শামসুর রহমানের (শাহজাদা মিয়া) জন্ম হয়েছে ব্রিটিশ ভারতে ১৯৪২ সালের ১ এপ্রিল। তাঁর গ্রামের নাম হাটুরিয়া। থানার নাম গোসাইরহাট। জেলা শরীয়তপুর। ভারতবর্ষের অনেক ঘটনাই ঘটেছে তাঁর শৈশবে। ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টি দেশ স্বাধীন হয়েছে। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এ সব ঘটনায় আলোড়িত হয়েছে এদেশের মানুষ। তখনো শিশু শাহজাদার এসব ঘটনার তাৎপর্য বোঝার বয়স হয়নি। তবে তিনি পাকিস্তানের স্বাধীনতার কথা শুনতে শুনতে বড় হয়েছেন। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য তাঁকে মর্মাহত করেছে।
শামসুর রহমানের বাবার নাম মৌলভী খলিলুর রহমান এবং মাতার নাম মোসাম্মাৎ সফুরা বেগম। বাবা ছিলেন জমিদার পরিবারের। তাই ছেলের নাম রেখেছেন শাহজাদা। এটাই স্বাভাবিক। তবে চলনে-বলনে ছিল তাঁর আভিজাত্য। এলাকার মানুষের স্নেহ তাঁকে স্বাপ্নিক তরুণে পরিণত করেছে।
১৯৫৭ সালে তিনি বরিশাল জিলা স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করেন। তখন থেকেই তিনি মানুষের জন্য কিছু একটা করার কথা ভাবতে থাকেন। তাঁর হৃদয়ে তৈরি হতে থাকে বিরাট একটি স্বপ্ন। এই অবস্থায়ই তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ বিএম কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর তরুণ বয়সেই বাংলাদেশের ইতিহাসের বড় বড় ঘটনা সংঘটিত হয়। তিনি নিজেও ছিলেন এসব ঘটনার একজন কুশীলব। সরাসরি অংশ নেন ৬-দফা আন্দোলনে। তখন থেকেই তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুর রাজ্জাক, শেখ ফজলুল হক মণি, তোফায়েল আহমেদ ও আবদুল জলিলের সান্নিধ্যে আসেন।
জনাব আবদুর রাজ্জাক এর বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন শামসুর রহমান। তাঁর সঙ্গ পেয়ে তিনি ছাত্রলীগের কর্মকান্ড জড়িয়ে যান। অংশ নেন ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে। ‘৭০-এর নির্বাচন এবং ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। দেশ স্বাধীন হবার পর স্বপ্ন বিজড়িত হয়ে পড়ে তাঁর দু’চোখ। তবু তিনি বেছে নেন গতানুগতিক জীবনধারাকে। কর্ম জীবন শুরু করেন আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে। এরপর তিনি বিসিএস পাস করেন। কিন্তু তাতে তাঁর মন বসেনি। তিনি ১৯৭৮ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন। চাকরি ছেড়ে দিয়ে বেকার বসে থাকেননি। বরং তারুণ্যের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজে লেগে যান। শুরু করেন ব্যবসা। তাঁর উদ্যোগ শুরু হয় নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টার মধ্য দিয়ে। তা শেষ পর্যন্ত জাতীয় জীবনে উন্নয়নের কাজে লেগেছে।
শামসুর রহমানের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলের নাম রেজাউর রহমান। তিনি লেদার টেকনোলজির উপর ইংল্যান্ডের নর্দাম্পটন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন এবং বাবার প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দ্বিতীয় ছেলে জিয়াউর রহমান। তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে এমবিএ সম্পন্ন করে বাবার প্রতিষ্ঠান বে-ফুট ওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছোট ছেলে আসিফুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যানসাস থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ডিগ্রি লাভ করেছেন। তিনি বে-এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক। শামসুর রহমান তাঁর তিন ছেলেকেই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছেন। পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার প্রতিও কোনো অবহেলা করেননি। বড় মেয়ে রাবেয়া শারমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ডিগ্রি গ্রহণ করেছেন। অপর মেয়ে রোকেয়া শারমিন ইংল্যান্ডের ইস্ট এংলিয়া ইউনিভার্সিটি, নরউয়িচ, ইংল্যান্ড থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন।
বে-শিল্প গ্রæপ
সাফল্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন লক্ষ্যের দৃঢ়তা। শামসুর রহমান সব সময়ই দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যই সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেকে সফল ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। তাতে বেশ সফলও হয়েছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে ‘বে-গ্রæপ’। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বে-ট্যানারিজের খ্যাতি দেশজোড়া। বিদেশেও এই প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি রয়েছে। শিল্পপতি শামসুর রহমান বে-গ্রæপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান। বে-গ্রুপের অধীনে রয়েছে বে-ফুটওয়্যার, বে-রাবার, আজিজ ট্যানারি, বে-এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ, পারুমা সু, শালবাহান ফার্মস লিমিটেডের মতো সুনামধন্য প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। পাদুকা ও চামড়াজাত দ্রব্য বাজারজাতকরণের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘বে-এম্পোরিয়াম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আর একটি প্রতিষ্ঠানের নাম বে-ইকোনোমিক জোন। তিনি এই প্রতিষ্ঠানেরও চেয়ারম্যান। শিল্পপতি শামসুর রহমান নিজেকে শুধু শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রতি নিয়োজিত রাখেননি, পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও নিজেকে যুক্ত করেছেন। তিনি এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স ও গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের পরিচালক। এক সময় তিনি এই দু’টো প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন।
শিল্পপতি শামসুর রহমান বলেন, টেকসই উন্নয়নের জন্য শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। জমির সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষি উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল রয়েছে। কিন্তু এই খাতে অতিরিক্ত জনশক্তি সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই অতিরিক্ত জনশক্তির জন্য কর্মসংস্থান করার ক্ষেত্রে শিল্প খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শ্রমজরিপ ২০১০-১৭ অনুসারে এই সাত বছরে দেশে মোট ৬৭ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এই সময়ে কৃষি খাতে কর্মসংস্থান কমেছে ১৫ লাখ এবং সেবা খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৩৯ লাখ। অন্যদিকে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৩ লাখ। নতুন তৈরি কর্ম ক্ষেত্রের সিংহভাগই এসেছে সেবা খাত থেকে। এর অর্থ হচ্ছে শিল্পখাতে যথেষ্ট কর্মসংস্থান বাড়েনি। তবে শিল্পখাতে তৈরি হয়েছে বিপুল দক্ষ জনশক্তি। কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো যে, দেশের এত বড় অর্থনীতি বা বাজেট শুধু একটা শিল্পের উপর নির্ভরশীল হওয়াটা আমাদের স্বল্প উন্নত দেশ থেকে উন্নত দেশে পদার্পণ করা সম্ভব নয়। তাই আমাদের আরও কয়েকটি সম্ভাবনাময় শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে- যার মধ্যে অন্যতম চামড়া খাত, তারপর রয়েছে পাটসহ কয়েকটি নন-ট্রেডিশনাল খাত। এই সাত বছরে চামড়া শিল্পের উপর অনেক ধকল যাচ্ছে। রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে শিল্প স্থানান্তরের ফলে প্রচুর ক্ষতি হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে সাভারে ট্যানারি কারখানা নির্মাণ করতে হয়েছে। কিন্তু পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারিভাবে নির্মিত কেন্দ্রীয় বর্র্জ্য শোধনাগারটি Central Effluent Treatment Plant (CETP) কার্যকর না হওয়ায় অর্থাৎ CETP টি পরিবেশবান্ধব এবং আন্তর্জাতিক মানের না হওয়ায় এবংLeather Working Group (LWG) কর্তৃক Certificate না পাওয়ার ফলে বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডেড সু প্রস্তুতকারী (Timberland, Clarks, Hush Puppies, Reebok, Adidas ইত্যাদি) প্রতিষ্ঠান সমূহের নিকট বিপুল পরিমাণ চামড়া রফতানির চাহিদা থাকা সত্তে¡ও আমরা তাদের কাছে চামড়া বিক্রয় করতে পারছি না। দুই বৎসর যাবৎ সামান্য পরিমাণ চামড়া স্বল্প মূল্যে নন-ব্র্যান্ডেড কোম্পানিসমূহের নিকট রফতানি করা হচ্ছে। ফলে প্রতি বর্গফুট চামড়া ২ থেকে ৩ ডলারের পরিবর্তে ১ থেকে ১.৫০ ডলারে বিক্রয় করতে হচ্ছে। এভাবে চামড়া খাতে বিপর্যয় নেমে এসেছে। অথচ ১ জানুয়ারি ২০১৭ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২২তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় চামড়া শিল্পকে ‘Product of The Year’ ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে শুধু CETP এর জন্য একদিকে যেমন ট্যানারি মালিকগণ মারাত্মকভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। অপরদিকে দেশ হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মূদ্রা অর্জনের অপার সুযোগ। নিজ খরচে কয়েকটি বড় বড় ট্যানারি Private ETP স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে অনুমতি চাইলেও এখন পর্যন্ত সরকার কর্তৃক Private ETP নির্মাণের অনুমতি না দেওয়ায় চামড়া শিল্পে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। অথচ ভারতের চেন্নাই (মাদ্রাজ) প্রদেশের শুধুমাত্র ভেলর জেলাতেই ৩৫টি Private ETP এবং ১০টি Central ETP আছে। ভারতের প্রায় সকল ট্যানারি প্রচুর কাঁচা চামড়া আমদানি করে। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, দেশে ও বিদেশে চামড়াজাত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিভিন্ন রফতানি পণ্যের শ্রেণিভিত্তিক প্রবৃদ্ধি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রæয়ারি পর্যন্ত আট মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশে প্রচুর উন্নতমানের গরু ও ছাগলের চামড়া পাওয়া যায়। যদি এখানে Leather Working Group (LWG) এর সার্টিফাইড ট্যানারি অর্থাৎ Compliance ট্যানারি থাকত, তবে তার উপর নির্ভর করে বহু বিদেশি বিনিয়োগকারী এখানে নতুন নতুন জুতার কারখানা স্থাপন করতে আগ্রহী হতো। তারা ভিয়েতনামে না যেয়ে বাংলাদেশমুখী হতো। এতে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হতো। পাদুকা শিল্প, তৈরি পোশাক শিল্প থেকেও একটি অধিক শ্রমঘন শিল্প।
লেদার সেক্টরের প্রজ্ঞাবান শিল্পোদ্যোক্তা জনাব শামসুর রহমান বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পখাত বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের নেতৃত্বে যথাযথ কর্তৃপক্ষ লেদার সেক্টরের CETP কার্যকর করার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। যদিও CETP বাস্তবায়ন করা একটু সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তারপরও আমি বলবো CETP যত দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে ততই লেদার সেক্টরের উদ্যোক্তারা পরিবেশবান্ধব পাকা চামড়া উৎপাদন করতে সক্ষম হবেন। এতে এই সেক্টরের উদ্যোক্তারা অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে যেমন তাদের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারবেন। পাশাপাশি সরকারও এই খাত থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করার সুযোগ পাবেন। তিনি আরও বলেন, বাস্তব ক্ষেত্রে CETP সম্পূর্ণভাবে কার্যক্ষম করতে এখনো অনেক সময়ের প্রয়োজন বলে মনে হয়। তাই এসব শিল্প উদ্যোক্তাদের ব্যাংক লোন পরিশোধ ও রফতানি বাজার ধরে রাখার স্বার্থে নিজস্ব অর্থায়নে নিজ নিজ কারখানায় ETP স্থাপন করার সুযোগ দেওয়া হলে তা হবে প্রতিবেশী দেশের চামড়া শিল্পোদ্যোক্তাদের মতো একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। যার সুফল শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে দেশ ও জাতি উপভোগ করবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
রপ্তানি খাতের ভূমিকা
এদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের বড় প্রমাণ হচ্ছে আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদন। এর বড় দৃষ্টান্ত পোশাক শিল্প, প্লাস্টিক পণ্য, ঔষধ শিল্প, সিরামিক পণ্য এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। ১৯৬০-এর দশকেও মানুষ জুতো-স্যান্ডেল তেমন পরত না। গ্রাম-গঞ্জের মানুষ খালি পায়ে হাটে বাজারে যেত। এখন মানুষের গায়ে নতুন পোশাক, পায়ে নতুন জুতো এবং গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত পুরো তৈজসপত্র দেশেই তৈরি হচ্ছে। এই সম্পর্কে শিল্পপতি শামসুর রহমান বলেন, চামড়া ও পোশাক শিল্পের বিকাশের মূলে রয়েছে বেসরকারি খাতের অবদান। পোশাক শিল্প যেভাবে ৫০ লাখ গ্রামীণ শ্রমিকদের আত্মীভূত করেছে, তা নিঃসন্দেহে একটি বিস্ময়কর ঘটনা। আমরা চামড়া শিল্পে যথেষ্ট উন্নতি করেছি। বাংলাদেশের জুতো ৩ ভাগে বিক্রি হচ্ছে আমেরিকা, লন্ডন, জার্মানি, চীন, ইতালিসহ আরও বহু উন্নত দেশে। এদেশের চামড়াজাত শিল্পপণ্য বিশ্বমানের।
অন্তর্ভুক্তি
বে-গ্রুপের শিল্প কারখানায় কর্মরত রয়েছে প্রায় নয় হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক। নিজেকে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ছাড়াও নানা রকম সমাজ সেবামূলক কাজে নিয়োজিত রেখেছেন দেশের এই বরেণ্য শিল্পপতি। নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে শরীয়তপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী গোসাইরহাট উপজেলায়। শামসুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত গাউসিয়া ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, গোসাইরহাট উপজেলার নিজ গ্রাম হাটুরিয়ায় পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত খলিলুর রহমান ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, সামন্তসার ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত সামন্তসার উচ্চ বিদ্যালয়, হাটুরিয়া গ্রামে মায়ের নামে গড়ে তুলেছেন আলহাজ্ব সফুরা বেগম শিশু সদন (এতিমখানা) এবং তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে ইকরাকান্দি দাখিল মাদ্রাসায় ও নাগেরপাড়া ইউনিয়নে নাগেরপাড়া দাখিল মাদ্রাসায়। সমাজ সেবায় তিনি বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৮৯ সালে কবি নজরুল স্বর্ণ পদক সম্মানে ভূষিত হন।
বিশিষ্ট শিল্পপতি শামসুর রহমান নিজ এলাকায় একজন দানবীর ও জনদরদী মানুষ হিসেবে পরিচিত। তিনি অত্যন্ত দৃঢ় চরিত্রের মানুষ। অথচ অসাধারণ বিনয়ী। মানুষের দুঃখ-কষ্টে তিনি সহানুভূতিশীল। বন্যা, নদী ভাঙন, খরাসহ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যের সময় দুর্গত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। তিনি বলেন, দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়েছে। একসময় বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ রাতের খাবার না খেয়ে ঘুমাতো। সেই নিবিড় দারিদ্র্য এখন আর নেই। বাংলাদেশের মানুষ প্রমাণ করেছে তারা সৃজনশীল। একটি জাতির মধ্যে সৃজনশীলতা থাকলে সেই জাতি চিরকাল দরিদ্র থাকে না। এর বড় প্রমাণ বাংলাদেশ। এদেশে শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে। তৈরি হয়েছে অসংখ্য ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা ও শিল্পপতি। তারাও দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসেন। অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাদের অবদান অপরিসীম। এটা তারা নিজেরাই অনুধাবন করতে শিখেছেন; দেশের উন্নয়নে গরিব মানুষগুলোর অবদান সীমাহীন। কৃষকরা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে কোটি কোটি মানুষের মুখে অন্নের যোগান দেয়। পুরো জাতিই তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। তাদের কথা মনে রেখেই দেশের উন্নয়নে আমাদের ভূমিকা রাখা উচিত। আমি সেইরূপ সামান্য ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি।
শামসুর রহমান বলেন, তবে দেশের এই অর্থনৈতিক উন্নতির পিছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে চলেছেন আমাদের বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। তাঁর গভীর দেশপ্রেম, কঠোর পরিশ্রম ও দূরদর্শী উন্নয়ন পরিকল্পনার সুবাদেই আজ আমাদের এই দৃশ্যমান উন্নয়ন।
সাফল্য
শামসুর রহমান ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি হিসেবে সফল। তিনি একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ। ইচ্ছা করলে জীবনটা আরাম-আয়েশে কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু বেছে নিয়েছেন সংগ্রামী জীবন। কঠোর পরিশ্রম, কর্মকৌশল ও দক্ষতার মাধ্যমে নিজেকে একজন শিল্পপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ব্যবসায় সাফল্য অর্জনের জন্য তিনি বেশ কয়েকবার সিআইপি নির্বাচিত হন ও রফতানি ট্রফিতে স্বর্ণ পদক পান। একজন ব্যবসায়ীর জন্য এটা বিরাট সম্মানের ব্যাপার। শিল্পপতি শামসুর রহমান বলেন, মূলত সকল মানুষই সৃজনশীল; কিন্তু তা সুপ্ত অবস্থায় থাকে। কঠোর পরিশ্রম ও অনুশীলনের মাধ্যমে তা জাগিয়ে তুলতে হয়। আমি চেষ্টা করেছি নিজের সুপ্ত ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে। জীবনের শুরুতে আমি সরকারি চাকরি পেয়েছি এবং কিছু দিন তা করেছি। কয়েক বছর কেটে যাবার পর আমার মনে হয়েছে চাকরি করলে সৃজন ক্ষমতা নির্দিষ্ট স্থানে আটকে যাবে। তাই চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা করছি। ব্যবসায় উত্থান-পতন আছে। জীবনে এমন অনেক কঠিন সময় এসেছে, তখন মনে হয়েছে ব্যবসা ছেড়ে দেই। কিন্তু পরে আবার নিজেকে স্থির রেখেছি। এদেশে বড় বড় শিল্পপতি রয়েছেন। এটা দেশের অর্থনীতির জন্য শুভ লক্ষণ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে জিডিপির হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশ ৪৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। ২০১৭ সালের হিসাব অনুসারে বিশ্বের দ্রæত প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এতে সরকারি খাতের পাশাপাশি ব্যক্তি খাতের অবদান রয়েছে। দ্রæত অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে বিনিয়োগ। সরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। এই বিনিয়োগের লক্ষ্য হচ্ছে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা। বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির সংযোগ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু এখনো এই সব বিষয় জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকে রয়েছে।
অগ্রগতি
২০১৮ সালের ১৬ মার্চ জাতিসংঘেরCommittee for Development (CDP) বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নতি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে তিনটি সূচক রয়েছে। এগুলো হচ্ছে-
(১) মাথাপিছু আয় (২) মানবসম্পদের উন্নয়ন ও (৩) অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা হ্রাস। এই তিনটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ যথেষ্ট ভালো করেছে। এর ফলে এদেশের ঋণ ধারণ ক্ষমতা বেড়েছে। বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্র স¤প্রসারিত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষমতা বেড়েছে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের সামর্থ্য বেড়েছে। এই সম্পর্কে দেশের স্বনামধন্য শিল্পপতি শামসুর রহমান বলেন, ‘সন্দেহ করার কোনো অবকাশ নেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চেহারা অনেকটাই বদলে গেছে। এর পেছনে রয়েছে পোশাক, চামড়া, পাট ও মৎস্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের অবদান। শিল্প-কারখানা ছাড়া এদেশের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা। উন্নয়ন সারথিদের মনে রাখা উচিত, এদেশের কৃষক কঠোর পরিশ্রম করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে আমাদের জন্য অন্নের যোগান দিয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করছে। গত কয়েক বছর ধরেই কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সর্বোপরি আমাদের এই উন্নতির মূলে বর্তমান সরকার তথা আমাদের সুযোগ্য ও বিচক্ষণ প্রিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।



