নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশি আমেরিকান নার্গিস আহমেদ সেইসব ব্যক্তিত্বের একজন যারা নিজেদের সগৌরব প্রতিভা ও কর্মের মাধ্যমে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে সমুজ্জ্বল করেছেন। শিক্ষিত, উদ্যমী, সৃজনশীল, মেধাবী এবং সময়ের সাহসী নারী নার্গিস আহমেদ আমেরিকায় বাংলাদেশ কমিউনিটিতে বটেই আমেরিকার অভিবাসী সমাজের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। মেধাবী এই নারীর জন্ম বাংলাদেশের কুমিল্লার হাজিগঞ্জে। তিনি ২০০৬-২০০৭ সালে আমেরিকায় বাংলাদেশ কমিউনিটির আমব্রেলা খ্যাত সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। নারী হিসেবে তিনিই প্রথম এবং একমাত্র প্রেসিডেন্ট হবার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেন।

স্বপ্নদর্শী নার্গিস আহমেদ ঢাকার আজিমপুর গার্লস হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং ইডেন কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের পর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু ১৯৮১ সালে ফার্মাসিস্ট মোশতাক আহমেদ এর সাথে বিয়ের সুবাদে পাড়ি জমান আমেরিকায়। এখানে তিনি ট্রাভেল এবং ট্যুরিজমের ওপর পড়াশোনা করেন। খুঁজে পান আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবার সিঁড়ি। এখানকার বিশ্বখ্যাত ট্রাভেল এজেন্সি জুরিস ওয়ার্ল্ডে ম্যানেজার হিসেবে ২৪ বছরেরও বেশি সময় ফুল টাইম ট্রাভেল এজেন্ট এবং সাপোর্টিং হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আত্মপ্রত্যয়ী নার্গিস আহমেদ ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের বাইরে প্রথম বাংলা টিভি ‘রূপসী বাংলা’র নিউজ প্রেজেন্টার হিসেবে নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ় করেন। সুদর্শনা ও স্মার্ট নারী ব্যক্তিত্ব নার্গিস ১৯৮৭ সালে আমেরিকার বাংলাদেশ কমিউনিটিতে নারী হিসেবে মঞ্চ নাটকে অংশ নেন। দিল আফরোজ আহমেদ ওরফে নার্গিস আহমেদ নিউ ইয়র্ক তথা আমেরিকায় বাংলাদেশ কমিউনিটির এক অনন্য প্রতিভা। তিনি ৩৬ বছর ধরে পেশাগত জীবনের বাইরে সমাজসেবা ও আমেরিকার মূলধারার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি কুইন্সের কমিউনিটি বোর্ডে একটানা ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৮৮ সাল থেকে মূলধারার রাজনীতিতে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ আমেরিকান পাবলিক অ্যাফেয়ার্স ফ্রন্ট (বিএপিএফ) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদেরকে আমেরিকান মেইন স্ট্রিম পলিটিক্সের সাথে যুক্ত করার উদ্যোগ নেন- যার ফলে এখন অনেক বাংলাদেশি রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। বাংলাদেশি সম্প্রদায় ও অভিবাসীদের অধিকার আদায়ে তার ভূমিকা অবিস্মরণীয়। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের নির্বাচনে ফান্ড রাইজার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

নার্গিস আহমেদ ১৯৮৮ সালে ১১ জন সদস্য নিয়ে বাংলাদেশ কমিউনিটির উন্নয়নে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ সংসদ। এই সংসদ বয়স্কদের ইংরেজি শিক্ষা, আমেরিকান কাস্টমস ম্যানার এন্ড ইথিক্স প্রশিক্ষণ, নতুন অভিবাসীদের চাকরির ব্যবস্থা, বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা, ওপি-১ ভিসাধারীদের সহযোগিতা প্রদান, তরুণ প্রজন্মকে বাংলা শেখানোসহ বাঙালি কালচারের প্রতি আকৃষ্ট করার কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এই সংসদের পক্ষ থেকে পুরুষদের গাইডেন্স ক্লাব খোলা হয়। এতে আমেরিকান লাইফের করণীয় ও বর্জনীয় শেখানো হয়।
বাংলাদেশ সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি বেশ ক’টি উদ্যোগ নেন- যা বাংলাদেশি কমিউনিটিকে এগিয়ে নিচ্ছে। তিনি বয়স্কদের ইংরেজি শেখার ও বাচ্চাদের ভালো বাংলা শেখার ব্যবস্থা করেন। তরুণদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ওখানকার বিত্তবানদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বিভিন্ন সময় দেশে দুর্গত ও অসহায়দের সহযোগিতাসহ কমিউনিটির সদস্যদের নানা বিষয়ে সচেতনতার উদ্যোগ নিয়ে আলোচিত হয়ে আছেন।
সুদর্শনা নার্গিস আহমেদ ২০০১ সালে ফোবানার নির্বাহী সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে বাংলার সংগীত, থিয়েটারসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের উন্নয়নে কাজ করছি।
১৯৯৫ সালে তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ড্রামা সার্কেল’। তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট। বাংলা নববর্ষ উদযাপনসহ সম্প্রতি ফাল্গুন উৎসব পালনেরও অন্যতম উদ্যোক্তা তিনি। প্রবাসে তিনিই প্রথম ১লা বৈশাখে মাটির পাত্র সানকিতে পান্তা ইলিশ ও রঙ-বেরঙের শাড়ির প্রচলন করে এই উৎসবকে দৃষ্টিনন্দন করেছেন।
প্রবাসীদের কাছের মানুষ নার্গিস আহমেদ একজন খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ। তিনি এশিয়ান আমেরিকান ডেমোক্রেটিক এসোসিয়েশন অব কুইন্স এর ভোটার নিবন্ধন কমিটির সহ চেয়ারম্যান, নিউ ইয়র্ক ডেমোক্রেটিক পার্টির দক্ষিণ এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সদস্য হিসেবে গত ১৫ বছর ধরে কমিউনিটি বোর্ডের সদস্য। তিনিই দক্ষিণ এশীয় মহাসাগরীয় অঞ্চলের নারী সদস্য।
সমাজসেবার ক্ষেত্রে তার রয়েছে ব্যাপক অবদান। তিনি দেশি সিনিয়র সেন্টারের পরিচালক। ২০১৪ সালে দেশি সিনিয়র সেন্টার জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার স্থাপন করেছে। তিনি ২০১৪ সালে নিউ ইয়র্কের আল মামুর ইসলামি স্কুলের উপদেষ্টা কাউন্সিলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। জ্যামাইকাতে সিনিয়র সিটিজেন রিক্রেয়েল সেন্টার প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা অনেক। তিনি এর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর। নার্গিস আহমেদ বাঙালি কমিউনিটির ‘ট্রেন্ড সেটার’ হিসেবে অনন্য। নেতৃত্বের নানা গুণাবলী-সম্পন্ন স্মার্ট ব্যক্তিত্ব নার্গিস আহমেদ তার কর্মসাফল্যের অনেক স্বীকৃতি ও সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে কংগ্রেসনাল প্রক্সেমেশন সিটি কম্পট্রলারের সেরা এশিয়ান আমেরিকান হওয়ার কমেন্ডেশনসহ এশিয়ান আমেরিকান অ্যান্ড প্যাসিফিক আইল্যান্ডার হিরো অ্যাওয়ার্ড অন্যতম।
আমেরিকায় নারীর ক্ষমতায়নের তিনি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। স্বামী মোশতাক আহমেদ পেশায় ফার্মাসিস্ট। দুই কন্যা মুনিরা আহমেদ ও কায়নাথ আহমেদকে নিয়ে এই গর্বিত দম্পতির সুখের সংসার।
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক



