বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, আমরা উৎসাহহীন, উদ্যোগহীন, উচ্ছ¡াসহীন ও উদ্যমহীন ১০০ দিন দেখেছি। আশা করেছিলাম, ১০০ দিনে বড় ধরনের উন্নয়ন ও উত্থানের প্রতিফলন দেখতে পাব। কিন্তু তা না হয়ে শুধু ধারাবাহিক উদ্যোগ দেখা গেছে। আবার সরকার যে ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে, তা মিশ্র ইঙ্গিত দিচ্ছে। যেমন কর ছাড়, সুদের হারে সুবিধা। ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বাধীন পর্যালোচনা: বর্তমান সরকারের প্রথম একশো দিন’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সিপিডির এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির পর্যালোচনা তুলে ধরেন সংস্থাটির গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান। বক্তব্য রাখেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে দেবপ্রিয় বলেন, নতুন সরকার যখন নতুনভাবে আসে, তখন সে বিগত সময়ের বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে নতুন ধরনের উদ্যোগ নেয়। সেই উদ্যোগটা তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। আমি মনে করি সামপ্রতিক সময়ে যত নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশিত হয়েছে আওয়ামী লীগের এই নির্বাচনী (একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে) ইশতেহার সব থেকে সুচিন্তিত, সুলিখিত এবং সুগঠিত। তিনি বলেন, শাসক দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- কোনো রকম দুর্নীতি আমরা সহ্য করবো না। কিন্তু আমরা দেখছি রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে, অন্যান্য সামাজিক সেবার ক্ষেত্রে সেই দুর্নীতি প্রকটভাবে রয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পরিবর্তনের, দিন বদলের। আর ওই বদলকে আটকে রাখছে এমন একটি গোষ্ঠী যারা এই দুর্নীতি থেকে সুবিধা ভোগ করছে। সুবিধাভোগী স¤প্রদায় যেটা রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে আছে, সেটা রাজনৈতিক পরিবর্তনের শক্তিকে সামনে আসতে দিচ্ছে না। এটাকে যদি সমাধান করা না যায়, তাহলে আওয়ামী লীগের সুগঠিত ইশতেহার কাল্পনিক দলিল হিসেবেই ইতিহাসে স্থান পাবে।
তবে এই সময়ে সরকারের কিছু ভালো উদ্যোগের কথা জানান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার মতে, এই ভালো উদ্যোগগুলোর মধ্যে আছে, বিদেশি কর্মজীবীদের বিষয়ে জরিপ চালিয়ে করের আওতায় আনা, মানি লন্ডারিং বিধিমালা জারি করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞাপনকে করের আওতায় আনা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব করা আট দশমিক ১৩ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিকে ঈর্ষণীয় বলছে সিপিডি। উৎপাদন খাতের ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধিই জিডিপির প্রবৃদ্ধি চালিকাশক্তি। তবে সিপিডি এই প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে। সিপিডির মতে, এই হিসাব বাস্তবসম্মত নয়। অর্থনীতির সূচকগুলোর সঙ্গে এর মিল নেই। জিডিপির হিসাব আরও গভীরে গিয়ে করা উচিত। তা না হলে নীতিনির্ধারণে সমস্যা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি জিডিপির হিসাবসহ কিছু অসংগতি তুলে ধরে। সিপিডি বলেছে, উৎপাদন খাত নির্ভর প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিবিএসের হিসাব, চামড়া খাতে প্রথম প্রান্তিকে সাড়ে ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অথচ রফতানিতে নেতিবাচক প্রবণতা রয়েছে। রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ শতাংশ। কিন্তু চলতি মূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছে ১২.৭ শতাংশ। আবার গত ফেব্রæয়ারি মাস পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে প্রবৃদ্ধি সাড়ে ১২ শতাংশ। কিন্তু গতবার একই সময়ে এই খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ১৮ শতাংশ। সিপিডির মতে, বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী এই প্রবৃদ্ধি অর্জনের মানে হলো, শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বেড়েছে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এই প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের ভূমিকা দেখিনি। আবার কর আহরণের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি নেই। ব্যক্তি খাতের ঋণ প্রবাহ বেশি হয়নি। মূলধনি পণ্যের আমদানিও বেশি দেখা যায়নি। ব্যাংক খাতেও চাঞ্চল্য নেই। তিনি বলেন, যেহেতু বিনিয়োগ বেশি হয়নি, তাই উৎপাদনশীলতা বেশি দেখাতে হবে। শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, গত কয়েক বছরে কি এমন প্রযুক্তির উন্নয়ন হয়েছে, যাতে শ্রমের উৎপাদনশীলতা এত বাড়ল? আবার উৎপাদনশীলতা বাড়লে শ্রমিকের আয় বৃদ্ধি হওয়ার কথা। কিন্তু সর্বশেষ খানা আয় ও ব্যয় জরিপের প্রতিফলন নেই। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কতটা কর্মসংস্থান হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তাই প্রবৃদ্ধির হিসাবটি উন্নয়নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হচ্ছে না। যেসব দেশে বৈষম্য কম, সেসব দেশে তুলনামূলকভাবে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা সহজ হয় বলে মনে করেন সিপিডির আরেক বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বৈষম্য কমানোর দিকে নজর না দিলে প্রবৃদ্ধি শ্লথ হতে পারে।
নির্বাচনী ইশতেহার সম্পর্কে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, শাসক দলের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও রাষ্ট্রযন্ত্রের বাস্তবায়নের মধ্যে পার্থক্য আছে। শাসক দল বলছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানো হবে। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে তা দেখছি না। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হলো পরিবর্তন, দিন বদল। কিন্তু তা আটকে রাখছে রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে থাকা সুবিধাভোগীরা। আওয়ামী লীগের দেওয়া নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই নিতে হবে। তা না হলে এই ইশতেহার কাল্পনিক দলিল হিসেবে ইতিহাস বিচার করবে।
খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্যে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেওয়া সুবিধার ফলে ঋণ খেলাপিরা ও দুর্বল ব্যাংক উৎসাহিত হবে এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তারল্য সংকট দেখা দেবে বলে মনে করছেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা অর্থনীতির মূল স্তম্ভ। আমরা অতীতে দেখেছি, বড় বড় উদ্যোক্তদের অর্থ জোগানের ক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থার একটা ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এখন আমরা এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছি ঋণ খেলাপি এটা একটা সমস্যা তা সবাই স্বীকার করছে। সরকারও স্বীকার করছে, যার ফলে আমরা দেখছি নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কীভাবে এটা ( খেলাপি ঋণ) কমানো যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলো সত্যিকার অর্থে ঋণ খেলাপি না কমিয়ে, সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে এটা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। যার ফলে আমরা গুড প্রাকটিস থেকে ব্যাড প্রাকটিসে চলে যাচ্ছি। সুবিধা দেওয়ার ফলে ঋণ খেলাপিরা উৎসাহিত হবে। সেইসঙ্গে দুর্বল ব্যাংকও উৎসাহিত হবে। ফলে তারল্যের ওপর প্রভাব পড়বে।
ফাহমিদা বলেন, আমরা মনে করি খেলাপি ঋণের বিষয়ে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তার ফলে আমরা উল্টো দিকে যাচ্ছি। এতে ব্যাংকের প্রকৃত যে স্বাস্থ্য তা পুনরুদ্ধার করতে পারবে না।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। এ সময় খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের বড় সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। বর্তমান সরকারের ১০০ দিনে ব্যাংক খাতের কোনো উন্নয়ন আমরা দেখছি না। সরকারের পক্ষ থেকে ভালো ঋণ গ্রহীতাদের ছাড় দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু কারা ভালো ঋণ গ্রহীতা সে বিষয়ে দিক-নির্দেশনা আসেনি। এটা নির্দিষ্ট করা উচিত। তা না হলে এর ফলে সুযোগ নেওয়া হবে এবং অর্থনীতির জন্য কোনো লাভ হবে না।


