দুলাল আচার্য
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর সেরা উপহার স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এটি বাঙালির স্বপ্নসিঁড়ি। দেশি ও আন্তর্জাতিক নানা চক্রান্ত পেছনে ফেলে দেশীয় অর্থায়নে নির্মিত হলো দেশের যোগাযোগখাতে সবচেয়ে বড়ো এই প্রকল্প। আগামী জুনেই সেতুটি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে খুলবে সেতুর রেলপথও। প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হওয়ামাত্রই দক্ষিণ এশিয়াসহ আন্তর্জাতিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কে যুক্ত হবে বাংলাদেশ। বাড়বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। প্রকল্প কেন্দ্র করে নির্মাণ হবে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পর্যটনকেন্দ্র। ঘুচবে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর বেকারত্বও। প্রত্যক্ষভাবে দেশের ২৯টি জেলা যোগাযোগ সুবিধা পেলেও কার্যত গোটা দেশেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সব মিলিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে বিশ^ দরবারে বাংলাদেশ সৃষ্টি করল আরও এক বিস্ময়।
বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতু নির্মাণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের চলাচলের পথ সুগম হবে। সময় বাঁচবে কমপক্ষে তিন ঘণ্টার বেশি। দূরত্ব কমবে ৭০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পথের। সরাসরি উপকৃত হবে পাঁচ কোটির বেশি মানুষ। দারিদ্র্য কমবে এক দশমিক নয় শতাংশ হারে। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ। বলা যায়, গত ৫০ বছরে দেশের সড়ক যোগাযোগে যত উন্নয়ন-অগ্রগতি হয়েছে, শেষ ১৩ বছরে এগিয়েছে সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে যোগাযোগ সেক্টরে সবচেয়ে বড় মেগাপ্রকল্প হয়েছে এই সময়ে। এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ চলমান। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে বদলে যাবে গোটা দেশের চিত্র। এক অন্যরকম বাংলাদেশ অপেক্ষা করছে সামনের দিনগুলো
২০০১ সালের ৪ জুলাই পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন থেকেই দেশের মানুষ গুরুত্বপূর্ণ এই সেতু নির্মাণের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এর মধ্যে কেটেছে ২০ বছরের বেশি সময়। অর্থাৎ ২০ বছর পর সেতু নির্মাণের স্বপ্ন সফল হওয়া এখন অপেক্ষামাত্র। পদ্মা সেতুতে সর্বশেষ স্প্যান বসানো হয়েছে অনেক আগেই। যুক্ত হয়েছে মাওয়া-জাজিরা দুই প্রান্ত। দৃশ্যমান হয়েছে ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটারের সেতুটি। সেতুর সড়কের কাজও শেষ পর্যায়ে। সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে মানুষের স্বপ্ন, অবসান হতে যাচ্ছে দীর্ঘ প্রতীক্ষার। পদ্মা সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের দিনটি ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
অগ্রগতি প্রায় ৯৮ ভাগ
নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে এখন শেষের পথে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ। জানা গেছে, নভেম্বর পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের সার্বিক কাজ এগিয়েছে ৮৯ শতাংশ। আর মূল সেতুর কাজের অগ্রগতি ৯৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ মূল সেতুর কাজের আর বাকি মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সর্বশেষ তথ্য মতে সেতুর অগ্রগতি প্রায় ৯৮ ভাগ।
সেতুর প্রকৌশল বিভাগের এক সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতু প্রকল্পের সর্বমোট বাজেট ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। যার মধ্যে গত নভেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২৬ হাজার ৪৭৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বা মোট বাজেটের ৮৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ। মূল সেতুর কাজের চুক্তিমূল্য প্রায় ১২ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা। যার মধ্যে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৫১২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
সেতু প্রকল্পের আওতায় নদীশাসনের কাজের অগ্রগতি হয়েছে সাড়ে ৮৬ শতাংশ। নদীশাসন কাজের চুক্তিমূল্য ৮ হাজার ৯৭২ কোটি ৩৮ লাখ টাকার মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার ৩১ কোটি ৭১ লাখ টাকা। মূল সেতুর মধ্যে দুই হাজার ৯১৭টি রোডওয়ে স্ল্যাব, ২ হাজার ৯৫৯টি রেলওয়ে স্ল্যাব ও ৫ হাজার ৮৩৪টি শেয়ার পকেট বসানো হয়েছে। ১২ হাজার ৩৯০টি প্যারপেট ওয়ালের মধ্যে ১২ হাজার ২৫৪টি স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে।
আর মাওয়া ও জাজিরার ভায়াডাক্টে ৪৩৮টি সুপারটি গার্ডারের মধ্যে ৪৩৮টি এবং ৮৪টি রেলওয়ে আই গার্ডারের মধ্যে ৮৪টিই স্থাপন করা হয়েছে। মূল সেতুর মোট ৪১টি ট্রাস রয়েছে, যার সবই ইতোমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। যার দৈর্ঘ্য ছয় হাজার ১৫০ মিটার বা ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার।
সেতুর সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়ার কাজ ইতোমধ্যেই শতভাগ শেষ হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৪৯৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পরিবেশ খাতে বরাদ্দ ৪ হাজার ৩৪২ কোটি ২৬ লাখ টাকা। অন্যান্য (পরামর্শক, সেনানিরাপত্তা, ভ্যাট ও আয়কর, যানবাহন, বেতন-ভাতাদি এবং বিবিধ) খাতে বরাদ্দ ২ হাজার ৮৮৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। সেতুর অবশিষ্ট কাজের মধ্যে ওয়াটার প্রুফিং মেমব্রিনের ১৩ ভাগ, কার্পেটিং ২ দশমিক ০৫ ভাগ, মুভমেন্ট জয়েন্ট ৫৯ ভাগ, ল্যাম্পপোস্ট ৯ দশমিক ১৯ ভাগ এগিয়েছে। এছাড়া গ্যাস পাইপলাইন ৪৯ দশমিক ৩৫ ভাগ এবং ৪০০ কেভিএ বিদ্যুৎ লাইনের কাজ ৬২ ভাগ এগিয়েছে।
সেতুর স্টিলের স্প্যানের ওপর দিয়ে চলবে যানবাহন। এই পথ তৈরির জন্য কংক্রিটের স্ল্যাব বসানোর কাজ চলছে। সম্পন্ন হয়ে গেলে পিচ ঢালাই করা হবে। পুরো কাজ শেষ হলে যানবাহন চলাচলের পথটি হবে ২২ মিটার চওড়া, চার লেনের। মাঝখানে থাকবে বিভাজক। স্প্যানের ভেতর দিয়ে চলবে ট্রেন। সেতুতে একটি রেললাইনই থাকবে। তবে এর ওপর দিয়ে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ দুই ধরনের ট্রেন চলাচলেরই ব্যবস্থা থাকবে। ভায়াডাক্টে এসে যানবাহন ও ট্রেনের পথ আলাদা হয়ে মাটিতে মিশেছে।
দুই পারে গড়ে উঠবে উন্নত শহর
পদ্মা সেতুর সঙ্গে দুই পারের মানুষের জীবনযাত্রাও একেবারে বদলে যাবে। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে বৃহৎ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেতু সংশ্লিষ্টদের অভিমত, সেতুর দুই পাশে সিঙ্গাপুর ও চীনের সাংহাই শহরের আদলে পরিকল্পিতভাবে নতুন শহর গড়ে তোলা হবে। এর সঙ্গে আবাসিক সুবিধার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি হবে শিল্প-কারখানা। যার মাধ্যমে প্রায় কোটি মানুষের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। বিনিয়োগের ১৯ ভাগ রিটার্ন আসবে প্রতিবছর।
দেশে দীর্ঘ, বিশ্বে ১১তম
বিশে^র দীর্ঘতম সেতুর তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে চীনের ডেনইয়াং কুনশান গ্র্যান্ড ব্রিজ। চীনের জিয়াংজু প্রদেশের সাংহাই ও নানজিং এলাকায় দীর্ঘতম সেতুটি অবস্থিত। চীনের ইয়াংজি নদীর ওপর ব্রিজটি স্থাপিত। সেতুর সঙ্গে রয়েছে রেললাইনও। সেতুটির দৈর্ঘ্য ১৬৪ দশমিক আট কিলোমিটার। ২০১০ সালে সেতুটি উদ্বোধন করা হয়। সেতুটিতে খরচ হয় ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। পৃথিবীর বৃহত্তম সড়ক সেতুগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বাস্তবায়নাধীন পদ্মা সেতুর অবস্থান ১১তম। তবে নদীর ওপর নির্মিত সব সেতুর মধ্যে দৈর্ঘ্যরে দিক থেকে পদ্মা সেতুর অবস্থান প্রথম।
সেতুর ফাউন্ডেশনের গভীরতার দিক থেকেও এর অবস্থান প্রথম। প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, বিশে^র শক্তিশালী সেতুগুলো সাধারণত ‘সি’ আকৃতির হয়। কিন্তু নদীর অবস্থানের কারণে ওপর থেকে দেখলে পদ্মা সেতু নির্মাণ হয়েছে ‘এস’ আকৃতির। পদ্মা লাইফ টাইম ধরা হয়েছে শতবছর। এই সময়ে বড়ো কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা না দিলে সেতুর বড়ো রকমের কোনো মেরামতের প্রয়োজন হবে না। নতুন করে রং করা, প্রয়োজনে নাট-বোলটু টাইট দেওয়া, ঝালাই কাজ প্রয়োজন হতে পারে।
রয়েছে চার লেনের সড়ক
পদ্মা সেতুর ওপর নির্মিত সড়ক হচ্ছে চার লেনের। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই বড়ো পরিসরে সড়ক করা হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সড়ক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর সেতুতে যানবাহন চলাচলে চাপ বাড়বে। মূলত এই বিবেচনা থেকেই সেতুর পরিধি বড়ো করা হয়েছে। চার লেনের সড়কের মাঝখানে থাকবে রোড ডিভাইডার। ফলে যানবাহন আলাদা আলাদা লেনে চলবে। এতে দুর্ঘটনা কমবে।
বিশ্বের আমাজান নদীর পর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় নদী পদ্মা। প্রমত্তা এই নদীতে ৪১তলা গভীর পর্যন্ত পাইল করে পিলার বসানো হয়েছে। সেতুর মোট প্রস্থ ৭২ ফুট। মাওয়া-জাজিরা প্রান্ত মিলিয়ে সংযোগ সড়ক নির্মাণ হয়েছে ১৪ কিলোমিটার। দুই পারে নদীশাসন হয়েছে ১২ কিলোমিটার। কাজ করেছে চার হাজার মানুষ। মোট ৪২ পিলারের মধ্যে প্রতি পিলারের জন্য পাইলিং হয়েছে ছয়টি। মাটি জটিলতার কারণে ২২টি পিলারের পাইলিং হয়েছে ৭টি করে। মোট পাইলিং হয়েছে ২৮৬টি। পানির স্তর থেকে সেতুর উচ্চতা ৬০ ফুট। সেতুর ভায়াডাক্ট পিলার ৮১টি।
সেতুর নকশায় যারা
মূল পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। সেতুর নকশা করেছে আমেরিকান মাল্টিন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম এইচসিওএম নামের একটি প্রতিষ্ঠান। মূল সেতুর নির্মাণকাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (সিএমবিইসি)। নদীশাসনের কাজ করছে চীনের আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন। সেতু ও নদীশাসনের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে কোরিয়ান এ্রক্সপ্রেসওয়ে।
মাওয়া ও জাজিরায় পদ্মার উভয় তীরে সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ যৌথভাবে করছে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেড ও মালয়েশিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এইচসিওএম। সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এলাকার পরামর্শক হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কার্স অর্গানাইজেশন। মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে যানবাহন সেতুতে ওঠার জন্য এবং সেতু থেকে নামার জন্য দুইদিকে ভাগ করা হয়েছে সংযোগ সড়ক। এটি মূলত ভায়াডাক্ট বা ডাঙায় সেতুর অংশ। দুই প্রান্ত মিলিয়ে সেতুর এই অংশের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। মাঝখান দিয়ে চলে যাবে ট্রেনলাইন। জাজিরা প্রান্তে আছে টোলপ্লাজা।
নানা বাধাবিপত্তি
বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু প্রকল্পের যাত্রা শুরু কার্যত ২০০৭ সালে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ওই বছরের ২৮ আগস্ট ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করেছিল। পরে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে রেলপথ সংযুক্ত করে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি প্রথম দফায় সেতুর ব্যয় সংশোধন করে। কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাব্য তারিখ ধরা হয়েছিল ২০১৩ সাল। প্রকল্পের অর্থঋণ হিসাবে জোগান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পাঁচটি সংস্থা।
এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা ছিল। আর জাইকার দেওয়ার কথা ছিল ৪১ দশমিক ৫ কোটি ডলার। কিন্তু বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে ২০১২ সালের ২৯ জুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নেয়।
বিশ্বব্যাংক আর্থিক সহযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর পর ২০১২ সালের ১০ জুলাই জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, পদ্মা সেতু নির্মাণে তাঁর সরকার আর কোনো দেশ বা সংস্থার কাছে স্বেচ্ছায় সহায়তা চাইবে না। কেউ স্বেচ্ছায় দিতে চাইলে ভালো। এরপরই দেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ এগোতে থাকে। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শরীয়তপুরের জাজিরাপ্রান্তে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের মূল সেতুর নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন।
এর আগে ১৯৯৯ সালে একটি প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতুর পরিকল্পনা প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিস্তারিত সমীক্ষা পরিচালনার জন্য অর্থ সংগ্রহের জন্য সেতু বিভাগ থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অর্থায়নের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও জাপান দূতাবাসে চিঠি দেওয়া হয়। জাপান সরকার ইআরডির প্রস্তাবে সম্মত হয়ে ২০০১ সালের ৪ ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষর করে। সমীক্ষায় ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৫৩ কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০১ সালের ৪ জুলাই মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের মাওয়ায় পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০৩-০৫ সালে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া পয়েন্টে এবং শরীয়তপুর জেলার জাজিরা পয়েন্টে সেতুর স্থান নির্বাচন করে। ২০০৫ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হলে প্রকল্পটি কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিকে থেকে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়।
রাখবে জিডিপিতে অবদান
নির্মাণ শেষে পদ্মা সেতু জিডিপিতে ১ দশমিক ২৬ শতাংশ অবদান রাখবে। বলা হয়, আগামীর বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এগিয়ে নিতে এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এর দ্বারা উপকৃত হবে। এডিবি’র মূল্যায়ন বলছে, বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে এক দশমিক পাঁচ শতাংশ থেকে দুই ভাগ।
দ্বার খুলবে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের
পদ্মা সেতু হওয়ায় শুধু দক্ষিণাঞ্চলের ২১টিসহ ২৯ জেলার মানুষই উপকৃত হবে না, জাতীয়ভাবে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। গোটা দেশের যোগাযোগ খাতে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। রেল ও সড়কপথ মিলিয়ে দ্বিতল এই সেতুটি দক্ষিণাঞ্চলের সব জেলা-উপজেলার সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগকে আরও সমৃদ্ধ করবে। যুক্ত হবে এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে। শুধু তাই নয়, আরেকটু বড়ো পরিসরে যদি বলা হয়, তাহলে পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সড়ক যোগাযোগের অন্যতম অনুষঙ্গ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষ বেশি উপকৃত হলেও বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
কত হবে টোল
টোল দিয়ে চলতে হবে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে। সাধারণত যেসব নদীতে ফেরি চলাচল করে, সেখানে একটি স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস রয়েছে যেন ফেরি পারাপারের সময় যানবাহনগুলোকে যে পরিমাণ টোল দিতে হয়, সেতু পারাপারের ক্ষেত্রেও সেটাই টোল নির্ধারণ করা হয়।
সাধারণত বিদেশি অর্থায়নে কোনো সেতু নির্মিত হলে কত টাকা টোল হবে, সেটা নির্ধারণে দাতাদের পরামর্শ বা শর্ত থাকে। কিন্তু দেশীয় অর্থায়নে নির্মিত সেতুর টোল কত হবে, সেরকম কোনো নিয়মনীতি নেই। আপাতত সরকারের সেতু বিভাগ পদ্মা সেতুর জন্য যে টোল হারের প্রস্তাব করেছে, সেটি ফেরি টোলের চেয়ে দেড়গুণের বেশি।
সেতু চালু হওয়ার পর পরবর্তী ১৫ বছরের জন্য মোটরসাইকেলের জন্য ১০৫ টাকা, কার জিপের জন্য ৭৫০ টাকা, ছোটো বাসের জন্য ২ হাজার ২৫ টাকা, বড়ো বাসের জন্য ২ হাজার ৩৭০ টাকা, পাঁচ টনের ট্রাকের জন্য ১ হাজার ৬২০ টাকা, আট টনের বড়ো ট্রাকের জন্য ২ হাজার ৭৭৫ টাকা, মাইক্রোবাসের জন্য ১ হাজার ২৯০ টাকা টোল প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতি ১৫ বছর টোলের হার ১০ শতাংশ বাড়ানো হবে। তবে এখনো এই প্রস্তাবের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার।
বাংলাদেশের অর্থ বিভাগের সঙ্গে সেতু বিভাগের চুক্তি অনুযায়ী সেতু নির্মাণে ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে সরকার। ১ শতাংশ সুদ হারে ৩৫ বছরের মধ্যে সেটি পরিশোধ করবে সেতু কর্তৃপক্ষ। সেই পরিশোধ বিবেচনায় নিয়েই টোলের এই হার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নয় মাত্রার ভূমিকম্পেও ক্ষতি হবে না
সেতুতে ‘ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিংয়ের’ সক্ষমতা হচ্ছে ১০ হাজার টন। এখন পর্যন্ত কোনো সেতুতে এমন সক্ষমতার বিয়ারিং লাগানো হয়নি। রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে টিকে থাকার মতো করে পদ্মা সেতু নির্মাণ হচ্ছে। সেতুর নদীতে থাকা ৪০টি পিলারের নিচের পাইল ইস্পাতের। আর ডাঙার দুটি পিলারের পাইল কংক্রিটের। নদীতে যেসব পাইল বসানো হয়েছে, সেগুলো তিন মিটার ব্যাসার্ধের ইস্পাতের বড়ো বড়ো পাইপ, যার ভেতরটা ফাঁপা। ২২টি পিলারের নিচে ইস্পাতের এমন ৬টি করে পাইল বসানো হয়েছে। বাকি ২২টিতে বসানো হয়েছে ৭টি করে পাইল। আর ডাঙার দুটি পিলারের নিচের পাইল আছে ৩২টি, যা গর্তের মধ্যে রড-কংক্রিটের ঢালাইয়ের মাধ্যমে হয়েছে।
নদীর পানি থেকে প্রায় ১৮ মিটার উঁচু পদ্মা সেতুর তলা। পানির উচ্চতা যতই বাড়–ক না কেন, এর নিচ দিয়ে পাঁচতলার সমান উচ্চতার যে কোনো নৌযান সহজেই চলাচল করতে পারবে। সেতুটির মূল কাঠামোর উচ্চতা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় সমান। এর মূল কারণ, সেতুর ভেতর দিয়ে রেললাইন আছে। সড়ক ও রেললাইন একসঙ্গে থাকলে সেতু সাধারণত সমান হয়। না হলে ট্রেন চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ প্রত্যাশিত স্বপ্নপূরণের পথে বাংলাদেশ। নতুন এক মাইলফলকের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে এখন শুধু চূড়ান্ত লক্ষ্য ছোঁয়ার অপেক্ষায় বাঙালি। বীর বাঙালি আবারও প্রমাণ করলো অসম্ভবকে সম্ভব করে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে লক্ষ্যপানে। সংকট-ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বীরের জাতি এগিয়ে চলে সামনের দিকে। সেই এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাসে এ সময় বাঙালিদের অন্যতম অনুষঙ্গ স্বপ্ন ও মর্যাদার পদ্মা সেতু। নানা ধরনের ষড়যন্ত্র ও দুর্নীতির অভিযোগে এই সেতুর ভবিষ্যৎ যখন প্রশ্নবিদ্ধ তখন বাঙালি একাট্টা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বপ্ন পূরণের অদম্য স্পৃহা নিয়ে। তারই সুফল আজ স্বপ্নছোঁয়া পদ্মা সেতু। যে স্বপ্ন দ্বার খোলার অপেক্ষায়। অর্থকন্ঠ ডেস্ক


