অর্থনীতিপ্রতিবেদন

বিনিয়োগ বিকাশ : সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি

বোরহান উদ্দিন

 

বোরহান উদ্দিন

 

বিনিয়োগ হচ্ছে উন্নয়নের চাবিকাঠি। বিনিয়োগের ফলে দেশজ উৎপাদন বাড়ে, কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয় এবং দারিদ্র্যের হার হ্রাস পায়; মানুষের জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি বাড়ে। বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুবাদেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে।

শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে শিক্ষার হার এবং দক্ষ জনশক্তির হার বেড়েছে। যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগের হার বৃদ্ধির ফলে যাতায়াত ব্যবস্থায় গতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে। এক কথায়, বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে নজিরবিহীন উন্নতি ঘটেছে এবং বিশে^র মধ্যে উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশ হিসেবে সুনাম অর্জন করেছে। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিনিয়োগের ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। এ-সব বিনিয়োগের মধ্যে রয়েছে সরকারি বিনিয়োগ, বেসরকারি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ। বৈদেশিক বিনিয়োগের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতই রয়েছে। এখনো বাংলাদেশ বেসরকারি বিনিয়োগের উপরই অধিকতর নির্ভরশীল।

বিদ্যুৎখাতে বিনিয়োগ করে সরকার অভাবিত সাফল্য অর্জন করেছে। বিদ্যুৎখাত হচ্ছে মানব দেহের ধমনীর মতো, যার মাধ্যমে পুরো দেহে রক্ত সঞ্চালিত হয়। কৃষি, শিল্পসহ প্রতিটি খাতেই রয়েছে বিদ্যুতের ব্যবহার। সরকার ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দিয়েছে। ফলে গ্রামেও সৃষ্টি হয়েছে উৎপাদন বিপ্লব। উন্নত পুঁজি, শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। এর ফলে কৃষকের জমিতে গরু টানা লাঙলের পরির্বতে প্রবেশ করেছে কলের লাঙল বা পাওয়ার টিলার। এতে যেমন দক্ষ শ্রমের সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার দশটি উদ্যোগের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি বাড়ি একটি খামার, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, আশ্রয়ণ প্রকল্প, ডিজিটাল বাংলাদেশ, শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি, নারীর ক্ষমতায়ন, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, কমিউনিটি ক্লিনিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, বিনিয়োগ বিকাশ এবং পরিবেশ সুরক্ষা। কর্মসূচিগুলো একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। এগুলো বাস্তবায়নের ফলে দেশের উন্নয়নের চেহারা বদলে গিয়েছে এবং জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশের মধ্যে হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। অগনিত মানুষ নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরে এসে গিয়েছে। এর মূলে রয়েছে সরকারি বিনিয়োগ। আসলে সরকারের উন্নয়নের রূপরেখা তৃণমূল থেকে নগর পর্যন্ত বিস্তৃত। একটি বাড়ি একটি খামারের ধারণার মূলে রয়েছে হতদরিদ্র মানুষকে কর্মের সঙ্গে যুক্ত করা এবং তাদের কৃষি উৎপাদনের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা। প্রাথমিকভাবে সরকারের কর্মসূচি সফল হয়েছে। একটি দেশের সুষম উন্নয়নের জন্য যেমন বড় বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ প্রয়োজন, তেমন প্রয়োজন ছোট-খাটো বিনিয়োগ। তাই বলা যায়, একটি বাড়ি একটি খামার হচ্ছে একটি সুবিবেচনা-প্রসূত কর্মসূচি। 

প্রতিটি কর্মসূচি বাস্তাবায়নের জন্য দরকার বিনিয়োগ। সরকার বিনিয়োগ করে জনস্বার্থে, মুনাফা করা মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, বরং বিনিয়োগের অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। এই সরকার জনস্বার্থে নিজস্ব তহবিল থেকে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য বিনিয়োগ করেছে বিপুল অর্থ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশজ উৎপাদন প্রায়-১.৮ শতাংশ বেড়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্যই জাতীয় সঞ্চয়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। জাতীয় সঞ্চয় কাক্সিক্ষত হারে বাড়েনি। উন্নত দেশগুলোতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার অনেক বেশি।

সাময়িক হিসাবে দেশে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিনিয়োগ বেড়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বিনিয়োগের হার ছিল জিডিপির ৩১.৫৭ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে জিডিপির ৩১.৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল ২৩.৬৩ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ছিল ৮.১২ শতাংশ। গত এক দশকে সরকার বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। তাতে সরকার সফলও হয়েছে। এর মূলে রয়েছে বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন, আইন ও বিধির সংস্কার ইত্যাদি। বিনিয়োগকারীদের নির্বিঘ্ন দ্রুত সেবা প্রদানের জন্য জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইন-২০১৮। ইতোমধ্যে তা কার্যকর হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের একই অফিস থেকে সেবা প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলকে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের আওতায় নয় ধরনের সেবা প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে অনলাইনের মাধ্যমে। এ-সব কর্ম প্রক্রিয়া বিনিয়োগ উদ্যোগকে গতিশীল করেছে। ফলে দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। 

কোভিড-১৯ এর বৈশি^ক দুর্যোগের সময়ে সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক ঝুঁকিকে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। যেখানে বিশে^র বিভিন্ন উন্নত দেশ বৈশি^ক মহামারির প্রথম তরঙ্গে দেশজ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির দিকে গিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এ থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশ বিনিয়োগের শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৭.১১ এবং ৭.২৮ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭.৮৬ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির হার আট শতাংশ ছাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮.১৫ শতাংশ। এর পরই এসেছে বৈশি^ক মহামারির কোভিড-১৯ এর প্রবল আঘাত। এই আঘাতে উন্নত দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক। এই দুর্যোগের সময়েও বাংলাদেশে জিডিপির ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি হার হয়েছে ৫.২৪ শতাংশ। সরকার করোনাভাইরাস মহামারির সময়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য-সেবাখাতে অতিরিক্ত ব্যয়, মানবিক সহায়তা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ১.২ লক্ষ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।

উৎপাদনখাতে সহায়তা প্রদানের মধ্যে রয়েছে রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ তহবিল, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান ও সেবাখাতের প্রতিষ্ঠানের জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের সুবিধা প্রদান, কৃষিখাতের জন্য বিভিন্ন তহবিল গঠন ইত্যাদি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসচ্ছল মানুষকে মানবিক সহায়তা প্রদান ছাড়াও কৃষি ও শিল্পখাতে বিপুল  অঙ্কের অর্থ সহায়তা দিয়েছেন, যাতে দেশের সার্বিক উৎপাদন ব্যবস্থা সহনীয়ভাবে সচল করা সম্ভব হয়। শিল্পোদ্যোক্তা এবং কৃষকরা অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলা করেছেন। এই জন্য সরকারের পক্ষে মহাদুর্যোগের সময়েও জিডিপির প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের মাথাপিছু আয় বেড়ে হয়েছে ১,৯৭০ ইউএস ডলার যা পূর্ববর্তী বছরের ছিল ১,৮২৮ ডলার। সরকারের পক্ষে বিনিয়োগের নীতিমালাগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়েছে বলেই উন্নয়নের এই গতি অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে।

প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি) ফিচার

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button