দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাওফিকা গ্রুপ
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : এনামুল হক এনাম
বাংলাদেশের এক মেধাবী উদ্যোক্তা দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক ২৬ বছরের অধিক সময় মালয়েশিয়া অবস্থানের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি তাঁদেরই একজন যাঁরা বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম ও ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করে চলেছেন। আইসক্রিম শিল্পে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘লাভেলো’ ব্র্যান্ড এসময়ের সেরা আইসক্রিম হিসেবে ব্যাপক আলোচিত ও প্রশংসিত। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও তাওফিকা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দাতো প্রকৌশলী মো. একরামুল হক বর্তমানে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এই শিল্প-ব্যবসা গ্রুপের আওতায় দেশের নির্মাণ খাত, ব্যাংক ও খাদ্যপণ্যের ব্যবসায় বিনিয়োগ করে চলেছেন তিনি। এ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান তাওফিকা ফুডস অ্যান্ড এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ সম্প্রতি আইপিওতে অংশ নিয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ৭৪৪টি মিটিংয়ের পর আইপিওতে ৩০ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহের অনুমোদন দিয়েছে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এর সাবস্ক্রিপশন সমাপ্ত হয়। প্রত্যয়ী ও সফল উদ্যোক্তা ব্যক্তিত্ব দাতো’ ইঞ্জিনিয়ার একরামুল হক বলেন, আমরা আমাদের সুনাম অক্ষুণ্য রাখবো এবং বিনিয়োগকারীদের ভালো রিটার্ন দেবো ইনশাআল্লাহ। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে- আগামী ৫ বছরে এটি ব্লুচিপ কোম্পানিতে পরিণত করতে সক্ষম হবো। উল্লেখ্য, দাতো’ একরামুল হক একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা যিনি ৯০র দশক থেকে মালয়েশিয়া ও কানাডায় ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন, সে সব দেশেও তিনি থাকেন। তিনি দেশের এনআরবি ব্যাংকের উদ্যোক্তা এবং নির্বাহী কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি মনে করেন, বর্তমানে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার মতো উন্নয়ন ধারা গ্রহণ করছে।
উদ্যমী, আত্মপ্রত্যয়ী উদ্যোক্তা, অনিবাসী ব্যবসায়ী দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক সম্প্রতি অর্থকণ্ঠকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে যা বলেন তা এখানে উপস্থাপন করা হলো :

অর্থকণ্ঠ : আপনি একজন এনআরবি ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব। বিদেশে যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন পাশাপাশি দেশেও নির্মাণ খাত, ব্যাংক ও খাদ্যপণ্যের ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। সম্প্রতি আপনার প্রতিষ্ঠান তাওফিকা ফুডস অ্যান্ড এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের অনুমোদন পেয়েছে। আপনি কেন পুঁজিবাজারে এলেন?
দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক : দেখুন, আমি প্রবাসে ব্যবসা-বাণিজ্য করলেও বাংলাদেশ আমার নিজের দেশ। এখানেই আমার শেকড়। আমার উদ্যোগে দেশের নির্মাণ ও ব্যাংকিং খাতে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। বিদেশিরা তখনই বিনিয়োগ করে যখন তারা যাচাই-বাছাই শেষে বুঝতে পারে প্রতিষ্ঠানটি ভালো এবং যে দেশে বিনিয়োগ হবে সেখানকার বিনিয়োগ পরিবেশসহ সামাজিক রাজনৈতিক পরিবেশ বিনিয়োগ অনুকূল। অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝতে পারলাম আমার নিজের প্রতিষ্ঠানকেই যদি আইপিওতে নিয়ে আসি তাহলে এটি আরো সুন্দর ব্যবস্থাপনায় গোছানো এবং দায়বদ্ধ একটি কোম্পানিতে পরিণত হবে। এটি যখন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহী হবে এতে বিনিয়োগ করতে। আপনাদের অবগতির জন্যে জানাচ্ছি যে, ‘Lovello’ এই নামটি ‘Love’ থেকে নেওয়া। গত ৪ বছরে ‘লাভেলো আইসক্রিম’ লাখ লাখ মানুষের হৃদয়ে স্থান লাভে সক্ষম হয়েছে। এর স্বাদ সম্পূর্ণ আলাদা। সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশব্যাপী এর চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে। লাভেলো’র ৬২টি আইটেম রয়েছে।
দ্বিতীয়ত: যে সকল এনআরবি উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী তারা একটি প্ল্যাটফর্ম পাবেন।
তৃতীয়ত: এটি এখন একটি পারিবারিক কোম্পানি। আমার স্ত্রী ও মেয়ে এ কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার। মেয়ে পড়াশোনা শেষ করে দেশে এসে এখানে তার ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাবে। মূলত এসব কারণেই বিশ্বমানের লাভেলো ব্র্যান্ডের আইসক্রিম প্রস্তুতকারী কোম্পানি তাওফিকা ফুডস অ্যান্ড এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজকে আইপিওতে নিয়ে এসেছি।

অর্থকণ্ঠ : বাজার অর্থনীতির এই সময়টায় শেয়ার বাজারের প্রতি মানুষের আস্থা যথেষ্ট কম; এর মধ্যেও আপনারা আইপিওতে যাচ্ছেন
দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক : পৃথিবীর সকল শেয়ার বাজারেই ভালো-মন্দ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার রয়েছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীসহ অন্য বিনিয়োগকারীদের বুঝে নিতে হবে সেই প্রতিষ্ঠানটি কাদের দ্বারা পরিচালিত, প্রকৃত ব্যবসায়ী কিনা এবং তাদের গ্রুপের পজিশন। আমরা প্রকৃত অর্থেই উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী। আমাদের গ্রুপের সুনাম রয়েছে। সম্পদ রয়েছে। এসব বিবেচনা করেই শেয়ার হোল্ডার হতে আগ্রহীরা এটি বেছে নেবেন এ বিশ্বাস আমাদের রয়েছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় ৪৮ বিঘা জমির মধ্যে আমাদের ফ্যাক্টরি বিল্ডিং অবস্থিত। মনোরম পরিবেশ ও স্বাস্থ্যসম্মত এই ফ্যাক্টরিতে কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা, ইটিপি এবং অন্যান্য স্থাপনা রয়েছে।
অর্থকণ্ঠ : বাংলাদেশে সুস্বাদু আইসক্রিম এই খাদ্যশিল্পের অবস্থান কেমন?
দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক : আইসক্রিমের বিশ্ববাজার বিশাল প্রায় ৬ হাজার কোটি ডলার। বাংলাদেশে এ খাতের আকার প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্র্যান্ডেড আইসক্রিমের দখলে রয়েছে ১২০০ কোটি টাকার বাজার। একসময় গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। এখন বিদ্যুৎ থাকায় গ্রামের দোকানপাটেও রেফ্রিজারেটরের ব্যবস্থা রয়েছে। সুতরাং এর চাহিদা ও উৎপাদন অনেক গুণ বেড়েছে।
অর্থকণ্ঠ : আপনি ২০১৬ সালে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে ‘ভালোবাসার আইসক্রিম’ হিসেবে ‘লাভেলো’ ব্র্যান্ডের আইসক্রিম বাজারজাত করেন কেমন সাড়া পেয়েছিলেন?
দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক : ‘ভালোবাসা আইসক্রিম’ দিয়েই আমাদের লাভেলো’র পথ চলা শুরু। অল্প সময়ের মধ্যে আমরা ভোক্তা-সাধারণের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছি। এর কারণ হচ্ছে স্বাদের ভিন্নতাসহ প্যাকেজিং, মার্কেটিং, ডিস্ট্রিবিউশন এবং ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে আমরা নতুনত্ব এনেছি। প্রতি বছরই আমাদের আইসক্রিমের চাহিদা ১৮ থেকে ২০ শতাংশ হারে বৃৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা এখনো মার্কেট শেয়ারের দিক থেকে শীর্ষে পৌঁছুতে পারিনি। তবে পণ্য মান বিবেচনা করলে লাভেলো সবার উপরে। অল্প সময়ের মধ্যেই সব বয়সের আইসক্রিম-প্রেমীরা লাভেলোকে গ্রহণ করেছেন। এটি এখন সুপরিচিত ব্র্যান্ড।
অর্থকণ্ঠ : এই শিল্পে কত জন বল সংশ্লিষ্ট বলে মনে করেন?
দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক : আইসক্রিম শিল্পে বর্তমানে ২০/২৫ হাজার মানুষ কাজ করছেন। তবে পরোক্ষভাবে অর্থাৎ বাজারজাত প্রক্রিয়ায় আরও অনেক লোক এর সাথে জড়িত।
অর্থকণ্ঠ : কোভিড-১৯ এর অভিঘাতে আপনাদের আইসক্রিম শিল্প কতোটা ক্ষতিগ্রস্ত?
দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক : করোনার কারণে এই শিল্পের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কারণ মানুষের মধ্যে ধারণা জন্মেছে যে, ঠান্ডা জিনিস খেলে ‘করোনা’ হতে পারে। এটি কিন্তু ভুল ধারণা। উন্নত বিশ্বে প্রচন্ড শীতের সময়েও মানুষ আইসক্রিম খায়। আইসক্রিমের পিক মৌসুম হচ্ছে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত। করোনার কারণে এ সময় ব্যবসা হয়নি বললেই চলে। তবে পরে কিছুটা গতি ফিরে এলেও আবার শীত চলে এসেছে। ফলে ব্যবসা অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। আমরা আগামী বছরকে সামনে নিয়ে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করছি। আশা করছি, এই শিল্প সামনের দিকে আরও গতিশীল হবে।
অর্থকণ্ঠ : তাওফিকা ফুডস অ্যান্ড এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ আইসক্রিম ছাড়া আর কোন ধরনের পণ্য বাজারে আনার উদ্যোগ নিচ্ছে?
দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক : এটি ঠিক বর্তমানে আমরা শুধু ‘লাভেলো আইসক্রিম’ বাজারে এনেছি। আমাদের শুরুটা ছিল ২০১৬ সালের ১৪ ফেব্রæয়ারি ভালোবাসা দিবসের মাধ্যমে। আশা করছি সামনের ভালোবাসা দিবসে আমরা উন্নত মানের চকোলেট ও ক্যান্ডি উৎপাদন এবং বাজারজাত করবো। দেশে এর ব্যাপক চাহিদা আছে এবং তা আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। আমরা আমদানি বিকল্প উন্নতমানের চকোলেট ও ক্যান্ডি উৎপাদনের উদ্যোগ নিচ্ছি।
অর্থকণ্ঠ : আপনি একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশে নির্মাণ খাতের ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত। সেসব থেকে এগ্রোবেজড খাদ্যশিল্পের প্রতি আগ্রহী হলেন কীভাবে?
দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক : ঠিকই বলেছেন। একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমার ব্যবসার মূল বিষয় হচ্ছে নির্মাণ খাত। গত ২৬ বছর ধরে আমি মালয়েশিয়ায় আছি। দেশেও আমরা বেশ কিছু কনস্ট্রাকশন, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ও কনসালট্যান্সি করেছি।
আমি উপলব্ধি করলাম বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। এখানে খাদ্যপণ্যের বিশাল বাজার রয়েছে। এ খাতের ব্যবসা সম্ভাবনাময়। দেখলাম দেশে আন্তর্জাতিক মানের আইসক্রিম ফ্যাক্টরি নেই। আমি মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ের আইসক্রিম শিল্পের বেশ ক’জন উদ্যোক্তার সাথে কথা বলেছি। তারা একটি কমপ্লায়েন্ট প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতে চায়। সেজন্যেই আমরা আইপিওতে এসেছি। ‘লন্ডন ডেইরি’ দুবাইয়ের বিখ্যাত আইসক্রিম ব্র্যান্ড। তাদের সাথে কথা হয়েছে। তারা যৌথ উদ্যোগে ব্যবসা করতে ইচ্ছুক। এক্ষেত্রে তারা হয়তো সাবকন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আমাদের কারখানায় পণ্য উৎপাদন করে একই সাথে লাভেলো ও তাদের ব্র্যান্ডের মাধ্যমে এ দেশের বাজারে ব্যবসা করতে পারে। আবার এমনটাও হতে পারে যে, তারা আমাদের সাথে যৌথভাবে ইন্ডাস্ট্রি করে উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করতে পারে। প্রতিবেশী ভারতেও আমাদের ব্যবসার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতের আইসক্রিম শিল্পের আকার বর্তমানে ৯ হাজার কোটি রুপি। আমরা এখানে যৌথভাবে শিল্প গড়তে সক্ষম হলে ভারতেও বাজারজাত সম্ভব হবে।
অর্থকণ্ঠ : আপনি দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় প্রবাসী এবং ‘দাতো’ হিসেবে সম্মানিত। মালয়েশিয়ার বিস্ময়কর উন্নয়ন উত্থান দেখার সুযোগ পেয়েছেন। বাংলাদেশের উন্নয়নে কি ধরনের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করেন?
দাতো’ প্রকৌশলী মো.একরামুল হক : আমি গত শতাব্দীর ৯০ দশকে যখন মালয়েশিয়ায় আসি তখন এখানকার অবস্থা বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ ছিল। কিন্তু তাদের দৃঢ়তা, নেতৃত্ব ও পরিকল্পনা আজ দেশটির চেহারা পাল্টে দিয়েছে। মালয়েশিয়ার উন্নয়নের রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ যেমন দূরদর্শী, আত্মপ্রত্যয়ী নেতৃত্বের মাধ্যমে মালয়েশিয়াকে জাগিয়ে দিয়েছেন- তেমনি তাদের পরিকল্পনা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি। রাস্তাঘাট, বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরি এবং বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস প্রতি ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের নিকট পৌঁছে দিয়েছেন দ্রæততার সাথে। তাদের ওখানে সড়ক, সেতু, মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, এয়ারপোর্ট, টুইন টাওয়ার, ব্যবসার সুযোগ ও অথনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলেছেন- তাদের অবকাঠামোর উন্নয়নই দেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতকে এভাবেই শক্তিশালী পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। আশার কথা বর্তমান সরকার অবকাঠামো খাতে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা তার বড় প্রমাণ। বিশ্ব আজ বাংলাদেশের এই অভাবনীয় নির্মাণে সত্যিই অবাক হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশেও অনেক অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থকণ্ঠ : এদেশের জনশক্তি বিশ্বের দেশে দেশে কাজ করছে, অনেক টাকা রেমিট্যান্স আসছে ফলে আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ বর্তমানে ৪২ বিলিয়ন ডলার। আপনার প্রতিক্রিয়া কি?
দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক : এদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স বড় ভ‚মিকা পালন করছে। আমাদের জনশক্তিকে অধিক দক্ষ করে বিদেশে প্রেরণের ব্যবস্থা করা হলে এই রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৫ গুণ হয়ে যাবে তাতে সন্দেহ নেই। আমি মনে করি, এ ব্যাপারে সরকারের পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন স্কুল পর্যায়ে বিদেশের চাহিদা মোতাবেক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা উচিত। এতে করে শুধু বিদেশে কর্মী প্রেরণই নয় আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে।

অর্থকণ্ঠ : অনেকেই মনে করছেন, দেশে দুর্নীতি-অনিয়ম ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের জতি-রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাই শুধু নয়, দেশের বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ হারাচ্ছেন আপনার কি মনে হয়?
দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক : এটা ঠিক যে, দুর্নীতি শুধু দেশের অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, দেশের ভাবমূর্তিকেও বিনষ্ট করে। আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। দুর্নীতি কমবেশি সব দেশেই আছে। কিন্তু বাংলাদেশে এটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। শুধু দুর্নীতিই বা বলি কেন? মাদকাসক্তির হারও বেড়েছে। এটিও দেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে- নতুন প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। এ সব ব্যাপারে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অর্থকণ্ঠ : আপনি কি মনে করেন, বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাও ব্যাপক- এক্ষেত্রে সরকারের কি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক : এদেশের পর্যটন শিল্প নীতিমালার আধুনিকায়ন প্রয়োজন। বিদেশিরা এখন এখানে আসবে, তাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দরকার। যে সব স্থানে পর্যটকরা যাবে সে সব এলাকা ও রাস্তাঘাটের উন্নয়ন প্রয়োজন। আমাদের দেশে পাহাড়পুর, কুমিল্লার ময়নামতি ও বগুড়ায় মহাস্থানগড়সহ যেমন প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে- তেমনি দর্শনীয় এবং বেড়ানোর জায়গাও রয়েছে। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, কুয়াকাটা, সুন্দরবন, পার্বত্য জেলাগুলোসহ সিলেটের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান বিদেশিদের মুগ্ধ করে। বিশ্বের পর্যটন উৎসাহী মানুষদের আগ্রহ সৃষ্টি করতে আমাদের দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে এসব তথ্য বিভিন্ন মাধ্যমে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
অর্থকণ্ঠ : বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ অনেক কমে এসেছে- নতুন বিনিয়োগ আসছেই না; আপনার পরামর্শ কি?
দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক : আমি মনে করি, অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহ গড়ে উঠলে এর পরিবর্তন ঘটবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন দেখবে এখানে বিনিয়োগ অনুক‚ল পরিবেশ ও অবকাঠামো বিদ্যমান তখন তারা আসবেই। কারণ, বাংলাদেশ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি অপার সম্ভাবনাময় দেশ। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়।
অর্থকণ্ঠ : বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনি কতটুকু আশাবাদী?
দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক : বাংলাদেশ ক্রমাগত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে চলেছে। ইতোমধ্যে আমরা নি¤œ মধ্যম অর্থনীতির মোড়ক থেকে বেরিয়ে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি। মাথাপিছু আয় ২২০০ ডলার ছাড়িয়েছে। হতদরিদ্র ও দারিদ্র্যের হার একসময় ৬০ শতাংশ ছিল যা এখন ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে। খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশ এখন খাদ্যপণ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হচ্ছে। আমরা নিজের অর্থে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারছি- ঢাকায় আরও ফ্লাইওভার নির্মাণ, মেট্রোরেলের কাজ, মহাসড়কগুলো ফোর/সিক্স লেনের হচ্ছে। উন্নয়নের এই চেহারায় আমি নিশ্চিত- বাংলাদেশ আগামী দশ বছরের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
অর্থকণ্ঠ : আপনি এনআরবি ব্যাংকের একজন উদ্যোক্তা এবং নির্বাহী কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান। আপনি দীর্ঘদিন মালয়েশিয়া থেকে সেখানকার উন্নয়ন দেখার সুয়োগ পেয়েছেন। আমাদের দেশে কি ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন?
দাতো’ প্রকৌশলী মো. একরামুল হক : আপনি ঠিকই বলেছেন। বাংলাদেশ ক্রমেই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে চলেছে এবং বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে। আমি মনে করি, বর্তমান সরকারের উচিত এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়াকে মডেল হিসেবে ধরা। তবে এটাও ঠিক যে, আমাদের দেশের উন্নয়ন নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ীই হবে। আশা করছি বর্তমান সরকার পরিকল্পিতভাবেই উদ্যোগ নিচ্ছে। অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্তভাবে দেশ পরিচালিত হলে আমরা আরও দ্রæত কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছুতে সক্ষম হবো।



