আন্তর্জাতিকসাক্ষাৎকার

জাপানের সাহায্য সংস্থা JETRO-কে নিয়ে বাংলাদেশে বড় ধরনের বিনিয়োগের চেষ্টা করছি

বশির আহমেদ, প্রেসিডেন্ট ব্রিটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ইউকে)

“পদ্মা রেস্টুরেন্ট ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হওয়ায় বাদল চাকলাদার জাপানে তার ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পদ্মা কোম্পানিজ লিমিটেড। তিনি এর প্রেসিডেন্ট। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ২৭টি দেশ থেকে হালাল ফুড আমদানি এবং জাপানের বিভিন্ন স্থানে তা সরবরাহ করেন”

বাংলাদেশের যে সকল সূর্যতরুণ ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা নিজ মেধা, শ্রম ও আন্তরিকতা দিয়ে শীর্ষ উন্নত প্রযুক্তির দেশ জাপানেও ব্যবসা-বাণিজ্যের শক্ত ভিত গড়তে সক্ষম হয়েছেন তাদেরই একজন বাদল চাকলাদার। তিনি Bangladesh Chamber of Commerce and Industry in Japan (BCCIJ)-এর প্রেসিডেন্ট। বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলার সন্তান তারুণ্যে উজ্জীবিত বাদল চাকলাদার জাপানে Misato City’র Saitama’র ঝধরঃধসধ’র বাংলাদেশি পণ্যসহ অন্যান্য দেশের পণ্যসম্ভারে সমৃদ্ধ সুপার মার্কেট বঙ্গবাজার (Bonga Bazar) এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর। তিনি সেখানে তার প্রতিষ্ঠিত উল্লেখযোগ্য রেস্টুরেন্ট ‘পদ্মা রেস্টুরেন্ট’ ও ‘পদ্মা কোম্পানি লিমিটেড’-এর প্রেসিডেন্ট। পদ্মা কোম্পানি লিমিটেড বিশ্বের ২৭টি দেশ থেকে ‘হালাল ফুড’ আমদানির পর তা জাপানের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করে। বাংলাদেশ থেকেও তারা খাদ্য ও খাদ্যপণ্য আমদানি করে।
ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব বাদল চাকলাদারের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার শাসনগাঁও গ্রামে। তার পিতা মরহুম হাজী রমিজউদ্দিন চাকলাদার এবং মা হাসিনা বানু। বুদ্ধিদীপ্ত বাদল চাকলাদার লৌহজং উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে এসএসসি এবং সরকারি তিতুমীর কলেজ ঢাকা থেকে ১৯৮৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেন। এ সময় তার ইচ্ছে জাগে বিদেশে পড়াশোনার। ভাবেন, এমন এক দেশে যেতে হবে যেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগ পাওয়া যায়। এই চিন্তা থেকেই তিনি জাপানকে বেছে নেন। তিনি ১৯৮৭ সালে জাপান আসেন।


আত্মপ্রত্যয়ী ও স্বপ্নদর্শী বাদল চাকলাদার একটি জাপানি স্কুলে জাপানি ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ বেছে নেন। শুরু হয় শিক্ষার পাশাপাশি পেশাজীবন। পরিশ্রমী যুবক বাদল চাকলাদার স্বপ্ন দেখতে থাকেন নিজের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার। ১৯৮৯ সালে তিনি তার জমানো টাকা দিয়ে হোটেল ব্যবসা করার উদ্যোগ নিলেন নাম দিলেন ‘পদ্মা রেস্টুরেন্ট’। এই পদ্মা রেস্টুরেন্ট নাম দেওয়ার পেছনে দু’টি বিষয় কাজ করেছে এক. তাদের বাড়ির পাশের বিশাল পদ্মা নদীর নামও তুলে ধরা, দুই. বাংলাদেশকে উপস্থাপন করা। বিশেষ করে জাপানে প্রবাসী বাংলাদেশিরা যাতে নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে পায় এই রেস্টুরেন্টে। রেস্টুরেন্ট উদ্বোধন করেন ১৯৯০ সালের এপ্রিলে। এই রেস্টুরেন্ট তার ভাগ্য বদলে দিয়েছে। তিনি ব্যবসায়িকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভে সক্ষম হয়েছেন।
পদ্মা রেস্তোরাঁর মানসম্মত খাবারের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে জাপানে। ফলে, বাঙালিরা তো বটেই, বিদেশিরাও পদ্মা’য় উন্নতমানের কারির জন্যে ছুটে আসেন। তারা শুধু পদ্মার কারিরই প্রশংসা নয়, প্রকারান্তরে বাংলাদেশ এবং এদেশের খাবার মানেরও প্রশংসা করেন।
বিশেষ করে অনেক দোকান এবং কোম্পানিতে তিনি ‘হালাল ফুড’ সরবরাহ করেন। এতে বিভিন্ন দেশের মুসলমানসহ অন্য ধর্মের লোকজনও হালাল ফুড ক্রয় করে থাকেন। বাংলাদেশের স্কয়ার, বনফুল, কাজী ফার্মস থেকে তিনি অনেক ধরনের খাদ্যসামগ্রী জাপানে আমদানি করেন। এর মধ্যে বনফুল থেকে স্পাইস, পরোটা; কাজী ফার্মস থেকে সিঙ্গারা, ভেজিটেবলস, ফ্রোজেন কাঁঠাল নেন। বাংলাদেশ থেকে বছরে এখন ৫/৬ লাখ ইউএস ডলারের পণ্য আমদানি করছেন। তিনি আশাবাদী ভবিষ্যতে এর পরিমাণ ৫/৬ গুণ হয়ে যাবে। কারণ, বাংলাদেশি খাদ্যের প্রতি শুধু দেশীয়রাই নয়, বিদেশিরাও বেশ আগ্রহী।
বাদল চাকলাদার সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ‘মেজিস্টেক’ থেকে ২/৩ লাখ ডলারের কাঁচামরিচ ও ফ্রোজেন মাছ নিচ্ছেন। তিনি আশাবাদী বাংলাদেশের অনেক খাদ্যপণ্যই তিনি জাপানে চালু করতে সক্ষম হবেন।


শেকড়ের প্রতি গভীর টান অনুভব করেন বলেই তিনি এ বছরের মার্চে জাপানে একটি সুপার মার্কেট করে নাম দিয়েছেন ‘বঙ্গবাজার’। একই সাথে তিনি ‘বঙ্গ কারী’ নামের আরও একটি হোটেল প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি আশাবাদী এসব প্রতিষ্ঠান দ্রæতই ব্যবসা সফল হতে সক্ষম হবে। তার বড় তৃপ্তি তিনি জাপানেও একখ বাংলাদেশ উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন। জাপান ছাড়াও বাংলাদেশে তার রিয়েল এস্টেট ব্যবসা রয়েছে। এটির নাম BRS। তিনি এর চেয়ারম্যান।
বাদল চাকলাদার বিয়ে করেছেন খাজুমি নামে এক জাপানি নারীকে। খাজুমি বিয়ের আগে ৭ বার রেস্টেুরেন্টে খেতে এসেছেন, সেই থেকে পরিচয়। খাজুমি তখন স্কুলের ছাত্রী। বিয়ের পর খাজুমি তার হোটেল ব্যবসায় যথেষ্ট সহযোগিতা করছেন। তাদের তিন ছেলে অমিত চাকলাদার, হায়াত চাকলাদার এবং আতারা চাকলাদার। বড় দু’জন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন। ছোট ছেলে এখনো হাই স্কুলের ছাত্র। তারা জাপানি ও ইংরেজি ভাষা বেশ ভালো বলতে পারে। বাংলাও নিয়মিত চর্চা করে। মুক্তিযুদ্ধ ও ২১শে ফেব্রুয়ারির কথা শুনে তারা গর্বিত। বড় ছেলে একাই বাংলাদেশে চলে আসে।
বাদল চাকলাদার ২০১১ সালে হজ করেছেন। ২০১৯ সালে স্ত্রী ও ছোট ছেলেকে নিয়ে ওমরা করেছেন।
ইচ্ছে করলেই তিনি জাপানিজ পাসপোর্ট করতে পারেন; কিন্তু করেননি। তিনি বাংলাদেশের পরিচয়টার মধ্যে মাতৃভ‚মির দরদ অনুভব করেন। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের একজন অনুসারী হিসেবে জাপান আওয়ামী লীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সোসাইটি, জাপান এর প্রেসিডেন্ট। এ সোসাইটির মাধ্যমে তারা নিজ এলাকার মসজিদ, স্কুল, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় সহায়তা করে থাকেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগেও সহায়তা দেন। তিনি নিজের গ্রামের প্রাইমারি স্কুলটির উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। বাদল চাকলাদার চট্টগ্রাম ই চেম্বার এর প্রতিনিধি। বাদল চাকলাদার বলেন, জাপানের সাহায্য সংস্থা JETRO- কে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন এবং এদেশে বড় ধরনের বিনিয়োগের চেষ্টা করছেন।
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button