প্রবাসে নিরাপদ এবং আরাম-আয়েশে জীবন যাপন করলেও প্রতি মুহূর্তে শেকড় সত্তার বাংলাদেশকে বুকে লালন করে চলেন- তাদেরই একজন জাপানের ব্যবসা-বাণিজ্য অঙ্গনের অন্যতম ‘কী পার্সন’ বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী নান্নু মোহাম্মদ ইসলাম (Nannu Md Islam)। তিনি জাপানের গাড়ি ব্যবসা খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান N.K. Trade International-এর উদ্যোক্তা চেয়ারম্যান এবং চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার। কর্মপেশায় নানা বৈচিত্র্যের অধিকারী নান্নু ইসলামকে এই সুউচ্চ অবস্থানে উঠে আসতে অনেক শ্রম ও মেধা ব্যয় করতে হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন সিটির পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকার বাসিন্দা নান্নু মো: ইসলামের জন্ম ৫ নভেম্বর এক সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী পরিবারে। তার পিতার নাম মরহুম হাজী আব্দুল জব্বার এবং মা মমতাজ বেগম। তার পিতার বাদামতলীতে ধানচালের আড়ত ছিল। তাদের ৯ ভাইবোনের বিশাল সংসার। নান্নু ইসলাম গেন্ডারিয়া হাই স্কুল থেকে ১৯৮৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় পাস করেন। সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে ১৯৮৫ সালে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেন এবং একই কলেজে স্নাতক ক্লাসে ভর্তি হন। কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি এলাকার সিনিয়র ব্যবসায়ী ভাইদের মাধ্যমে হংকং, ব্যাংকক এবং সিঙ্গাপুরে লাগেজ বিজনেসে জড়িয়ে পড়েন। এসব উন্নত দেশের চাকচিক্য ও জীবন যাপন তাকে আকৃষ্ট করে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন জার্মানি গিয়ে পড়াশোনা ও কাজ দুটোই করবেন। কারণ, তিনি অনুভব করতেন এত বড় সংসার বাবার একার আয়ে চলা কঠিন ব্যাপার। এসব চিন্তা করেই বিএ ক্লাস ভর্তি হলেও পড়াশোনা শেষ না করেই বন্ধুদের সাথে জার্মানিতে যাবার উদ্যোগ নেন। তাছাড়া দেশে তার বন্ধুদের অনেকেই এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়ায় নির্যাতনের শিকার হন। এই ভয় তার মধ্যেও কাজ করছিল। এসব ভেবেই বন্ধুরা মিলে ১৯৮৫ সালে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি যান।
বুদ্ধিদীপ্ত তরুণ নান্নু ভেবে দেখলেন জার্মান সরকারের দয়া-দাক্ষিণ্যে নয়, নিজস্ব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই চিন্তা থেকেই তিনি জার্মানি ছেড়ে জাপানে আসার চিন্তাভাবনা করছিলেন। ৭ মাস পর তিনি ব্যাংকক আসার পথে জাপানের টোকিওর হানেদা এয়ারপোর্টে ৩ দিনের ট্রানজিট সুবিধা নেন। ট্রানজিট সুবিধায় জাপান ঘুরে দেখে তার খুবই ভালো লাগে। তিনি আরও ৮ দিনের ট্রানজিট নিলেন। জার্মানরা যেখানে তাদের মতো কালো চামড়ার লোকদের কিছুটা হীনমন্য চোখে দেখে, তিনি বুঝতে পারেন জাপানিরা সেরকম নন। তিনি জাপানিদের মানুষের প্রতি মূল্যায়নকে খুব সম্মানের চোখে দেখেন এবং সিদ্ধান্ত নেন আর জার্মানি নয়Ñ জাপানেই থাকবেন। তিনি সেখানে অবস্থানকারী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে জানতে পারেন যদি স্টুডেন্ট ভিসা পাওয়া যায় তবে জাপান থাকা যাবে। তিনি একটি ল্যাংগুয়েজ ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে গেলেন। কিন্তু ল্যাংগুয়েজ ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ জানালেন, এখনই নয়, তাকে আবার অন্য দেশ থেকে জাপানে প্রবেশ করতে হবে।

জীবন সংগ্রামের অদম্য সৈনিক নান্নু ইসলাম তাই করলেন। তিনি ব্যাংকক হয়ে আবার জার্মানি এলেন। জার্মানি থেকে জাপানের স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে কিছুদিন পরেই জাপান এলেন এবং টোকিও ইন্টারন্যাশনাল ল্যাংগুয়েজ স্কুলে ক্লাস শুরু করলেন।
উল্লেখ্য, দূরদর্শী চিন্তার অধিকারী নান্নু ইসলাম জার্মানি যাওয়ার আগে দেশে জার্মান ও ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ কোর্স করেছিলেন। এই দুটো কোর্স ও এসব ভাষা চর্চা করার সুবাদে তিনি জার্মান ও ইংরেজিতে বেশ দক্ষ হয়ে ওঠেন।
তিনি জাপানের Tokyo International Language School-এ ভর্তি হলেন বন্ধুদের নিয়ে। জাপানে শুরু হলো জীবন-জীবিকার যুদ্ধ। ল্যাংগুয়েজ ক্লাসের পাশাপাশি হোটেল ম্যানেজমেন্ট বিষয়েও ৩ মাসের কোর্স করেন। তারুণ্যে উচ্ছল নান্নুর চাকরি হয়ে যায় জাপানের ইন্টারন্যাশনাল হোটেল শেরাটনে। তিনি এখানে বছরে ৬০ হাজার ডলার বেতনসহ ৩০% বোনাস পেতেন। হোটেলের চাকরি সুবাদে বাংলাদেশের অনেক শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তার সাথে তার পরিচয় ঘটে। তাদেরই একজন দেশখ্যাত উদ্যোক্তা, সাবেক মন্ত্রী প্যাসিফিক গ্রæপের চেয়ারম্যান মোর্শেদ খান। তিনি জাপান গেলে এই হোটেলেই উঠতেন। মোর্শেদ খান বাংলাদেশে Nissan & Excell গাড়ির ইম্পোর্টার ছিলেন। পরিচয় হবার পর মোর্শেদ খান তাকে তার প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করার অনুরোধ জানান। নান্নু ইসলাম ১৯৯৩ সালে জাপানের ওরিয়েন্ট ট্রেডিং এর এক্সপোর্ট ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন।
অভিজ্ঞ ও দক্ষ নান্নু দেখলেন, বাংলাদেশে ১৫/১৬ হাজার ডলারের গাড়ি বিক্রয় করা বেশ কঠিন। তিনি ভিন্ন চিন্তা করলেন। তিনি সেখানকার সদ্য পুরনো গাড়িগুলোকে ব্র্যান্ড নিউ বানিয়ে ৩/৪ হাজার ডলারের মধ্যে গাড়ি আমদানির কথা বললেন মোর্শেদ খানকে। এ জন্যে তিনি ১৯৯৫ সালে গড়ে তুললেন নিজের প্রতিষ্ঠানN.K. International Trading. শুরু হলো একজন উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী হিসেবে নান্নু ইসলামের নতুন জীবন। তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। বাংলাদেশে ‘রি-কন্ডিশন’ গাড়ি রপ্তানির তিনিই পাইওনিয়ার ব্যক্তিত্ব। শুধু তাই নয়, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে ‘ইয়েলো ক্যাব’ এর তিনিই উদ্যোক্তা। তিনি তার রিকন্ডিশন গাড়ি বাংলাদেশে রপ্তানি এবং উন্নত দেশের মতো এদেশেও পরিবহন ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যেই এটি করেন। তিনি সেসময় দেশের ব্যাংক ও ফিন্যান্সিয়াল/লিজিং প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ প্রক্রিয়ায় শত শত মানুষকে ‘ইয়েলো ক্যাব’ ব্যবসার মালিক হবার সুযোগ করে দিয়েছেন।
চিন্তা-চেতনায় অগ্রসর এই মানুষটি যেখানেই যে উদ্যোগ নিয়েছেন সেখানেই সফল হয়েছেন। বিশ্বের প্রায় ৫৬টি দেশে N.K. International গাড়ি রপ্তানি করে।
নান্নু ইসলামের বাংলাদেশ প্রেম শত ভাগ। তার ফেসবুক ওয়ালে তিনি লিখে রেখেছেন- ‘Love My Country Bangladesh Love My Country People’.
আপাদমস্তক একজন গুণী ও ভালো মানুষ নান্নু ইসলাম প্রতি মুহূর্তে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রত্যাশা করেন। তিনি বলেন, দেশে প্রচুর পরিশ্রমী ও সৎ মানুষ রয়েছে। কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে জাতীয় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক


