প্রতিবেদন

২৫ মার্চ কালো রাতের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে

নজরুল মৃধা

১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল মাত্র ৯ মাস। এই অল্প সময়ে আমরা হারিয়েছি ৩০ লাখ তাজা প্রাণ, দু’লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম। এর বিনিময়ে পেয়েছি স্বাধীনতা। স্বাধীনতা আন্দোলনের মাস মার্চে ঘটেছিল অনেক স্মরণীয় ও বেদনাময় ঘটনা। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ২৫ মার্চের গণহত্যা। ২৫ মার্চ দিনগত রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্মম হত্যাকাÐ চালিয়েছিল।
সেই হত্যাকাকান্ডের ঘটনা বিশ্ববাসীর জানা। ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবসের দাবি পুরো বাঙালি জাতির। জাতিসংঘ এই দিবসটিকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিলে মহান একুশে ফেব্রুয়ারির মতো ২৫ মার্চের ঘৃণিত হত্যাকাকান্ডের কথা বিশ্ববাসী স্মরণে রাখতো। তাই এই দিবসটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দাবি করছি।
বিগত সংসদে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করার বিষয়ে প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৭ (১) বিধিতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সংসদ সদস্য শিরীন আখতার এ প্রস্তাব সংসদে তোলেন। উত্থাপিত প্রস্তাবটি হচ্ছে, সংসদের অভিমত এই যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যাকে স্মরণ করে ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা করা হোক এবং আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবসের স্বীকৃতি আদায়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হোক।
সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার ১৮ মিনিটের একটি সচিত্র প্রতিবেদন সংসদে দেখান। এরপর সংসদ সদস্যদের সাধারণ আলোচনা শুরু হয়।

২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক গণহত্যার দিনটি জাতীয়ভাবে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাব পাস হয়। একই সঙ্গে এই দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করার প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রস্তাবটির ওপর দীর্ঘ চার ঘণ্টার সাধারণ আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় অর্ধশত সংসদ সদস্য অংশ নেন। তবে শিরীন আখতারের প্রস্তাবের ওপর সামান্য সংশোধনী আনেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ।
সংশোধনীতে তিনি বলেন, ‘মূল প্রস্তাবের দ্বিতীয় পঙ্ক্তিতে অবস্থিত আন্তর্জাতিকভাবে শব্দটির পূর্বে জাতিসংঘসহ শব্দটি সন্নিবেশ করা হউক।’ আলোচনায় ১ ডিসেম্বরকে’ মুক্তিযোদ্ধা দিবস ঘোষণা এবং সিমলা চুক্তি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে পাকিস্তানি ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবিও জানানো হয়। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃক অপারেশন সার্চলাইটে নিহত ও আক্রান্তদের স্মরণে ২০১৭ সালের ১১ মার্চ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। স্বাধীনতার সাড়ে ৪ দশক সময়ের বেশি পর এই দাবিটি সংসদে পাস হওয়ায় দেশবাসী একটি আশার আলো দেখে। দেশে এ দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দাবি আদায়ে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দিবসটি পালিত হলে বাঙালি জাতি বিশ্বের দরবারে ভিন্ন মাত্রায় সমাদৃত হতো। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুিক্তযুদ্ধে যারা স্বজন হারিয়েছেন তারা কিছুটা স্বস্তি পেতেন। ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি পেলে শহীদদের আত্মা যেমন তৃপ্তি পাবে তেমনি স্বজনহারা মানুষগুলোও কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে। ২১ ফেব্রæয়ারি যেমন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে তেমনিভাবে ২৫ মার্চ কালরাত ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া উচিত বলে মনে করেন এদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষেরা। কারণ ২৫ মার্চ মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। বিশ্বের কোথাও এমন নৃশংস ঘটনা ঘটেনি।
একাত্তরের এইদিনে বাঙালির জীবনে নেমে আসে নৃশংস, ভয়ঙ্কর ও বিভীষিকাময় কালরাত। এ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইট নামে স্বাধীনতাকামী ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে বর্বরের মতো ঝাপিয়ে পড়েছিল। এই জঘন্য হত্যাকার্যে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছিল সেদিন। জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠ ফলাফল এবং আইনসঙ্গত অধিকারকে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দিয়ে পাকিস্তানি হানাদাররা সেদিন সারা দেশে গণহত্যা চালিয়েছিল।
পাকিস্তানিদের অপারেশন সার্চলাইট নামে পরিচালিত এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির মুক্তির আকাক্সক্ষাকে চিরতরে ধ্বংস করে ফেলা। সেই রাতে হানাদাররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল, রোকেয়া হল, শিক্ষকদের বাসা, পিলখানার ইপিআর সদরদপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে অগণিত নিরস্ত্র দেশপ্রেমিক নাগরিক ও দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করে। যা বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দিয়েছিল।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের পর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করতে থাকে। তারা বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে গোপনে গোপনে নিতে থাকে সামরিক প্রস্তুতি। মুক্তিকামী বাঙালি তখন স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বেলিত মুক্তির নেশায় পাগল। আলোচনার নামে শাসকগোষ্ঠী সময় ক্ষেপণ করতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার একটি দিক-নির্দেশনামূলক রূপরেখা পেশ করেন। যা ছিল বাঙালি জাতির স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। তৎকালীন সামরিক জান্তা বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রবল ইচ্ছাকে সামরিক শক্তির মাধ্যমে ধূলিসাৎ করতে প্রস্তুতি নেয়। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে জাহাজ বোঝাই করে সৈন্য ও গোলাবারুদ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আনা হয়। এসব দেখে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে বাঙালি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তির সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। গ্রেফতারের আগেই বঙ্গবন্ধু ইপিআরের ওয়্যারলেসযোগে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা প্রথম চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার করা হয়। সেই থেকে শুরু হয় বাঙালি জাতির প্রত্যক্ষ মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রাম। নয় মাসের মুক্তি সংগ্রামের জন্য জীবন দিতে হয়েছিল ৩০ লাখ মানুষকে। সম্ভ্রম হারাতে হয়েছিল ২ লাখ মা-বোনকে। মাত্র নয় মাসে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ হত্যা ও নারী নির্যাতনের নজির পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ’৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হবার মধ্যদিয়ে এ আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে। স্বাধীনতার এত বছর পরে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি চাওয়া কিছুটা দেরিতে হলেও দাবিটি শতভাগ যৌক্তিক ও বাস্তবধর্মী। আসুন আমি, আপনি সবাই এক হয়ে দাবি করি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ২৫ মার্চকে দ্রুত গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক এবং দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণার দাবিও সাধারণ মানুষের।

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button