বজলুর রায়হান
সিনিয়র সাংবাদিক
এই নিবন্ধের লেখক

গোপালগঞ্জ জেলার এক সময়ের ছোট্ট একটি গ্রাম টুঙ্গিপাড়া। শ্যামল-সবুজে ঘেরা মায়াময় এই গ্রামে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম হয় ইতিহাসের এক মহানায়কের, এক কিংবদন্তির। যাঁর জন্য আজ আমরা স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক বলে পরিচয় দিতে পারছি। সব ভয়কে জয় করে পারছি প্রাণ ভরে শ্বাস নিতে। তিনি হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
টুঙ্গিপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া পরিবারের স্বজনদের আদর করে ডাকা ‘খোকা’ যে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন চিরদিন, তা হয়তো তখন কেউ বুঝতেই পারেননি। তিনি এমন একজন দরদি মানুষ যিনি নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের সার্বিক উন্নয়নে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সমৃদ্ধ করতে গ্রহণ করেছিলেন নানা পরিকল্পনা। প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন, সংবিধান প্রণয়ন, এক কোটি মানুষের পুনর্বাসন, যুদ্ধবিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা ব্যবস্থার স¤প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক স্কুল পর্যন্ত বিনামূল্যে এবং মাধ্যমিক শ্রেণি পর্যন্ত নামমাত্র মূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি।
মদ, জুয়া, ঘোড়দৌড়সহ সমস্ত ইসলামবিরোধী কর্মকান্ড কার্যকরভাবে নিষিদ্ধকরণ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন, ১১ হাজার প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠাসহ ৪০ হাজার প্রাথমিক স্কুল সরকারিকরণ, দুস্থ মহিলাদের কল্যাণে নারী পুনর্বাসন সংস্থা, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন, ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মাফ, বিনামূল্যে/স্বল্পমূল্যে কৃষকদের মধ্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, পাকিস্তাানিদের পরিত্যক্ত ব্যাংক, বিমা ও ৫৮০টি শিল্প ইউনিটের জাতীয়করণ ও চালু করার মাধ্যমে অসংখ্য শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।
ঘোড়াশাল সার কারখানা, আশুগঞ্জ কমপ্লেক্সের প্রাথমিক কাজ ও অন্যান্য নতুন শিল্প স্থাপন, বন্ধ শিল্প-কারখানা চালুকরণসহ অন্যান্য সমস্যার মোকাবিলা করে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরি করে দেশকে ধীরে ধীরে একটি সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রয়াস চালান তিনি।
বঙ্গবন্ধু শুধু রাজনৈতিক মুক্তিই নয়, স্বপ্ন দেখেছিলেন অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশের। তিনিই প্রথম গ্রাম ও শহরের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তৈরি করেছিলেন গ্রামের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের জন্য একটি আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার রূপকল্প।
কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের নিষ্ঠুরতায় থমকে যায় মহান নেতার সেই স্বপ্ন। তবে তাঁর সেই অর্থনীতি উন্নয়নের ভাবনার চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিতে বর্তমান সরকারের ব্যবস্থাপনায় অবহেলিত গ্রামবাংলায় অর্থনৈতিক মুক্তি মিলতে শুরু করেছে।
বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সোনার বাংলারূপে গড়ে তুলতে ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনে অনেক বড় অবদান রেখেছিলেন। দেশের অর্থনীতিকে সচল করতে ব্যাংকিং খাতে বঙ্গবন্ধুর সব থেকে বড় অবদান ছিল।
পাকিস্তান আমলে যে সব বেসরকারি ব্যাংক ছিল মুক্তিযুদ্ধের পরে তিনি সেসব ব্যাংক ছয়টি ব্যাংকের আওতায় নিয়ে আসেন। এ ছয়টি ব্যাংকের নাম দিয়ে তিনি সব ব্যাংক জাতীয়করণ করেন। এ ছয় ব্যাংকের নাম দেন তিনি জনতা, সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, উত্তরা ও পূবালী ব্যাংক।
পাশাপাশি দুটি বীমা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। একটি সাধারণ বীমা ও অপরটি জীবন বীমা। তাঁর এই পদক্ষেপের ফলে দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। বলা যায়, বঙ্গবন্ধু হত্যার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত দেশের জনগণের মাঝে তাদের সঞ্চয়ের জন্য নিরাপদ জায়গা হিসেবে গড়ে উঠেছিল ব্যাংকিং খাত।
এছাড়া বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের মধ্যে অন্যতম ছিল কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন। কারণ তিনি মনে করতেন কৃষির উন্নয়ন ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে না। বঙ্গবন্ধু কৃষকের উন্নয়নে ও দেশের অর্থনীতি বেগবান করার লক্ষ্যে ব্যাপক উদ্যোগ হাতে নিয়েছিলেন।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রতি মানুষের ভালোবাসা, দেশের সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়া সহ্য হয়নি কিছু ঘাতকের। তাই তারা তৈরি করেছিল ইতিহাসের সেই কালো অধ্যায় ’৭৫ এর ১৫ আগস্টের।
বঙ্গবন্ধুর স্বনির্ভর অর্থনীতি
১৯৭৩ সালে রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় দাতাদের প্রথম বৈঠক। সভায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন, পাকিস্তানের নেওয়া বিদেশি সাহায্যের কোনো দায় নেবে না বাংলাদেশ। কেননা বাংলাদেশ পাকিস্তানের কোনো উত্তরাধিকারী রাষ্ট্র নয়।
বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট পিটার কারগিল বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করলেন, দাতাদের কাছ থেকে সহায়তা না নিয়ে বাংলাদেশের জনগণ কী খাবে? বঙ্গবন্ধু পাইপ হাতে নিয়ে উঠে তাকে বললেন, ‘আমার সঙ্গে আসুন’; বলে জানালার কাছে নিয়ে গেলেন, দেখালেন এবং বললেন, ‘আপনি নিচে কী দেখতে পাচ্ছেন? আপনি বাইরে কী দেখতে পাচ্ছেন?’ কারগিল বললেন, ‘সবুজ ঘাসের একটি সুন্দর উঠোন।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘যদি আপনারা কোনো ধরনের সহায়তা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তবে আমার জনগণ এগুলো খাবে।’
এমনই আত্মমর্যাদাশীল এক নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। পরবর্তী সময়ে অবশ্য অনেক শিথিল শর্তে ওই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সরকারের তৎকালীন পরিকল্পনা কমিশন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম সাইদুজ্জামানের স¤প্রতি প্রকাশিত এক লেখায় ওই বর্ণনা পাওয়া যায়।
মূলত: বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল স্বনির্ভরতা। আত্মনির্ভরশীল জাতি গঠনের পাশাপাশি বৈষম্য ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। সেই লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু। একইসঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও বাঙালি জাতির জনক। তাই তো দেশকে স্বাধীনতার স্বাদ পাইয়ে দিয়ে তিনি থেমে থাকেননি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় ভেঙে পড়া অর্থনীতি থেকে কিভাবে স্বনির্ভর বা আত্মনির্ভশীল জাতিতে রূপান্তরিত হওয়া যায় সে লক্ষ্য পূরণে নিরলস কাজ করে গেছেন।
মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। স্বাধীন দেশে ফিরে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই বঙ্গবন্ধু নেমে পড়েন নতুন করে অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে। গ্রহণ করেন মধ্য-দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনা। এসবের মধ্যে ছিল- প্রথমত: স্ব-নির্ভরতা, যতটা সম্ভব দেশের সম্পদ ব্যবহার করা। দ্বিতীয়ত: বিদেশ ও দাতাদের কাছ থেকে শর্তহীন অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে স্বাগত জানানো এবং ক্রমান্বয়ে এ ধরনের নির্ভরতা হ্রাস করা।
নিজস্ব সম্পদ আহরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি স্বনির্ভরতা অর্জনের অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু নিজের হাতে প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ১৯৭২ সালে সংবিধানের ৭৬ নম্বর আদেশে এ সংস্থার যাত্রা শুরু হয়। যার ধারাবাহিকতায় বীর বাঙালি ধীরে ধীরে আত্মনির্ভশীলতার পথে হাঁটছে।
বর্তমানে মোট জাতীয় বাজেটের ৬০ শতাংশের বেশি অর্থের যোগান দেয় এনবিআর। অন্যদিকে বৈষম্য ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু ব্যাংক, বীমা ও সব বৃহৎ শিল্প-কারখানাকে রাষ্ট্রীয়করণের ঘোষণা দেন। যেখানে উল্লেখ ছিল শিল্প-কারখানার ম্যানেজমেন্ট বোর্ডে ৪০ শতাংশ শ্রমিক থাকবেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিলগ্নীকরণ করা হবে, যার অনেকগুলো পরিত্যক্ত হয়েছে। ভূমি মালিকানার সর্বোচ্চ ২৫ বিঘা সীমা নির্ধারণ করে দেয়ারও ঘোষণা দেন তিনি।
অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের চমৎকার আরো কিছু বিবরণ পাওয়া যায় সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামানের লেখায়। যেখানে তিনি লিখেছেন, ‘স্বাধীনতার পরে বহু রাজনৈতিক নেতা দলীয়ভাবে, ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও উন্নয়নের নীতি কী হবে, সে বিষয়ে ঘোষণা ও দাবি প্রকাশে ব্যস্ত ছিলেন। ওই সময় থেকে অর্থনৈতিক দর্শনের ওপর মূল আলোচনা শুরু হয়। আমাদের নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে কিছু তথ্য। প্রথমত. আওয়ামী লীগ সমাজতান্ত্রিক দল হিসেবে ছিল না, দ্বিতীয়ত. আওয়ামী লীগের ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের অর্থনীতিতে সমাজতান্ত্রিক সংস্কারের কথা উল্লেখ ছিল। অর্থনীতিবিদরা সার্বিকভাবেই এসবের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি এবং পরিকল্পিত উন্নয়নের সঙ্গে দারিদ্র্য ও অসমতা হ্রাসের উপায় হিসেবে।’
স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার মানসিক তাড়না উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন ভাষণেও। ১৯৭২ সালের ৭ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘দুনিয়ার সমস্ত দেশ থেকে আমি সাহায্য নিতে রাজি আছি। কিন্তু সে সাহায্য হবে শর্তহীন। শর্ত দিয়ে কারো কাছ থেকে ভিক্ষা আনতে পারবো না। এমন কিছু আনতে চাই না, যাতে ভবিষ্যতে আমাদের অসুবিধা হতে পারে। সেজন্য একটু আস্তে আস্তে চলি।’
শ্রমিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আল্লার ওয়াস্তে একটু উৎপাদন করো। উৎপাদন করতে হবে। ইনশাল্লাহ একবার যদি উৎপাদন বেড়ে যায়, তাহলে আর কষ্ট হবে না। যারা গ্রামে বাস করে, কৃষক তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য আছে। তাদের ২৫ বিঘা জমি পর্যন্ত খাজনা মাফ করেছি। ঋণ দিচ্ছি-আরো দিবো। আমি চাই তারা উৎপাদন করুক’।
বঙ্গবন্ধু সরকারের ঘোষিত ১৯৭২ সালের ৫শ’ কোটি টাকার প্রথম বাজেটে কৃষি ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখার পর শিক্ষা ও সমাজকল্যাণে বরাদ্দ ছিল। সার ও শিশু খাদ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করা ও তুলা থেকে তৈরি সুতার এবং পানির পাম্পের ওপর থেকে কর কমানোর সিদ্ধান্ত ছিল বাজেটে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ। সাধারণ জনগণ যাতে সহজে কাপড় সংগ্রহ করতে পারেন তার জন্য সূতি কাপড়ের ওপর কর ধার্য করা হয়েছিল কম। বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে ১৯৭৪ সালের শুরুতেই বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সীমা ২৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ কোটি টাকা করা হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু যেমন আত্মমর্যাদাশীল এক নেতা হয়ে কঠিন শর্তযুক্ত বিদেশি ঋণ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ঠিক তেমনটি ঘটেছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে। বিশ্বব্যাংকের কঠিন শর্তযুক্ত ঋণ ফিরিয়ে দিয়ে নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণ করার সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন তিনি। তাতে বিদেশি অর্থায়নকৃত প্রকল্প কমেনি বরং বেড়েছে বহুগুণ। দেশের সর্ববৃহৎ স্থাপনা পদ্মা বহুমুখী সেতু এখন দৃশ্যমান।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা ছিল বঙ্গবন্ধুর
১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ। স্বাধীনতা দিবসের পঞ্চমবার্ষিকী। রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো জনতার সামনে সবুজ চত্বরে দাঁড়িয়ে দুর্নীতিবাজদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ভাষণে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে নতুন সংগ্রামের ডাক দিয়ে জনগণের সহায়তা চান তিনি। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সরকারি আইন করে কোনো দিন দুর্নীতিবাজদের দূর করা সম্ভব নয়, জনগণের সমর্থন ছাড়া। আজকে আমার একটিমাত্র অনুরোধ আছে আপনাদের কাছে। আমি বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, জেহাদ করতে হবে, যুদ্ধ করতে হবে শত্রুর বিরুদ্ধে। আজকে আমি বলব বাংলার জনগণকে- এক নম্বর কাজ হবে দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে। আমি আপনাদের সাহায্য চাই। গণআন্দোলন করতে হবে। আমি গ্রামে গ্রামে নামব। এমন আন্দোলন করতে হবে যে ঘুষখোর, যে দুর্নীতিবাজ, যে মুনাফাখোর, যে আমার জিনিস বিদেশে চোরাচালান দেয় তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। এ কথা মনে রাখতে হবে। গ্রামে গ্রামে মিটিং করে দেখতে হবে, কোথায় আছে ওই চোর, ওই ঘুষখোর। ভয় নাই, আমি আছি। ইনশাল্লাহ, আপনাদের ওপর অত্যাচার করতে দেব না।’
বঙ্গবন্ধু আহ্বান জানালেন দেশ গড়ার নতুন যুদ্ধের। যা ছিল মূলত মার্চে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দীতে দেয়া তাঁর শেষ ভাষণ। কারণ, এরপরে এতো দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেয়ার সময় দেয়নি হায়েনারা। তাঁর অসাধারণ ভাষণটি স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন। বাংলাদেশ এগিয়ে নেওয়ার চমৎকার সম্ভাবনাময় এই ভাষণটির কথা জানেন না হয়তো অনেকেই। হয়তো হায়েনারাই ভাষণটি জনসমক্ষে আসতে দেয়নি। এর চার মাস পরেই রক্তের হোলিখেলায় মেতে উঠেছিল খুনিরা। এই ভাষণটির অনুলিখন ১৯৭৯ সালের ১৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ থেকে প্রকাশিত স্মরণিকায় প্রকাশ করা হয়েছিল।
সেদিন অনলবর্ষী বক্তা বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় উচ্চারণ, ‘কেন সিস্টেম পরিবর্তন করলাম? সিস্টেম পরিবর্তন করেছি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য। সিস্টেম পরিবর্তন করেছি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবার জন্য। কথা হলো, এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে, সবকিছু ফ্রি স্টাইল! অফিসে-আদালতে-ফ্যাক্টরিতে কাজ না করে টাকা দাবি করে। সাইন করিয়ে নেয়। যেন দেশে সরকার নাই। আবার, স্লোগান হলো বঙ্গবন্ধু কঠোর হও। বঙ্গবন্ধু কঠোর হবে। কঠোর ছিল, কঠোর আছে। কিন্তু দেখলাম, চেষ্টা করলাম, এত রক্ত, এত ব্যথা, এত দুঃখ। তার মধ্যে ভাবলাম দেখি কী হয়, কিছু করতে পারি কিনা। আবদার করলাম, আবেদন করলাম, অনুরোধ করলাম, কামনা করলাম; কিন্তু কেউ কথা শোনে না। চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনী।’
বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রায় প্রতিটি ভাষণেই দুনীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি করেছেন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনেও আবেগাপ্লুত জাতির জনক বলেন, ‘আজ থেকে আমার অনুরোধ, আজ থেকে আমার আদেশ, আজ থেকে আমার হুকুম ভাই হিসেবে, নেতা হিসেবে নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, আমি তোমাদের ভাই, তোমরা আমার ভাই, এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি আমার বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এ দেশের মানুষ, যারা আমার যুবক শ্রেণি আছে তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়। বঙ্গবন্ধু দেশের উন্নয়নের জন্য ডাক দিলেন এভাবে- যথেষ্ট কাজ পড়ে রয়েছে। আপনারা জানেন, আমি সমস্ত জনগণকে চাই, যেখানে রাস্তা ভেঙে গেছে, নিজেরা রাস্তা করতে শুরু করে দেও। আমি চাই জমিতে যাও, ধান বোনাও, কর্মচারীদের বলে দেবার চাই, একজনও ঘুষ খাবেন না, ঘুষখোরদের আমি ক্ষমা করব না।’
দুর্নীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর যুদ্ধের ঘোষণা ছিল ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারির ভাষণেও। তিনি বলেছিলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকরি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে জাতির ভবিষ্যৎ তমিস্রায় ছেয়ে যাবে। দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, চোরাচালানি, মজুদদারি, কালোবাজারি ও মুনাফাখোরদের সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু বলে আখ্যায়িত করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এদের শায়েস্তা করে জাতীয় জীবনকে কলুষমুক্ত করতে না পারলে আওয়ামী লীগের দুই যুগের ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বদানের গৌরবও ম্লান হয়ে যেতে পারে।
এর আগে ১৯৭২ সালের ৭ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও বঙ্গবন্ধু কালোবাজারিদের হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন, ‘মুনাফাখোর, আড়তদার ও চোরাকারবারি সাবধান হয়ে যাও। ভবিষ্যতে সোজা পথে না এলে আমি বাধ্য হয়ে আইন পাস করবো তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য।’
তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মচারী ভায়েরা আপনারা ঘুষ খাবেন না। আমার লোক আছে। আমি সব খবরই পাচ্ছি। ঘুষখোররা নয় নম্বর ধারায় চাকরি হারাবে, জেলখানায় যাবে।’
বঙ্গবন্ধুর দুর্নীতির বিরুদ্ধে সেই যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। বরং সোনার বাংলা গড়তে যুদ্ধের কৌশল ও ব্যাপকতা বেড়েছে বহুগুণ। দুর্নীতি এখন অনেকটা কাঠামোগত সমস্যা হয়ে আছে। উপরি কাঠামোতে দুর্নীতি রেখে, নিচে এর সমাধান খুঁজতে চাইলে তা কেবল রসিকতারই জন্ম দেবে।
সমাজে বিশালায়তনের যে দুর্নীতি হয়, তাকে সুরক্ষা দিয়ে, নিচ কাঠামোর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অঙ্কের দুর্নীতি রোধ করে খুব বেশি লাভ হয় না বলেই বারবার প্রমাণিত হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও সম্ভবত বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে বিষয়টি শক্তভাবেই উপস্থাপন করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু ওই দিন বলেছিলেন, ‘আজকে করাপশনের কথা বলতে হয়। এ বাংলার মাটি থেকে করাপশন উৎখাত করতে হবে। করাপশন আমার বাংলার কৃষকরা করে না। করাপশন আমার বাংলার মজদুর করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ। যারা আজকে ওদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছি। আজ যেখানে যাবেন, করাপশন দেখবেন- আমাদের রাস্তা খুঁড়তে যান- করাপশন। খাদ্য কিনতে যান- করাপশন। জিনিস কিনতে যান- করাপশন। বিদেশ গেলে টাকার ওপর করাপশন। তারা কারা? আমরা যে ৫% শিক্ষিত সমাজ, আমরা হলাম দুনিয়ার সবচেয়ে করাপট পিপল, আর আমরাই করি বক্তৃতা। আমরা লিখি খবরের কাগজে, আমরাই বড়াই করি। এই দুঃখী মানুষ যে রক্ত দিয়েছে, স্বাধীনতা এনেছে, তাদের রক্তে বিদেশ থেকে খাবার আনবো সেই খাবার চুরি করে খাবে, অর্থ আনবো চুরি করে খাবে, টাকা আনবো তা বিদেশে চালান দেবে। বাংলার মাটি থেকে এদের উৎখাত করতে হবে।’
সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে দুর্নীতিবাজদের উৎখাতের সেই কাজ অসমাপ্ত থেকে গেছে তাঁর নির্মম হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে। দুর্নীতি দমনের জন্য প্রতিটি সরকার এরপর ঘোষণা দিয়েছে বটে, অনেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণাও করেছেন; কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারও দুর্নীতি-অনিয়ম রোধে বিভিন্ন ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রশাসনের অনেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত বলে তাদের মূলোৎপাটন করা সম্ভব হচ্ছে না।


