সাক্ষাৎকার

মহান ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ জাতি হিসেবে আমাদের অনেক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে

রোকেয়া হায়দার মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী শিক্ষিত সচেতন মানুষ মাত্রই তাকে এক নামে চেনেন তিনি রোকেয়া হায়দার। আর চিনবেই না কেন যখন বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ের মিডিয়া ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ বাংলা নিউজ সার্ভিসের নিউজ এঙ্কর রোকেয়া হায়দারের সুরেলা কণ্ঠ ভেসে আসে ‘সাগর পারের বন্ধুরা, ভয়েস অব আমেরিকা থেকে খবর পড়ছি রোকেয়া হায়দার’। শ্রোতাদের কাছে সে এক অন্যরকম অনুভূতি। দেশ-বিদেশের অসংখ্য খবর পাঠকের কণ্ঠই শোনা হয় প্রতিদিন কিন্তু একজন রোকেয়া হায়দারের কণ্ঠে যেন ক্যারিশমা রয়েছে যা তাকে সাধারণ থেকে অসাধারণ পরিচিতি এনে দিয়েছে এনে দিয়েছে খ্যাতির মুকুট।
রোকেয়া হায়দারের জন্ম ১৯৪৬ সালে পশ্চিম বঙ্গের কলকাতায়। তিনি হাই স্কুলের শেষ সার্টিফিকেটটিও কলকাতা থেকেই নিয়েছেন। এরপর চলে আসেন ঢাকায়, ভর্তি হন ইডেন মহিলা কলেজে। এখান থেকে কৃতিত্বের সাথে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি বিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিভাগে ¯œাতক ও ¯œাতকোত্তর শেষ করেন ১৯৬৬ সালে। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭১ এই ক’টি বছর পরিবারের সাথে চট্টগ্রামে অবস্থান করেন। এসময় তিনি রেডিও পাকিস্তান, চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কেন্দ্রের সংবাদপাঠক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম রেডিওতে স্থানীয় সংবাদ পড়ার মাধ্যমে তার মিডিয়া জগতের কার্যক্রম শুরু। যদিও ছোট বেলায় নাটক, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচ, গান প্রভৃতি কর্মকার্যে অংশগ্রহণ ছিল কিন্তু তখনো পেশা হিসেবে এই সম্পৃক্ততার কথা ভাবেননি। এই ভালোলাগা থেকেই তিনি চট্টগ্রাম রেডিওতে স্থানীয় সংবাদ পড়া শুরু করেন।


তিনি ১৯৭৪ সালে ঢাকায় বাংলাদেশ বেতার এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন দু’মিডিয়াতেই নিয়মিত খবর পড়তে থাকেন। একসময় কণ্ঠের মাধ্যমে যাকে সবাই একান্ত আপন হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বিটিভি’র সৌজন্যে তাকে দেখারও সুযোগ পেলেন শ্রোতারা। ঢাকায় বসেই ১৯৭১ সাল থেকে তিনি নিয়মিত কণ্ঠ দিতেন ভয়েস অব আমেরিকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। এরপর চূড়ান্ত পরীক্ষায় পাস করে ১৯৮১ সাল থেকে আমেরিকায় গিয়ে ভয়েস অব আমেরিকায় যোগদান করেন। এই পেশাতেই স্থায়ী হয়ে যান। তিনি মনে করেন, ভয়েস অব আমেরিকার ‘খবর পাঠক’ হিসেবে তিনি যে খ্যাতি ও সম্মান লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন অন্য পেশায় হয়তো নাও পেতে পারতেন। পেশার প্রতি তিনি এতোই আন্তরিক যে, তার ধ্যান জ্ঞান এই খবর পাঠ নিয়েই। বর্তমানে তিনি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মিডিয়া প্রতিষ্ঠান ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধান সম্পাদক। তিনি শুধু খবর পড়েন না, লিখেন, অনুবাদ এবং সম্পাদনাও করেন।


ছোটবেলা থেকেই মেধাবী রোকেয়া হায়দার খেলাধুলার ব্যাপারেও সমান আগ্রহী। এর ফলে অলিম্পিক, কমনওয়েলথ গেমস, বিশ্বকাপ ফুটবল ও ক্রিকেটের খবর সংগ্রহের জন্যে অনেক দেশেই ছুটে বেড়িয়েছেন। ১৯৮৪ সালে লস এঞ্জেলসে বিশ্ব অলিম্পিক গেমসে ভয়েস অব আমেরিকার প্রতিনিধি হিসেবে নিউজ কভার করেন। এই বিশ্ব অলিম্পিকে বাংলাদেশ প্রথম অংশগ্রহণ করে এবং বাঙালির গর্বের লাল-সবুজ পতাকা ওড়ে।
রোকেয়া হায়দারের সাংবাদিকতা জীবন বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব তাকে ঈর্ষণীয় পেশাজীবীর মর্যাদা এনে দিয়েছে। বাংলাদেশকে নিয়ে তার গর্বের সীমা নেই। তিনি বলেন, বায়ান্ন’র মহান ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ জাতি হিসেবে আমাদের অনেক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। অন্য অনেকের মতো এই দেশপ্রেমিক ব্যক্তিত্ব মনে করেন- বাংলাদেশ শিগগিরই উন্নত রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভে সক্ষম হবে। তিনি বলেন, একসময় বাংলাদেশ দরিদ্রতার কারণে উন্নত ও ধনী অনেক রাষ্ট্রের কাছে সাহায্যের হাত পাততো; কিন্তু এখন সে অবস্থা নেই। বাংলাদেশ এখন নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধানে সক্ষম বলে তিনি মনে করেন।
নারী অগ্রগতির প্রশ্নে রোকেয়া হায়দার বলেন, বাংলাদেশ প্রমাণ করে দিয়েছে, নারীরা কর্মমুখিন হলে অর্থনীতি পাল্টে দেয়া যায়। সুযোগ পেলে নারীরাও যে অর্থনৈতিক শক্তি- বাংলাদেশ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। গ্রামের অল্পশিক্ষিত মেয়েরাও এখন শিল্প শ্রমিক হিসেবে উৎপাদনের গর্বিত অংশীদার।
মেধাবী, শিক্ষিত, অধ্যবসায়ী সংবাদ পাঠক ও কৃতী সাংবাদিক রোকেয়া হায়দার তার সুললিত কণ্ঠের মাধ্যমে অগণিত মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিতে সক্ষম হয়েছেন।
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button