
আমরা সকলেই জানি অন্ধের হাতি দেখার গল্প। তারপরেও সংক্ষেপে একটু না বললেই নয়, কয়েকজন অন্ধ হাতি দেখতে কেমন সেটা জানতে চাইল, তাদের একটি শান্ত হাতির সামনে ছেড়ে দেওয়া হলো যেন তারা ছুঁয়ে বুঝতে পারে হাতি কেমন। এক অন্ধ হাতির শুর ছুয়ে বলল হাতি বড় অজগর সাপের মতো, কান ছুঁয়ে একজন বলল হাতি কুলার মতো, পা ছুয়ে একজন বলল হাতি পিলারের মতো, পেট ছুঁয়ে বলল হাতী দেয়ালের মতো, এভাবে যে যেটা ছুঁতে পারল সে সেভাবেই হাতীর বর্ননা দিল। কিন্তু হাতী কি তাই বর্তমান সময়ের অত্যন্ত আলোচিত একটি বিষয় ক্রিপটো কারেন্সি। কয়েন মার্কেট ক্যাপ এর তথ্য মতে বিটকয়েন, এথেরিয়াম, ডোজ কয়েনসহ এমন প্রায় ১০ হাজার সচল ক্রিপ্টো রয়েছে আন্তর্জাতিক মার্কেটে। কিন্তু ক্রিপ্টো সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি। আমি আমার পরিচিত কয়েকজন যারা ওয়াল স্ট্রিটের সাথে সম্পৃক্ত তাদের জিজ্ঞাসা করলাম যে, আপনি ক্রিপ্টো সম্পর্কে কি বোঝেন? জবাব সেই অন্ধের হাতি দেখার মতো।
একজন বলল ক্রিপ্টো হচ্ছে ভার্চুয়াল, বাস্তবে এর কোন অস্তিত্ব নাই, তাই ভরসা করা ঠিক হবে না।কেউ বলেন এটি জুয়া তাই হালাল হারাম প্রসঙ্গ চলে আসে, আবার কেউ বলেন এটি ডিজিটাল কারেন্সি যা ভবিষ্যতের মানি মার্কেট। আর বাংলাদেশ সরকার তো এটাকে অবৈধ বলে হুলিয়া জারী করে রেখেছে। কারন ঐ একটাই অবৈধ জুয়া। হালাম তকমা দিয়ে যদি অশিক্ষিত বক ধার্মিকেরা আবার সরকারকে বিরক্ত করে! বিরোধী দলের সমালোচনার ইস্যু হতে পারে। এমন অনেক কিছু হতে পারে। কিন্তু সেটার সাথে বাস্তবতার অনেক ফারাক। এই ফারাক বুঝতে হলে তো পড়াশুনা করতে হবে, সে সময় কোথায় আমাদের। যেমন চলছে চলুক না!
আমি খুব সংক্ষেপে বলতে চাই ক্রিপ্টো কারেন্সি কি এবং কেন এটি ভবিষ্যতের অর্থনীতির চাবিকাঠি হবে ক্রিপ্টো কি সেটা জানতে হলে আগে জানতে হবে মাইনিং কি এবং ব্লক চেইন কি ক্রিপ্টো কারেন্সি কিংবা ক্রিপ্টো হচ্ছে ডিজিটাল কারেন্সি বা ডিজিটাল টোকেন যেটা কোন পন্য কিংবা সেবা ক্রয় বিক্রয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহ্নত হয়। যেহেতু এটি অনেকটা ডলার কিংবা টাকার মতো কাজ করে তাই একে কারেন্সিও বলা হয়। যেমন এই মুহুর্তে আপনি বিটকয়েন কিংবা ডোজ কয়েন দিয়ে টেসলা গাড়ি কিংবা স্পেস এক্স এর সকল সেবা পেতে পারেন। এছাড়া উইকিপিডিয়া, মাইক্রোসফ্ট, এটিএনটি, মায়ামী ডলফিন, কিছু কিছু পিৎজা হাট, সাবওয়ে, বার্গার কিং, নরওয়েজিয়ান এয়ার সহ বেশ কিছু কোম্পানী তাদের পেমেন্ট গেটওয়ে হিসেবে বিটকয়েন গ্রহন করছে। কিছু কোম্পানি এথেরিয়াম এবং ডোজকয়েন এক্সেপ্ট করছে। এমনকি এমাজনও একটি বিশেষ উপায়ে বিটকয়েন এবং এথেরিয়াম গ্রহণ করে থাকে। আর ব্লক চেইন হচ্ছে সকল ধরনের ক্রিপ্টো টোকেনের ডিজিটাইজেশনের দলিল। সহজ কথায় আমরা যাকে ট্রেড মার্ক বলে থাকি। যেটা আপনার টোকেনের স্বকীয়তা, নিরাপত্তা এবং অস্তিত্ব নিশ্চিত করে। সকল ক্রিপ্টো কারেন্সি বল্কচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে যার মাধ্যমে পৃথিবীর সকল ডিভাইসকে সন্ট্রালাইজেশন করে এর আদান প্রদানকে নিরাপত্তা প্রদান করে। মাইনিং হচ্ছে একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি ক্রিপ্টো ব্লকচেইনে পাঠানো হয় এর নথিকরণ এবং স্বকীয়তা নিশ্চিতকরণের জন্য। এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া। ধারণা করা হয়, একটি বিটকয়েন মাইনিং করতে প্রায় ৭০-৭৫ হাজার ডলার খরচ হয়ে থাকে।
আসুন এবার জানি কেন ক্রিপ্টো ভবিষ্যতের মানি মার্কট শাসন করবে। এই মুহূর্তে ক্রিপ্টো কারেন্সির মার্কেট মূল্য প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। যার বড় অংশ দখল করে আছে বিটকয়েন এবং এথেরিয়াম। এবং দিন দিন এর সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ চায়না ১৭ এপ্রিল ২০১৭ সালে তাদের নিজস্ব ক্রিপ্টো ইউয়ান চালু করে এবং এবছর মে মাসে চায়নিজ সরকার আন্তর্জাতিক সকল ক্রিপ্টো নিষিদ্ধ করে তাদের নিজস্ব ক্রিপ্টোর ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য। যদিও বিটকয়েনের সমগ্র মার্কেট ক্যাপিটালের প্রায় ৬৫% চায়না দাবিদার। এদিকে আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপর চাপ আসছে নিয়মিত তাদের নিজস্ব ক্রিপ্টো কারেন্সি করার। ওয়েল্স ফার্গো, মাইক্রোসফ্ট, টেসলার মতো বড় বড় কোম্পানি তাদের বিনিয়োগ ক্রিপ্টোর দিকে ঝুঁকছে। আমরা সবাই আলী মিজানীকে চিনি কম-বেশি, যারা জানি না তারা একটু গুগল করে নেবেন। ক্রিপ্টো সম্পর্কে তার কোনো প্রেডিকশন আজও ভুল প্রমাণিত হয়নি। আমার মতো তিনিও এক বাক্যে স্বীকার করেন যে, ক্রিপ্টো ইজ দ্য ফিউচার। আর তার মতে ক্রিপ্টো মূল্য কেমন হবে সেটা এখানে না বলাই ভালো। ওয়াল স্ট্রিটের বড় বিনিয়োগকারী চাম্পাথ পালিহাপিটিয়া তো টিভি সাক্ষাৎকারে বলেই দিলেন যে বিটকয়েন ২ লক্ষ ছোঁবে খুব শীঘ্রই। এলোন মাস্ক তো টুইটের পর টুইট করেই যাচ্ছেন ডোজকয়েন নিয়ে এবং টেসলা ও স্পেস এক্সের সকল সেবার বিনিময়ে বিটকয়েন এবং ডোজকয়েন এক্সেপ্ট করছেন কয়েকমাস যাবত। ধারণা করা হয় ক্রিপ্টো কারেন্সিকে জনসাধারণদের কাছে গ্রহন যোগ্য করার জন্য এলোন মাস্কই অনেকাংশে দাবিদার। এতো এতো অর্থনীতিবিদ, বিনিয়োগকারী সকলেই যখন ডিজিটাল কারেন্সির পক্ষে তখন আমি আপনি হালাল-হারাম কিংবা জুয়ার দোহাই দিলে তাতে আমাদের লোকসান হবে। ক্রিপ্টো তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলেছে।

ক্রিপ্টো মার্কেটে বিনিয়োগ আপনার ভবিষ্যতের রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান হতে পারে। ক্রিপ্টোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগই উত্তম। আপনি এমন কোনো অর্থ বিনিয়োগ করবেন না যেটা দিয়ে আপনার দৈনন্দিন কিংবা মাসিক বিল পরিশোধ করতে হবে। পোর্টফোলিও হতে হবে বিভিন্ন কোম্পানি নিয়ে। এবং বিনিয়োগের আগে অবশ্যই প্রতিটি ক্রিপ্টোর মার্কেট ক্যাপিটাল, টোটাল ভল্যুম এবং সার্কুলেশন যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগ করুন। এক্ষেত্রেও আপনার যথেষ্ট পড়াশোনা করার প্রয়োজন রয়েছে। ক্রিপ্টোর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই কথাটি সত্য নয়। ব্লকচেইনে নথিভুক্ত একটি বাস্তব এবং নিরাপদ দলিল। তবে এখানেও ছোট বড় ক্রিপ্টো রয়েছে। যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগ করলে লাভবান হওয়া সম্ভব, তবে ধৈর্য্য এখানে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।


