বিদেশি পর্যটকরা যাতে বাংলাদেশ ভ্রমণে এসে নির্বিঘেœ চলাফেরা করতে পারেন তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ।
গত ১৮ এপ্রিল নবম বাংলাদেশ ট্র্যাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ফেয়ারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আমাদের ঐতিহ্যসহ পর্যটন আকর্ষণীয় স্থানগুলোকে বিদেশে চমৎকারভাবে তুলে ধরতে হবে। পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ আমাদের দূতাবাসগুলোকে এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
বিদেশি পর্যটকরা আমাদের অতিথি। তারা যাতে নির্বিঘ্নে এবং আনন্দঘন পরিবেশে বাংলাদেশ ভ্রমণ করতে পারে, আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়, তাও নিশ্চিত করতে বলেন রাষ্ট্রপতি। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি দেশের পর্যটন খাতের বিকাশে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমি আশা করি পর্যটন শিল্প জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে ভূমিকা রাখবে। এ জন্য প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ। আমি আশা করি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনসহ সরকারি-বেসরকারি সকল সংস্থা একত্রে কাজ করে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরবে।
আবদুল হামিদ বলেন, ভ্রমণপিপাসু মানুষের নিত্য চাহিদার ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীজুড়ে গড়ে উঠেছে হাজারও পর্যটন কেন্দ্র। বর্তমানে বিশ্বে পর্যটন এক বৃহৎ অর্থনৈতিক খাত হিসাবে বিবেচিত। মানুষে মানুষে স¤প্রীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনেও এই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের লক্ষ্যে ‘অন অ্যারাইভাল ভিসা’ সুবিধা প্রাপ্য দেশের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ভিসা প্রক্রিয়া সহজতর করাসহ বাংলাদেশের মিশনগুলো সম্ভব দ্রæততম সময়ের মধ্যে ই-ভিসা প্রদান করছে। বাংলাদেশ ২০১৮-২০১৯ মেয়াদের জন্য দশম ইসলামিক কনফারেন্স অব ট্যুরিজম মিনিস্টারস (আইসিটিএম)-এর চেয়ার নির্বাচিত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ঢাকা শহরকে ২০১৯ সালের জন্য ‘দ্যা ওআইসি সিটি অব ট্যুরিজম’ ঘোষণা করা হয়েছে। এ কর্মসূচি দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ভারত, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, আরব আমিরাতসহ ১৩টি দেশের প্রতিনিধিরা তিন দিনব্যাপী বাংলাদেশ ট্র্যাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ফেয়ারে অংশগ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে টোয়াবের সভাপতি তৌফিক উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান, ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী ভুবন চন্দ্র বিশ্বাস বক্তব্য দেন। পরে রাষ্ট্রপতি মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।
জমজমাট পর্যটন মেলা
প্রথমদিনেই জমজমাট হয়ে ওঠে বিমান বাংলাদেশ ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ফেয়ার। ১৮ এপ্রিল বিকেলে মেলা উদ্বোধনের পর দর্শনার্থীদের ঢল নামে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বসেছিল এ মেলা। মেলার আয়োজন করে ট্যুরিজম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (টোয়াব)।
ভ্রমণ পছন্দ করেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে বাঙালি জাতি বিদেশ ভ্রমণের প্রতি একটু বেশিই দুর্বল। তাই সন্তানদের নিয়ে পছন্দের দেশে ভ্রমণে যেতে দেখেছেন প্যাকেজ। কেউ বা মেলায় বুকিংও দিয়েছেন। বিকেল ৫টায় মেলার উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় মেলা ঘুরে দেখেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী।
রাষ্ট্রপতি যাওয়ার পর পরই দর্শনার্থীদের জন্য মেলা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। সন্ধ্যায় মেলায় ঢল নামে ভ্রমণপিপাসু দর্শনার্থীদের। ছোট ছেলে-মেয়েদের নিয়েও অনেক দম্পতি এসেছেন, তারা খোঁজ-খবর নিয়ে জেনেছেন, কোন দেশে যেতে কত খরচ। পছন্দের প্যাকেজকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন তারা। প্রথমদিনেই দর্শনার্থীদের বেশ সাড়া মিলেছে। তিন দিনব্যাপী এ মেলায় ছিল নানা অফার।
মেলায় ঘুরতে আসা তাসলিমা জান্নাত বলেন, আমরা উজবেকিস্তানের প্যাকেজ দেখলাম। এখানকার ইসলামিক সভ্যতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। তাই আমরা উজবেকিস্তানের হলিডে প্যাকেজে বুকিং দিয়েছি। স্বামী ও ছেলেকে নিয়ে ঈদের পর ঘুরতে যাবো।
আসাদুল ইসলাম নামে এক দর্শনার্থী বলেন, ভ্রমণ মানুষের মানসিক প্রশান্তি বাড়ায়। টানা কাজের চাপ থেকে মুক্তি পেতে ভ্রমণ একমাত্র উপায়। তাই মেলায় এলাম। ভুটান ভ্রমণ করতে আগ্রহী।
মূল মেলার পাশাপাশি ছিল গোলটেবিল বৈঠক, বিভিন্ন দেশের উপস্থাপনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও র্যাফেল ড্র। ফলে জমজমাট হয়ে ওঠে এ পর্যটন মেলা।
এছাড়া মেলায় ‘বৌদ্ধপ্রধান অঞ্চলে ভ্রমণ ব্যবস্থা’ এবং ‘ঢাকার হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ শীর্ষক দু’টি সেমিনার অনুষ্ঠিত। মেলার দ্বিতীয় দিনে ছিল টোয়াবের সদস্য এবং বিদেশি প্রদর্শকদের অংশগ্রহণে অধিবেশন। ১৪০ জন বিদেশি প্রদর্শক এবারের মেলায় অংশগ্রহণ করেন।
মেলায় ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনসহ অন্যান্য দেশের জাতীয় পর্যটন সংস্থা, উজবেকিস্তানসহ দেশ-বিদেশের ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল অপারেটর, বিমান সংস্থা, হোটেল এবং রিসোর্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ২২০টি স্টল ছিল।
মেলা প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। প্রবেশমূল্য ছিল ৩০ টাকা। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল বিটিটিএফের ওয়েবসাইটে www.bttf.toab.org নিবন্ধন করে মেলায় আইডি কার্ড প্রদর্শন করে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সাল থেকে প্রতিবছর পর্যটন মেলার আয়োজন করে আসছে টোয়াব।


