Uncategorized

বঙ্গবন্ধুকে যেমন দেখেছি

বজলুর রায়হান

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি তিনি। বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে কালজয়ী অবিসংবাদিত মহান নেতা। স্বাধীন-সার্বভৌম সোনার বাংলার অকুতোভয় স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির শোষণ মুক্তি আন্দোলনের আপসহীন মহানায়ক। স্বাধীনতাপ্রিয় একটি জাতির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের অধ্যবসায়ী ও মানবিকতায় তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রত্যয়ী। মাতৃভাষা বাংলার জন্য অকুতোভয় এক লড়াকু যোদ্ধা ছিলেন তিনি। শোষণ-নির্যাতন তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে বারবার তাঁকে কারাবন্দি হতে হয়েছে। কিন্তু কখনও আপস করেননি। নত করেননি উন্নত শির। ভয় করেননি ফাঁসির দড়িকে। চক্রান্তের বেড়াজালে তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি বাংলা ও বাঙালির শত্রুরা। স্বাধীনতা যুদ্ধের আহবান জানিয়ে তিনি প্রিয় মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার জন্যে বাংলার আপামর জনসাধারণের মাঝে অভূতপূর্ব আলোড়নের সৃষ্টি করেন।

বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন বাংলার সূর্য-সন্তানগণ- যাঁদের মধ্যে ছিল নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম, অসীম সাহস এবং আত্মত্যাগী মনোভাব। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই- বাঙালি জাতির জন্য স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। তাঁরা বর্বর পাকস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে প্রমাণ করেছিলেন বাঙালি যুদ্ধ করতে জানে এবং তাঁরা বীরের জাতি। এই বীর বাঙালির অদম্য প্রেরণা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
বাঙালির চেতনার বাতিঘর এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কাছ থেকে দেখেছেন গবেষক, সমাজচিন্তক মহিউদ্দিন আহমাদ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শবাহিত বিভিন্ন কর্মযজ্ঞের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও সহযোগী তিনি। বঙ্গবন্ধুর জীবন-যৌবনের প্রদীপ্ত-উজ্জ্বল দিনগুলোর সঙ্গে মহিউদ্দিন আহমাদ বিচরণ করতে পেরেছেন বলে রচনা করেছেন অসাধারণ এক স্মৃতি-আখ্যান ‘বঙ্গবন্ধুকে যেমন দেখেছি’। এ গ্রন্থের ভূমিকা পর্বে মহিউদ্দিন আহমাদ লিখেছেন- ১৯৪৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষ্ণনগরে প্রথমবারের মতো তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা শুনে আমি হয়েছিলাম বিস্মিত এবং অভিভূত। কৈশোরে আমার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করার ফলে আমি তখন থেকে ‘মুজিব-ভক্ত’। পরবর্তীকালে তাঁর ত্যাগ, সাহস এবং হার না মানা আন্দোলন দেখে আমার ভক্তি ক্রমে বেড়েই গিয়েছে। জনগণের মুক্তি এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রামের জন্য ‘বঙ্গবন্ধু’ আখ্যা পাওয়ায় আমি হয়েছি উল্লসিত। রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতাগণের মধ্যে শেরে বাংলা এবং বঙ্গবন্ধু আমার প্রিয় নেতা।…. সময় বয়ে যায়; দেখতে দেখতে এলো ‘মুজিব শতবর্ষ’। নিষ্প্রভ মনে যেন দোলা লাগল। শুভানুধ্যায়ীগণও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কিছু লিখতে উৎসাহ দিলেন। তাই কাছে থেকে জানার সুযোগ না হলেও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুকে যেমন দেখেছি, তা নিয়ে এ বই লেখার প্রয়াস। এ লেখাকে রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে আমার মনের আবেগ ও অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ বলে গণ্য করলে কৃতজ্ঞ থাকব।
‘বঙ্গবন্ধুকে যেমন দেখেছি’ গ্রন্থে মহিউদ্দিন আহমাদ কয়েকটি পর্বে তাঁর স্মৃতিচারণা উপস্থাপন করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখাতেই তিনি আত্মহারা হয়েছিলেন। মহিউদ্দিন আহমাদ লিখেছেন- ‘৭১ বছর আগের কথা। যাঁকে দেখে এবং যাঁর বক্তৃতা শুনে বিমুগ্ধ হয়েছিলাম, আত্মহারা হয়ে পড়েছিলাম, মনে মনে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলাম ‘এ লোক একদিন বড় মাপের নেতা হবে’, তাঁর কথাই বলছি। তিনি আর কেউ নন, তখনকার শেখ মুজিব, পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’
বঙ্গবন্ধুকে ১৯৪৯ সালে প্রথম দেখার পর মহিউদ্দিন আহমাদ পরবর্তীকালে আরো অনেকবার দেখা পেয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছেন, কথা বলেছেন। বায়ান্ন’র মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনকালে বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখেছেন মহিউদ্দিন আহমাদ। তিনি লিখেছেন- ‘তিনি বাঙালি তথা পূর্ব বাংলার ন্যায্য অধিকারের জন্য নিরলস আন্দোলন করে গেছেন। ক্ষমতা লাভের জন্য তাঁর কোনো লোভ বা মোহ ছিল না। নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়েও ১৯৫৪ সালে মন্ত্রিত্ব নিতে চাননি। …… শেখ মুজিব ১৯৫৭ সালেও মন্ত্রী হওয়ার স্বল্পকাল পরেই দেশের স্বার্থে, আন্দোলনের স্বার্থে পদত্যাগ করে পার্টির কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ফলে দলের সাংগঠনিক কাজ তাঁর জীবনের সবটুকু স্বাদ, আরাম-আয়েশ, আহ্লাদ কেড়ে নেয়। কিন্তু তিনি লক্ষ্যচ্যুত হননি। বাঙালির মুক্তি, তাদের ন্যায্য দাবি আদায়, মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়েই এগিয়ে গেছেন জীবন বাজি রেখে।’
স্বায়ত্ত শাসনের দাবি ও ছয় দফা পর্বে মহিউদ্দিন আহমাদ লিখেছেন- ‘….. ১৯৫৭ সালের শুরুতে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে এক সম্মেলন আয়োজন করা হয়। ঐ সম্মেলন থেকে হুঁশিয়ারি সংকেত দিয়ে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, অবিচার ও জুলুম চলতে থাকলে, পশ্চিম পাকিস্তানিদের ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে বিদায় জানানো হবে। …..সম্মেলনে পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও যোগ দিয়েছিলেন। …… শেখ মুজিব সম্মেলন সফল করার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করছেন। …… রাতেও দেখেছি একটি সাদা লম্বা টর্চলাইট হাতে নিয়ে অন্ধকারেও ঘুরে বেড়িয়েছেন। কর্মীরা তাঁকে দেখে উৎসাহ পেতেন এবং ‘মুজিব ভাই, মুজিব ভাই’ বলে তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার চেষ্টা করতেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষ্ণনগরে দেখা সাহসী শেখ মুজিবকে টাঙ্গাইলে আওয়ামী লীগের ছোট-বড় নেতা-কর্মী সবার শ্রদ্ধাভাজন ও প্রেরণাদাতা দেখে কতটা আনন্দিত হয়েছিলাম তা বর্ণনা করা দুঃসাধ্য।’
সত্তরের নির্বাচন ও স্বাধীনতা পর্বে মহিউদ্দিন আহমাদ লিখেছেন- ‘এমন অবস্থায় এলো ৭ই মার্চ, রেসকোর্স ময়দান লোকে-লোকারণ্য। তিল ধারণের জায়গা নেই ময়দানে। আমি আমার ভায়রা ভাই প্রকৌশলী জামিল আহমেদসহ মাঠেই জায়গা নিয়ে আগে থেকেই বসেছিলাম। নেতা আসবেন- সবাই প্রতীক্ষায়। …… এমন সমাবেশ, জনতার এমন ঢল আগে কেউ দেখেনি। প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে নেতা এলেন, মঞ্চে আরোহণ করলেন। ….. শুরু করলেন ভাষণ- ‘ভায়েরা আমার।‘ বজ্রকণ্ঠে স্বভাবসুলভ মোটা গলার স্বরে বলে চলছেন, আর আমরা তন্ময় হয়ে শুনছি।’
২৪ মার্চ ১৯৭১ লেখক মহিউদ্দিন আহমাদ ডাক বিভাগের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ধানম-ি ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। লেখক বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেন- ‘৮/৯ দিন যাবৎ ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে- কী সুরাহা হবে বলে মনে হয়? বঙ্গবন্ধু স্বভাবসুলভ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন- যা বলি, তাই মেনে নেয় বলে মনে হয়; কিন্তু ওদের হাব-ভাব ভাল ঠেকছে না।’ মহান নেতার প্রত্যাবর্তন ও দেশ পুনর্গঠনসহ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আরো কিছু স্মৃতিচারণা রয়েছে গ্রন্থে।
‘বঙ্গবন্ধুকে যেমন দেখেছি’ মুজিব জন্মশতবর্ষে এক অনন্য প্রকাশনা। এর প্রকাশকাল নভেম্বর ২০২০। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছেন অমর প্রকাশনীর পক্ষে অমর হাওলাদার বাবুল। প্রচ্ছদ বিডি ৭১। গ্রন্থের মূল্য ২৫০ টাকা।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে প্রকাশিত এ গ্রন্থের বহুল প্রচার কামনা করি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button