সাক্ষাৎকার

নিজেকে বাংলাদেশের সন্তান হিসেবে ভাবতেই বেশি গর্ব অনুভব করি

লায়লা হারুন প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ আমেরিকান চিলড্রেন অ্যান্ড উইমেন ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন

বিশ্বে অনেক তেজস্বী নারী রয়েছেন যারা পারিবারিক গন্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও ব্যাপ্তি লাভে সক্ষম হয়েছেন- তাদেরই একজন বাংলাদেশি আমেরিকান লায়লা হারুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী লায়লা হারুনের সংসার ও কর্মজীবন নানা অভিজ্ঞতায় বৈচিত্র্যময়। ফ্লোরিডার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে লায়লা হারুন একজন দক্ষ সংগঠক এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব।

লায়লা হারুনের পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামে হলেও পিতার চাকরির সুবাদে জন্ম নরসিংদীতে। তিনি যার সাথে ঘর বেঁধেছেন সহপাঠী সরকার হারুনের বাড়িও নরসিংদীতে। লায়লা হারুনের পাঠ শুরু হয় সিলেটে। তিনি এখানে প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সুযোগ পান। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জেলায় ঘুরে বরিশাল থেকে এসএসসি এবং পটুয়াখালী থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেন। মেধাবী ছাত্রী হিসেবে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পান এবং এসএসসিতে মেধা তালিকায় স্থান লাভ করেন। এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ার সময় সহপাঠী সরকার হারুনের সাথে তিনি প্রেমে জড়ান। ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তারা বিয়ে করেন এবং ১৯৭৮ সালে পশ্চিম জার্মানিতে যান। সেখানে তারা ৬ বছর থেকে দেশে ফিরেন।

লায়লা হারুন ও সরকার হারুন দু’জনেই সাংস্কৃতিকমনা। দেশে কিছুদিন থাকার পর তাদের বন্ধু বাদল এর অনুরোধ ও আগ্রহে তারা ১৯৯৬ সালের অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় চলে আসেন।

উদ্যমী লায়লা হারুন ফ্লোরিডায় এসে বাংলাদেশ কমিউনিটির সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে মুখর রাখতে বেশ কিছু অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেন। তারা ১৯৯৮ সালে ফ্লোরিডায় বাঙালিদের নিয়ে সাড়ম্বরে বিজয় দিবস উদযাপন করেন। অনুষ্ঠানটি সেখানকার বাংলাদেশ কমিউনিটি ও বিদেশিদের কাছে উপভোগ্য হয়। ১৯৯৯ সালে লায়লা হারুন প্রতিষ্ঠা করেন মা ও শিশুদের জন্য সংগঠন ‘বাংলাদেশ আমেরিকান চিলড্রেন অ্যান্ড উইমেন ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, ফ্লোরিডা- ইউএসএ’। 

লায়লা হারুনরা ৬ বোন। তাদের পিতার কথা ছিল- ছেলেরা পড়াশোনা না করলেও চলে; কিন্তু মেয়েদের অবশ্যই শিক্ষাগ্রহণ করা প্রয়োজন। তাঁর কঠোর অনুশাসন ও অনুপ্রেরণাতেই তারা ৬ বোন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। লায়লা হারুন ছোটবেলা থেকেই অনুভব করেন এ সমাজে মেয়েরা উপেক্ষিত, বঞ্চিত এবং অবহেলিত। সেই চিন্তা থেকেই তিনি ফ্লোরিডা ও বাংলাদেশের নারী ও শিশুদের জন্যে গড়ে তোলেন এই প্রতিষ্ঠান। ফ্লোরিডার বিশিষ্ট চিকিৎসক ও সংগঠক ডা. সুলতান সালাহউদ্দিন এ সংগঠনের অন্যতম উপদেষ্টা। লায়লা হারুন শুরু থেকেই সেমিনারসহ ডাক্তারদের নিয়ে কমিউনিটির নারী ও শিশু এবং অন্যদের স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করেন। যেসকল শিশুর মানসিক উন্নয়ন কম, তাদের ব্যাপারে এই সংগঠন নিয়মিত পরামর্শ ও চিকিৎসার উদ্যোগ গ্রহণ করে। শুধু নারীদেরই নয়, এখানে পুরুষদের চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসেবারও ব্যবস্থা নেয়া হয়। এসব কার্যক্রমের সময় শিশুসহ অন্যদের মানসিক উৎকর্ষের জন্যে সাংস্কৃতিক বিনোদনের ব্যবস্থা নেয়া হয়। একই পদ্ধতিতে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে এই প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। দুস্থ মা ও শিশুদের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবার পাশাপাশি আর্থিক সহযোগিতাও করে প্রতিষ্ঠানটি।

লায়লা হারুনের স্বামী সরকার হারুনও একজন দক্ষ সংগঠক। তিনি ফ্লোরিডায় পহেলা বৈশাখ উদযাপন কমিটির উদ্যোক্তা ব্যক্তিত্ব। মহাসমারোহে এখানে বৈশাখী মেলা ও অনুষ্ঠানাদি পালিত হয়। লায়লা হারুন ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই, ফ্লোরিডার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালে ৩১ সদস্যের নতুন কমিটি গঠনে সরকার হারুন ও তার অবদান অনেক।

লায়লা হারুন ফেডারেশন অব বাংলাদেশি এসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা ফোবানার সাথে জড়িত। তিনি ফোবানা সম্মেলনে ফ্লোরিডা কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এখানকার নজরুল গীতি, রবীন্দ্র সংগীত ও সাহিত্য সম্মেলনের উদ্যোক্তা হিসেবেও বিশেষ ভূমিকা পালন করেন এবং অনেকবারই সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফোবানাতে প্রকাশিত স্মরণিকায় প্রায় প্রতিবারই তিনি লেখা দিয়েছেন।

তার পিতা ও চাচার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হালিশহর ট্যালেপ্টেড ক্যাম্পাস স্কুল এবং একটি মাদ্রাসা। তিনি এই স্কুলের অসচ্ছল ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন এবং স্কুল পরিচালকরাও আর্থিক সহযোগিতা দেন।

বাংলাদেশ কমিউনিটির অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠক ব্যক্তিত্ব লায়লা হারুন তার সংগঠনকে সহযোগিতার জন্যে ইউএসএ অবস্থানকারী মানুষকে এভাবেই অনুপ্রাণিত করেন যে, আমেরিকার ১ টাকার সমান বাংলাদেশের ৮০ টাকা। আমরা ইচ্ছে করলেই এই সংগঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অসচ্ছল জনগোষ্ঠীকে সহযোগিতা করতে পারি। দুস্থ ও অসহায়দের মুখে হাসি ফোটাতে পারি। লায়লা হারুন বাংলাদেশ কমিউনিটির নতুন প্রজন্মকে বাঙালি সংস্কৃতির ব্যাপারে আগ্রহী করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে অনুষ্ঠানে শাড়ি পরা, পারস্পরিক বাংলায় কথা বলা। একুশে ফেব্রুয়ারি, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসে তারা নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন। 

তার একটি কাজ যথেষ্ট প্রশংসা লাভ করেছে- সেটি হচ্ছে ফ্লোরিডা বয়েনটাল বিচ হাইস্কুলের মনোগ্রামে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ছবি সংযোজন। স্কুলের সাইনবোর্ডের এই ছবি দেখে দেশি-বিদেশি যে কারো মনেই বাংলাদেশ ও সুন্দরবনের ছবি ভেসে ওঠে। স্কুল প্রতিষ্ঠার মুহূর্তে মনোগ্রাম বিষয়ক জুরি বোর্ডে তিনি এই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ছবি সংযোজনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং তা গৃহীত হয়।

সংস্কৃতি ও সমাজসেবক ব্যক্তিত্ব লায়লা হারুন ও সরকার হারুন দম্পতি দুই কন্যার জনক-জননী। উদ্যমী লায়লা হারুন বলেন, প্রবাসে সব সময় নিজেকে বাংলাদেশের সন্তান হিসেবে ভাবতেই বেশি গর্ব অনুভব করি। 

অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button