সাক্ষাৎকার গ্রহণ : এনামুল হক এনাম
বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন অনেক বাঙালি উদ্যোক্তা। তারা যেমন নিজেদের জীবন মানের উন্নয়ন করেছেন, তেমনি মাতৃভ‚মি বাংলাদেশের উন্নয়নের উদ্যোগের সাথেও সম্পৃক্ত থাকছেন। অনেকেই আছেন যারা বিদেশে ভালো থাকলেও শেকড়ের কথা ভুলে যাননি। যারা তাদের কার্যক্রম এবং উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্থিতিশীল উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে চলেছেন তাদেরই একজন আজিজ আহমদ।
আমেরিকার নিউ ইয়র্ক প্রবাসী আজিজ আহমদ একজন প্রকৌশলী। তবে একাডেমিক শিক্ষার ডিসিপ্লিন যাই থাক না কেন- তিনি একজন উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী, গবেষক ও শিক্ষক হিসেবে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভে সক্ষম হয়েছেন। আত্মপ্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে হয়ে উঠেছেন বিশিষ্ট একজন।
বাংলাদেশি আমেরিকান আজিজ আহমদ স্ত্রী ও তিন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বাস করেন নিউ জার্সিতে। তার ব্যবসায়িক কার্যালয় ম্যানহাটনে। কম্পিউটারভিত্তিক সফটওয়্যার তৈরি ও সেবাই তার প্রধান ব্যবসা। তিনি যুক্তরাজ্যের প্রথম সারির প্রতিষ্ঠান ইউটিসি অ্যাসোসিয়েটস-এর প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী। তার ব্যবসায়িক বাজার আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশে বিস্তৃত। বাংলাদেশেও তার ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল বিজনেস ইনক্লুশন কনসোর্টিয়ামের অন্যতম সদস্য। গত আড়াই দশক ধরে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি জগতে সুনামের সাথে কার্যক্রম পরিচালনা করছে ইউটিসি অ্যাসোসিয়েটস। এটি নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের একটি প্রথম সারির প্রযুক্তি পরামর্শক ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান।
আজিজ আহমদ শুধু নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়েই ভাবেন না, তিনি বাঙালি অন্যান্য উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীর সুযোগ সুবিধার বিষয়েও সোচ্চার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এশিয়ান আমেরিকানদের সংগঠন ইউএস এসপ্যান এশিয়ান আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের (ইউএসপিএসসিসি) অন্যতম নেতা। এই প্রতিষ্ঠান এশিয়ান আমেরিকানদের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, খেলাধুলা ও জনসেবামূলক কাজের সাথে সম্পৃক্ত। প্রকৌশলী আজিজ আহমদ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম টেলিকমিউনিকেশন প্রতিষ্ঠান টুয়েন্টি ফাস্ট সেঞ্চুরি নেটওয়ার্কের প্রধান সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ’৯০-এর দশকে তিনি নেক্সট জেনারেশন ইন্টারনেট (এনজিআই) টিমের প্রতিনিধিত্ব করেন। এ দলের গবেষণার ফসল হিসেবেই পরবর্তী সময়ে বিশ্বে ব্রডব্যান্ড, মাল্টিওয়েভলেথে অপটিক্যাল টেকনোলজি জনপ্রিয় হয়। ওই সময় এই কনসোর্টিয়ামের সাফল্য বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে। তার নেতৃত্বেই গঠিত হয়েছে ইউএস-বাংলাদেশ গ্লোবাল চেম্বার অব কমার্স নামের শক্তিশালী ফোরাম। এই ফোরাম যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলসহ বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে ভ‚মিকা রাখে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের বেশ কিছু প্রযুক্তিভিত্তিক কোম্পানির পরিচালনা পরিষদের সদস্য।
আজিজ আহমদ তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বেশ কিছু সম্মাননা অর্জন করেছেন। নিউ ইয়র্ক সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে তিনিই প্রথম এশিয়ান আমেরিকান হিসেবে সম্মানসূচক ‘অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেছেন। ২০১০ সালে নিউ ইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটি, সিটি কলেজ ও গ্লোভ স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওয়াল অব অনারে স্থান পায় আজিজ আহমদ-এর নাম। নিউ ইয়র্ক স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সিটি কলেজ অব নিউ ইয়র্কের এন্টারপ্রেনারশীপ ইনস্টিটিউট চালু করা হয়েছে; ব্যবসা নেতৃত্ব বিষয়ে আজিজ আহমদ ধারাবাহিক বক্তৃতামালা এবং এ বছর শেষে ঐতিহ্যবাহী ‘রিংগিং দ্য ক্লোজিং বেল’ অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক সাফল্য ও নানা ধরনের জনসেবামূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ আজিজ আহমদ-এর নামও স্থান পায়। নিউ ইয়র্কে ব্যবসা ও প্রযুক্তির উন্নয়নে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্যে নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র বিল ডি বø্যাজিও, পরিচালক অ্যাডভোকেট লেটিসিয়া জেমন এবং কম্পট্রোলার থমাস পি ডিন্যাপোলির পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী আজিজ আহমদ নিউ ইয়র্ক সিটি কলেজ থেকে ত্বড়িৎ প্রকৌশল বিষয়ে ব্যাচেলর অব ইঞ্জিনিয়ারিং (বিই) এবং মাস্টারস অব ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি লাভ করেছেন। এরপর তিনি ডার্ট মাউথ কলেজের টাক স্কুল অব বিজনেস থেকে এক্সিকিউটিভ ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম সম্পন্ন করেছেন। তিনি কয়েক বছর সিটি টেকনিক্যাল কলেজ এবং পেস ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করেন।
বিশিষ্ট উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব আজিজ আহমদ-এর পৈতৃক বাড়ি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায়।
আজিজ আহমদ-এর দেশপ্রেম অতুলনীয়। তিনি ব্যবসা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশেষ করে ডিজিটাল বাংলাদেশের উত্তরণে ডেনমার্কভিত্তিক বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান কোডাস্ট্রাস্টকে নিয়ে এসে গড়ে তুলেছেন কোডাস্ট্রাস্ট-বাংলাদেশ ভারজিন গ্রæপ। এর প্রতিষ্ঠাতা স্যার রিচার্ড ব্র্যানসন। তিনি আরো নিয়ে এসেছেন বিশব্যাপী পরিচিত স্কাইপের কো-ফাউন্ডার মরটেন লুভকে। তাদের নিয়ে যৌথভাবে আজিজ আহমদ প্রতিষ্ঠা করেছেন কোডাস্ট্রোস্ট বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে শত শত বাংলাদেশি তরুণ আইটি খাতে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। বিশ্ববাজারে তারা তাদের অবস্থান সূচিত ও সংহত করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশেও তৈরি করছে বিশ্বমানের সফটওয়্যার- যা বিদেশেও বাজার পেয়েছে। আজিজ আহমদ এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকেরও অন্যতম উদ্যোক্তা।
আজিজ আহমদ একজন গুণী মানুষ। তার অনেক বক্তব্যই এখন এ প্রজন্মকে নাড়া দিয়েছে- যেমন আজকের তরুণদের মধ্যে তিনটি প্রধান বিষয় জাগ্রত হতে হবে জবাবদিহিতা, দায়িত্বশীলতা ও মালিকানাবোধ। অর্থকণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গুণী উদ্যোক্তা প্রকৌশলী আজিজ আহমদ যা বলেন তা এখানে উপস্থাপন করা হলো-
অর্থকণ্ঠ : আপনি একজন বাংলাদেশি আমেরিকান। প্রায় দু’দশক ধরে আমেরিকায় থেকে নিজের ভাগ্য গড়েছেন। আপনি শুধু নিজ ভাগ্যই গড়েননি, মাতৃভ‚মি বাংলাদেশকেও আন্তর্জাতিকভাবে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। আমার প্রশ্ন, এবার আপনি কতদিন দেশে থাকবেন?
আজিজ আহমদ : এবার অবশ্য আমি ৫ দিনের জন্যে এসেছি, বলতে পারেন খুব সংক্ষিপ্ত সময়। যেখানে নিজের শেকড় প্রোথিত, সেখানে মাত্র ক’দিনের জন্যে আসায় খুব খারাপ লাগছে। মূলত আমার টেকনোলজি ব্যবসা। আগে চাকরি করতাম, পরে ২০০১ সালে ব্যবসার সাথে যুক্ত হই। ব্যবসায়িক কাজেই এবার আমার বাংলাদেশে আসা। আইটি, সাইবার সিকিউরিটিসহ অন্যান্য প্রযুক্তিগত ব্যবসা আমাদের।
অর্থকণ্ঠ : জনাব আজিজ, জানতে চাইছি বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্যে আপনি কি কি কাজ করেছেনÑ যদি আমাদের বলেন।
আজিজ আহমদ : আমি স্বার্থপর নই। আমার মনে হয়েছে, শুধু আমি একা কেন আমেরিকায় প্রতিষ্ঠিত হবো আমার চারপাশে যারা আছেন, তাদের জন্যেও কিছু করা উচিত। তাদের আয় বাড়লে, তারা প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলাদেশেরই লাভ। অনেকেই আছে যারা শুধু নিজেদের নিয়েই ভাবে- আমরা এর ব্যতিক্রম। স্বার্থপরতা না থাকলে মানুষ দেশ ও জনগণের জন্যে কিছু করার উদ্যোগ নেয়। সে অবস্থান থেকে আমি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিয়েছি- যাতে আমার এই উদ্যোগ ও ব্যবসার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারি। আমরা আমাদের উন্নত আইটি দ্বারা দেশের উন্নয়নে অংশ নিতে চাই।
আপনি হয়তো জেনে থাকবেন, আমেরিকার ম্যানহাটনে আমাদের প্রধান অফিস। আমরা যখন আইটির মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রমে সফল হলাম, আস্তে আস্তে তার প্রসার ঘটাতে থাকলাম এবং এরই ধারাবাহিকতায় নিজেদের জন্মস্থান বাংলাদেশেও আইটি বিজনেস শুরু করেছি। আমার বিশ্বাস, এখানে এর সম্ভাবনা প্রচুর। আমরা যদি আইটিতে ভালো করতে পারি, তবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে।
অর্থকণ্ঠ : বাংলাদেশ বর্তমানে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ হিসেবে এগিয়ে চলেছে; আপনার অনুভূতি কি?
আজিজ আহমদ : বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এটি একটি প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। সারা বিশ্বে আজ ডিজিটালাইজেশনের ধারা চলছে। তার এই উদ্যোগের ফলে আমরা সেই উন্নত ধারার সাথে সংযুক্ত হতে সক্ষম হয়েছি।
অর্থকণ্ঠ : এ লক্ষ্যে বাংলাদেশে আপনারা কি কি উদ্যোগ নিয়েছেন?
আজিজ আহমদ : বাংলাদেশে প্রচুর আন-এমপ্লয়মেন্ট এবং আন্ডার এমপ্লয়মেন্ট রয়েছে। অনেক ছেলে আছে যারা এসএসসি বা এইচএসসি পাস করে পিয়ন কিংবা রেস্টুরেন্ট বয়ের চাকরি করছে। অনেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েও যোগ্যমতো চাকরি পাচ্ছেন না। এর মূল কারণ, তার একাডেমিক সার্টিফিকেট আছে; কিন্তু চাকরির জন্যে যে যোগ্যতা প্রয়োজন তা নেই। আমরা সেই অবস্থার পরিবর্তনে তাদেরকে প্রয়োজনীয় ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলছি। যাতে সংশ্লিষ্ট তরুণটি একটি ভালো চাকরি পেতে পারে।
অর্থকণ্ঠ : এ ধরনের স্কিল ডেভেলপমেন্টের কার্যক্রম করতে গিয়ে বাংলাদেশের ছেলে-মেয়েদের সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?
আজিজ আহমদ : আমি লক্ষ্য করেছি, এদেশের ছেলে-মেয়েরা যথেষ্ট মেধাবী ও কঠোর পরিশ্রমী। তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্য করে গড়ে তোলার অনেক সুযোগ রয়েছে। আইসিটি সম্পৃক্ত হবার পর এই তরুণরাই অনেক ভালো চাকরি পাচ্ছে- ভালো আয় করছে। কেউ কেউ চাকরি না করে নিজেই প্রতিষ্ঠান দিয়েছে- সেখানে অন্যেরাও চাকরির সুযোগ পাচ্ছে।
অর্থকণ্ঠ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলে থাকেন শুধু চাকরি খুঁজলে হবে না, উদ্যোক্তা হয়ে চাকরি দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।
আজিজ আহমদ : জী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই স্বপ্নটি আমাদের মধ্যে বপন করতে সক্ষম হয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি, একজন উদ্যমী তরুণ যখন প্রয়োজনীয়ভাবে দক্ষ হয়ে ওঠেন তখন তার মধ্যে উদ্যোক্তা হবার স্বপ্ন বাসা বাঁধবেই। এজন্যে আমাদের উদ্যোগে প্রচুর সাড়া পাচ্ছি।
অর্থকণ্ঠ : আমরা জানি, বিদেশে বিশেষ করে আমেরিকাসহ ইউরোপিয়ান দেশসমূহে যাওয়া অসংখ্য উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশিও ‘অডজব’ করে থাকেন। ইচ্ছে করলেও তারা ভালো চাকরির সুযোগ পান না।
আজিজ আহমদ : এই বাস্তবতা দীর্ঘ দিনের। এদেশের লাখ লাখ মানুষ শিক্ষাগতভাবে উচ্চ ডিগ্রি নিয়ে স্মার্ট হয়েও ‘অডজব’ করতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ ট্যাক্সি ড্রাইভার, কেউ হোটেল বয় আর কেউবা দোকান অথবা সুপারশপে সেলসম্যানের চাকরি করে। বেতনও স্বল্প। আমরা তাদেরকে ভালো কাজের উপযোগী ট্রেনিং দিয়ে থাকি যাতে তারা ভালো ‘জব’ পান। যেখানে একজন ঘন্টায় ৮/১০ ডলার পান- সেখানে দক্ষ হিসেবে গড়ে উঠলে তারাই বছরে দেড় লাখ দুই লাখ ডলার আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। এর ফলে শুধু যে তাদেরই আর্থিক উন্নয়ন হচ্ছে তাই নয়, বাংলাদেশও লাভবান হচ্ছে। তাদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। আরেকটি বিষয়- বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হচ্ছে। অর্থাৎ ‘অডজব’ থেকে আমরা তাদের মূলধারার চাকরি পাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছি।
অর্থকণ্ঠ : আপনি দীর্ঘদিন বিদেশে রয়েছেন, অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন-দেখেছেন। আমাদের ছেলে-মেয়েদের এই গেøাবাল মার্কেটে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে কি কি পদক্ষেপ নিতে হবে?
আজিজ আহমদ : প্রথম কথা হচ্ছে- তাদের স্বপ্ন থাকতে হবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যে উদ্যমী হতে হবে। আমাদের ছেলেরা স্কিল ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে বেশ সার্প। তারা যথেষ্ট উদ্যমীও; কিন্তু স্বপ্ন দেখতে জানে না। এ জন্যেও আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। তাদেরকে একাডেমিক সার্টিফিকেট-সর্বস্ব হলে চলবে না, ভালো কাজ পাওয়ার জন্যে ৩ মাস ৬ মাস ট্রেনিং গ্রহণ করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, এর মাধ্যমে তারা গেøাবাল ওয়ার্ক সিস্টেমে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম হবে।
অর্থকণ্ঠ : আপনি যে সম্ভাবনার কথা বললেন তার বাস্তবায়নে আপনারা কি করছেন?
আজিজ আহমদ : আমরা তরুণদের মধ্যে একটা অ্যাওয়ারনেস সৃষ্টি করছি, স্বপ্ন দেখাচ্ছি- অন্যের সাফল্যের উদাহরণ তুলে ধরছি। আগে সেভাবে সাড়া পাওয়া যেতো না- এখন আমাদের ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে অনেক প্রশিক্ষণার্থী।
আরেকটি বিষয়, শুধু বাংলা ভাষায় দক্ষ হলেই হবে না, তাদেরকে ইংরেজি ভাষাও রপ্ত করতে হবে। বর্তমানে বিদেশে আমাদের দেশের প্রায় ২৫ লাখ গ্রাজুয়েট রয়েছে। যারা উচ্চ শিক্ষা নিয়েও ভালো কাজ পায়নি। মাত্র এক থেকে দেড় লাখ লোক ভালো কাজ করছে- এর অর্থ বাকিরাও যদি ভালো ‘জব’ পায় তবে দেশের অর্থনীতি কত দূর যাবে- একবার ভাবুন।
অর্থকণ্ঠ : আপনি বলছেন ট্রেনিং মাস্ট?
আজিজ আহমদ : জ্বী হ্যাঁ, এর বিকল্প নেই। প্রফেশনাল স্কিলনেস ইজ মাস্ট। যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কেউ চাকরি চাইলে তাকে বলা হয় তোমার দক্ষতা আছে কিনা- অভিজ্ঞতা আছে কিনা? এখন একজন ছাত্রের তো দক্ষ হবার সুযোগ নেই। এ জন্যেই ট্রেনিং একাডেমির দরকার। আমরা ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে তাদেরকে যেমন প্রফেশনাল স্কিল করছি- তেমনি তাদের মধ্যে লিডারশীপও গড়ে তুলছি। এতে করে তারা একেকজন আন্তর্জাতিক অর্থাৎ গেøাবাল সিটিজেন হিসেবে গড়ে উঠছে।
অর্থকণ্ঠ : আমরা এক সময় অর্থনৈতিকভাবে বেশ পিছিয়ে ছিলাম। এখন অনেক উন্নয়ন ঘটেছে। আমরা পদ্মা সেতুসহ অবকাঠামো খাতেও অনেক এগিয়েছিÑ এই বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?
আজিজ আহমদ : এটা ঠিক, আমরা আমাদের সামনে এক নতুন বাংলাদেশ দেখতে পাচ্ছি। যে বাংলাদেশ উন্নয়নের ট্র্যাকে উঠে আসতে সক্ষম হয়েছে। ঢাকা শহরে অনেক ফ্লাইওভার হয়েছে, নতুন নতুন বহুতল ভবন, রাজধানী ঢাকার সম্প্রসারণ হচ্ছে। গড়ে উঠেছে নতুন নতুন স্থাপনা। পদ্মা সেতুর উদ্যোগ তো আমাদের অগ্রগতিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশিদের সকল ষড়যন্ত্র পাশ কাটিয়ে নিজেদের অর্থায়নে গড়ে তুলছেন পদ্মা সেতু; এটি সত্যিই আমাদের বড় গর্বের, বড় অহঙ্কারের বিষয়। তিনি ঢাকায় মেট্রোরেলেরও উদ্যোগ নিয়েছেন। কাজ শুরু হয়েছে। বিদেশিরা এখন বাংলাদেশকে সমীহ করে চলে। আমরা ভাগ্যবান- এক সময় যে দেশকে নিয়ে ব্যঙ্গ করা হতো ‘তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ’ হিসেবে- সেই দেশ এখন সমৃদ্ধ ও উন্নত হতে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। বাংলাদেশকে নিয়ে বিদেশিরাও এখন উচ্ছ¡াস প্রকাশ করে। এ দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা আমেরিকায় বাস করেও এজন্যে গর্ব অনুভব করি।
অর্থকণ্ঠ : বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনি কতটুকু আশাবাদী?
আজিজ আহমদ : আমি আশাবাদী মানুষ। আমি অনেক অনেক আশাবাদী এদেশের উন্নয়ন ও সাফল্য নিয়ে। বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়নকামী। সঠিক রাস্তার সন্ধান পেলে তারা অনেকদূর যেতে পারে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি। এখন পরিশ্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বনির্ভর অর্থনীতির দেশে পরিণত করবো। এ জন্যে আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করে যাচ্ছি। আমার বিশ্বাস, আমরা এখন নিন্ম মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে এগোতে পেরেছি; অতি অল্প সময়েই মধ্যম এবং উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হতে সক্ষম হবো।
তবে এ জন্যে অবশ্যই আইটি খাতকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারকে আইটিবান্ধব হতে হবে।



