সাক্ষাৎকার

ব্রিটেনে কারি সম্রাজ্য গড়ে ওঠার পেছনে বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টের অবদান অনেক

মাহতাব মিয়া, ডিরেক্টর, বিবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট, নর্থ ইস্ট রিজিওন, ইউকে

ব্রিটেনের ব্যবসা-বাণিজ্যে যে ক’জন বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠালাভে সক্ষম হয়েছেন মাহতাব মিয়া তাদের অন্যতম। তিনি ব্রিটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিবিসিসিআই) ডিরেক্টর এবং নর্থ ইস্ট রিজিওনের প্রেসিডেন্ট। তিনি Newcastle Bangladeshi Association-এরও চেয়ারম্যান।
ব্রিটেনের অর্থনীতিতে কারি সাম্রাজ্যের ভূমিকা ও অবদান ব্যাপক। এ খাতের বিশিষ্ট উদ্যোক্তা ব্যক্তিত্ব মাহতাব মিয়ার ‘ভোজন’ রেস্টুরেন্ট শুধু ব্রিটেনেই নয়, অন্যান্য দেশের ভোজনপ্রিয় মানুষের কাছেও সুপরিচিত। ভোজন একটি অভিজাত বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট। উদ্যোক্তা মাহতাব মিয়াদের মতো সৃজনশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশি এসব রেস্টুরেন্ট আধুনিকায়ন ও খাবারে নিত্য-নতুন বৈচিত্র্য সৃষ্টিতে নতুন মাত্রা পেয়েছে। ক্যাটারিং সেক্টরের ব্যবসার ক্ষেত্রে এই সাফল্য ও খ্যাতি মেইন স্ট্রিম মিডিয়া এবং মূলধারার রাজনীতিতেও ঈর্ষণীয়ভাবে সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছে।
দূরদর্শী ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব মাহতাব মিয়ার গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলাধীন নবীগঞ্জ উপজেলার রাধাপুর। তার বাবা মো: গৌছ মিয়া একজন সমাজসেবী। দাদা মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন দ্বীনের খেদমতে নিয়োজিত। ১৯৬৭ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে মাহতাব মিয়া ব্রিটেনে আসেন। এখানে নানা চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে ১৯৭৪ সালে যৌথ মালিকানায় সান্দারল্যান্ডে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মতিরাজ তন্দুরি’। এরপর ১৯৭৯ সালে তিনি এখানে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মাহতাব ক্যাটারিং সার্ভিস’ যার কার্যক্রম এখনো সগৌরবে অব্যাহত রয়েছে। ১৯৮০ সালে তিনি সাউথশিল শহরে চালু করেন ‘তন্দুরি ইন্টারন্যাশনাল’। সর্বশেষ তিনি নিউক্যাসলে চালু করেছেন ‘ভোজন’ রেস্তোরাঁ। ১৯৯০ সাল থেকে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে এটি চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি কাট পে মার্চেন্ট সার্ভিস লিমিটেডেরও চেয়ারম্যান।


মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মাহতাব মিয়া ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন সামাজিক কর্মকার্যের সাথে জড়িত। তিনি ১৯৭১ সালে বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধে ম্যানচেস্টার অঞ্চলে প্রবাসী নেতা এমএম মতিন ও ড. কবির চৌধুরীর নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি সান্দারল্যান্ড জামে মসজিদের কো-অর্ডিনেটর ও চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ কমিউনিটির যুবকদের ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সান্দারল্যান্ড শাপলা যুব সংঘ’। তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। ১৯৭৫ সালে তিনি চেন এন্ড ওয়ার বাংলাদেশি এসোসিয়েশনের ডেপুটি জেনারেল সেক্রেটারি, ১৯৭৬ সালে টাইন এন্ড ওয়্যার কমিউনিটি রিলেশন সার্ভিসের নির্বাহী সদস্য, ১৯৭৮ সালে নর্থামব্রিয়া পুলিশ ও কমিউনিটি লিয়াজোঁ গ্রুপের সদস্য হিসেবে কমিউনিটির বিকাশে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
মানব-কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ মাহতাব মিয়া রাজনৈতিক দল ও সামাজিক বিভিন্ন সংগঠনের সাথেও সম্পৃক্ত। তিনি ১৯৮১ সালে জাতীয় জনতা পার্টি নর্থ ইস্টের সেক্রেটারি জেনারেল, ১৯৯৬ সালে নর্থ ইস্ট যুব সংঘের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯৩ সালে যুক্তরাজ্য বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং একই সময়ে গ্রেটার সিলেট ডেভেলপমেন্ট এন্ড ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল ইউকে’র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থান করলেও বাংলাদেশের শেকড়সত্তাকে কখনো ভুলে যাননি। তিনি ২০১১ সাল থেকে নিউক্যাসল বাংলাদেশি এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তার আন্তরিক ব্যবস্থাপনায় সংগঠনটির প্রকল্প বাংলা স্কুল, নিউক্যাসল বাংলাদেশি কমিউনিটি সেন্টার ও জামে মসজিদ সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৬ সালে জামে মসজিদের নতুন ভবন গড়ে উঠেছে।
মানবদরদি মাহতাব মিয়া বাংলাদেশ ক্যাটারার্স এসোসিয়েশন-ইউকে’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ঘূর্ণিঝড় আইলা ও সিডরে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্যে এ সংগঠনের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার পাউন্ড সংগ্রহ করে প্রদান করেন।


২০১৭ সালের ২৮ অক্টোবর নিউক্যাসল বাংলাদেশি এসোসিয়েশনের ত্বরিৎ উদ্যোগে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থাকল্পে ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে অক্সফামের সহায়তায় গভীর নলক‚প স্থাপন করে দেয়া হয়; এতে প্রতিদিন ১৫ হাজার মানুষ বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারছে। ২০১৭ সালে তার নেতৃত্বে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে অর্থ সহায়তা দিয়েছে নিউক্যাসল বাংলাদেশি এসোসিয়েশন-ইউকে। এখানে ৭০০ মানুষের মাঝে জনপ্রতি ২০০০ টাকা করে নগদ সহায়তা প্রদান করা হয়।
এ সংগঠনের উদ্যোগে নবীগঞ্জ ইউকে আইসিটি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে- যেখানে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী কম্পিউটার বিষয়ে অধ্যয়নের সুযোগ পাচ্ছে।
আত্মপ্রত্যয়ী মাহতাব মিয়া যখন যে কাজ করেন তা অত্যন্ত দৃঢ়তা ও আন্তরিকতার সঙ্গে করেন। তার প্রতিষ্ঠিত ‘ভোজন’ ইতোমধ্যে অস্কারখ্যাত ‘ব্রিটিশ কারি অ্যাওয়ার্ড’সহ জাতীয়ভাবে শ্রেষ্ঠ রেস্তোরাঁসমূহের ব্যাংকিং গাইড মিশেলিন স্টারের স্বীকৃতি লাভ করেছে একাধিকবার। ভোজন রেস্তোরাঁর অভিজাত খাবার পরিবেশনের প্রশংসা করে ‘নর্থ ইস্ট এক্সক্লুসিভ’ প্রতিবেদনে ব্রিটেনের মূলধারার মানুষ এখন কারি ফুডে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলে অভিমত প্রকাশ করেছে। ব্রিটেনে ‘কারি সা¤্রাজ্য’ গড়ে ওঠার পেছনে ‘ভোজন’ এর মতো অভিজাত বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট ও একজন মাহতাব মিয়ার অবদান অনেক। মাহতাব মিয়া মনে করেন ‘ভোজন’ শুধু ব্রিটেনে বাংলাদেশ কমিউনিটির গর্ব বা অহংকার নয়, এর সাথে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও জড়িত। তিনি ভালো মানের খাবারের সাথে কখনো আপস করেন না। দেশের সুনাম অর্জনসহ বাংলাদেশে রেমিটেন্স প্রেরণের মাধ্যমেও তারা দেশপ্রেমের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।
বাংলাদেশি ব্রিটিশ মাহতাব মিয়া ও তার স্ত্রী সৈয়দা সালমা মাহতাব প্রকৃত অর্থেই গর্বিত দম্পতি। সালমা মাহতাব সত্যিই রতœগর্ভা মা এবং মাহতাব মিয়া একজন বিদ্যানুরাগী আদর্শ পিতা। তাদের ৫ মেয়েকেই তারা উচ্চশিক্ষিত ও সমাজের কল্যাণমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। মেয়েদের মধ্যে তিন জন ডাক্তার, এক জন ব্যারিস্টার ও এক জন চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট। পঞ্চরতেœর জনক হিসেবে মাহতাব মিয়াকে নিয়ে ২০০৪ সালের আগস্ট মাসে নিউক্যাসলের জনপ্রিয় ইংরেজি ম্যাগাজিন ‘নর্থ ইস্ট এক্সক্লুসিভ’ Our Father বা ‘আমাদের পিতা’ শিরোনামে কভারস্টোরি করে। তার স্ত্রী সৈয়দা সালমা মাহতাব রত্নগর্ভা মা হিসেবে ‘মাদার অব দ্য ইয়ার’ সম্মাননা লাভ করেন ২০১৩ সালে। এটি এটিএন বাংলা, ইউকের একটি প্রেস্টিজিয়াস অ্যাওয়ার্ড।
পরিকল্পিত জীবনমুখী মানুষ মাহতাব মিয়া সময়ের একজন আলোকিত ব্যক্তিত্ব যিনি কর্মপেশায় যেমন সফল- তেমনই পারিবারিক জীবনেও সাফল্যের এক অগ্রণী নায়ক। ক্রীড়ামোদী মাহতাব মিয়া গলফ, অ্যাঙলিং এবং টেনিস খেলায় পারদর্শী।
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button