সাক্ষাৎকার

ট্রেজারি হচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হৃৎপিন্ড

বিশ্বনাথ পাল, জেনারেল ম্যানেজার, সোনালী ব্যাংক লিমিটেড

বিশিষ্ট ব্যাংকার বিশ্বনাথ পালের জন্ম ১৯৬০ সালের ১৪ মে। তার গ্রামের নাম খালভাঙ্গা, উপজেলা নালিতাবাড়ী, জেলা শেরপুর। বিশ্বনাথ পালের পিতা প্রয়াত নগেন্দ্রনাথ পাল। পেশায় ছিলেন একজন শিক্ষক। জেলার খ্যাতনামা বিদ্যাপীঠ তারাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি। ওই অঞ্চলের ইতিহাসের সাক্ষী তারাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়। অবসর নেওয়ার পর আমৃত্যু এই প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মা মোহন মালা পাল ছিলেন একজন আদর্শ গৃহিণী। বাবা-মা দু’জনে মিলে নিজেদের আদর্শে সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করেছেন। সে কারণেই বিশ্বনাথ পাল অত্যন্ত কর্তব্যনিষ্ঠ ও পরিশ্রমী। তার ব্যবহারও বিনয়ী। তিনি বক্তব্য প্রকাশে সংযত। বিশ্বনাথ পাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৮১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ১৯৮৪ সালে একজন আর্থিক বিশ্লেষক (ফিন্যান্সিয়াল এনালিস্ট) হিসেবে যোগ দিয়েছেন সোনালী ব্যাংকে। এরপর ৩৪ বছর ধরে এই ব্যাংকের একের পর এক পদ অলঙ্কৃত করেছেন। ২০১২ সালের ১০ জুন পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার। এরপর পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন জেনারেল ম্যানেজার। দীর্ঘদিন কাজ করেছেন ব্যাংকের সেন্ট্রাল একাউন্টস ডিভিশন এবং ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনে। সন্দেহ নেই, তিনি একজন অভিজ্ঞ ব্যাংকার। ব্যাংকে কাজ করার সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং যোগ দিয়েছেন বহু সেমিনারে। একই সঙ্গে পেশাগত অধ্যয়ন কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি একজন পেশাদার কস্ট এন্ড ম্যানেজমেন্ট একাউন্ট্যান্ট। তিনি অর্জন করেছেন উঅওইই, ঋঈগঅ (ওঈগঅই)। তিনি কাজ করেছেন মাইক্রো ক্রেডিট, রুরাল ক্রেডিট, সরকারি হিসাব ও সার্ভিস বিভাগেও। তিনি ১৪ বৎসর শাখা ব্যাংকিংয়ে কাজ করেছেন।
বিশ্বনাথ পাল শত কর্মব্যস্ততার মধ্যেও সময় দেন স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের। নিজের সন্তানদের নিয়ে রয়েছে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। তাদের মধ্যে মেয়ে সবচেয়ে ছোট। বড় ছেলে তন্ময় আনন্দ পাল পড়াশোনা করতে গিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। ছোট ছেলে বিস্ময় পাল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। মেয়ে হলিক্রস স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্রী। এ বছর এইচএসসি পরীক্ষার্থী।
বিশ্বনাথ পালের ছেলেমেয়ে সকলেই মেধাবী। তাদের সামনে পড়ে আছে বিরাট ভবিষ্যৎ। বিশ্বনাথ পাল একজন দক্ষ ব্যাংকার, বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে তিনি একটি পরিচিত নাম। ভাল ট্রেজারার হিসাবে তার খ্যাতি রয়েছে। তাছাড়া তিনি রিসোর্স পার্সন হিসেবে সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন। যোগ্যতার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের প্রধান করা হয়েছে। এছাড়াও তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পালন করছেন সোনালী ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান সোনালী সিকিউরিটিজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব।
ব্যাংকিং নিয়ে বিশ্বনাথ পাল বলেন, ব্যাংকের কাজ বেশ জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিয়ে ব্যাংকের কাজ। আমানতকারী ও ঋণ গ্রহীতার সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় ব্যাংকের কার্যক্রম; বিষয়টি অনেকটাই মনস্তাত্তি¡ক। ব্যাংকের ভেতরে কাজের ধরন সম্পূর্ণ পৃথক। পুরো ব্যাপারটাই নিয়মতান্ত্রিক, নিয়মনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ, শৃঙ্খলা-নির্ভর এই কাজের জন্য প্রয়োজন দক্ষতা এবং পরিশ্রম করার সামর্থ্য। দক্ষতা সহজে অর্জিত হয় না। সরেজমিনে কাজ করে অর্জন করতে হয় দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা। যা মানুষে মানুষে ভিন্নতা, আচার-আচরণে পার্থক্য থাকা সত্তে¡ও তাদের মনোভাব, চাহিদা বুঝে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয় ব্যাংকারকে। ব্যাংকার- গ্রাহক সুসম্পর্কের উপর নির্ভর করে ব্যাংকের সাফল্য। সকল মানুষ নিয়ে কাজ করা সত্যি কঠিন ব্যাপার। এই দুই বিপরীত পরিবেশের মধ্যে কাজ করে ব্যাংকার অর্জন করে অভিজ্ঞতা।
এ ব্যাপারে তিনি আরও বলেন, উদ্যোক্তারা বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে ব্যাংকে আসেন। তাদের কেউ কেউ যখন ব্যাংক থেকে হতাশ হয়ে ফিরে যান তখন সত্যিই নিজের কাছে ভীষণ খারাপ লাগে। কিন্তু তারা আমাদের বুঝতে চান না। ব্যাংকের রয়েছে নিজস্ব পলিসি। নিয়মনীতি মেনে একজন ব্যাংকারকে কাজ করতে হয়। উদ্যোক্তাদেরকে ব্যাংকের নিয়মনীতি মেনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ বাস্তবমুখী প্রস্তাব দাখিল করা প্রয়োজন।

কাজের ফাঁকে তার সাথে আলাপচারিতায় ব্যাংকের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে, যা নিন্মরূপ-
অনেকেই মনে করেন ব্যাংকের কাজ একঘেয়েমিপূর্ণ। একই ধরনের কাজ বারবার করতে একঘেয়েমি এসে যায়। এই সম্পর্কে মেধাবী ব্যাংকার বিশ্বনাথ পাল বলেন, একঘেয়েমি এসে যায় কথাটা ঠিক নয়। এই ধরনের কাজ বাইরে থেকে একঘেয়েমি মনে হতে পারে, বাস্তবে তা নয়। বিচিত্র ধরনের মানুষ ব্যাংকে আসেন। তাদের ব্যবহার, কর্মপদ্ধতি ও চাওয়া একই রকম নয়। তাই লেনদেনের কাজ করলে মানুষ সম্পর্কে জানা যায়। মানুষ কত বিচিত্র- প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রকমের মানুষের সাথে কাজ করতে হয় বিধায় একঘেয়েমির বিষয়টি থাকে না। অর্থবাজার ও তারল্য ব্যবস্থাপনার কাজের ধরন অন্যরকম। তারল্য সংরক্ষণ ব্যাংকের বড় চ্যালেঞ্জ। তারল্য সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে ব্যাংক বাজারে টিকে থাকতে পারে না। তাই ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগকে ব্যাংকের হৃৎপিন্ডের সাথে তুলনা করা হয়ে থাকে। শাখা পর্যায়ে সময়মতো নিয়মমাফিক অর্থের সরবরাহ বাজায় রাখার প্রধান দায়িত্ব ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের। আবার শাখার উদ্বৃত্ত অর্থ তুলে এনে লাভজনক বিনিয়োগ নিশ্চিত করার দায়িত্বও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের।
ব্যাংক শুধু আমানত সংগ্রহ ও ঋণ প্রদানের কাজই করে না। ব্যাংকগুলোর নিজস্ব বিনিয়োগ ক্ষেত্র রয়েছে। বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের মানি মার্কেট ইনস্ট্রুমেন্টগুলি হচ্ছে কলমানি, ট্রেজারি বিলস, বাংলাদেশ ব্যাংক বিল, রেপো, রিভার্স রেপো, টার্ম ডিপোজিট ইত্যাদি। এই সম্পর্কে সোনালী ব্যাংকের ট্রেজারি ডিভিশনের প্রধান বিশ্বনাথ পাল বলেন, ব্যাংকগুলোর তারল্য বজায় রাখার জন্য তাৎক্ষণিক লেনদেনের ব্যবস্থা করতে হয়। এটা করতে হয় আর্থিক নীতিমালা মেনেই। যে-সব ব্যাংকের উদ্বৃত্ত অর্থ রয়েছে, সে-সব ব্যাংক অন্য ব্যাংককে টাকা ধার দেয়।
ধার করার এই প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে হয়ে থাকে। একদিনের জন্য ধারকে বলে ঈধষষ গড়হবু। এই ধার একদিনের তারল্য মিটাতে ব্যবহৃত হয়। কল লোনের জন্য দেয় সুদের হার আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়ে থাকে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে তারল্য সংরক্ষণে সোনালী ব্যাংক অনেক সচেতন। বিগত কয়েক বছর ধরেই সোনালী ব্যাংক তারল্য সংকটের মধ্যে পড়েনি।
ট্রেজারি কল লোন ছাড়াও রেপো, প্লেসমেন্ট, অখং ঝঢ়বপরধষ জবঢ়ড় এর মাধ্যমে তারল্য সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়। ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড, শেয়ার উদ্বৃত্ত বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রয়ের মাধ্যমেও তারল্য নিরসনের চেষ্টা করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী তাদের কাছে দৈনিক ৫.৫ শতাংশ পাক্ষিক ভিত্তিতে জমা রাখা বাধ্যতামূলক। এতে কোনো ব্যাংক ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পেনাল্টি আরোপের বিধান রয়েছে। সোনালী ব্যাংক প্রাইমারি ডিলার। এই জন্য সরকারের বিভিন্ন কর্মকাÐে অর্থ যোগানের জন্য নির্দিষ্ট অনুপাতে ট্রেজারি বিল ক্রয় করতে বাধ্য। অবশ্য এখনো বাংলাদেশে গতিশীল বন্ড মার্কেট গড়ে ওঠেনি। এই জন্য বহু বন্ড অবিক্রীত অবস্থায় ব্যাংকে পড়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ট্রেজারি বন্ডস খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মেয়াদে কিছু মুনাফা তুলে আনা হয়। আবার প্রয়োজনমতো এসকল বন্ড বিল বিক্রি করা হয়, সে ব্যবস্থাও থাকা দরকার। বন্ড বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন একটি গতিশীল বাজার ব্যবস্থা। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের বাজার প্রত্যাশিতভাবে গড়ে উঠেনি। এই বাজার আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
সোনালী ব্যাংকের ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন ট্রেজারি সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখাশোনা করে। ট্রেজারি বিল বন্ড, ডিবেঞ্চার এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়গুলো পরিচালনার দায়িত্ব এই বিভাগের উপর ন্যস্ত। ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন জেনারেল ম্যানেজার বিশ্বনাথ পাল। এই ব্যাপারে তার রয়েছে বিশেষ অভিজ্ঞতা। বিশ্বনাথ পাল বলেন, আমি মনে করি, এই বিভাগে দক্ষ কর্মচারী ও কর্মকর্তা রয়েছেন। তারা দায়িত্বশীল ও সৎ। ট্রেজারি কার্যক্রম থেকে সোনালী ব্যাংকের আয় উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে এই ধরনের বিনিয়োগের বাজার কিছুটা হলেও সীমিত। তা সত্তে¡ও সোনালী ব্যাংক দক্ষতার সাথে এই সংক্রান্ত বিনিয়োগের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সোনালী ব্যাংকের কাছে ট্রেজারি বিল বন্ড, ডিবেঞ্চার শেয়ারে বিনিয়োগ রয়েছে পর্যাপ্ত তারল্য। তাই এ ব্যাংকের তারল্য সংরক্ষণে এবং প্রতিযোগিতামূলকভাবে ট্রেজারি কার্যক্রম পরিচালনায় সফলতা বেশি।
বর্তমান বিশ্বকে বলা হয় ডিজিটাল ভিলেজ। এর কারণ, তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের এক প্রান্ত যুক্ত হয়েছে অন্য প্রান্তের সঙ্গে। বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০১৬ ডিজিটাল ডেভিডেন্টস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন এবং এই সংক্রান্ত প্রযুক্তির ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে।
এ ব্যাপারে একজন ঊর্ধ্বতন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেছেন, ব্যাংকিং সেবার মান প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। লেনদেনে এসেছে গতিশীলতা। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বিশ্বনাথ পাল বলেন, আমি যখন চাকরিতে প্রবেশ করি, তখন গ্রাহকদের জন্য ডিজিটাল সেবা বলতে কিছু ছিল না। সব কাজ হাতে করতে হতো। ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার পর গ্রাহককে তা জানাতে দুই তিন দিন সময় লেগে যেত। গ্রাহকরাও তাতে ক্ষুব্ধ হতেন না। কিন্তু এখন গ্রাহকের চাহিদার পরিবর্তন হয়েছে। তারা দ্রæত এবং ঘরে বসে ব্যাংকিং সেবা পেতে চায়। টাকা জমা দেওয়ার পর গ্রাহকরা মোবাইল ফোন হাতে বসে থাকেন। দেরি হলে খোঁজখবর নেন। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিযোগিতা। তথ্য প্রযুক্তির কারণে ব্যাংকের কাজের প্রকৃতি অনেক বদলে গেছে। বিভিন্ন ডেস্কে কর্মরত কর্মকর্তাদেরকে অধিকাংশ সময় কম্পিউটারের পর্দায় চোখ রেখে চলতে হয়। এই সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তথ্য প্রযুক্তি আসার পর ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা বেড়েছে। ব্যাংকিং খাতে তৈরি হয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তথ্য প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তি।
সোনালী ব্যাংকের কাঠামোগত ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস ও সম্পর্ক। এই বিশ্বাস ও সম্পর্ক এক দিনে গড়ে ওঠেনি। ৪৬ বছরে তৈরি হয়েছে বিশাল প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনী। এর ব্যবস্থাপনার মানও অনেক উন্নত। এই সম্পর্কে সোনালী ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান বিশ্বনাথ পাল বলেন, বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের মোট জনবলের সংখ্যা ২০,০০০ এর অধিক। এই কর্মীবাহিনীকে পরিচালনার জন্য রয়েছে দক্ষ প্রশাসন ও পলিসি প্রণয়নের জন্য রয়েছে বিজ্ঞ পর্ষদ। এই জন্য কম্পিউটারের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়েছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, সোনালী ব্যাংক কর্মীবাহিনীর বিশেষ একটি অংশকে প্রতি বছরই প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। আমি নিজেও তথ্য প্রযুক্তির বিষয়ে বেশ কয়েকটি প্রশিক্ষণ নিয়েছি। ফলে আমার পক্ষে ট্রেজারি বিভাগের কাজ দক্ষতার সঙ্গে চালানো সম্ভব হচ্ছে। এই বিভাগের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি।
বৈশ্বিক কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ। এই সম্পর্কে বিশ্বনাথ পাল বলেন, ব্যাংকের কাছে গ্রাহক ও শেয়ার হোল্ডারদের চাহিদা বেড়েছে। অন্যদিকে দুর্নীতি প্রতিরোধও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংক দক্ষতার কাক্সিক্ষত পর্যায়ে যেতে পারছে না। এই ব্যাপারে সোনালী ব্যাংক আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। সোনালী ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ের কর্মসূচি জোরদার করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য ছয়টি মূল ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। এগুলো হচ্ছে ১. ঋণ ঝুঁকি, ২. সম্পদের দায় সংক্রান্ত ঝুঁকি, ৩. বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি, ৪. মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি ৫. ব্যাংক ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার ঝুঁকি এবং ৬. তথ্য প্রযুক্তির ঝুঁকি। ঝুঁকি সংক্রান্ত বিষয়গুলো ব্যাংকের কার্য ও পরিধি বৃদ্ধি করেছে। ব্যাংকগুলোকে সবসময় ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হয়। ঝুঁকি মোকাবিলার বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণের জন্য প্রধান কার্যালয়ে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ রয়েছে। এই বিভাগ একটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা চেকলিস্ট চালু করেছে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ প্রতি মাসে এবং ছয় মাস পরপর সমন্বিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিবেদন তৈরি করে। এই প্রতিবেদন অনুসারে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দ্রæত ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। সাইবার নিরাপত্তা ব্যাংকের লেনদেনের সঙ্গে জড়িত। কাজেই এটা ভাবার কোনো কারণ নেই, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে নেই। এই ব্যাপারে আইটি ব্যবহারকারী কর্মকর্তারা সদা সতর্ক। তবে কেউ কেউ মনে করেন, বর্তমানে যেভাবে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, তাতে এদেশের ব্যাংকগুলো ঝুঁকিমুক্ত নয়। কারণ, হ্যাকাররা খুব তৎপর। তারা তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে খুবই দক্ষ। তাই ব্যাংকগুলোতে অধিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত আপ টু ডেট প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
সোনালী ব্যাংক অভ্যন্তরীণমূলক ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন সেবামূলক কাজে। এই সম্পর্কে সোনালী ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী বিশ্বনাথ পাল বলেন, সোনালী ব্যাংক একটি রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক। এই ব্যাংক সরকারের পক্ষ থেকে ন্যস্ত অনেক দায়িত্বই পালন করে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, দুস্থ মহিলা ভাতা প্রদান ইত্যাদি। এসব কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত কাজগুলো করার সময় ব্যাংক মুনাফার কথা চিন্তা করে না। এই ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রামের অগণিত মানুষ ব্যাংকের আওতায় এসেছে। এই ব্যাংকে ১০ টাকা দিয়ে কৃষকরা যে হিসাব খুলেছেন- এমন হিসাবের সংখ্যা ১৪,২৭,৫৪২টি। এতেই বোঝা যায়, এই ব্যাংকের কর্মপরিধি কত ব্যাপক ও বিস্তৃত। এ প্রসঙ্গে ট্রেজারি বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার বিশ্বনাথ পাল বলেন, আমি যখন চাকরিতে যোগ দিয়েছি, তখন থেকেই ভেবেছি গরিব মানুষের জন্য কাজ করবো; আমি সকল পল্লী ঋণ বিভাগে এবং মাইক্রো ক্রেডিট ডিভিশনে কাজ করছি, তখন আমি আমার কাজে সে ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে চেষ্টা করেছি। ট্রেজারি বিভাগের কার্যক্রম হলো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে। তবে যে সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠান দারিদ্র্য বিমোচনে বা সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করে তাদের প্রতি আমার একটা সফটকর্নার থাকে। আমি নিয়মনীতির মধ্যে থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করি তাদেরকে সহায়তা করার।৩
লেখক : বোরহান উদ্দিন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button