বাংলাদেশের অনন্য কৃতী সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ডা. সুলতান সালাহউদদীন আহমেদ আমেরিকার চিকিৎসা জগতে বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। তিনি Clinical Adjunct Professor, CMC Director। বাংলাদেশি আমেরিকান এই চিকিৎসক ব্যক্তিত্ব Larkin University, University of Miami এবং ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট। তিনি নোভা সাউথ ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিরও শিক্ষক। একজন স্বনামধন্য শিক্ষক, গবেষক এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক হিসেবে তার নাম বাংলাদেশ কমিউনিটিসহ চিকিৎসা ক্ষেত্রে বেশ আলোচিত।

বাংলাদেশের গর্বিত সন্তান অধ্যাপক ডা. সুলতান সালাহউদদীন আহমেদের জন্ম এক শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৫৩ সালের ৭ জুন। তাদের পৈতৃক নিবাস রাজশাহীতে। তার পিতামহ মরহুম শামসুদদীন আহমেদ ছিলেন ডিপার্টমেন্ট অব আর্কিওলজির ডিরেক্টর। ৭টি ভাষায় তাঁর দখল ছিল। তিনি ‘জাতীয় অধ্যাপক’ হিসেবে সম্মানিত হন। সুলতান সালাহউদদীন আহমেদের পিতা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় একটি মিলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন। সে সুবাদে ভেড়ামারাতেই তার বিদ্যার্জন শুরু। তিনি ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৭২ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেন এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন।
সুলতান সালাহউদদীন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ১৯৭১ সালে যখন ঢাকা কলেজের ছাত্র তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সাথে সংযুক্ত হন। এক পর্যায়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন তিনি। বন্দি শিবিরে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন। মৃত্যুর হাত থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে আসেন। মুক্তিযুদ্ধে তার উদ্ভাবিত হাতে তৈরি সাইক্লোস্টাইল মেশিনে মুক্তিবাহিনীর অনেক জরুরি এবং গোপন তথ্য নিয়মিত প্রকাশিত ও ঢাকা শহরে প্রচারিত হতো। যন্ত্রটি পরবর্তী পর্যায়ে তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়।

মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসক হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি যথেষ্ট মমত্বশীল। এমনও অনেক সময় ঘটেছে যে, নিজের বেতনের টাকা দিয়ে দুস্থ অসহায় রোগীর জন্যে দামি ওষুধ কিনে জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেছেন।
সুদর্শন চিকিৎসক সুলতান সালাহউদদীন আহমেদ বিটিভিতে ‘আপনার ডাক্তার’ ও ‘বিজ্ঞান বিচিত্রা’ নামে দুটো অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন। এ জন্যে সে সময় তিনি দর্শকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় মুখ ছিলেন। কবিতা লেখার সুবাদে ঢাকা কলেজে পড়াকালীন জননন্দিত অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ তাকে বেশ ¯েœহ করতেন।
জীবনের চড়াই-উতরাই মুহূর্তে কোনো দুরবস্থা তাকে হতাশার মধ্যে ফেলতে পারেনি। সব সময় তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী, সাহসী মনের অধিকারী। দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে অর্থনৈতিক সঙ্কটে ধৈর্য না হারিয়ে প্রবাসে রাস্তায় তিনি ফুল বিক্রি করেছেন, ট্রেনে ঘুমানোর ঘটনাও ঘটেছে।
এক পর্যায়ে গুণী এই চিকিৎসক আমেরিকার একটি ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের সুযোগ পান। তার বৈচিত্র্যময় জীবনজুড়ে রয়েছে অনেক প্রাপ্তি। জীবন সম্পর্কে তার ধারণা অতি বাস্তব। তিনি এখন খ্যাতনামা চিকিৎসক, কিন্তু ছোটবেলায় নিজে অসুস্থ হলে ডাক্তারের সেবা নিতে ভয় পেতেন। চট্টগ্রামে নানার বাসায় থাকা অবস্থায় তার জ্বর হলে দুধ কিংবা হরলিক্সে মিশিয়ে ওষুধ খাওয়ানো হতো।
সুলতান সালাহউদদীন আহমেদ একজন জীবন ও মৃত্তিকা-ঘনিষ্ঠ কবি। তার লেখায় যেমন মহান মুক্তিযুদ্ধ থাকে, তেমনই মাটি ও মানুষের কথাও বাক্সময় হয়ে ওঠে। তিনি তার জীবনের অনেক ঘটনা ‘সুতোর টানে’ নামক স্মৃতিকথায় তুলে এনেছেন। ‘সুতোর টানে’ বই সম্পর্কে অনেক বিদগ্ধজনের মন্তব্যই হচ্ছে এরকম- ‘জীবন যে কতোটা প্রদীপ্ত, সংগ্রামী, কর্মমুখর ও সৃজনশীল হতে পারে সুতোর টানে তার জীবন্ত দলিল। জীবনযুদ্ধে জয়ী হবার বীজমন্ত্র বুঝতে চাইলে এটি পড়া দরকার।’

দেশমাতৃকার সূর্যসন্তান অধ্যাপক ডা. সুলতান সালাহউদদীন আহমেদ সুদূর আমেরিকায় থাকলেও বাংলাদেশের দরিদ্র অসহায় মানুষের কথা মনে করে বিভিন্ন সমাজ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট রয়েছেন। এর মধ্যে Hope Foundation একটি। তিনি এর উপদেষ্টা। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে দুস্থ মা ও শিশুদের উন্নয়নে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছে। Hope Foundation কক্সবাজারে একটি হাসপাতালসহ রোহিঙ্গা শিবিরেও হাসপাতাল করেছে। ডা. সুলতান সালাহউদদীন পিতামহ জাতীয় অধ্যাপক মরহুম শামসুদদীন আহমেদ-এর একটি দর্শনতত্ত¡কে গভীরভাবে মনে রেখেছেন। শামসুদদীন আহমেদ জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে স্বীকৃতি পাবার পর এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, আমি সারাজীবন যা করেছিÑ সেটা কোনো প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আশায় নয়। তিনি সুলতান সালাহউদদীনকে বলেছিলেন, ‘কাজ করলে বিনিময়ে কিছু চেয়ো না- কাজটাই জেনো আনন্দের হয়- সেটাই যেন তোমার জীবন হয়। প্রাপ্তির প্রত্যাশা করলে চাওয়াটা বেড়ে যাবে।’
মানবতার বন্ধু কর্মপ্রিয় সুলতান সালাহউদদীন আহমেদ চিকিৎসা কাজে প্রচুর সময় ব্যয় করেন। তিনি মাত্র ৪/৫ ঘণ্টা ঘুমানো ও আহারের জন্যে ব্যয় করতে পারেন। আর বাকি সময় অধ্যাপনা ও রোগীর সেবা করতেই চলে যায়। প্রিয় মাতৃভ‚মি বাংলাদেশকে নিয়ে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে- এর উন্নয়ন অবশ্যম্ভাবী।
অধ্যাপক ডা. সুলতান সালাহউদদীন আহমেদ পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে নিজের চেষ্টায় মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল গড়ে তুলেছেন। এই পÐিত ব্যক্তিত্ব বলেন, জীবন হলো এমনই এক যাত্রাÑ যা অনিশ্চিত ও অজানা পথে এক পরম কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।৩
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক



