প্রতিবেদন

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ঐতিহাসিক উদযাপন

করীম রেজা এ নিবন্ধের লেখক

বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষের উৎসবও পালিত হচ্ছে এ বছরই। আড়ম্বরের আয়োজন সংক্ষিপ্ত করতে হয়েছে অতিমারি কোভিড-১৯ এর ভয়াল থাবার কারণে। স্বাধীনতা যুদ্ধের, মহাসংগ্রামের স্মৃতিবিজড়িত জনগোষ্ঠীর জন্য এ আয়োজন অবিস্মরণীয়। এ উপলক্ষে আমাদের সুযোগ রয়েছে পেছন ফিরে দেখার, বিগত ত্রুটি-বিচ্যুতি বিচার-বিশ্লেষণের। এমন সুযোগ মানবজীবনে, সমাজে সংসারে বার বার আসে না। সুবিবেচনার মাধ্যমে অগ্রসর হতে পারলে সাফল্য অনায়াসেই মুঠোবন্দি করা সম্ভব।

রাজ্য জয়ের অভিযানের দিন গত হয়েছে। অবসান হয়েছে অধীনতাবদ্ধ নিষ্ক্রিয় নাগরিক জীবন যাপনের। স্বাধীন রাষ্ট্রীয় নাগরিক হিসেবে বসবাসের জন্য মানুষ এখন অতীতের মতো প্রশাসনযন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো জীব নয়। দেশের স্বাধীনতার মূল্যকে অর্থবহ করে জীবন ও জগৎ ধারাবাহিক উন্নয়ন সাধন করে। সে উন্নয়ন দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান বস্তুগত অবস্তুগত জাগতিক এবং নৈতিক।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে অর্ধশতাব্দীকাল। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি জাতি গৌরব ও প্রায় আড়ম্বরের সাথে উদযাপন করছে। যদিও শতাব্দীর কঠিন অতিমারি উদ্যোগকে নানাভাবে সীমিত করেছে। আমরা যারা দেশের স্বাধীনতা অর্জন প্রত্যক্ষ করার বিরল সম্মানের অধিকারী হয়েছি তাদের সংখ্যাও দিনে দিনে কমছে। স্বাধীনতা অর্জনে যারা অকুতোভয়, যুদ্ধের ময়দানে আত্মবিসর্জন চেতনায় বলিয়ান হয়ে আগ্রাসী হানাদার পাকিস্তানি সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন তাদের সংখ্যাও কমছে। পঞ্চাশ বছরে স্বাধীনতা অর্জনের এই সময়কালে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে অর্জন-অনার্জন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে, চলছে এবং আরো চলবে। মনে রাখা যায়, বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্মলগ্ন থেকেই গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে নানারকম কুতর্কের সৃষ্টি করে জাতীয় অগ্রগতির পথ অমসৃণ করা হয়েছে; বিপত্তি তৈরি করা হয়েছে। যার ফলে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, আজকের বাংলাদেশ যে অবস্থানে রয়েছে এই বাংলাদেশের এখানে থাকার কথা ছিল না। কথা ছিল আরো অনেক অনেক দূরে এগিয়ে যাবার। যেতে পারেনি। কবি মাইকেল মধুসূদন-এর ভাষায় বলা যায়, বাঙালি ‘অলীক কুনাট্য রঙ্গে’ মজেছিল। আবার এখনকার কথা যদি বিবেচনা করা যায় তাহলে দেখা যাবে- মানুষ দৃশ্যমান অর্জন নিয়ে পাঁচ মুখে দশ কথা বলছে, বলবে। হয়তো বলতেই থাকবে সুবিধাবাদী চরিত্রের মানুষের স্বভাবমতো। যে কোনো অর্জনের পাশাপাশি অনার্জনও থাকে।  সমালোচকের দৃষ্টিতে অর্জন বর্জন বিসর্জন অনার্জন ইত্যাদি নিয়ে সমানভাবে আলোচনা করাই জাতীয় স্বাস্থ্যের জন্য উৎকৃষ্ট, প্রয়োজনীয়। এগিয়ে যাবার দিকনির্দেশনা এই সমালোচনা থেকেই বেরিয়ে আসবে। আমরা বিশ্ব সভ্যতার প্রেক্ষাপটে দেখতে পাই বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে  অনেক অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। জাতিসংঘের বৈশ্বিক তুলনামূলক উন্নয়ন সূচকে যার প্রতিফলন প্রতিনিয়ত উপরের দিকে যাচ্ছে। দুর্মুখেরা কুতর্কের সূচনা করে কোন কোন ক্ষেত্রে উন্নয়ন হয়নি এই প্রশ্ন তুলে। কিন্তু যে সকল ক্ষেত্রে উন্নয়ন  হয়েছে তা যে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। দেখা যায়- কখনো কখনো প্রবল বিরোধিতাকারী শক্তিও নেতি নেতি করেও স্বীকার করতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশ এগিয়েছে। প-িত বলেন- ‘গতস্য শোচনা নাস্তি।’ এই আপ্তবাক্যটি সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলেই মনে হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা পর্যবেক্ষণ না করলে, ইতিহাসের সত্য আড়ালে থেকে যায়। মূলত আত্মসমালোচনা, অতীতের ভুল ত্রুটি-বিচ্যুতি পর্যালোচনা সামনে এগিয়ে যাওয়ার ভিত্তি। হ্যাঁ নিঃসন্দেহে বলা যায়, স্বাধীনতার অন্যতম আকাক্সক্ষা ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের, সর্বক্ষেত্রে জবাবদিহিতা চর্চার। সমাজে সততা, দেশপ্রেম চর্চা ও প্রতিষ্ঠা পাবে এই ছিল সাধারণ মানুষ তথা সমগ্র দেশবাসীর অন্যতম নয় প্রধানতম আকাক্সক্ষা। দেখা যায় এইসব প্রসঙ্গেও আলোচনায় সবাই নেতিবাচক বিষয়গুলো আড়ালে রেখে গা বাঁচিয়ে কথা বলেন, বলেছেন এবং হয়তো আরও বলবেন। আমরা তার বিপরীতে সমাজে অগ্রগতির অন্তরায় তৈরি করেছে এমন দুই-একটি বিষয়ে সামান্য দৃষ্টি দেওয়ার চেষ্টা করব।

এদেশের জনআকাক্সক্ষার সমান্তরালে একটি ন্যায়ের সমাজ প্রতিষ্ঠায় আমরা এগোতে পারিনি। রাষ্ট্রযন্ত্র যাদের মাধ্যমে যাদেরকে অবলম্বন করে পরিচালিত হয় সেই আমলা সমাজ ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী ও দুর্নীতিপরায়ণ হয়েছে। আজকে বাংলাদেশ যে অবস্থানে পৌঁছতে পেরেছে তা আরও অনেক আগেই সম্ভব ছিল। অন্য যে সব সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে ওইসব ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অতি দ্রুতই সর্বোচ্চ অবস্থানের দিকে যেতে পারত। সম্ভব হয়নি দুষ্ট দেশপ্রেমহীন চিন্তা চেতনার ধারক, আত্ম-স্বার্থ-পরায়ণ কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনযন্ত্রের উচ্চাভিলাসের কারণে। যার ফলে দেখা যায়- সাধারণ মানুষের মনে ছায়া ফেলেছে একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার বর্তমানে কার্যকর- এই ধারণায়। প্রায় ক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পাই- জনআকাক্সক্ষার বিপরীতে সরকারকে কৌশলে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। রাষ্ট্র জনগণের কল্যাণের জন্য, জনগণের সুবিধার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, আইন প্রণয়ন করে, প্রয়োগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়, প্রশাসনযন্ত্রের মাধ্যমে। সেই পুরনো প্রচলিত বাংলা আপ্ত বাক্যটি আবার  চোখের সামনে উপস্থিত হয়, ‘সরিষা ভূত ছাড়াবে কিন্তু সরিষার ভূত কে ছাড়াবে?’ আমরা করোনাপীড়িত এই দুঃসময়ে প্রশাসনযন্ত্রের নির্মমতা, জাতীয় কল্যাণ নানা অজুহাতে অবহেলা করা, চরম দুর্নীতির বহি:প্রকাশ আরও অনেক কিছু বেরিয়ে এসেছে সংবাদমাধ্যমে।

বালিশ কা-, পর্দা কা-, সেতু কা-, ফ্লাইওভার কা-, মাস্ক কা-, ওষুধ কা-, ক্যাসিনো কা-, টেন্ডার কা- প্রভৃতি। এইরূপ আরও কত অপ্রকাশিত কা- আছে, কোনোদিন হয়তো আর জানা যাবেই না। এই প্রকাশিত সব কা-ের সঙ্গে জড়িত অসম্ভব রকমের অপরাধ, অপরাধীর বিস্তৃত বিবরণ জেনে জাতি হতাশাগ্রস্ত। যে সব ক্ষেত্রে নীরবে উন্নয়ন সাধিত হয়েছে সেই ক্ষেত্রে যারা নিয়ামক তাদেরকে পুরস্কৃত করা হয়েছে এমন সংবাদ কিন্তু সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়নি।

কৃষিক্ষেত্রে, গবাদিপশু উন্নয়নের ক্ষেত্রে, দেশি-বিদেশি ফল, মৎস্য উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্যের কোনও অংশের উন্নয়নে যারা নিবেদিতভাবে কাজ করছে তাদেরকে জনসম্মুখে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়নি। বরং প্রশাসনের নানা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ তাদের নিজস্ব নৈতিক-অনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করেছেন আমৃত্যু। অবসর নেওয়ার পরেও।  ইত্যাদি বিষয় কখনোই জাতীয় অগ্রগতির জন্য শুভ লক্ষণ নয়।

এ সবের আশু সমাধান দরকার। জবাবদিহিতার  আওতায় আনা দরকার সর্বস্তরের কর্মকর্তা- কর্মচারীদের সব রকমের আচরণ। তা করতে গিয়ে যদি কম্বলের লোম বাছতে কম্বল হারিয়ে যায় তাতেও বোধ করি সুদূর ভবিষ্যতে লাভের পরিমাণ বাড়বে।

শিক্ষাক্ষেত্রে, যোগাযোগের ক্ষেত্রে যে নৈরাজ্য তা ভাষায় অবর্ণনীয়। প-িত প-িত সব দিগগজদের নানা রকম নিদানের খবর আমরা প্রতিনিয়ত পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জানি কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তা শুধু বাগাড়ম্বর মাত্র।

বর্তমানে দেশ পরিচালনার চালক হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল। একটি পক্ষ দলের সমর্থক, আর একটি পক্ষ বিরোধিতাকারী।  এই দুই পক্ষের মাঝেও রয়েছে বিপুল জনসংখ্যা, যারা সরাসরি কোনো দলের ধ্বজাধারী না হয়েও স্বাধীনতাকামী, স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষাকারী দলের প্রতি যুক্তিসঙ্গতভাবে নীরব সমর্থন যুগিয়ে আসছে। সমর্থনকারীদের আকাক্সক্ষার বিপরীতে যখন রাজনৈতিক দলের কর্মকা- পরিচালিত হয় তখন সবচেয়ে বেশি দুরবস্থা এবং হতাশার মধ্যে এই জনগোষ্ঠীকে মানসিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে চলতে হয়। কেননা এরা কখনোই বিরোধিতা করে বলে অন্য কোনো বিরোধীদলের ছায়াতলে মাথা দিতে পারে না বা দেয় না।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি আমরা আরও ২৫ বছর আগেও করতে পারতাম, পারিনি। জাতি আশা করে, আশা করবে ভবিষ্যতে গৌরবের সঙ্গে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক উদযাপন হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ, কবি ও কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button