এনামুল হক এনাম
সাফল্য ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ‘ওয়ালটন’। এক সময় ‘ওয়ালটন’ পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ‘আরএবি গ্রুপ’। এখন গ্রুপের নাম হয়েছে ‘ওয়ালটন গ্রুপ’। ওয়ালটন বাংলাদেশের শিল্পায়নের ইতিহাসকে অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে। দেশের শিল্পায়নের ধারায় নিয়ে এসেছে এক মাইলফলক।
দেশখ্যাত ওয়ালটন গ্রুপের যাত্রা শুরু ১৯৭৭ সালে। এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব এস এম নজরুল ইসলাম। তিনি ছিলেন জাত ব্যবসায়ী। ব্রিটিশ আমল থেকেই তিনি ব্যবসা করতেন। নিজ গ্রামে গড়ে তুলেছিলেন ডেইরি ফার্ম। কর্ণফুলী পেপার মিলে ঠিকাদারিও করেছেন। টাঙ্গাইল শহরের আদালত রোডে টিনের ব্যবসা পরিচালনা করতেন। এ ব্যবসায় মন্দা দেখা দিলে তিনি ‘ট্রাইকন’ টিভি বাজারজাত করার ব্যবসায় সম্পৃক্ত হন। এরই এক পর্যায়ে ১৯৭৭ সালে ওয়ালটন টিভি বাজারজাত শুরু করেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন আরএবি গ্রুপ।
বিশিষ্ট উদ্যোক্তা এস এম নজরুল ইসলামের বিশ্বাস ছিল- দেশেই এ ধরনের ইলেক্ট্রনিক ও ইলেক্ট্রিক্যাল পণ্য উৎপাদন সম্ভব। তাঁর এই উদ্যোগকে কার্যকর করতে সক্রিয় ভ‚মিকা রাখেন ওয়ালটনের ভাইস চেয়ারম্যান তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র এস এম নূরুল আলম রেজভীসহ তাঁর ৫ পুত্র। সেই শুরু ওয়ালটনের ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য সামগ্রী উৎপাদন- যা আজ শুধু দেশেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।
ওয়ালটন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এস এম নজরুল ইসলাম যখন ইলেক্ট্রনিকস পণ্যের ব্যবসা শুরু করেন তখন এই শিল্প গ্রুপের নাম ছিল ‘আরএবি গ্রুপ’। পরবর্তীতে এটি ‘ওয়ালটন গ্রুপ’ নামে যাত্রা শুরু করে। এ গ্রুপের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন স্বপ্নদর্শী তারকা শিল্পপতি এস এম নূরুল আলম রেজভী। তার যাদুকরী হাতের ছোঁয়ায় ওয়ালটন পণ্যসামগ্রী শুধু শহরে নয়- দেশের আনাচে কানাচে বিস্তৃতি ঘটেছে। ‘ওয়ালটন’ এই ব্র্যান্ড নামটির নাম জানে না এমন কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। একটি ব্র্যান্ড পণ্য যে একটি শিল্প গ্রুপ ও উদ্যোক্তা পরিবারকে আকাশচুম্বী খ্যাতি এনে দিতে পারে তার বড় উদাহরণ এই ওয়ালটন।
ওয়ালটন এই ব্র্যান্ড নামটি এখন দেশের গর্ব। এই শিল্প গ্রুপের সাফল্যের পেছনে যে উদ্যোক্তার অবদান অনস্বীকার্য তিনি এস এম নূরুল আলম রেজভী, বর্তমানে এই গ্রুপের দক্ষ চেয়ারম্যান। তারুণ্যে উদ্দীপ্ত এই শিল্পোদ্যোক্তার একান্ত প্রচেষ্টা, মেধাবী অনুশীলন এবং গভীর আত্মপ্রত্যয়ের ফলেই ওয়ালটন-এর ব্যবসায়িক সাফল্য আজ শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসতে সক্ষম হয়েছে। এতো সাফল্য সত্তে ও এই উদ্যোক্তা ব্যক্তিত্বের মধ্যে সামান্যতম অহংবোধ নেই। বরং প্রচারণা বিমুখ নিভৃতচারী এই মানুষটি প্রমাণ করে দিয়েছেন দেশখ্যাত শিল্পপতি হবার জন্যে বিশাল শিল্প পরিবারের সন্তান হবার প্রয়োজন নেই; সঠিক ও পরিকল্পিত পথে সততা ও নিষ্ঠার সাথে পরিশ্রম করলে সাফল্যের সোনার হরিণের দেখা মিলবেই।
সময়ের আলোকিত উদ্যোক্তা এস এম নূরুল আলম রেজভীর জন্ম ১৯৫৪ সালের ১৪ জানুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার সদর থানাধীন গোসাই জোয়াইর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত ব্যবসায়ী পরিবারে। তার পিতা মরহুম আলহাজ্ব এস এম নজরুল ইসলাম। তিনি ছিলেন সময়ের প্রাগ্রসর একজন মানুষ। তিনি টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক ও ভ‚মি বন্ধকী ব্যাংকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি প্রথমে আরএবি গ্রুপ ও পরে ওয়ালটন গ্রুপের চেয়ারম্যান ছিলেন। মা মোসাম্মৎ নূরজাহান ইসলাম একজন মমতাময়ী রত্নগর্ভা জননী যিনি তাঁর ৫ ছেলে ও ২ মেয়ের সকলকেই শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন। আলহাজ্ব নুরুল আলম রেজভী জানান, তার এবং ভাইদের প্রতিষ্ঠার পেছনে বাবার পাশাপাশি মায়ের অবদানও অনেক।
এস এম নূরুল আলম ছাত্র হিসেবে ছিলেন বেশ মেধাবী। পিতার জ্যেষ্ঠ সন্তান হবার সুবাদে ছাত্রজীবন থেকেই তিনি পরিবারের প্রতি ছিলেন অধিক দায়িত্বশীল। পড়াশোনার ফাঁকে তিনি পিতার ব্যবসায়িক কার্যক্রমে সহযোগিতা করতেন। কারিগরি মহাবিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নেওয়ার পর ১৯৯৮ সালে তিনি সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনা শেষে তিনি পুরোপুরিভাবে পিতার ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। শুরু হয় পিতা-পুত্রের ব্যবসায়িক অধ্যবসায়। সততা ও নিষ্ঠার সাথে ব্যবসা পরিচালনার ফলে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বেশ সুনাম অর্জন করেন রেজভী। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত টাঙ্গাইল আদালত পাড়ায় ঢেউ টিনের দোকানটি ছিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। ১৯৯৩ সালে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন আরএবি ডেইরি কমপ্লেক্স লিমিটেড যা এখন টাঙ্গাইল জেলার শীর্ষস্থানীয় ডেইরি ফার্ম।
দূরদর্শী উদ্যোক্তা ব্যক্তিত্ব নূরুল আলম রেজভী শুধুমাত্র টিনের ব্যবসায় নিজেদের সম্পৃক্ত না রেখে মানুষের চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে চীন থেকে ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী আমদানির উদ্যোগ নেন। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে চীন থেকে আমদানিকৃত ওয়ালটন টিভি, ফ্রিজসহ অন্যান্য সামগ্রী বাজারের অন্যান্য পণ্যের চেয়ে কম মূল্যে ও টেকসই হবার সুবাদে দ্রুত ব্যাপক বাজার লাভ করতে সক্ষম হয়।
এক পর্যায়ে দেশপ্রেমিক উদ্যোক্তা ব্যক্তিত্ব নূরুল আলম রেজভী ভাবলেন, এভাবে বিদেশি পণ্য আমদানি করার মাধ্যমে দেশ দু’দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে না, কর্মসংস্থান হচ্ছে না; আর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। এই চিন্তা থেকেই তিনি চীনের উন্নত প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সহায়তা নিয়ে দেশের মানুষের চাহিদা মোতাবেক পণ্য উৎপাদনের জন্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন ওয়ালটন শিল্প পার্ক। ঢাকার অদূরে গাজীপুরের চন্দ্রায় ওয়ালটন শিল্প কারখানা থেকে তৈরি হচ্ছে- ওয়ালটন ফ্রিজ, টিভি, মোটরসাইকেল, এসি, মোবাইল ফোন সেটসহ আরও অনেক ধরনের গৃহস্থালি পণ্যসামগ্রী।
সময়ের দেশখ্যাত কৃতী ও উদ্যমী শিল্পোদ্যোক্তা এস এম নূরুল আলম রেজভীর দু’চোখ ভরা শুধু স্বপ্ন আর স্বপ্ন। তার মননশীল চিন্তায় এখন একটি গাড়ি ইন্ডাস্ট্রি করার স্বপ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। আশা করা যায়, এই উদ্যমী উদ্যোক্তার হাত ধরে ডিজিটাল বাংলাদেশেও একদিন গড়ে উঠবে গাড়ি শিল্প কারখানা। আমরা সেই শুভ দিনের অপেক্ষায় রইলাম।


