বিশ্বের অনেক দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশি বংশোদ্ভ‚ত মানুষ আন্তর্জাতিক খ্যাতি নিয়ে নিজের অবস্থান সৃষ্টি করেছেন। তাদেরই একজন বায়োকেমিস্ট ও গুণী শিক্ষাবিদ ড. নাহিদ বানু। কর্মপ্রিয় ও বৈচিত্র্যময় পেশাজীবনের অধিকারী সুদর্শনা নাহিদ বানুর জন্ম টাঙ্গাইলের থানাপাড়ার মিয়াবাড়ির এক অভিজাত পরিবারে। তার পিতা মরহুম আব্দুল হালিম ছিলেন একজন সৎ, দক্ষ নিবেদিতপ্রাণ পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি পুলিশ সুপার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। বিদ্যানুরাগী পিতার অতি আদরের কন্যা নাহিদ বানু ছোটবেলা থেকেই দারুণ মেধাবী। তিনি ১৯৭২ সালে আজিমপুর গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৫ সালে হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে। অনার্স এবং ১৯৮২ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন শীর্ষ রেজাল্ট দ্বারা। তিনি ১৯৮৩ সালে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার পদে যোগদান করার সৌভাগ্য অর্জন করেন।
অদম্য মেধাবী নাহিদ বানুর উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের ইচ্ছের ধারাবাহিকতায় সম্পূর্ণ বৃত্তিতে ১৯৮৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেন। ১৯৯২ সালে বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে Hematology তে পোস্ট গ্রাজুয়েট এবং পরে Physiology তে পোস্ট ডক্টরেট লাভ করেন।
পেশাজীবনের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকে বেছে নিলেও আমেরিকায় এসে ১৯৯৭ সালে তিনি বোস্টনে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ওষুধ প্রতিষ্ঠান Citomatrix এর সায়েন্টিস্ট হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৪ সালে তিনি হার্ভার্ডে ফিরে আসেন এবং ‘স্টমসেল’ প্রতিষ্ঠানে রেডিওনারিটিভ মেডিসিন ও সেলুলার থেরাপি বিষয়ক গবেষণা সম্বলিত Biologist হিসেবে যোগদান করেন।

আপাদমস্তক মেধাবী ও নতুন নতুন কর্মআগ্রহী ড. নাহিদ বানু আমেরিকার অনেক খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি ২০১০ সালে নিউ জার্সিতে পরিবারসহ স্থায়ী নিবাস করেন। ২০১৬ সালে গাড়ি ড্রাইভ করতে গিয়ে তিনি দুর্ঘটনার শিকার হন। ওই সময় তিনি ফিলাডেলফিয়ায় চিলড্রেন হাসপাতালের লীড সায়েন্টিস্ট ছিলেন।
উদ্যমী ও আত্মপ্রত্যয়ী এই নারী বসে থাকার মানুষ নন। সুস্থতার পর তিনি ২০১৬ সালে ইউএসএর অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয় সিটি ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত হন। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, গবেষক ও শিক্ষাবিদ ড. নাহিদ বানু আমেরিকার প্রতিষ্ঠিত ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান Mark Pharmaceutical এর বিজ্ঞানী হিসেবে যোগদান করেছেন।
সময়ের কৃতী সন্তান বাংলাদেশি আমেরিকান ড. নাহিদ বানুর বিয়ে হয় ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী অবস্থায়। স্বামী ড. সৈয়দ হাসান মামুনও তখন একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। তিনি কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেছেন। নাহিদ বানুর শ্বশুরবাড়ি ফদিরপুরের গুড্ডিতে। নাহিদ বানুর ভাইবোনেরাও যথেষ্ট মেধাবী। ভাইদের মধ্যে ফিরোজ আহমেদ নিউ ইয়র্ক, ডা. কায়েস আহমেদ ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ও তারেক আহমেদ বোস্টনে রয়েছেন।

ড. নাহিদ বানু ও ড. সৈয়দ হাসান মামুন দম্পতির একমাত্র মেয়ে সাইয়েদা নওরীন নাজমী উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন। তিনি একজন ফিন্যান্সিয়ালিস্ট হিসেবে কনসালটেন্সি করেন। এর আগে তিনি একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের কর্মকর্তা পদে দায়িত্ব পালন করেন।
ড. নাহিদ বানু কথা প্রসঙ্গে বললেন, প্রবাসে থাকলেও বাংলাদেশই তার শেকড়। এক মুহূর্তের জন্যেও তিনি শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের সেই স্মৃতিময় বাংলাদেশকে ভুলতে পারেন না। প্রতি মুহূর্তেই মনে পড়ে স্মৃতিময় বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কার্জন হলের কথা। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনে ছাত্র রাজনীতির সাথেও সংযুক্ত ছিলেন, সহপাঠীদের কেউ কেউ রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
ড. নাহিদ বানু আমেরিকাতেও বাঙালি সংস্কৃতিকে চর্চার মধ্যে রেখেছেন। বাংলাদেশ কম্যুনিটিতে তিনি নতুন প্রজন্মের সন্তানদের মধ্যে এর প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরেন। বাংলাদেশের ভালো কোনো খবর তাকে আপ্লুত করে। তিনি দেশের আত্মীয়-স্বজনদের উন্নয়নের কথা ভাবেন। বাংলাদেশি আমেরিকানদের প্রতিষ্ঠিত হবার ব্যাপারে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
বাংলাদেশের গর্বিত সন্তান ড. নাহিদ বানু মাঝে মাঝেই দেশে আসেন এবং মাতৃভ‚মির উন্নয়ন ধারা তাকে মুগ্ধ করে। তিনি আশা করে বলেন, বাংলাদেশ একটি শিক্ষিত-মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হোক। যেখানে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সমূহের বাস্তবায়ন ঘটবে।৩
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক


