায়। এটি এদেশ ও জনগণের জন্যে এক বিশাল প্রাপ্তি। সে সময় সদ্য যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের লোকসংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে ৭ কোটি এখন তা ১৬ কোটির উপরে। অর্থাৎ দ্বিগুণের অধিক। আর বাজেটের অঙ্ক অকল্পনীয়- বিশালত্বে ভরপুর। 

বাজেট হচ্ছে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের একটি রূপকল্প, একটি দলিল যা দেশের জনগণের নাগরিক চাহিদার আলোকে উপস্থাপিত। একজন ব্যক্তির আয় যত বেশিই হোক না কেন, তিনি যদি হিসাবমতো খরচ না করতে পারেন তাহলে সংসারে যেমন অচলাবস্থা সৃষ্টি হবে তেমনি সরকারের ক্ষেত্রেও। একজনের সংসারে প্রয়োজন ৫ মণ চাউল তিনি যদি ৫০ মণ কেনেন তাহলে তা নষ্ট হবে। আবার যদি ঘরের ঝাড়–র জন্য ৫০০ টাকাও না রাখেন তাহলে গৃহ অচল হয়ে যাবার অবস্থায় দাঁড়াবে। তেমনি সরকারকেও অত্যন্ত দক্ষতা ও যোগ্যতার সাথে বাজেট প্রণয়ন করতে হয়। আশার কথা, বাংলাদেশের বাজেট অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দ্বারা প্রণীত; ধারাবাহিক বাজেটে সরকারের আয়-ব্যয়সহ জনগণের জীবন-ধারার এবং উন্নয়নের রূপকল্প সুন্দরভাবেই উপস্থাপিত হয়। তবে এর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কখনোই পূর্ণ সফলতা দেখা যায়নি। 

স্বাধীনতার ৫০ বছরে পরিকল্পিত উন্নয়ন হলে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবসৃষ্ট রাজনৈতিক সঙ্কট না থাকলে হয়তো উন্নয়নের ক্ষেত্রে আকাশ স্পর্শ করাও সম্ভব ছিল; কিন্তু তা ঘটেনি। বরং একটা সময় বাংলাদেশকে দারিদ্র্যের ছেঁড়া জামা পরে থাকতে হয়েছে। ক্ষুধা-অনাহারে অনেককে কঙ্কালসার থাকতে হয়েছে। আশার কথা, আজ সেই অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। ১৯৭১ সালে যে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১০০ ডলার সে দেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২২০০ ডলারের উপরে। এই মাথাপিছু আয়সহ অন্যান্য উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ দরিদ্র দেশের তালিকা থেকে ছাড়া পেয়ে নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় নিজেদের নাম যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে আগামী দশ বছরের মধ্যে এদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে সক্ষম হবে তাতে সন্দেহ নেই। 

৬ লাখ  ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট

বিশ্বব্যাপী চলছে করোনা মহামারির ভয়াবহ তা-ব। সেই তা-বের শিকার বাংলাদেশও। এখানকার জনজীবনেও অজানা আতঙ্ক, শঙ্কা এবং ভয়ার্ত অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজমান। বিশ্বে ইতিমধ্যে করোনায় ৩৯ লাখেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছে। বাংলাদেশেও করোনায় মৃতের প্রায় ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে। অন্যান্য দেশের মতো আমরাও যুদ্ধ করছি অদেখা এই জীবনধ্বংসী ভাইরাসের সাথে। চলমান করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলা ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারকে গুরুত্ব দিয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্যে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট সংসদে উপস্থাপিত হয়েছে। এবারের বাজেটের স্লোগান হচ্ছে- জীবন ও জীবিকার প্রাধান্য, আগামীর বাংলাদেশ। এটি দেশের ৫০তম বাজেট এবং বর্তমান সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদের তৃতীয় বাজেট ও বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল-এর তৃতীয় বাজেট উপস্থাপন। 

নতুন বাজেটে করোনাভাইরাস মহামারির এই সংকটকালে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে। 

প্রাধান্য রয়েছে ৮টি খাতে 

বাজেটে ৮টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে করোনা নিয়ন্ত্রণে অর্থায়ন ও স্বাস্থ্য খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামাজিক নিরাপত্তার আওতা সম্প্রসারণ করা। এ ছাড়া প্রণোদনা প্যাকেজ সফলভাবে বাস্তবায়ন, নি¤œ আয়ের মানুষের মধ্যে স্বল্প ও বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ, অধিক খাদ্য উৎপাদনে কৃষিতে গুরুত্ব এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রধিকার দেওয়া হয়েছে।

দেশী শিল্পে ছাড়

দেশে উৎপাদিত এবং অধিক ব্যবহার হয় এমন বেশিরভাগ পণ্যের দাম নাগালে রাখতে দেশি শিল্পে ব্যাপক হারে রাজস্ব ছাড় দেওয়ার কথা বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশে কম্পিউটারসহ কিছু পণ্যের উৎপাদন উৎসাহিত করতে সেসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বেশি হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তবে শুল্ক ছাড় পাচ্ছে কৃষিযন্ত্র, স্বাস্থ্য সুরক্ষা পণ্য। অন্যদিকে বিড়ি, সিগারেটসহ তামাকজাতীয় পণ্যের ওপর বাড়তি কর আরোপের ঘোষণা আসছে।

চাল ডাল লবণের কথা 

বাজেট বলতেই এক সময় প্রাধান্য পেতো চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণ। ধরে নেওয়া হতো বাজেট মানেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়বে। হালে এই অবস্থার পরিবর্তন এসেছে। নতুন করে কর আরোপ না করায় চাল, ডাল, চিনি, লবণ, দেশে উৎপাদিত পেস্ট, পাউরুটি, সাবান, বোতলজাত পানি, ফলের জুস, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়বে না। কর অব্যাহতি রেয়াতি সুবিধা এবং আমদানি করা সমজাতীয় পণ্যে শুল্ক আরোপ করায় বিদেশি খেলনায় দাম বাড়লেও কমবে দেশি খেলনার দাম। আমদানি কর সম্পূর্ণ মোটরসাইকেলের চেয়ে দেশে সংযোজিত মোটরসাইকেল কম দামে পাওয়া যাবে। এর ফলে দেশীয় মোটরসাইকেল শিল্পের উন্নয়ন ঘটবে।

বাজেটে মোট ব্যয়

বাজেটে সরকারের মোট ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরের  বাজেটে এটি ছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের পরিচালন ব্যয় বা অনুন্নয়ন খাতে ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৬১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। করোনায় মহামারির ফলে সরকারের পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। চলতি বছরের বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। সে তুলনায় আসছে বছরে পরিচালন ব্যয় বাড়ছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। আর আবর্তন ব্যয় ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ২৮ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় ধরা হচ্ছে ৬২ হাজার কোটি টাকা। আর বিদেশি ঋণের সুদ ব্যয় ধরা হচ্ছে ৬ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা।

  

এডিপির চিত্র

বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। এডিপি এরই মধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) অনুমোদন করেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের পর বাস্তবায়ন হয়েছে ৩৫ শতাংশেরও কম। এদেশের বাজেটের এডিপি বাস্তবায়ন ভাগ্য প্রায়শই এরকম।

আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা

গত বাজেটের চেয়ে এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে আয় খুব বেশি ধরা হয়নি। গত বাজেটে ছিল তিন লাখ ৭৮ হাজার কোটি; এবার তা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। মাত্র ১১ হাজার কোটি টাকা বেশি। এরমধ্যে এনবিআরকে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই প্রথম এনবিআর-এর লক্ষ্যমাত্রা গত বাজেটের সমানই রাখা হয়েছে। আর বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বহির্ভূত কর থেকে আসবে ১৬ হাজার কোটি টাকা। কর ব্যতীত প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৪৩ হাজার কোটি টাকা। আসন্ন অর্থবছরে বৈদেশিক অনুদান পাওয়ার পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা।

মূল্যস্ফীতির হার

এবারের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭.২ শতাংশ। গত বাজেটে এই হার ধরা হয়েছিল ৮.২ শতাংশ। আগামী অর্থবছরের মোট জিডিপির আকার ধরা হচ্ছে ৩৪ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। করোনার কারণে মানুষের আয় কমে গেছে। ফলে মানুষের হাতে টাকার সরবরাহও কমেছে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ সহনীয়ই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নতুন অর্থবছরে মূল্যস্বীতি ৫.৩ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। 

ঘাটতি বাজেট

প্রতি বছরের মতো এ বাজেটও ঘাটতি বাজেট। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এটা স্বাভাবিক। করোনাভাইরাসের কারণে এই ঘাটতি এবার সব সীমা অতিক্রম করছে। আগামী বাজেটে ঘাটতি ধরা হচ্ছে ৬.২ শতাংশ। চলতি বাজেটে তা ৬.১ শতাংশ। এবারের অর্থবছরের বাজেটে অনুদান ব্যতীত ঘাটতির সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে দেবে। ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। আর অনুদানসহ সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হচ্ছে ২ লাখ ১১ হাজার ১৯১ কোটি টাকা। এটি জিডিপির ৬.১ শতাংশ। এ বাজেটে অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ঋণ নেবে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। আর জাতীয় সঞ্চয় পত্র থেকে ঋণ নেবে ৩২ হাজার কোটি টাকা।

অন্যান্য খাত থেকে নেওয়া হবে ৫ হাজার ১ কোটি টাকা। বাজেটে বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯৭ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ

প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা খাতে ৩২ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। করোনা মোকাবিলায় গৃহীত কার্যক্রমসমূহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। গত বাজেটে এটি ছিল ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। করোনা মোকাবিলায় এবারও থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। মানসম্পন্ন গবেষণাভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষার সম্প্রসারণে বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

কিন্তু লক্ষণীয় বিষয়, বাজেটে করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ব্যাপারে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। তাছাড়া এ খাতে গত অর্থবছরে যে পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে তা বন্ধ না হলে এই বাজেট বরাদ্দ সেভাবে সুফল বয়ে আনবে না।

শিক্ষাখাতে ৩৬ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য রাখা হয়েছে ৭১ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের তুলনায় শিক্ষায় বরাদ্দ বেড়েছে .৫ শতাংশ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের জন্য ৯ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সড়কপথের উন্নয়নে

একটি আধুনিক ও টেকসই মহাসড়ক সংযোগ গড়ে তোলার জন্য ৪৫২টি নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে সড়ক পথের উন্নয়নে। গত ১২ বছরে সরকার সড়ক পথের উন্নয়নে ৩৩১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে ৪৫৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক চার এবং তদূর্ধ্ব লেনে উন্নীত করা হয়েছে।

গ্রামে বাড়ি করতেও নকশা এবং কর

বর্তমানে গ্রামে বাড়ি করতে যেমন নকশা প্রয়োজন হয় না তেমনি বাড়ির মালিকের টিআইএন অর্থাৎ কর সনাক্তকরণ নম্বর প্রয়োজন হয় না। নতুন বাজেটে এটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে বাড়ির মালিক করের আওতায় আসবেন। যেকোনো সমবায় সমিতির নিবন্ধনের জন্যেও টিআইএন (ঞওঘ) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

 

জরিমানা কমেছে ভ্যাট ফাঁকির

দেশে অনেকেই ভ্যাট ফাঁকি দেয়। আবার এই ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার জরিমানার পরিমাণ বেশি বলেই তা না দিয়ে আইনিভাবে লড়ে যায়। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আইনে শাস্তি ও জরিমানার বিধান অতিরিক্ত কঠোর করা হলে অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রয়োগে জটিলতার সৃষ্টি হয়। এটি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কর্মকা-কে বাধাগ্রস্ত করে। এ কারণে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২-এ জরিমানা ও সুদের হার কমানোর প্রস্তাব করেছেন তিনি।

 

করমুক্ত আয়ের সীমা

করমুক্ত আয়সীমা আগের অর্থবছরের মতো তিন লাখ টাকা রাখারই প্রস্তাব করা হয়েছে। অবশ্য এই সীমা আরও বাড়ানো উচিত ছিল। কারণ, এখন দেশের মানুষের আর্থিক আয় বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যক্তিগত আয়ের করমুক্ত সীমা অন্তত চার লাখ টাকা করা প্রয়োজন। গ্রাম পর্যায়ে অনেক লোকের আর এই পরিমাণ হলেও তা দেখার কেউ নেই।

দাম কমছে নির্মাণ সামগ্রীর

রড- সিমেন্টসহ নির্মাণ সামগ্রীর দাম কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ বাজেটে এসব পণ্যসামগ্রীর শুল্ক হার কমানো হয়েছে। বাজেটে লৌহজাত পর্ণ প্রস্তুতে ব্যবহার্য কতিপয় কাঁচামাল, স্ক্র্যাপ ভেসেল এবং পিভিসি, পিইটি, রেজিন উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ইথানল গ্লাইকলসহ বিভিন্ন পণ্যে আগাম কর অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। এতে ফ্ল্যাটের মূল্য কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাড়ছে উপবৃত্তি ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানি ভাতা ১২০০০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। আগের বয়স্ক ভাতায় নতুন করে যুক্ত হবে ৮ লাখ মানুষ। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া ঠেকাতে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উপবৃত্তির টাকা বাড়ছে। কারণ, বিদ্যালয়সমূহ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত

দেশের অর্থনীতি ও জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। গত বাজেটের চেয়ে এর পরিমাণ বেড়েছে ৭২৬ কোটি টাকা।

কর্পোরেট কর কমছে

বাজেটে উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী, ব্যাংক-বীমা, কর্পোরেট হাউজের জন্য আশার সংবাদ হচ্ছে ‘করপোরেট ট্যাক্স’ কমছে। আর দুই লাখ টাকার কম সঞ্চয় পত্রে টিআইএন নম্বর লাগবে না। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজে আয়ের ১৫% কর প্রস্তাব রয়েছে।

প্রবাসীদের জন্য সুখবর

গতবারের মতো এবারও প্রবাসীদের জন্য ২% প্রণোদনা রাখা হয়েছে। আর সেবার মান বাড়াতে রেলওয়েতে ৪৭ হাজার জনবল নিয়োগ করা হবে।

২০২২ সালে মেট্রোরেল

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আশান্বিত করেছেন যে, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীতে মেট্রো রেল চলবে। এটি নিঃসন্দেহে দেশের এবং ঢাকাবাসীর জন্য সুসংবাদ। এতে ঢাকার যানজট পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে।

ভূমি সেবার মান বৃদ্ধি

বাংলাদেশে ভূমি নিয়ে জটিলতার শেষ নেই। মামলা-মোকদ্দমা এবং সংঘাতের প্রায় ৬০ শতাংশ ভূমি সংক্রান্ত বিরোধে সৃষ্ট। বর্তমান সরকার ভূমি বিরোধ কমিয়ে আনার জন্য ১৮টি সফটওয়্যারের মাধ্যমে অটোমেশন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এতে ভূমি ব্যবস্থাপনায় নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, পর্চা সংগ্রহ, সব ধরনের সেবা দ্রুত এবং ভোগান্তি মুক্ত করার উদ্দেশ্যে সারাদেশে ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন করছে। এটি অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ।

সরকার বাস্তবতার নিরিখে আইন ও বিচার বিভাগের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ১১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদানের প্রস্তাব রেখেছে।

কালো টাকা সাদা

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রতি বছরই দেওয়া হয়। এ বছর নতুন করে তা দেওয়া হয়নি। গত বাজেটের প্রস্তাবনাকেই বহাল রেখেছে। এতে করে অবাধ সুযোগ থাকছে না। এক অর্থে সতর্ক করার একটা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এতে টিআইবি সাধুবাদ জানিয়েছে। এটি বর্তমান সরকার-প্রধানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার একটি পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা যায়।

উপবৃত্তির টাকা বাড়ছে। কারণ, বিদ্যালয়সমূহ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত

দেশের অর্থনীতি ও জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। গত বাজেটের চেয়ে এর পরিমাণ বেড়েছে ৭২৬ কোটি টাকা।

কর্পোরেট কর কমছে

বাজেটে উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী, ব্যাংক-বীমা, কর্পোরেট হাউজের জন্য আশার সংবাদ হচ্ছে ‘করপোরেট ট্যাক্স’ কমছে। আর দুই লাখ টাকার কম সঞ্চয় পত্রে টিআইএন নম্বর লাগবে না। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজে আয়ের ১৫% কর প্রস্তাব রয়েছে।

প্রবাসীদের জন্য সুখবর

গতবারের মতো এবারও প্রবাসীদের জন্য ২% প্রণোদনা রাখা হয়েছে। আর সেবার মান বাড়াতে রেলওয়েতে ৪৭ হাজার জনবল নিয়োগ করা হবে।

২০২২ সালে মেট্রোরেল

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আশান্বিত করেছেন যে, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীতে মেট্রো রেল চলবে। এটি নিঃসন্দেহে দেশের এবং ঢাকাবাসীর জন্য সুসংবাদ। এতে ঢাকার যানজট পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে।

ভূমি সেবার মান বৃদ্ধি

বাংলাদেশে ভূমি নিয়ে জটিলতার শেষ নেই। মামলা-মোকদ্দমা এবং সংঘাতের প্রায় ৬০ শতাংশ ভূমি সংক্রান্ত বিরোধে সৃষ্ট। বর্তমান সরকার ভূমি বিরোধ কমিয়ে আনার জন্য ১৮টি সফটওয়্যারের মাধ্যমে অটোমেশন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এতে ভূমি ব্যবস্থাপনায় নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, পর্চা সংগ্রহ, সব ধরনের সেবা দ্রুত এবং ভোগান্তি মুক্ত করার উদ্দেশ্যে সারাদেশে ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন করছে। এটি অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ।

সরকার বাস্তবতার নিরিখে আইন ও বিচার বিভাগের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ১১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদানের প্রস্তাব রেখেছে।

কালো টাকা সাদা

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রতি বছরই দেওয়া হয়। এ বছর নতুন করে তা দেওয়া হয়নি। গত বাজেটের প্রস্তাবনাকেই বহাল রেখেছে। এতে করে অবাধ সুযোগ থাকছে না। এক অর্থে সতর্ক করার একটা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এতে টিআইবি সাধুবাদ জানিয়েছে। এটি বর্তমান সরকার-প্রধানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার একটি পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা যায়।

প্রস্তাবিত বাজেটকে আশাব্যঞ্জক বাজেট হিসেবে অনেকেই এর প্রশংসা করেছেন। তবে এটা ঠিক যে, করোনা মহামারির কারণে এরূপ উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ঘোষিত বাজেট আশাব্যঞ্জক হলেও বাস্তবায়নে সরকারকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) তাদের বিবৃতিতে একথা জানিয়েছে।

বিসিআই এর মূল্যায়ন

আশাব্যঞ্জক বাজেট। তবে চ্যালেঞ্জও আছে

প্রস্তাবিত বাজেটে কোনো করদাতা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ১০ শতাংশ তৃতীয় লিঙ্গের শ্রমিক অথবা একশ’র অধিক কর্মচারী নিয়োগ সাপেক্ষে ৫ শতাংশ কর রেয়াতের প্রস্তাব এবং দেশীয় পণ্য উৎপাদনকারী বৃহৎ শিল্পে (অটোমোবাইল) ২০ বছর, হোম অ্যাপ্লায়েন্স ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ১০ বছর কর অব্যাহতি এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে যন্ত্রাংশ উৎপাদনে ১০ বছর কর অব্যাহতি প্রদান করায় বিসিআই অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। বিসিআই মনে করে, প্রস্তাবিত বাজেট দেশীয় শিল্প ও বেসরকারি খাত সহায়ক বাজেট।

তবে বিসিআই জানিয়েছে শিল্প প্রতিষ্ঠানের সমুদয় মূলধন যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে করের হার ৩৭.৫ শতাংশ। এটি কমানোর অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু কমানো হয়নি। তারা শিল্প প্রতিষ্ঠানের মূলধনী যন্ত্রাংশের ওপর আরোপিত ১ শতাংশের অতিরিক্ত সকল প্রকার শুল্ক-করাদি ও মওকুফ করার পুনরায় অনুরোধ জানিয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে করপোরেট ট্যাক্স ২.৫ শতাংশ কমানোতে বিসিআই স্বাগত জানিয়েছে। আমদানি পর্যায়ে ভ্যাটের আগাম কর (এটি) ৪ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশ করায় ধন্যবাদ জানিয়ে বলা হয়েছে, এ কর সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা উচিত। তিন কোটি টাকার ন্যূনতম কার হার .৫০ শতাংশ কমিয়ে .২৫ শতাংশ করায় ধন্যবাদ জানিয়েছে। বিসিআই মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ টাকা করার প্রস্তাব করেছে। বিসিআই বেসরকারি ইউনিভার্সিটি, মেডিকেল কলেজ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আয়ের উপর ১৫% কর আরোপের বিষয়টি বিবেচনার দাবি জানিয়ে বলেছে এতে দেশে উচ্চ শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

বিসিআই ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের চাহিদা ও আকাক্সক্ষা পূরণের লক্ষ্যে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য এই আকারের বাজেট অবাস্তব নয়। তবে বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সুশাসন যথাযথ মনিটরিং, বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাক্সিক্ষত রাজস্ব আদায়।

প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা

বর্তমান সরকার দেশের উন্নয়নে কাজ করছে তাতে সন্দেহ নেই। এজন্য সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে কাজ করছে। কিন্তু দেশে অব্যাহত ধারায় দুর্নীতির বৃদ্ধি সরকারের অনেক সাফল্যকেই ম্লান করে দিচ্ছে। এজন্যে দেশে সরকারের কার্যক্রমের সকল পর্যায়ে প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। এর বাস্তবায়ন সম্ভব হলে প্রস্তাবিত বাজেটের সকল লক্ষ্যই অর্জিত হবে বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন।

অর্থকণ্ঠ ডেস্ক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button