কথায় আছে, রোম শহর একদিনে গড়ে ওঠেনি তেমনি কোনো মানুষের জীবনের সাফল্য এক মুহূর্তেই অর্জিত হয় না। এর জন্যে তাকে অনেক পথ হাঁটতে হয়- পরিকল্পনা ও পরিশ্রম করতে হয়। থাকতে হয় আত্মপ্রত্যয়ী মনোভাব। এমনই একজন আত্মপ্রত্যয়ী কর্মনিষ্ঠ মানুষ জাপানে অবস্থানরত বাংলাদেশি মো. লিয়াকত হোসাইন। তিনি জাপানের একজন প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী। তিনি জাপানে উল্লেখযোগ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান Woody Company Ltd.-এর প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার। বাংলাদেশের গাজীপুর জেলার শ্রীপুরের মাওনায় তিনি একটি শিল্প স্থাপন করেছেন যার নাম ‘এরিকো পেপার মিল’।
আলোকিত উদ্যোক্তা ব্যক্তিত্ব মো. লিয়াকত হোসাইন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় এক শিক্ষিত পরিবারে ১৯৬২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম মো. আমির হোসেন এবং মা আফিয়া বেগম। ছোটবেলা থেকেই পারিবারিকভাবে তারা ঢাকা শহরের তেজগাঁও থানাধীন শাহীনবাগের বাসিন্দা। বুদ্ধিদীপ্ত এবং স্বপ্নদর্শী লিয়াকত হোসাইন ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজে গ্র্যাজুয়েশনের ছাত্র থাকাকালীন ১৯৮৫ সালে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে জাপান যান। জাপানে তিনি ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুলে ভর্তি হন এবং এক মাসের মধ্যে জাপানি ভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠেন। এরপর ভর্তি হন কম্পিউটার সায়েন্স বিষয়ে একটি ইনস্টিটিউটে। এ সময়গুলোতে তিনি তার খরচ সঙ্কুলানের জন্যে পার্ট টাইম চাকরি নেন। পরিশ্রমী তরুণ মো. লিয়াকত হোসাইনের শুরুটা এরকম হলেও ধীরে ধীরে নিজেকে জাপানে স্থায়ীভাবে বসবাসের উপযোগী করতে থাকেন। ৪ বছর অধ্যয়ন শেষে তিনি বিয়ে করেন জাপানি তরুণী এরিকোকে। একই প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুবাদে তাদের পরিচয় ও পরিণয়। বিয়ের পর স্ত্রীর নাম হয়েছে এরিকো হোসাইন।

পরিশ্রমী ও মেধাবী লিয়াকত দুই বছর চাকরির পর ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে ১৯৮৬/৮৭ সালে ব্যবসায় নামেন। প্রথমে বাংলাদেশ থেকে লেদার পণ্য জাপানে আমদানি করে তা বাজারজাত এবং বিক্রি করতেন। পরবর্তী সময়ে রিকন্ডিশন গাড়ি বাংলাদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেন। কিন্তু সে ব্যবসা স্থায়িত্ব পায়নি। এরপর ‘মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট’ এর ব্যবসা ধরেন। কিন্তু এতেও তেমন আগ্রহ পাননি। এক পর্যায়ে ১৯৯৮ সালের দিকে কনস্ট্রাকশন খাতের মেশিন থাইল্যান্ড ও মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানির ব্যবসা শুরু করেন। এটি তিনি পার্সোনেল এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমেই পরিচালনা করতেন। পরে গঠন করেন Woody Company Ltd. তিনি এ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টর। কনস্ট্রাকশন কাজে ব্যবহৃত মাটি কাটার ভারী যন্ত্রসহ অন্যান্য ইক্যুইপমেন্ট তৈরির জন্যে তিনি ফ্যাক্টরি দিয়েছেন। তার তৈরি মেশিনারিজ মধ্যপ্রাচ্য, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও বাংলাদেশে রপ্তানি হয়।
জাপানে স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও জন্মভ‚মি বাংলাদেশের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসা বিদ্যমান। তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করেই গাজীপুরের মাওনায় কাগজ উৎপাদনের কারখানা ‘এরিকো পেপার মিল’ স্থাপন করেছেন। চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে আরো শিল্প স্থাপনের চিন্তা-ভাবনা রয়েছে লিয়াকত হোসাইনের। শুধু তাই নয়, দেশে শিল্পবান্ধব পরিবেশ বিদ্যমান থাকলে এবং দুর্নীতি-অনিয়ম কমে এলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও দেশে নিয়ে আসার আশাবাদ পোষণ করেন। স্ত্রী এরিকো হোসাইন ও একমাত্র মেয়ে আমিনা হোসাইন তার কোম্পানির পরিচালক এবং শেয়ার হোল্ডার। তিনি তাদের নিয়ে সময় সুযোগ পেলেই দেশে আসেন। তারাও বাংলাদেশ এবং এদেশের শিল্প-সংস্কৃতিকে বেশ ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন।
মো. লিয়াকত হোসাইন চিন্তা-চেতনায় একজন অগ্রসরমান মানুষ। নিজ মাতৃভ‚মির অগ্রগতি, উন্নয়ন-চিন্তাকে সবসময় প্রাধান্য দেন। আর এটি চিন্তা করতে গিয়েই মনের দিক থেকে খুব আহত হন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যথেষ্ট পরিশ্রমী, সৎ এবং নিষ্ঠাবান। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রশাসনে কর্মরত কতিপয় দুর্নীতিবাজ নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে দেশের কল্যাণ চিন্তার ব্যাপারে উদাসীন। একটি স্বাধীন দেশের উপযোগী ব্যবসায়িক ব্যবস্থা দরকার। এদেশে আমলারা নিজেদের প্রভু মনে করেন। তারা এটা ভাবেন না যে, রাষ্ট্রের মালিক হচ্ছেন জনগণ। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তাদের বেতন হয়। তাদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।
কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিগত পাকিস্তান আমলে ছাত্রদের শিশু পাঠ্যে নৈতিকতার প্রাধান্য ছিল। এখন তা নেই। দেশে শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো উচিত। শুধু তাই নয়, কেরানি বা আমলা সৃষ্টির শিক্ষা নয়, শিক্ষাকে সময়োপযোগী করতে হবে। দেশে প্রচুর ইন্ডাস্ট্রি হয়েছে- হচ্ছে। বিদেশেও উৎপাদন সংশ্লিষ্ট লোকের চাহিদা বেশি। ইংরেজি জানা লোকেরা বিদেশে গিয়ে বেশি সুযোগ পায়। এসব মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে এখন চাটুকারতন্ত্র চলছে। চাটুকারদের দৌরাত্ম্যে ও দলীয় প্রশাসনের কারণে সরকারের প্রশাসনযন্ত্র সঠিক সার্ভিস দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ফলে তা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সমালোচকরা এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করলেও কোনো দিক নির্দেশনা দেন না। ব্যাপক সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে দেশ এগোতে পারে না।
তিনি বলেন, আমরা প্রবাসীরা কষ্ট করি স্বপ্ন দেখি নিজেদের দেশের উন্নয়ন হবে; কিন্তু উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্নীতির হারও অনেক বেশি হয়ে গেছে। তিনি বলেন, প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলে দেশে স্থিতিশীল উন্নয়নের রুট তৈরি হবে।
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক



