যাদের অবিরাম চেষ্টা এবং মেধাবী উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমেই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে চলেছে, বাংলাদেশ স্বল্প আয়ের অর্থনীতির দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠে আসতে সক্ষম হয়েছে সেই বেসরকারি খাতের পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা ব্যক্তিদের অন্যতম একজন ফারুক হাসান। তিনি দেশের পোশাক শিল্প খাতের শীর্ষ পর্যায়ের গ্রুপ ‘জায়ান্ট গ্রুপ’-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর।
তিনি দীর্ঘকাল ধরে বিজিএমইএর পলিটিক্সের সাথে সম্পৃক্ত। উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী হিসেবে ক্লিন ইমেজের ফারুক হাসান ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০১৭ সাল থেকে ডাচ-বাংলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট। বিজিএমইএর গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য হিসেবে ২০১৭ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। কূটনৈতিক অঙ্গনের সাথেও সম্পৃক্ততা রয়েছে এই উদ্যোক্তা ব্যক্তিত্বের। তিনি অনারারি কনসাল জেনারেল অ্যাট অনারারি কনসুলেট জেনারেল অব গ্রীস ইন বাংলাদেশ। তিনি ২০১৮ সাল থেকে এই সম্মানিত পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফারুক হাসান ছোটবেলা থেকেই ছাত্র হিসেবে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি এবং ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৮৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
ফারুক হাসান পড়াশোনা শেষে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি আগ্রহী হন এবং গার্মেন্টস শিল্প ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েন। কঠোর পরিশ্রম এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেন জায়ান্ট গ্রুপের মতো বিশাল শিল্প গ্রুপ। তিনি শুধু নিজের ভাগ্যোন্নয়নেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি বিজিএমইএর সাংগঠনিক কার্যক্রমের সাথে নিজেকে যুক্ত করেন। তিনি দীর্ঘকাল ধরে বিজিএমইএর সম্মিলিত পরিষদের নেতা হিসেবে সুপরিচিত। তিনি পোশাক মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনে এই ভিশনারি লিডার ও চেঞ্জ মেকার সম্মিলিত প্যানেলের নেতা। মূলত একজন নেতার মধ্যে যে সব গুণাবলি থাকা প্রয়োজন সবই তার মধ্যে আছে। বিশেষ করে নেতৃত্ব দেয়ার মতো মনোবল ও চিন্তাশক্তি ফারুক হাসানের রয়েছে। তার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। তিনি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এ সংগঠনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এ দিক থেকে বলা যায়- বিজিএমইএর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন পরিচালনায় যে দক্ষ নেতৃত্ব প্রয়োজন সকল গুণাবলিই তার মধ্যে রয়েছে। আগামী ৪ এপ্রিল বিজিএমইএ নির্বাচন বিষয়ে অর্থকন্ঠের পক্ষ থেকে জায়ান্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এবং বিজিএমইএর সফল নেতা ফারুক হাসানের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে। ফারুক হাসান সাক্ষাৎকারে যা বলেন তা এখানে উপস্থাপন করা হলো-

অর্থকন্ঠ : আপনি বিজিএমইএর আসন্ন নির্বাচনে সম্মিলিত পরিষদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অতীতেও এই পরিষদের সাথেই ছিলেন। সম্মিলিত পরিষদ অনেকবারই নির্বাচিত হয়েছে। শোনা যায়, সমঝোতার মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের চেষ্টা হয়েছিল- কিন্তু হয়নি। নির্বাচন কি নিজেদের মধ্যে বিভেদের সৃষ্টি করে না?
ফারুক হাসান : পোশাক শিল্প দেশের অর্থনৈতিক পরিম-লের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত। এই খাতকে ঘিরে শুধু আমাদের মধ্যেই নয়- দেশের সচেতন মানুষের মাঝেও অনেক আশার স্বপ্ন রোপিত হয়। প্রত্যেকের মধ্যেই একটি আশাবাদ কাজ করে যে, এ খাত ভালো থাকলে দেশের অর্থনীতি ভালো থাকবে। আমরাও এটি বিশ্বাস করি। স্বাভাবিকভাবে এই খাতের সমৃদ্ধি এবং উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্ব। যে নেতৃত্বের মধ্যে থাকবে দৃঢ় মনোবল ও উন্নয়ন চিন্তাশক্তি। প্রয়োজন নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা।

আমরা প্রত্যেক নির্বাচনেই নেতৃবৃন্দ আলোচনা করে বা সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়ে থাকি। তবে সাধারণ ভোটাররা সবসময়ই আশা করেন নির্বাচন। কারণ নির্বাচনের মাধ্যমেই যোগ্য এবং শক্তিশালী নেতৃত্ব উঠে আসে। যারা তাদের ইনোভেটিভ চিন্তা দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিকে নেক্সট লেভেলে নিয়ে যাবেন।
আপনি বলেছেন, নির্বাচন বিভেদের সৃষ্টি করে কিনা? আমি বলবো- না। আমরা নির্বাচন সময়ে আলাদা আলাদা দল হলেও বিজিএমইএ আমাদের সবার এবং বিজিএমইএর নির্বাচিত নেতৃত্বও সবার। অর্থাৎ প্যানেল যার যার কিন্তু নির্বাচিত সভাপতি ও নেতৃবৃন্দ সবার। যে কারণে এখানে কখনো দলীয় বিভেদ সৃষ্টি করে নোংরামির পলিটিক্স স্থান পায়নি। কারণ আমরা যারা শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী তারা প্রত্যেকেই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উন্নত চিন্তার অধিকারী। আমাদের মূল ভাবনাই হচ্ছে- শিল্পায়ন এবং এই শিল্পের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরানি¦ত করা।
অর্থকন্ঠ : আপনি দীর্ঘদিন ধরেই বিজিএমইএর পলিটিক্সের সাথে সম্পৃক্ত। নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু বলুন।
ফারুক হাসান : দেশের বলি, শিল্পের বলি আমাদের অনেক ভালো অর্জন রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর প্রচার-প্রচারণা বেশি হয়নি। শুরুর দিকে দেশে এই শিল্প অনেকটা অপরিকল্পিতভাবেই গড়ে উঠেছিল। সবাই এটাকে শুধু ব্যবসায়িকভাবে বিচার বিবেচনা করেছে। কিন্তু এটি যে একটি শিল্পখাত- এর মধ্যে যে পরিকল্পিত অনেক কিছুই প্রয়োজন, তা সেভাবে ভাবা হয়নি। ফলে যত্রতত্র এই শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে। একটি বিল্ডিং ভাড়া নিয়ে কিছু মেশিনপত্র সংযোজন করেই একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হতো। ফলে অগ্নি দুর্ঘটনাসহ নানা ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হতে হতো। দীর্ঘ সময় আমরা এ পরিস্থিতির শিকার হয়েছি- এতে এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেক সময় শ্রমিক অসন্তোষ এবং বিদেশে দেশের এই শিল্পের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতো।
পরবর্তীতে ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধসের পরে আমরা মারাত্মক ধাক্কা খেয়েছিলাম। বিশেষ করে বিদেশে আমাদের পোশাক শিল্পের ভাবমূর্তি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হতে থাকে। সে সময় বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ক্রেতাদের পরামর্শ এবং সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপে গার্মেন্ট খাতে ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে। কারখানাগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের করা হয়েছে। এ বিষয়গুলো দেশে এবং দেশের বাইরে সেভাবে প্রচার পায়নি। এমনকি আমার মনে হয়, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ব্র্যান্ডিং ঠিকমতো করা হয়নি। এখানে আমাদের ব্যাপক কাজ করতে হবে এ ব্যাপারে। বিশেষ করে এ শিল্পের ব্র্যান্ডিং ঠিকমতো হলে ব্যাপক অর্থনৈতিক লাভ হবে। দেশের অর্থনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আমি বিশ্বাস করি।

অর্থকণ্ঠ : একসময় গার্মেন্টস খাতে শিশু শ্রম নিয়ে বিরূপ ধারণার জন্ম হয়। আপনারা তা কাটিয়ে উঠছেন। আপনারা শিশুদের জন্য স্কুলের ব্যবস্থা করেছিলেন- তার সফলতা কেমন?
ফারুক হাসান : ঠিকই বলেছেন। এ দেশের গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে অনেক পথই আমাদের পাড়ি দিতে হয়েছে। অনেক সমস্যাবহুল অবস্থা পাড়ি দিয়ে আমাদের এগোতে হয়েছে। ‘চাইল্ড লেবার’ নিয়েও আমাদের বেশ জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছিল। আশার কথা, আমরা সে বিষয়টি কাটিয়ে উঠেছি এবং অত্যন্ত সফলতার সাথে। এখন আপনারা এই খাতে কোথাও চাইল্ড লেবার পাবেন না। এটি কিন্তু নেতৃত্বের দৃঢ়তায় সম্ভব হয়েছে। আমরা বলেছি- কারো কারখানায় কোনো শিশু শ্রমিক পাওয়া গেলে সেই ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দেয়া হবে। এতে কাজ হয়েছে। আমরা সেই শিশুদের জন্য বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করেছিলাম- এটি চালু আছে।
অর্থকণ্ঠ : একসময় অনেক ফ্যাক্টরিতেই আগুন লেগে ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণহানি ঘটতো। এখন এটি দেখা যায় না-
ফারুক হাসান : আগেই বলেছি, এ শিল্প এখন আন্তর্জাতিক মানের। অনেক সংস্কার করা হয়েছে। এখন কারখানা বিল্ডিং করতে অনেক নিয়ম মানতে হয়। আমরা প্রতিনিয়ত পরিদর্শন করি। এর জন্যে একটি শক্তিশালী টিম রয়েছে। যদি কোনো কারখানায় ত্রুটি সংবলিত বিল্ডিং অথবা স্থাপনা পাওয়া যায় তা বন্ধ করে দেয়া হয়, জরিমানা করা হয়।
আশার কথা- এখন এই শিল্পখাত এসব থেকে অনেক মুক্ত। বিজিএমইএর গুরুত্বপূর্ণ তদারকি ও কঠোর অবস্থানের ফলেই আমাদের এই উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। আপনাদের জানার জন্য বলছি, আমি দীর্ঘদিন যাবত বিজিএমইএর নেতৃত্বের সাথে সম্পৃক্ত থাকায়- এসব সংস্কারে ভূমিকা রাখতে পেরেছি। এতে আমি নিজেও তৃপ্ত।
অর্থকণ্ঠ : গার্মেন্টস এখন বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক শিল্প। এর জন্য নতুন নতুন বাজার প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য জানতে চাইছি।
ফারুক হাসান : আমি বিজিএমইএর নেতৃত্বের সাথে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। এর আগে আমি যখন সহসভাপতি পদে ছিলাম তখন নতুন বাজার সন্ধানের দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। ওই সময় আমি এ বিষয়ে কাজ করেছি। নতুন বাজার বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের দখলে ছিল ৬.৮৮ ভাগ। সেটি আমরা ১৬ শতাংশের উপরে নিয়ে গিয়েছিলাম। নতুন বাজারে আমাদের রপ্তানি ৫ বিলিয়ন ইউএস ডলারের উপরে চলে গেছে- আরও অধিক হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু দুঃখজনক বিষয়- গত দু’বছরে এই নতুন বাজারের সম্প্রসারণ হয়নি; বরং আরও কমে গেছে।
আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি- আমি সভাপতি নির্বাচিত হলে নতুন বাজারে আমরা কিভাবে আরো শক্ত অবস্থান করে নিতে পারি সে লক্ষে কাজ করব। নতুন বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি আমাদের পোশাকের বহুমুখিকরণের উপরও কাজ করব।
অর্থকণ্ঠ : আপনি নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। সেক্ষেত্রে বিজিএমইএর সভাপতি নির্বাচিত হলে সংগঠনের জন্যে কি ভাবে কাজ করবেন?
ফারুক হাসান : আমি সংগঠন করা লোক। সংগঠন মানসিকতার একজন মানুষ যে অবস্থার মধ্যেই থাকুক না কেন- তিনি নিজের কাজের মধ্যেই সংগঠনের কাজও করে থাকেন। আমি এ ব্যাপারে দৃঢ়তার সাথে উচ্চারণ করছি যে, নির্বাচিত হতে পারলে গার্মেন্টস খাতের জন্য আগামী দু’টি বছর নিজেকে উৎসর্গ করবো। সবার সহযোগিতা নিয়ে একটি গতিশীল বিজিএমইএ গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। আমি আরো বলবো, যারা নির্বাচিত হতে পারবেন না তাদের মধ্যে যারা যোগ্যতার বিবেচনায় ভালো নেতা তাদের নিয়ে বিভিন্ন কমিটি গঠন করবো- যাতে তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এই শিল্প খাতকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে পারি।
অর্থকণ্ঠ : দেশের পোশাক শিল্পখাত নি:সন্দেহে সম্ভাবনাময়; এ খাত নিয়ে আপনার চিন্তাভাবনা কি?
ফারুক হাসান : মানুষের আশার কোনো শেষ নেই। আমাদেরও আশা অনেক বড়। নানা কারণেই বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পোদ্যোগের একটি অপরিহার্য স্থানে পরিণত হতে চলেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ শুধু ঘুরেই দাঁড়ায়নি- এদেশ এখন বিশ্বের সম্ভাবনাময় ‘শিল্প অরণ্য’।

আমি নির্বাচিত হলে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশকে তৈরি পোশাকের প্রধান উৎস কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করব। আমার বিশ্বাস, আমাদের পোশাক খাত কোনো অবস্থাতেই পিছিয়ে নেই। উন্নত বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতা করেই আমরা আজ এ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছি। এ ছাড়া দেশের মানুষ ও অর্থনীতির প্রতি আমাদের একটা দায়বদ্ধতাও রয়েছে। এই খাতের উন্নয়নের দিকে বাংলাদেশ তাকিয়ে আছে। আমাদের সরকারও মনে করে গার্মেন্টস খাত দেশের আয়ের প্রধান উৎস- কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস। আমরা পরিপূর্ণভাবে শিল্পবান্ধব কাজে এটি লাগাতে চাই।
অর্থকণ্ঠ : আপনার নেতৃত্বে সম্মিলিত পরিষদ বিজয়ের লক্ষে কতটুকু আশাবাদী? চট্টগ্রামে আপনার অবস্থান কেমন?
ফারুক হাসান : দেখুন, নির্বাচনে যারাই প্রতিযোগিতা করেন প্রত্যেকেই জয়ী হবার আশা নিয়েই ভোটে অংশ নেন। প্রত্যেকেই ভাবেন- ভোটাররা আমাদেরকেই রায় দেবে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলবো, আমি বুঝতে পারছি নির্বাচনের বাতাস আমাদের পালেই হাওয়া দিচ্ছে। আমরা অভিজ্ঞ এবং দক্ষ। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পখাতে আমাদের নিজ নিজ ভাবমূর্তি রয়েছে। চট্টগ্রামে আমাদের পরিষদে সহ সভাপতি পদে নির্বচন করছেন ওয়েল গ্রুপের সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তিনি শুধু শিল্পোদ্যোক্তাই নন- নেতৃত্বের সকল গুণাবলিই তার মধ্যে রয়েছে। তাছাড়া তিনি বিনয়ী এবং ভদ্র। আমার বিশ্বাস, তার নেতৃত্বে নির্বাচনে চট্টগ্রামের ভোটাররাও আমাদের পক্ষে সমর্থন দিবেন। আমরা পূর্ণ প্যানেলেই জয়ী হবো ইনশাআল্লাহ এবং পোশাক শিল্পে নতুন যুগের সূচনা ঘটাতে সক্ষম হবো।
অর্থকণ্ঠ : অনেকেই মনে করেন- এদেশ অবকাঠামোগতভাবে বিশেষ করে রাস্তাঘাটের অব্যবস্থাপনার জন্য শিল্পক্ষেত্রেও পিছিয়ে ছিল; বর্তমানে পদ্মা সেতুসহ অন্যান্য মহাসড়ক ৪ লেন ও ৬ লেন হচ্ছে- এতে শিল্প প্রসারের সম্ভাবনা কতটুকু?
ফারুক হাসান : উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ মূলত শিল্পের প্রাণ। গত এক দশকে এসব খাতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে এবং তা অব্যাহত আছে। পদ্মা সেতু দেশের অর্থনীতি বিশেষ করে শিল্পায়নে একটি মাইল-ফলক সৃষ্টি করবে। দেখুন, ঢাকার বাইরে আগে গ্রাম ছাড়া কিছুই ছিল না। কিন্তু এখন দেখবেন অসংখ্য শিল্পকারখানা। ছোট বড় ইন্ডাস্ট্রিতে ভরে গেছে। এর কারণ রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সুবিধা রয়েছে। এমনকি গ্রামগুলোতেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে উঠেছে। এর মূল কারণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন। সেক্ষেত্রে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন দেশকে অন্তত পঞ্চাশ গুণ এগিয়ে নিয়ে যাবে। দেশের দক্ষিণ অঞ্চল এতদিন ছিল অনেকটা অন্ধকারে। পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে শিল্পে সমৃদ্ধ একটি রাষ্ট্র। এই যে এতকাল বাংলাদেশকে অপার সম্ভাবনার দেশ বলা হতো- তার বাস্তবায়ন এখন ঘটতে যাচ্ছে।

একটি বিষয় দেখুন, বাংলাদেশে কৃষিজাত পণ্যের ব্যাপক সমারোহ রয়েছে; কিন্তু এক স্থান থেকে অন্যস্থানে নেয়ার আগেই তা পচে যায়। বিদেশে রপ্তানিযোগ্য পণ্যকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারের শুধু রাস্তা-ঘাট, বিদ্যুৎ-গ্যাস দিলেই হবে না তাদেরকে এসব অঞ্চলে শিল্পের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে হবে। এখনো শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ বিলম্বিত হয়- এগুলোকে দ্রুততার সাথে দেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।
অর্থকণ্ঠ : আপনারা দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছিলেন ব্যাংক ঋণের সুদ হার কমাতে হবে। সরকার এটিকে সিঙ্গেল ডিজিটে নিয়ে এসেছে- আপনার মন্তব্য কি?
ফারুক হাসান : এটি নি:সন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখবেন নানা ধরনের সার্ভিস চার্জ চালু করায় সিঙ্গেল ডিজিটের সুবিধা থেকে উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। একে দ্রুত কার্যকর করতে হবে।
অর্থকণ্ঠ : আপনারা বলছেন সুদের হার কমাতে, অন্যদিকে যারা ব্যাংকে ডিপোজিটের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ দ্বারা জীবন নির্বাহ করছেন তারা চান সুদ হার আরো বৃদ্ধি পাক।
ফারুক হাসান : আপনি ঠিকই বলেছেন, এদেশে অনেক মানুষ আছেন যাদের আয়ের উৎস একমাত্র ব্যাংকের জমা টাকা থেকে পাওয়া লাভ। এতে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াই স্বাভাবিক। তাদের জন্য সরকারের আলাদা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এমনিতেই কিছু কর্মসূচি আছে কিন্তু তাকে বিস্তৃত করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারকে এসব নাগরিকের জন্য ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে হবে। জনবান্ধব সরকারকে উপলব্ধি করতে হবে ব্যাংকে সুদের হার কমিয়ে দিয়ে যদি শিল্পায়ন অধিক করা যায় তবে সরকারের আয় কয়েক গুণ বাড়বে। আর সরকার তখন মানুষের কল্যাণে অধিক কাজ করতে পারবে।
অর্থকণ্ঠ : উন্নত দেশগুলোতে বয়সের সীমারেখায় নাগরিকদের কল্যাণ ভাতা দেয়া হয়, আমাদের এখানে সেই সুবিধা কতটুকু সম্ভব?
ফারুক হাসান : সবই সম্ভব। ইতোমধ্যে দেশে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতাসহ অনেক মানবিক ভাতা প্রদান স্বল্প আকারে হলেও চালু করা হয়েছে। দেশ শিল্পায়িত হলে, সরকারের আয় বাড়লে এই ভাতা প্রদান আরও বিস্তৃত হবে- সে বিশ্বাস আমাদের আছে। এভাবেই বাংলাদেশ একদিন কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
অর্থকণ্ঠ : দেশে দুর্নীতি ও অনিয়ম বাড়ছে- এ থেকে উদ্ধারে আপনার পরামর্শ কী?
ফারুক হাসান : এটি অবশ্য দুঃখজনক। আমাদের মনে রাখা উচিত- এই দেশের স্বাধীনতার জন্য ত্রিশ লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ দিয়েছেন, দু’লক্ষাধিক নারীকে সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে। আমরা যদি এই বোধ হৃদয়ে জাগ্রত করি তাহলে কিন্তু দুর্নীতির দিকে হাত বাড়াবো না। পাশাপাশি সকল স্তরে দুর্নীতি দমন এবং প্রতিরোধে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
অর্থকণ্ঠ : বাংলাদেশকে নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
ফারুক হাসান : আমি আশাবাদী মন-মানসিকতার মানুষ। তাছাড়া একজন নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশকে অবলোকন করার সুযোগ পেয়েছি। নিজের কাছেও আশ্চর্য লাগে এই অভাবনীয় উন্নতি দেখে। এর পেছনে একটাই কারণ- এদেশের মানুষ যদি ইচ্ছা করে এটি করবো- তা হয়ে যায়।
স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরই উন্নয়নকামী দৃঢ় মনোবলের মানুষ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিদেশিদের অর্থ সহায়তা ছাড়াই পদ্মা সেতু নির্মাণ করে দেখিয়ে দিলেন আমরা পারি।
অর্থকণ্ঠ : আপনি একজন সফল শিল্পোদ্যোক্তা, বিজিএমইএর পলিটিক্সে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছেন। আশা করছি, আসন্ন নির্বাচনে আপনার জয় হবে। আপনাদের মধ্যেকার অনেক নেতাই রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন, এমনকি মন্ত্রী মেয়র হয়েছেন- আপনার কোনো ইচ্ছা আছে কি?
ফারুক হাসান : আমি একজন উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী। বিজিএমইএ একটি অরাজনৈতিক ব্যবসায়িক সংগঠন। আমরা দল-মত নির্বিশেষে দেশের এবং উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের স্বার্থে কাজ করি। আমাদের সমস্যাগুলো দূর করে সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবোই। আমি যতদিন বিজিএমইএ-তে আছি ততদিন সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করবো না। তবে সময় সুযোগে যদি রাষ্ট্রের কোনো কাজ করার দায়িত্ব পাই তখন বিবেচনা করব। আমি মনে করি, ব্যবসায়ীরা ব্যক্তি হিসেবে রাজনীতি করবেন; কিন্তু কোনো ট্রেড নেতা হিসেবে নন।



