অভিজ্ঞ ব্যাংকার মো: নুরুল ইসলামের জন্ম ১৯৬০ সালের ৩১ ডিসেম্বর। তার পিতার নাম মো: বজলুর রহমান। মায়ের নাম সাকিনা বেগম। তাঁরা কেউ বেঁচে নেই। নুরুল ইসলামের জন্ম কুমিল্লার লালমাই উপজেলার বেতিয়াপাড়া গ্রামে। তিনি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড থেকে ১৯৭৬ সালে এসএসসি পাস করেন। এইচএসসি পাস করেন একই বোর্ড থেকে ১৯৭৮ সালে। এরপর তিনি ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। পছন্দের বিষয় হিসেবে বেছে নেন হিসাব বিজ্ঞান। ১৯৮১ সালে হিসাব বিজ্ঞানে স্নাতক সম্মান এবং ১৯৮২ সালে অর্জন করেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। তিনি ১৯৮৪ সালে ফিন্যান্সিয়াল এনালিস্ট হিসেবে যোগ দেন সোনালী ব্যাংকে। এরপর প্রিন্সিপাল অফিসার, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার, এজিএম ও ডিজিএম হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। এই সময়ে ৫টি প্রিন্সিপাল অফিস ও ১টি কর্পোরেট শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তবে ডিজিএম থেকে জিএম পদে পদোন্নতি বঞ্চিত ছিলেন দীর্ঘ ৮ বৎসর।
মো: নুরুল ইসলাম জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে ২০১৭ সালের ১৮ জুন ফরিদপুর জিএম অফিসে যোগদান করেন। পরবর্তীতে জিএম অফিস রংপুর, ঢাকাস্থ লোকাল অফিস এবং ১৩ নভেম্বর ২০১৭ হতে প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত।
মো: নুরুল ইসলাম একজন সফল ব্যাংকার। ব্যাংকের ব্যবসা উন্নয়ন এবং ঋণ বিতরণ ও খেলাপি ঋণ আদায়ে রয়েছে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন সময়ে কর্মদক্ষতার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রশংসা পেয়েছেন। তিনি সোনালী ব্যাংকের কর্মতৎপরতা সম্পর্কে বলেন, রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী ব্যাংকই হচ্ছে সবচেয়ে বড়। এ ব্যাংক তার কর্মকান্ডের জন্য রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে দায়বদ্ধ। এই ব্যাংকের একমাত্র লক্ষ্য মুনাফা অর্জনই নয়; বরং এর পাশাপাশি দেশের বৃহত্তর জনগণকে সেবা প্রদান করা। সোনালী ব্যাংক মুনাফা অর্জনের সাথে সাথে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। ব্যাংকটি মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি সেবার মান বৃদ্ধিসহ সরকার কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ। ২০১৮ সালে এই ব্যাংকের আমানত ছিল ১.০০ ট্রিলিয়ন টাকা; যা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে একটি মাইলফলক। প্রতিযোগিতামূলক অর্থ ব্যবস্থায় এই সাফল্য অভাবিত।
তিনি আরও বলেন, সোনালী ব্যাংকের বৃহদাঙ্কের ঋণ বিতরণ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। এই বিতর্ক থাকা অস্বাভাবিক নয়। বড় ব্যাংক বলে বিতর্ক থাকতেই পারে। আমি লোন রিকভারি বিভাগের দায়িত্বে আছি। কর্তৃপক্ষ আমার কাজে সন্তুষ্ট। এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি অনেক পুরানো। আর পুরানো বলেই জটিল। সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য আমরা ‘থ্রাস্ট প্রোগ্রাম’ নিয়েছি। এই ক্ষেত্রে সাফল্যও এসেছে অভাবনীয়।
খেলাপি ঋণ
খেলাপি ঋণ রাষ্ট্র মালিকানাধীন ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বোচ্চ মহল এই ব্যাপারে বারবার তাগিদ দিয়ে যাচ্ছে। তা সত্তে¡ও শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এই সমস্যা জটিল হয়েছে। কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না। ২০১৫ সালে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২৮.৩৮ শতাংশ। সোনালী ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১৬তে বলা হয়েছে ‘নিঃসন্দেহে এই পরিস্থিতি আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ’। প্রতিটি চ্যালেঞ্জ অমিত সম্ভাবনার সুযোগ নিয়ে আসে।
এই সম্পর্কে লোন রিকভারি ডিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার জনাব মো: নুরুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি বিভাগই প্রধান নির্বাহীর (সিইও) অধীনে থেকে কাজ করে। এই ব্যাংকের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হচ্ছেন জনাব মো: ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ। সব মহলে তিনি সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তাঁর নির্দেশেই ইতোমধ্যে ‘চ্যালেঞ্জকে’ সম্পদে রূপান্তরিত করার যথাযথ কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের রয়েছে দক্ষ কর্মী বাহিনী। তারা সকলেই সর্বান্তকরণে এই জটিল সমস্যার মোকাবিলা করেছেন। আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে সোনালী ব্যাংকে অনেক বেশি গতি এসেছে খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে। অতীতের ঘটনার যেন আর পুনরাবৃত্তি না হয়, এই ব্যাপারে সকল নির্বাহী কর্মকর্তা সতর্ক রয়েছেন। ২০১৭ সালে শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ের পরিমাণ ছিল ১০৯১.০০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেড়ে হয়েছে ৩৬৬৮.০০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে অবলোপনকৃত ঋণ আদায় ছিল ৩৮.০১ কোটি টাকা, যা ২০১৮ সালে দাঁড়িয়েছে ৯৪.০৭ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংক শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ের কর্মসূচিকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সবাইকে সিংহের মতো জেগে ওঠার তাগিদ দিয়েছেন। শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ ছাড়াও র্যাপিড টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা হিসেবে আমি মনে করি খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে সাফল্য আসবেই।
গ্রাহক সেবা
ডায়নামিক ব্যাংকার মো: নুরুল ইসলাম সোনালী ব্যাংকের ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার। তার উদ্যোগে বাস্তবায়িত বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে ব্যাংকের কর্ম পরিবেশ উন্নয়ন, নারী কর্মীদের জন্য মানসম্মত সেনিটেশনের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, ব্যাংকের সম্মানিত গ্রাহকের জন্য সুপেয় খাবার পানি সরবরাহ, দ্রæত অভিযোগ নিষ্পত্তি করা। এছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের সামাজিক সুরক্ষা ও পরামর্শ প্রদানসহ যাবতীয় ইতিবাচক কার্যক্রমের জন্য ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রশংসা কুড়িয়েছেন এই ব্যাংকার।
লিগ্যাল ম্যাটার্স ডিভিশন সংক্রান্ত
জনাব ইসলামের উদ্যোগে সোনালী ব্যাংকের লিগ্যাল ম্যাটার্স ডিভিশনে বৈচিত্র্য এসেছে। তিনি ডিভিশনে খধি ঝঁরঃ গধহধমবসবহঃ ঝড়ভঃধিৎব চালু করেছেন, যেখানে ১,২১৩ শাখার সকল মামলার সব ধরনের তথ্য আপডেট করা হয়েছে। প্রধান কার্যালয়ে বসেই মামলা সংক্রান্ত সকল আপডেট পাওয়া যাচ্ছে। অভাবনীয় সাফল্য এসেছে মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও । ২০১৭ সালে নি¤œ আদালতে মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা ছিল ১৫৭০টি, পক্ষান্তরে ২০১৮ সালে তা বেড়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ২,৯০৯টি। ২০১৭ সালে রীট নিষ্পত্তি ১৫৫টির বিপরীতে ২০১৮ সালে নিষ্পত্তি হয়েছে ২৪৩টি। মামলা নিষ্পত্তির হার বৃদ্ধির সাথে সাথে খেলাপি ঋণ আদায় সন্তোষজনক বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রত্যাশিত সাফল্যের দরুন তিনি বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন।
পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্রকল্পগুলোকে নিরুৎসাহিত করে সোনালী ব্যাংক। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, সরকার বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার বাইরে অবস্থিত দেশের শহর এবং গ্রামের মানুষকে ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সরকারের প্রকল্পগুলোকে গতিশীল করার জন্য সোনালী ব্যাংক সহায়তা করে। সোনালী ব্যাংকের এই ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এগুলোর মধ্যে ১০ টাকা জমা দানের মাধ্যমে গরিব কৃষকদের হিসাবের সংখ্যা লক্ষাধিক। এই বিশাল হিসাব সংখ্যা পরিচালনার সামর্থ্য একমাত্র সোনালী ব্যাংকেরই সবচেয়ে বেশি।
ক্ষুদ্র ঋণ
আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্র ঋণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ঋণ গ্রহণ ও ব্যবহারের মাধ্যমে হাজার হাজার অসহায় মানুষ দারিদ্র্যের দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছে। দেশের রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো সামাজিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে ক্ষুদ্র ঋণদান কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বর্তমানে সোনালী ব্যাংকে ২২টি ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচি রয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, ব্যাংক ও এনজিওর সেতুবন্ধনের ঋণদান কর্মসূচি, স্বনির্ভর বাংলাদেশ কর্মসূচি, দারিদ্র্য বিমোচন ঋণদান কর্মসূচি, গ্রামীণ ব্যবসায় অর্থায়নে ক্ষুদ্র ঋণ, কৃষি ঋণ কর্মসূচি ইত্যাদি। এ সব খাতে ঋণ বিতরণ করলে খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। কারণ, গরিব মানুষ ঋণ খেলাপি হওয়াকে অসম্মানজনক মনে করে। ক্ষুদ্র ঋণ সম্পর্কে ব্যাংকার মো: নুরুল ইসলাম বলেন, দরিদ্র মানুষ সৎ ও কর্মনিষ্ঠ। সামর্থ্য থাকলে তারা ঋণ গ্রহণ করতে চায় না। তাই বাংলাদেশের অন্যতম সফল ঋণদান কর্মসূচি হচ্ছে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ। এই কর্মসূচি খাতে বিতরণকৃত ঋণ আদায় করতে তেমন কোনো বেগ পেতে হয় না। আমি মনে করি, সোনালী ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচিগুলো খুবই সফল। এই ব্যাংক ‘জাগো নারী’ নামে একটি গ্রামীণ কর্মসূচি চালু করেছে। এই ব্যাংক সারা দেশে ২৫০টি গ্রামীণ শাখার মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণদান কর্মসূচি চালু করেছে। এই ঋণ নিতে ঋণ গ্রহীতার কোনো জামানতের প্রয়োজন হয় না।
২০১৬ সালে সোনালী ব্যাংক এই কর্মসূচির মাধ্যমে ১৩.১০ মিলিয়ন টাকা বিতরণ করেছে। এই ব্যাপারে তিনি আরও বলেন, আমি বলবো সোনালী ব্যাংকের প্রোডাক্টগুলো বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং আকর্ষণীয়। প্রোডাক্টগুলোতে বৈচিত্র্য আনা সম্ভব হচ্ছে ব্যাংকে পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ কর্মীবাহিনী থাকার কারণে। সোনালী ব্যাংকে দীর্ঘ ৩৪ বৎসর দায়িত্ব পালনের সুবাদে জনাব মো: নুরুল ইসলাম এই পর্যায়ে এসেছেন। তিনি বেসরকারি ব্যাংকে উচ্চ পদে চাকুরীর প্রস্তাব পেলেও দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সেবা প্রদানের মানসিকতা নিয়ে কাজ করে চলেছেন।



