সাক্ষাৎকার গ্রহণ : এনামুল হক এনাম
বাংলাদেশের যেসব উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়ে ভাবেন তাদেরই একজন দেশখ্যাত ফজিলা গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড সিইও আবুল হোসেন। তিনি বাংলাদেশে আফ্রিকার অন্যতম রাষ্ট্র উগান্ডার অনারারি কনসুলার। তিনি এফবিসিসিআই-এর আফ্রিকা বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি। ঢাকা চেম্বারেরও তিনি সক্রিয় সদস্য, সাবেক পরিচালক। তিনি ২০০৭ সালে যখন ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে উগান্ডা যান, তখন দেশটির প্রেসিডেন্ট মুসা বেনীর সাথে সাক্ষাৎকালে তিনি বলেন, বাংলাদেশে উগান্ডার কোনো দূতাবাস নেই। তিনি প্রস্তাব দিয়ে বলেন, আপনার মতো র্স্মাট বিজনেসম্যান যদি বাংলাদেশে আমাদের কনসুলেটের দায়িত্ব নেন তাহলে দু’দেশের মধ্যে ব্যবসা- বাণিজ্য সম্প্রসারিত হতে পারে এবং দুদেশের সম্পর্কও জোরদার হবে। প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবে আবুল হোসেন সম্মতি জানান এবং বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনসাপেক্ষে ২০০৯ সালে তার অফিসে উগান্ডার কনসুলেট অফিস স্থাপন করেন। সে থেকেই তিনি বাংলাদেশে উগান্ডার অনারারি কনসুলারের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

আবুল হোসেন কথা প্রসঙ্গে বলেন, উগান্ডাসহ আফ্রিকায় বাংলাদেশের ব্যবসা করার প্রচুর সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের আয়তনের দ্বিগুণ এই দেশটির লোকসংখ্যা মাত্র ৩ কোটি ৮০ লাখ। প্রচুর কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে আছে। এসব ভূমির ফার্টিলিটি বাংলাদেশের জমির দেড়গুণ। কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে- বাংলাদেশের ভূমি ৯ ইঞ্চিতে সারযুক্ত, আর উগান্ডায় সেখানে দেড় ইঞ্চিতে। অর্থাৎ বেশি ফসল ফলানো সম্ভব। দেশটিতে স্বর্ণ, কপার ও তেলসহ প্রচুর খনিজসম্পদ রয়েছে। এখানকার জমিতে তুলা, কফি, চা, ফলমূল, হর্টিকালচারসহ অনেক ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। এখানে ট্যুরিজমেরও ব্যপক সুযোগ রয়েছে। এখানকার সাফারি পার্কগুলোতে মাউন্টেন গেরিলা দেখা যায়।
তারুণ্যে উদ্দীপ্ত অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী নেতা আবুল হোসেন বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান লোকসংখ্যা ১৭ কোটিরও বেশি। আমরা স্বল্পোন্নত দেশের সিঁড়ি ভেঙে এখন উন্নয়নের দিকে যাচ্ছি। বর্তমানে নিন্ম মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি। ধীরে ধীরে উন্নত দেশে পরিণত হবো। আমাদের কৃষিজমির পরিমাণ অনেক কমে এসেছে। শিল্পায়ন বাড়ছে। এক সময় এখানে কৃষিজমির সঙ্কট দেখা দেবে। এটা শুধু এখানেই নয়- অন্যান্য উন্নত দেশও একসময় এমন হবে যে, আফ্রিকা ছাড়া কোথাও কৃষিজমি অবিশিষ্ট থাকবে না। সে ক্ষেত্রে আমরা যদি এখন থেকেই উগান্ডাসহ আফ্রিকার দেশসমূহে কৃষি, শিল্পস্থাপন এবং নিজেদের পণ্য বাজারজাত করার উদ্যোগ নেই এটি হবে বাংলাদেশের জন্য বিশাল সুযোগ। উগান্ডাসহ আফ্রিকার দেশগুলোতে কটন, কফি, চা যেমন উৎপন্ন হয়, ইচ্ছা করলে সেখানে প্রচুর ফল উৎপাদন করা যেতে পারে। সেখানে প্রচুর ফল উৎপাদন হয়- উদ্যোগ নিয়ে আরো বেশি উৎপাদন সম্ভব। যা বাংলাদেশের জন্য অন্যরকম সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে। সেখানে গার্মেন্টস এবং ওষুধের বিশাল বাজার রয়েছে।

জনসংখ্যা ও আয়তনের দিক দিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশ। বিশাল এই ভুখন্ডে ৫৪টি স্বাধীন দেশ ও ১০০ কোটি মানুষের বসবাস, যেখানে বিনিয়োগের জন্য প্রায় সব খাতই উন্মুক্ত। এক সময়ের যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, সন্ত্রাসবাদ কিংবা দুর্নীতি পীড়িত মহাদেশটির অনেক দেশই এখন নিরাপদ এবং স্থিতিশীল। বতসোয়ানা, নামিবিয়া, মালাউই, ঘানা স্থিতিশীল দেশ। নিরাপদ মরক্কো, কেনিয়া, তানজানিয়া কিংবা উগান্ডার মতো দেশও। পিছিয়ে থাকা এসব দেশে-কৃষি, ওষুধ ও প্রযুক্তি খাত হতে পারে অফুরান সম্ভাবনার। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর অবকাঠামো খাতও বাংলাদেশের বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র।
উগান্ডার অনারারি কনসুলার আবুল হোসেন জানান, গত সাড়ে ১১ বছরে আমরা দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক অনেক বৃদ্ধি করেছি। সেখানকার বিনিয়োগ নীতিমালা খুব আকর্ষণীয়। যে কোনো বিদেশি নাগরিক সেখানে যে কোনো পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে এবং লাভসহ যে কোনো সময় তা উত্তোলন করে দেশে আনতে পারে। তিনি বলেন, উগান্ডার প্রেসিডেন্ট মুসোবিনী বলেছেন রাতে বিনিয়োগ করে সকালে তুলে নিলেও কেউ কোনো বাধা দেবে না। সেখানে বিদেশিদের জন্য ডিউটি ফ্রি, ট্যাক্স ফ্রি সুবিধা রয়েছে।

তিনি বলেন, আফ্রিকা মহাদেশে বাংলাদেশি পণ্যের ব্যাপক চাহিদা আছে। ইতোমধ্যে প্রাণ গ্রুপ অনেক পণ্য বাজারজাত করেছে। তাদের থেকে সিরামিক যাচ্ছে প্লাস্টিক দ্রব্য যাচ্ছে। বিদেশে বিনিয়োগের বিষয়টি যদি বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকার সহজ নীতিমালা করে দেয় তবে সেখানে মিনি বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। এতে প্রচুর কর্মসংস্থানেরও সুযোগ ঘটবে।
আবুল হোসেন বলেন, তরুণ প্রজন্মের জন্যে এক অপার সুযোগ রয়েছে উগান্ডা এবং আফ্রিকার দেশসমূহে। হাইটেক বিজনেস বিশেষ করে আইটি সেক্টরে তাদের জন্যে রয়েছে অমিত সম্ভাবনা। তারা সফটওয়্যারের কাজ করতে পারবে। ওখানে সবেমাত্র উন্নয়নের শুরু। এসময়টাই বাংলাদেশের কাজে লাগানো উচিত। তিনি বলেন, চীন, ভারত, নেপাল ইতিমধ্যে সেখানে বিনিয়োগ নিয়ে যাচ্ছে- কিন্তু বাংলাদেশের আইনি জটিলতার জন্যে এদেশের ব্যবসায়ীরা সেভাবে সুযোগ পাচ্ছেন না। তিনি আইনি এই জটিলতা থেকে বেরিয়ে তা সহজীকরণের জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহবান জানান।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আফ্রিকায় জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা আছে। তবে কৌশুলী কর্মসংস্থান নীতির মাধ্যমে সেখানে কৃষি শ্রমিক, গার্মেন্টস ও ওষুধ খাতের জন্য শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া যায়। আবুল হোসেন বলেন, জনশক্তি রপ্তানি এদেশের জন্যে বড় ধরনের রপ্তানির খাত। এখন এটি সঙ্কুটিত হয়ে আসছে। সে ক্ষেত্রে উগান্ডাসহ আফ্রিকা মহাদেশ এদেশের জনশক্তি রপ্তানির নতুন বাজার হতে পারে।
আবুল হোসেন আফ্রিকাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। এবং বলেন, আফ্রিকা হতে পারে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগের স্বর্গ।



