প্রতিবেদন

গভীর সমুদ্রে খনিজসম্পদ অনুসন্ধান নিয়ে সংকট

অর্থকন্ঠ ডেস্ক

 

গভীর সমুদ্রে তেল, গ্যাসসহ খনিজসম্পদ অনুসন্ধান নিয়ে সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। অতীতে যেসব বিদেশি কোম্পানি অনুসন্ধানে সহযোগিতা করে এসেছে তারা এখন আগ্রহ কম দেখাচ্ছে। নানা সীমাবদ্ধতা আর প্রতিকূলতার যুক্তি তুলে ধরে পিছিয়ে যাচ্ছে কোম্পানিগুলো। খনিজসম্পদ আহরণে বিদেশিদের অনুরোধ করা হলে তারা নানা শর্তের বেড়াজালে ফেলছে দেশকে। পাশাপাশি বেশকিছু

 

 কোম্পানি পিএসসির আর্থিক শর্তাবলি আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিসমূহের নিকট তাদের পরবর্তী বিনিয়োগের জন্য অনুকূলে না হওয়ায় বেশ কয়েকটি ব্লক এরইমধ্যে ছেড়ে দিয়েছে। সবমিলিয়ে এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে চায় বাংলাদেশ। এজন্য বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সম্প্রতি সংসদীয় কমিটিকে দেয়া এক প্রতিবেদনে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সংসদীয় কমিটি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার সুপারিশ করেছে। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চলমান বৈশ্বিক মহামারির আগে ২০১৯ সালে অফশোর মডেল পিএসসি ২০১৯ চূড়ান্ত করা হয়। সে সময় বৈশ্বিক মহামারির কারণে আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছিল এবং এ সেক্টরের দৃশ্যপট অনেক পরিবর্তন হয়। ফলে নতুনভাবে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমসহ পেট্রোলিয়াম সেক্টরের অন্যান্য কার্যক্রমও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হ্রাস পায়। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিসমূহ আপাতত নতুনভাবে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে নতুন বিড আহ্বান করা হলে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এ সেক্টরের বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। সে প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ অফশোর মডেল পিএসসি ২০১৯-কে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আরও যুগোপযোগী ও প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বনামধন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য গত ৩০ অক্টোবর এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (ইওআই) আহ্বান করা হয়। নিয়োগের ৯ সপ্তাহের মধ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তাদের রিপোর্ট দাখিল করবে। পরামর্শকের মতামত এবং পেট্রোবাংলার নিজস্ব পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করে অফশোর মডেল পিএসসি ২০১৯ পরিমার্জনপূর্বক যুগোপযোগী করে চূড়ান্ত করে নতুন বিড রাউন্ড ঘোষণা করা হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গভীর সমুদ্রে খনিজসম্পদ আহরণে সক্ষমতার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে এ অবস্থা। ফলে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিদেশিদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। পরিস্থিতি উত্তরণে সুপারিশ করে বলা হয়েছে, গভীর ও অগভীর সমুদ্র এলাকায় ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের জন্য দক্ষ জনবল প্রস্থিতির লক্ষ্যে জিএসবির কর্মকর্তাগণকে বিভিন্ন দেশে পরিচালিত অনুসন্ধান কাজে সম্পৃক্ত করে প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। জাহাজ (রিসার্চ ভ্যাসেল) ক্রয়/ভাড়া করে অনুসন্ধান কাজ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। এ ধরনের জাহাজ ক্রয়ের প্রস্তাবনাসহ ‘বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নিরূপণ এবং খনিজসম্পদ অনুসন্ধান’ শীর্ষক একটি প্রকল্পপ্রস্তাব জিএসবি’র পক্ষ থেকে করা হয়।

বর্তমানে অগভীর সমুদ্র এলাকায় ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের জাহাজ ভাড়ার সংস্থান রেখে প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুতির কাজ চলছে। সমুদ্র এলাকায় খনিজসম্পদ অনুসন্ধানে ভূবৈজ্ঞানিক যন্ত্র সমন্বিত জাহাজের প্রয়োজন হয়। সেই জাহাজের সংস্থান এবং জাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জনবলও জিএসবি’র নেই। গভীর ও অগভীর সমুদ্র এলাকায় কাজের জন্য দক্ষ জনবলের প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জাহাজ না থাকায় গভীর ও অগভীর সমুদ্র এলাকায় জিএসবি’র কাজের অভিজ্ঞতা অতি সামান্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ব্যয় ও ঝুঁকি অনেক বেশি। তুলনামূলক কম খরচে সাইসমিক সার্ভে করা গেলেও অনুসন্ধান কূপ খনন, উন্নয়ন কূপ খনন, প্রডাকশন ফ্যাসিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট, সাব-সী ডেভেলপমেন্ট, পাইপ লাইন নির্মাণ ইত্যাদি কাজসমূহ যথেষ্ট প্রাযুক্তিক এবং ব্যয়বহুল। এ ছাড়াও অনুসন্ধান থেকে শুরু করে উন্নয়ন কূপ খনন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিনিয়োগ হারানোর সম্ভাবনা অধিক। দেশীয় কোম্পানি বাপেক্স স্থলভাগে যথেষ্ট সক্ষম। কিন্তু সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে যে ধরনের কারিগরি, আর্থিক ও জনবলের প্রয়োজন সেটি আপাতত বাপেক্স-এর নেই। তবে প্রতিটি অগভীর সমুদ্র ব্লকে বাপেক্সের জন্য ২০ ভাগ ক্যারিড ইন্টারেস্ট এর বিধান রাখা আছে যা ভবিষ্যতে বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রযুক্তি, ব্যয় এবং ঝুঁকি বিবেচনায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও উৎপাদন বণ্টন চুক্তির (পিএসসি) মাধ্যমে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। প্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি কেয়ার্ন এনার্জি কর্তৃক সমুদ্রবক্ষে দেশের প্রথম গ্যাসক্ষেত্র সাঙ্গু আবিষ্কৃত হয়। গ্যাসক্ষেত্রটি হতে ১৯৯৮ সালে গ্যাস উৎপাদন শুরু করা হয় যা আনুষ্ঠানিকভাবে নিঃশেষ হয় ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর। সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র হতে প্রায় ৫০০ বিসিএফ গ্যাস উৎপাদিত হয়েছে। ২০০৮ সালের অফশোর বিডিং রাউন্ডের আওতায় ২০১১ সালের জুন মাসে গভীর সমুদ্রের ২টি ব্লক ডিএস-১০ও ডিএস-১১-এর জন্য কনোকোফিলিপ্স-এর সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। উক্ত উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) মোতাবেক ৫৮৬০ লাইন কিলোমিটার দ্বি-মাত্রিক সাইসমিক জরিপ সম্পন্ন করা হয়। ২০১২ সালে সমুদ্রসীমা জয়ের পর ওই বছর বিড আহ্বান করা হয়। এর আওতায় ২০১৪ সালে ৩টি অগভীর সমুদ্রর ব্লকের জন্য ৩টি পিএসসি (ওএনজিসি ভিদেশ লি. এবং স্যান্টোস) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। মোট ৮,৭২০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৩০০ বর্গ কি.মি. ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হয়। ২০২০ সালে স্যান্টোস ড্রিলিং না করে ব্লকটি ছেড়ে দেয়। ওএনজিসি ভিদেশ লিমিটেড গত ২৯ সেপ্টেম্বর ব্লক এসএস-৪-এ একটি অনুসন্ধান কূপ কাঞ্চন-১ খনন কার্যক্রম শুরু করেছে। আগামী ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে ব্লক এসএস-৪-এ আরও একটি অনুসন্ধান কূপ এস এস-৯-এ একটি অনুসন্ধান কূপ মৈত্রী-১ খনন করা হবে। এতে আরও বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে বিশেষ বিধানের আওতায় গভীর সমুদ্রের ব্লকের জন্য বিড আহ্বান করা হয়। ব্লক ডিএস-১২-এর জন্য পসকো-এ একই বছর ১৪ মার্চ একটি উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) স্বাক্ষরিত হয়। পসকো ডাইয়ু এ ব্লকে ৩.৫৮০ লাইন কিলোমিটার দ্বি-মাত্রিক সাইসমিক জরিপ ও ইন্টারপ্রিটেশনের কাজ সম্পন্ন করে। পরবর্তীতে পিএসসি’র আর্থিক শর্তাবলি তাদের অনুকূলে না হওয়ায় ২০২১ সালে পসকো ডাইয়ু ডিলিং না করে ব্লকটি ছেড়ে দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অগভীর সমুদ্রের ব্লকসমূহের মাঝে স্ট্রাকচারাল এবং স্ট্রাটিগ্রিফিক প্লে টাইপের মিশ্রণ লক্ষণীয়। উদাহরণস্বরূপ, সাঙ্গু গ্যাস ক্ষেত্র এবং এ সংলগ্ন ব্ল­ক এসএস-০৪,এসএস-০৯ এ স্ট্রাকচারাল ট্র্যাপ থাকলেও একটু গভীরে এসএস-১১ ব্লকে স্ট্রাকচারাল এবং স্ট্র্যাটিগ্রাফিক প্লে লক্ষণীয় যা দক্ষিণে ক্রমশ স্ট্র্যাটিগ্রাফিক প্লে­তে রূপ নিয়েছে। এসএস ব্লক এর পরবর্তী গভীর সমুদ্র ব্লক ডিএস-১২ এ সম্পূর্ণরূপে স্ট্রাটিগ্রিফিক প্লে (ফ্যান ডিপোজিট) পরিণত হয়েছে। এ ছাড়াও গভীর সমুদ্র ব্লক ডিএস-১০ এবং ডিএস-১১ এর সাইসমিক ডাটা পর্যালোচনায় স্ট্রাটিগ্রিফিক প্লে (ফ্যান ডিপোজিট) বলে শনাক্ত হয়েছে। সকল পর্যালোচনা থেকে ধরে নেয়া যায় দক্ষিণ-পূর্বাংশের গভীর সমুদ্র ব্লকসমূহের প্লে টাইপ স্ট্রাটিগ্রিফিক। গভীর সমুদ্র ব্লকসমূহে স্ট্রাটিগ্রিফিক প্লে (ফ্যান ডিপোজিট) চিহ্নিত হওয়ায় এগুলোর সিল নিয়ে ঝুঁকি অনেক বেশি।
উল্লেখ্য, মাল্টিক্লায়েন্ট সাইসমিক সার্ভের জন্য টিজিএস স্কলাম্বারগার-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর ডাটা বিক্রয় প্রোমোট করার জন্য তারা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে। প্রায় প্রতিটি কোম্পানি জানায় যে, চলমান বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ এর কারণে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিসমূহ তাদের ব্যয় সংকোচন করেছে। সকল পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা নতুন বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশের অফশোর মডেল পিএসসি ২০১৯ এর ফিসক্যাল টার্মসসমূহ আরও উন্নত করার জন্য অনুরোধ জানায়। বেশির ভাগ কোম্পানি বিশেষ করে গ্যাসের মূল্য ও কন্ট্রাক্টরের প্রফিট আরও বৃদ্ধি করার বিষয়ে মতামত জানায়। অর্থকন্ঠ ডেস্ক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button