অর্থনীতিপ্রতিবেদন

এলএনজিতে দেউলিয়াত্বের শঙ্কা পেট্রোবাংলার

অর্থকণ্ঠ ডেস্ক

 

অর্থ জোগানের নিশ্চয়তা নেই। মিলছে না নিয়মিত ভর্তুকিও। এর মধ্যেই এলএনজি খাতের সম্প্রসারণ ঘটছে। বলা হয়েছিল, এলএনজিতে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি দেবে অর্থ বিভাগ। তবে এখন চাহিদা অনুযায়ী ভর্তুকির অর্থ তো মিলছেই না, উল্টো পেট্রোবাংলার হাতে থাকা উদ্বৃত্ত টাকা ফেরত নিচ্ছে অর্থ বিভাগ। ফলে অর্থ সংস্থান নিশ্চিত না হওয়ায় এলএনজি খাতের সম্প্রসারণে চাপে পড়েছে পেট্রোবাংলা। এ পরিস্থিতিতে সংস্থাটি দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে বলে শঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। সম্প্রতি একনেক সভায় এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রীও।

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থ বিভাগ পেট্রোবাংলা ও বিপিসির কাছে থাকা উদ্বৃত্ত টাকা নিচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে স্বশাসিত সংস্থার কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের অংশ হিসেবে পেট্রোবাংলা সরকারের তহবিলে জমা দিয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরও একই পরিমাণ টাকা নেওয়া হয়েছে সংস্থাটির কাছ থেকে। কিন্তু চাহিদার বিপরীতে এলএনজিতে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে না।

এর আগে একনেক সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, ‘অর্থ বিভাগ কর্তৃক পেট্রোবাংলা থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু এলএনজি খাতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে না। এতে অচিরেই দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হবে পেট্রোবাংলার।

সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমানের সভাপতিত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জানান, অর্থ বিভাগের কাছে এলএনজি খাতে ৩ হাজার ৯৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা চাহিদার বিপরীতে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফলে আগামী অর্থবছর এলএনজি খাতে অর্থ পরিশোধে চাপে থাকবে পেট্রোবাংলা। ভর্তুকির জন্য অর্থ বিভাগের কাছে পুনরায় প্রস্তাব পাঠাতে জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব বৈঠকে নির্দেশনা দেন।

জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমান বলেন, গত দুই অর্থবছরে পেট্রোবাংলার কাছ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার মতো নিয়ে গেছে অর্থ বিভাগ। একদিকে আমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যাচ্ছে, আবার কাক্সিক্ষত মাত্রায় ভর্তুকি পাওয়া যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত পেট্রোবাংলা থেকে এলএনজির ভর্তুকির অর্থ আমরা পরিশোধ করে যাচ্ছি। কিন্তু কতদিন তা দেওয়া যাবে সেটি বলা মুশকিল। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামও বাড়তির দিকে। ফলে ভর্তুকির চাহিদাও বাড়ছে।

ভবিষ্যতে পেট্রোবাংলার পক্ষে এ ভর্তুকির অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব নাও হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পেট্রোবাংলার আয়ের উৎস সীমিত। যদিও আমরা গ্যাসের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছি। উৎপাদন বাড়িয়ে প্রতিদিন প্রায় ১১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে করোনা মহামারির প্রভাবে রাজস্ব আহরণও সীমিত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা কতদিন চলে সেটিও এখন ধারণা করা যাচ্ছে না। ফলে অর্থ বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি না পেলে দীর্ঘমেয়াদে পেট্রোবাংলা দায় পরিশোধের ক্ষমতা হারাতে পারে।

প্রাকৃতিক গ্যাসের অনিশ্চয়তায় আমদানিকৃত এলএনজি দিয়ে জ্বালানি সংকট সামাল দিচ্ছে সরকার। এখনো গ্যাসের ঘাটতি প্রায় ৮০ কোটি ঘনফুট। তবে এর মধ্যেও এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কাজ চলছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালের মধ্যে চারটি এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব কেন্দ্রের জ্বালানি চাহিদার বিষয়ে সুপরিকল্পিত রূপরেখা নেই জ্বালানি বিভাগ বা পেট্রোবাংলার কাছে।

এলএনজি-ভিত্তিক এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র যখন অনুমোদন দেওয়া হয়, তখন পরিকল্পনা ছিল দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হবে, দেশীয় গ্যাস উত্তোলন বাড়বে এবং এলএনজি আমদানি বেড়ে যাবে। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তির চার বছর পেরিয়ে গেলেও গ্যাসের বড় ধরনের অনুসন্ধান, এলএনজি আমদানি বাড়ানো যায়নি। কোভিড মহামারিতে এলএনজিতেও অস্থিরতা শুরু হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে বেশক’টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ অনুমোদন দেওয়া হলেও তার জ্বালানি কীভাবে আসবে সে বিষয়ে কোনো চিন্তাভাবনা করা হয়নি। এসব প্রকল্প জ্বালানির নিশ্চয়তা পেয়েই নির্মাণকাজ এগিয়ে নিয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চারটি এলএনজি-ভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানিতে গ্যাস বা এলএনজি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের উল্লেখ থাকলেও এখন আমদানি করা এলএনজি দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার কথা বলা হচ্ছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২২-২৩ সালের শেষ নাগাদ উৎপাদনে যাবে। জ্বালানি হিসেবে এগুলোতে প্রতিদিন ১২-১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস লাগবে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এলএনজি আমদানি কিংবা দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ করার কোনো রূপরেখা নেই জ্বালানি বিভাগ কিংবা পেট্রোবাংলার কাছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, জ্বালানির নিশ্চয়তা পেয়েই আমরা কেন্দ্র নির্মাণকাজ শুরু করেছি। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে চুক্তিও হয়েছে। কেন্দ্র প্রস্তুত করার পর সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করতে না পারলে সে দায় তো সরকারকেই নিতে হবে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী আলী মো. আল-মামুন বলেন, এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোয় গ্যাস সরবরাহসংক্রান্ত বিষয়ে পেট্রোবাংলার সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা এখনো হয়নি। তাছাড়া এগুলো শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে নয়, পুরো শিল্পে আমাদের গ্যাস নিয়ে আমরা প্রজেকশন করব। প্রাথমিক কার্যক্রম চলছে।

জানা গেছে, এলএনজি-ভিত্তিক চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। ব্যক্তি খাত ও রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানাধীন এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি নির্মাণ করা হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে। আরেকটি নির্মিত হচ্ছে খুলনা জেলার রূপসায়। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের চাহিদা ২-৪ কোটি ঘনফুট।

বিদ্যুৎ বিভাগের অনুমোদন নিয়ে নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে ইউনিক গ্রুপ নির্মাণ করছে ইউনিক পাওয়ার মেঘনাঘাট ৫৮৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনে যাওয়ার কথা ২০২২ সালের জুলাই মাসে। ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই কেন্দ্রটি তিতাসের সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দৈনিক প্রায় তিন কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। কিন্তু এ পরিমাণ গ্যাস তিতাস কোত্থেকে সরবরাহ করবে, এখন পর্যন্ত তার কাঠামোগত পরিকল্পনা নেই বলে তিতাস গ্যাসের সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে।

ইউনিক মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য আমরা মোট তিনটি চুক্তি করেছি। যেখানে গ্যাস প্রাপ্তির চুক্তি হয়েছে তিতাসের সঙ্গে। চুক্তি অনুযায়ী আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করব। সেটি কমিশনিং করবে পিডিবি-সংশ্লিষ্টরা। এরপর গ্যাসের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকলে সেটা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ দেখবে। আমাদের এখানে কিছুই করার নেই।

নারায়ণগঞ্জে এলএনজি-চালিত আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে সামিট পাওয়ার। সামিট মেঘনাঘাট-২ নামে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যাবে ২০২২ সালের মার্চ মাসে। ৫৮৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য দৈনিক গ্যাসের প্রয়োজন তিন কোটি ঘনফুট। অন্যদিকে এলএনজি-ভিত্তিক আরেক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে রিলায়েন্স বাংলাদেশ পাওয়ার লিমিটেড। ৭১৮ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে পিডিবি বিদ্যুৎ ক্রয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আগামী বছরের আগস্টে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদনে যাওয়ার কথা। এ কেন্দ্রের জন্য গ্যাস প্রয়োজন ২ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ‘নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড’ খুলনার রূপসায় ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দুটি ইউনিটে বিভক্ত প্রথম ইউনিট উৎপাদনে যাবে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি এবং দ্বিতীয় ইউনিট উৎপাদনে যাবে একই বছরের আগস্ট মাসে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাস প্রয়োজন হবে দৈনিক চার কোটি ঘনফুট। কিন্তু এ গ্যাস কোত্থেকে আসবে তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, গ্যাস নিয়ে যে এমন পরিস্থিতি হবে তা আমরা অনেক আগেই বলেছিলাম। অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভর হয়ে আমরা দেশীয় অনুসন্ধান বা উত্তোলনে কোনো ধরনের কার্যক্রম করতে পারিনি। একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করেছি, কিন্তু তার জ্বালানি কোত্থেকে আসবে সেটা নিয়ে চিন্তা করিনি। যে কারণে আজ এমন বিরূপ পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে।

অর্থকণ্ঠ ডেস্ক

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button