প্রতিবেদন

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ : জমানো ডলার উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করার যে তিনটি ঝুঁকি

অর্থকণ্ঠ ডেস্ক

বাংলাদেশে নজিরবিহীনভাবে বৈদেশিক রিজার্ভের অর্থ উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এরই মধ্যে বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ছয় মাসের আমদানির জন্য অর্থ রেখে বাকি টাকা বিনিয়োগ করা যায়। এ তহবিল থেকে বিনিয়োগকারীরা ঋণ নিতে পারবেন।

সরকারের অগ্রাধিকার পাওয়া অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য নেয়া প্রকল্পগুলোতে দেশের রিজার্ভ থেকে সরকারের গ্যারান্টিতে ঋণ দেয়ার জন্য গঠন করা হয়েছে এই তহবিল।

এর আওতায় বছরে সর্বোচ্চ দু’শো কোটি ডলার ঋণ দেয়া হবে এবং এর সুদের হার হবে সর্বোচ্চ চার শতাংশ। তবে প্রাথমিকভাবে বিদ্যুৎ ও বন্দর খাতের সরকারি প্রকল্পগুলো এ তহবিল থেকে টাকা নিতে পারবে।

প্রাথমিকভাবে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষকে ঋণ হিসেবে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা দেয়ার জন্য চুক্তি হয়েছে।

কিন্তু রিজার্ভের টাকা উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়ে ঝুঁকি কী?

১. দক্ষ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ

গবেষক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন রিজার্ভ থেকে নেয়া অর্থ কোন প্রকল্পে দেয়া হচ্ছে তা সঠিকভাবে বাছাই করতে না পারলে এবং বিনিয়োগকৃত অর্থ ঠিকমতো উঠে না আসলে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

গবেষক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, এ ধরনের ফান্ড ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা আছে এবং এর ব্যবহার নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠলে তা স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ঋণ আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছ থেকে পাওয়া কঠিন হবে।

সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক। কিন্তু এর ঝুঁকি নির্ভর করবে ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর। রিজার্ভ অনেক হওয়ায় বিদেশি ঋণ পাওয়াটাও সহজ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে রিজার্ভ রেকর্ড হওয়ার কারণ করোনার কারণে আমদানি অনেক কমে গেছে।

তিনি বলেন, সরকার বলছে বেসরকারি খাতকে দেয়া হবে এই ঋণ; কিন্তু বেসরকারি খাত কিভাবে নিবে এবং কোন ধরনের প্রজেক্টে দেয়া হবে সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে ভালোভাবে।

যেমন প্রথম অর্থ দেয়া হচ্ছে পায়রা বন্দরকে। অথচ পায়রা বন্দর নিজেই ভায়াবল কি-না তা নিয়েই প্রশ্ন আছে। এ ধরনের প্রজেক্টে রিজার্ভের অর্থ বিনিয়োগ করলে বাণিজ্যিক স্বার্থ পূরণ হবে কিনা তাও বিবেচনার বিষয়।

এছাড়া বাংলাদেশে সরকারি খাতের এক প্রতিষ্ঠান আরেক প্রতিষ্ঠানকে টাকা দেয়া নিয়ে গড়িমসি করে বলে অভিযোগ আছে।

 

হোসেন বলছেন, বিদ্যুৎ বিভাগেরই এক প্রতিষ্ঠান তাদের সহযোগী আরেক প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য টাকা দিতে চায় না।

মনে রাখতে হবে এটি সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য রাজস্ব খাত থেকে পাওয়া অর্থ না। এর ব্যবস্থাপনাও আলাদা হতে হবে। আবার দেখতে হবে করোনা উত্তর সময়ে আমদানির চাহিদা কেমন হয়।

২. স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও মনিটরিংয়ের চ্যালেঞ্জ

ডা. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, ব্যাংকিং মডেলে কাজ করলেও এর মান হতে হবে বৈশ্বিক অর্থাৎ কাকে টাকা দেয়া হবে এবং সেটি সঠিকভাবে কাজে লাগানো হবে কি-না।

পাশাপাশি সঠিক বিনিয়োগে অর্থ উঠে আনা যাবে কি-না। এগুলো মনিটর করতে হবে শক্তভাবে। না হলে দায় দেনা বাড়বে ও অপব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি হবে।

তিনি বলেন, অন্যদিকে প্রজেক্ট ভায়াবল না হলে, আর্থিক লাভ হওয়া নিশ্চিত না হলে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশংকা থাকবে এবং একই সাথে দীর্ঘসূত্রতার কারণে একটা চক্র তৈরি হবে যারা রিজার্ভ থেকে নেয়া অর্থকে বিপদে ফেলে দেবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক সায়মা হক বিদিশা বলেন, অর্থনীতির ভিত কতটা শক্তিশালী তা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ।

এর মাধ্যমে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে একটা ইতিবাচক দিক আছে কিন্তু মনে রাখতে হবে রিজার্ভের অর্থ সব জায়গায় বা সব ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় না। এর জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়ম কানুন আছে যেগুলো দৃঢ়তার সাথে মেনে না চললে বিপদও হতে পারে।

তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি-না, নিয়ম মানা হচ্ছে কি-না এবং ঝুঁকি নির্ণয় করে টাকা ব্যবহার করা হচ্ছে কি-না এসব বিষয় নিশ্চিত করা।

এর দায়বদ্ধতা অনেক। অতিরিক্ত সতর্কতা থাকতে হবে। ব্যবহার যাতে সুষ্ঠু হয়। সাধারণ ব্যাংকিং ঋণের চেয়ে এখানে ভিন্ন নিয়ম ও সতর্কতা মেনে চলতে হবে। না হলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। ঠিকমতো ব্যবহারের দক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠবে।

৩. মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা ও মুদ্রবাজারে স্থিতিশীলতার সংকট

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও সায়মা হক বিদিশা- দু’জনেই বলছেন- যদিও এখন অল্প পরিমাণে অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে কিন্তু ভবিষ্যতে এর পরিমাণ বাড়লে আর তার ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ঠিকমতো নিশ্চিত না হলে মূল্যস্ফীতি কিংবা মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতার মতো সংকটের আশঙ্কা থাকে।

সায়মা হক বিদিশয় বলেন, এগুলোর সাথে দেশের ভাবমূর্তির বিষয় জড়িত যা দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মূল ব্যাংকিং চ্যানেলের ওপরই নির্ভরশীল থাকা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

রিজার্ভ হলো শেষ বিকল্প। এর বিধি নিষেধ অনেক। তাই যত কম ব্যবহার করা যায় ততই ভালো।

একই সাথে রিজার্ভের অর্থ ব্যবহার নিয়ে কোনো সমস্যা তৈরি হলে সেটি পরে আবার বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও যেমন সমস্যা তৈরি করবে তেমনি যারা বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান তাদের মধ্যেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে।

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেও বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রেকর্ড ৪৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা দিয়ে দশ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব বলে বলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে রিজার্ভে ছিল ৩২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ গত এক বছরে রিজার্ভ বেড়েছে ১০ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার।

আবার চলতি নতুন বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ১৯৬ কোটি ২৬ লাখ ডলারের রেমিটেন্স এসেছে, যা গত বছরের জানুয়ারির চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।

অবশ্য করোনা মহামারি বিবেচনা করে সরকার রেমিটেন্সের ওপর দুই শতাংশ হারে প্রণোদনা দিয়েছিল।

অর্থকণ্ঠ ডেস্ক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button