প্রতিবেদন

‘তাসফিয়া ফাউন্ডেশন’ নাটোরে অসচ্ছল ও অসহায় মানুষদের সহায়তা দিয়ে থাকে

অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক

আনিস রহমান

রিয়েল এস্টেট খাতের সফল ব্যবসায়ী

বাংলাদেশের বহু প্রতিভাবান উদ্যমী ব্যক্তিত্ব আমেরিকার মূলধারায় খ্যাতিমান ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভে সক্ষম হয়ে মাতৃভূমির ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছেন, তাদের একজন ক্যালিফোর্নিয়ার Downey এলাকার আনিস রহমান। এই বিশিষ্ট রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর জন্ম বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ার কুবপাড়া গ্রামের বিখ্যাত কাজী পরিবারে, ১৯৬২ সালের ২৬ এপ্রিল। তার পিতা মরহুম কাজী আব্দুস সালাম আবহাওয়া অধিদপ্তরে চাকরি করতেন। পাশাপাশি তিনি হোমিও চিকিৎসক হিসেবেও প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। সে সুবাদে তারা থাকতেন ঢাকার শেরে বাংলানগরে সরকারি কোয়ার্টারে। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ও দুরন্ত আনিস রহমান ১৯৭৯ সালে শেরে বাংলানগর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৮১ সালে সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকা কলেজে অনার্সে ভর্তি হন।

স্বপ্নদর্শী আনিস রহমান ছাত্রাবস্থাতেই ১৯৮২ সালে রাজধানী ঢাকার তৎকালীন একমাত্র ফাইভস্টার হোটেল ‘ইন্টারকন্টিনেন্টালে’ রীতিমতো ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি নেন। ৪ মাস ২০ দিন চাকরি করার পর চলে যান বাহরাইনে। সেখানে তিনি আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ‘Holy Day In’ এ চাকরি নেন। এখানে তিনি ৪ বছর দায়িত্ব পালনের পর ১৯৮৭ সালে দেশে ফিরেন। দেশে ফিরেই অনেকটা পড়াশোনাহীন অবস্থায় ডিগ্রি পরীক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নেন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে হরতাল প্রদান মুহূর্তেই তিনি ঘরে বসে পড়াশোনা করে পরীক্ষা দেন এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন।

এরপর তিনি ১৯৮৮ সালে নিটল মটরস-এ সেলস এক্সিকিউটিভ পদে যোগদান করেন। তার দায়িত্বশীল কর্মতৎপরতায় নিটল মটরসের ব্যবসা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি মোটর সাইকেল চালিয়ে মার্কেটিং এর জন্যে প্রচুর পরিশ্রম করেন। ১৯৮৮ সালে বন্যা মুহূর্তে কাজের ফাঁকে তিনি বন্ধুদের নিয়ে বন্যাদুর্গতদের জন্যে ৩টি ত্রাণ শিবির খোলেন এবং বিভিন্ন জনের সহায়তা নিয়ে দুর্গতদের ব্যাপক সহায়তা করেন। এ সময় তিনি আমেরিকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং সিনিয়র বন্ধু মোশাররফসহ ‘ওয়ার্ল্ড ট্যুর’ এর প্রস্তুতি নেন। এ জন্যে তারা স্লোগান হিসেবে ‘ড্রাগবিরোধী’ কার্যক্রমের প্রচারণাকে বেছে নেন। ১৯৮৯ সালে তারা দু’জন কলকাতা-দিল্লি হয়ে পাকিস্তান পর্যন্ত এসে দেশে ফিরতে বাধ্য হন।

এরপর আবার মোশাররফসহ আনিস রহমান বিশ্বভ্রমণের মাধ্যমে ইউএসএ যাবার উদ্যোগ নেন। এ যাত্রায় নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ভারত-পাকিস্তান হয়ে ১৯৮৯ সালে গ্রীসের এথেন্সে এসে পৌঁছান। সেটি ছিল খুব কঠিন ও কষ্টকর সময়। রাত কাটাতেন সেন্ট্রাল পার্কে। ড্রাগ সচেতনতা বিষয়ে বাংলাদেশ থেকে দুই তরুণ বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছে শুনে বাংলাদেশ অ্যাম্বেসির লোকেরা সহমর্মিতা তো প্রদর্শন করেইনি বরং তাচ্ছিল্য করেছে। তারা এখান থেকে আসেন যুগোস্লাভিয়ায়। ঘুমাতেন রেলস্টেশনে। অনেক কষ্টে এখান থেকে অস্ট্রিয়ায় আসেন। কষ্টকর এই যাত্রায় সেখানকার বাংলাদেশিরা তাদের বেশ আতিথ্য করে। মোশাররফের বন্ধু মোহসিন তাকে একটি কাজের সুযোগ করে দেন সংবাদপত্র বিক্রির অর্থাৎ হকারি। দিনে ১ ডলার পেতেন। এখান থেকে আনিস রহমানরা আসেন জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে। বাংলাদেশি কেউ কেউ তাদেরকে জার্মানে ‘অ্যাসাইলাম’এর মাধ্যমে থাকার পরামর্শ দেন। কিন্তু আনিস দৃঢ় মনোবল- স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় পৌঁছুবেনই। এখান থেকে তারা নেদারল্যান্ডসের আর্মস্টারডামে আসেন। তিনি উর্দু জানতেন বলে এক পাকিস্তানির সাথে থাকার সুযোগ পান। ১ বেডরুমের সেই বাসাটা তখন তার কাছে স্বর্গ মনে হয়েছিল। কারণ, ‘হোমলেস সিটিজেন’ হিসেবে তার অভিজ্ঞতা ছিল দিনের পর দিন বিভিন্ন দেশে পার্কের বেঞ্চিতে, রেলস্টেশনে ঘুমোতে হয়েছে। চলার পথে অনেক কিছুই শিখেছেন আনিস। এখানে একজন তাকে বললো, ‘একজন ছেলে আরেকজন ছেলের সঙ্গী হতে পারে না’। এখানে তিনি আর মোশাররফ আলাদা হয়ে যান।

কষ্টকর ও রোমাঞ্চকর এই কঠিন যাত্রায় আনিস রহমানের দৃঢ় মনোবল তাকে প্রতি মুহূর্তেই সাফল্যের বাতায়ন দেখার সাহস যুগিয়েছে। নেদারল্যান্ডসের ইউএসএ অ্যামবেসি মোশাররফের ভিসা দিলেও আনিসের ভিসা হয় না। বরং তার পাসপোর্টে ‘রিফিউজড’ সিল লাগিয়ে দেয়। আনিসের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তখন তিনি এক বাংলাদেশির সহযোগিতা পান। ওই ভদ্রলোক একটি বিশেষ যন্ত্র দিয়ে ‘রিফিউজড’ বা নো ভিসার সিলটা তুলে দেয় এবং সেই তোলার দাগ যাতে বুঝা না যায় সেখানে ক্যামেরা এবং হাতঘড়ি সঙ্গে আছে লিখে দেন। এরপর সেই পাসপোর্ট নিয়ে তিনি বাংলাদেশি কনস্যুলেট অফিস-কোপেনহেগেনে যান। এক বয়স্ক ভদ্রলোক ছিলেন কনস্যুলার। তিনি তার কাগজপত্র দেখে কথা বলে নিয়ম অনুযায়ী তাকে রিকমেন্ড করে দেন। সেসব ডাকে পরদিন তার দেওয়া ঠিকানায় চলে আসে। এগুলো নিয়ে তিনি সেদিনই ইউএসএ অ্যামবেসিতে জমা দেন। এবার তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। ১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে তিনি নিউ ইয়র্ক অর্থাৎ স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় এসে পৌঁছান।

এখানে পৌঁছে তিনি তার বন্ধু জোবায়েরের ভাই সিলেটি জোসেফের বাসায় উপস্থিত হন। ৩/৪ দিন এ বাসায় থাকেন। প্রথম দিনটি বিনা মজুরিতে জোসেফের বোন পিয়ারার হাসব্যান্ডের গ্রোসারি স্টোর-এর ফার্নিচার সাজানোর কাজ করেন। জোসেফ তাকে ১টি কম্বল ও ১টি টাওয়েল কিনে দেন। একটি রুম ঠিক করে দেন সেখানে আনিস তার ক্লাসমেটকে পান। একটি রেস্টুরেন্টে রাতের কাজ জুটিয়ে দেন- যেহেতু তার নামে ওয়ার্ক পারমিট ছিল না সে ক্ষেত্রে জোসেফের কাজিন লস্করের নামেই তিনি রেস্টুরেন্টে কাজ পান। তাকে ওই সময় সবাই ‘লস্কর’ নামে ডাকতেন। ৭/৮ মাস পর তিনি চেষ্টা করলেন রাতের কাজ ছেড়ে দেওয়ার।

ম্যানহাটনে তিনি যেখানে কাজ করতেন ১৮ ব্লক পাড়ি দিয়ে শীতের মধ্যে যেতে হতো- ঠান্ডায় নাক দিয়ে পানি ঝরতো। ম্যানহাটনে তিনি অনেক রেস্টুরেন্টে ও অন্যান্য সম্ভাব্য স্থানে চাকরির চেষ্টা করেছেন; কিন্তু কোনো চাকরি পাননি কারণ, তিনি শাদা চামড়ার নন। এ পর্যায়ে তিনি জানতেন ক্যালিফোর্নিয়ায় কাগজপত্র করার সুযোগ আছে। তিনি বাসে ক্যালিফোর্নিয়া যাবার সিদ্ধান্ত নেন, কারণ বাসে ৬৮ ডলার লাগে আর প্লেনে ৩৫০ ডলার। সে এক কঠিন যাত্রা। ৩ দিনে ১৪টি বাস স্টপেজে বাস বদলাতে হয়েছে। এখানে মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হয়, আলপাসো মেক্সিকোর বর্ডার, এখানে বাসে চেকিং হয় যে কোনো মেক্সিকান ঢুকছে কি-না? আর কোনো যাত্রীকে না নামিয়ে আনিসকে তারা নামিয়ে নেয় এবং দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর এক পর্যায়ে ছেড়ে দেয়। পরবর্তী বাসে গিয়ে তিনি সহযাত্রীদের পরের স্টপেজে পান।

ক্যালিফোর্নিয়ার আবহাওয়া এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা তার ভালো লেগে যায়- শুরুতে ড্রাইভিং লাইসেন্স করে গাড়ি চালালেও তিনি যেহেতু রেস্টুরেন্টের কাজে অভিজ্ঞ সে অনুযায়ী কাজের চেষ্টা করেন। কিন্তু না পেয়ে ম্যাসেঞ্জারের কাজ, এরপর বাড়ির গার্ডেনের কাজ, গ্যাস স্টেশনের কাজ ও ইন্স্যুরেন্স এজেন্টের কাজ করেন। মুদির দোকানেও কাজ করেন তিনি। ১৯৯৩ সালে দেশে ফিরে বিয়ের জন্য তার মা তাকে ‘সিকিউরিটি অফিসার’ এর পরিচয় দিলেও আনিস অকপটে বলেন- আমি নাইট গার্ডের চাকরি করি। তখনো গ্রীন কার্ড হয়নি। বিয়ের দু’বছর পর স্ত্রীকে আমেরিকা নেন। বিয়ের পরই তার ভাগ্য খুলে যায়। ইলেক্ট্রনিকস দোকানে সেলসম্যানের কাজ করে বেতন ও কমিশনসহ সপ্তাহে ৫০০ ডলারের বেশি আসতে থাকলো। প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হবার সময় ম্যানেজার বললেন যেখানেই কাজ করবে- Be a Key person। তার এই কথা মাথায় নিয়ে কাজ করেন। যোগদান করেন সার্কিট সিটিতে, ১৯৯৬ সালে তার বৈধ কাগজপত্র হলো। অন্য শহরে সাউথ ইস্টে ‘রিয়েল এস্টেট’ এর কাজ করেন। ৬ মাস কোনো ইনকাম নেই জমানো টাকা শেষ হতে থাকে রিয়েল এস্টেট এর পাশাপাশি গাড়ির শোরুমের কাজ করেন। ২০০৫ সালে তিনি একটি কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে ২,২০,০০০ ডলার পান। তার ইউএসএ জীবনের বাঁক বদল ঘটে। তিনি সে সময় ৭০,০০০ ডলার দিয়ে Lexas-458 ক্রয় করেন। তিনি রিয়েল এস্টেট বিজনেস খাতের বিশিষ্ট রিয়েলটর। এখনও তিনি প্রতিদিন ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পরিশ্রম করেন।

বর্তমানে তিনি নিজস্ব ২৫/৩০টি বাড়িভাড়া ছাড়াও ১৬০টি বাড়ির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছেন। সেখান থেকে ৭% করে কমিশন পান, এটা তার আয়ের ৮০%। জমি ক্রয়/বিক্রয় ব্যবসা তো আছেই। এছাড়া তার ফুড ব্যবসাও রয়েছে।

দূরদর্শী, বিচক্ষণ, আত্মপ্রত্যয়ী আনিস রহমান ব্যবসার পাশাপাশি সফল সুখী একজন মানুষ। আনিস রহমান উজ্জ্বল ও ফারজানা শাহীন লুনা দম্পতির তিন সন্তান অধ্যয়নরত।

আনিস রহমান বাংলাদেশি আমেরিকানদের মধ্যে এক অনন্য উদাহরণ যিনি অনেক সমস্যা ও সঙ্কট পাড়ি দিয়ে স্বপ্নের আমেরিকাকে জয় করেছেন। তিনি তার বড় মেয়ে তাসফিয়ার নামে ১৯৯৮ সালে ‘তাসফিয়া ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেছেন যার মাধ্যমে নাটোরের বিভিন্ন এলাকায় অসচ্ছল ও অসহায় মানুষদের সহায়তা দিয়ে থাকেন। 

স্বাধীনচেতা আনিস রহমান একজন বন্ধুবৎসল  ব্যক্তিত্ব।

অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button