বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রস্থল দুবাইতে আগামী ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘দ্বিতীয় গ্লোবাল সামিট ২০২১’। এই সামিট বাংলাদেশের উদ্যমী শিল্পোদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ নিয়ে আসছে। এই সামিটে প্রবাসে অবস্থানকারী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী যারা এনআরবি হিসেবে খ্যাত তারাসহ বিভিন্ন দেশের উদ্যোক্তারাও যোগ দিচ্ছেন। কারণ সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতি তাদের আগ্রহের কমতি নেই। সামিটে বাংলাদেশ থেকে বৃহৎ শিল্প গ্রুপসহ অসংখ্য উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী অংশ নিচ্ছেন তাদের পণ্য এবং প্রজেক্ট নিয়ে। এই সামিটের সুবাদে বিশ্বের উদ্যোক্তাসমাজ বাংলাদেশের পণ্য এবং এখানকার বিনিয়োগ অবস্থা সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবেন এবং দ্বিপাক্ষিক অনেক চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আসন্ন দুবাই সামিটে বাংলাদেশও তার অর্থনৈতিক শক্তি সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারবে।
দুবাইতে অনুষ্ঠিতব্য দ্বিতীয় গ্লোবাল সামিট বাংলাদেশের শিল্প-বাণিজ্য ও অর্থনীতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে উদযাপন করছে সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব। একই সাথে বছরটি বিশ্বের অন্যতম জাতীয়তাবাদী নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের মানুষের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের যে বীজ বপন করেছিলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তা ডালপালায় বিস্তৃত হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরাজয় ও আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে ৩০ লক্ষাধিক মানুষকে। দু’লাখের অধিক মা-বোনকে হারাতে হয়েছে সম্ভ্রম। অনেক প্রতীক্ষার এবং আন্দোলন-সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীন পতাকা আজ সগৌরবে উড্ডীন। কিন্তু তা সত্ত্বেও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকার কারণে আমরা কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা ও মুক্তির অর্জন থেকে পিছিয়ে আছি। প্রতিটি মানুষ চায় দেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন। এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণে শুধু বাংলাদেশে অবস্থানকারী এ দেশীয়রাই নন, প্রবাসে অবস্থানকারী উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি যারা ‘এনআরবি’ হিসেবে খ্যাত তারাও দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করছেন।
বলা হয়, বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনার দেশ। কিন্তু সেই অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রথমেই প্রয়োজন পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক সমর্থন। বাংলাদেশ অনেক চমৎকার পরিকল্পনা করতে পারে; কিন্তু তা বাস্তবায়নের আর্থিক সামর্থ্য পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। বর্তমান সরকার দেশে ১০০টি ইপিজেড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে এবং তার কাজও দ্রুত গতিতে চলছে। কথা হচ্ছে, এসব ইপিজেড বা অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠিত হলেই হবে না; সেগুলোতে শিল্প-বাণিজ্যে প্রাণের সঞ্চার ঘটাতে হবে। এজন্য প্রয়োজন ব্যাপক বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে এর জন্য দরকার প্রচুর বৈদেশিক বিনিয়োগ। ঠিক সে সময়টিতেই দেখা গেল বর্তমানে বিভিন্ন দেশে ১ কোটি ২০ লাখের উপরে বাংলাদেশি চাকরি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। তাদের পাঠানো রেমিটেন্স বাংলাদেশের বাজেটে জিডিপির অন্যতম প্রধান উৎস। তাদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে। ২০২০ সালে রেমিটেন্স খাতে ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ এসেছে। বর্তমানে দেশে রিজার্ভের পরিমাণ ৪২ বিলিয়ন ইউএ্রস ডলারেরও বেশি। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য আশার আলোকবর্তিকা। জিডিপির হিসাবে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ৪৪তম বৃহৎ অর্থনৈতিক দেশ। কিন্তু এ কথাও ঠিক, উপার্জনের জন্য সবাইকে বিদেশে যাওয়া যাবে না। দেশের শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্যও চাঙ্গা রাখতে হবে। নতুন নতুন শিল্পায়ন করতে হবে। দেশকে শিল্পায়িতভাবে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে হবে। এ লক্ষ্য নিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী যারা দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসেন, দেশের উন্নয়ন আশা করেন, দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার স্বপ্ন দেখেন তারা উদ্যোগ নিয়েছেন দুবাইতে ‘দ্বিতীয় গ্লোবাল সামিট ২০২১’ আয়োজনের। বিশেষ করে এনআরবি সিআইপিগণই এর উদ্যোক্তা। বর্তমান সরকার বিদেশে অবস্থানকারী ভালো উদ্যোক্তাদের ‘সিআইপি’ সম্মানে ভূষিত করেছে। এই এনআরবি সিআইপিগণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংগঠনিকভাবে সংগঠিত হয়েছেন। তারা চিন্তাভাবনা করছেন- কীভাবে বাংলাদেশে অধিক বিনিয়োগ করা যায়- কীভাবে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যায়।
বিষয়টি এমন যে, দেশে যেমন সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেশ কিছু বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অর্থাৎ এনজিও/এমএফআই দেশকে উন্নতির দিকে নিয়ে চলেছে, তেমনই বিদেশে অবস্থানরত এনআরবিগণও ঠিক এ ধরনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তাদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিতব্য ‘গ্লোবাল বিজনেস সামিট দুবাই-২০২১’ নিয়ে ইতিমধ্যে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরাতো বটেই বিদেশি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে। এবারের দুবাই সামিটের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে Connect Your Business.

প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্পর্কে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে এমন একটি ধারণা রয়েছে যে, বাংলাদেশি মানেই কায়িক পরিশ্রমের দরিদ্র শ্রমিক। যারা শ্রম বিক্রয় করতে বিদেশে পাড়ি জমায়। কথাটি অনেকটা ঠিক হলেও এ দেশেরও যে এক বিশাল উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী শ্রেণি বিদেশের মাটিতে সাফল্যের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা ও শিল্প স্থাপন করে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন তা অনেকেই জানেন না। এদেশের প্রকৌশলী, ডাক্তার, শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ, আইনজীবীগণ যে আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডাসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে শীর্ষ পর্যায়ের স্থান দখল করে আছেন, তাদের কেউ কেউ যে সেসব দেশের উল্লেখযোগ্য ‘বিজনেস ম্যাগনেট’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন তাও অনেকের জানা নেই। শুধু তাই নয়, আমেরিকা ও ব্রিটেনের মতো দেশের রাজনীতিতে বাংলাদেশি বাঙালিরা হাউজ অব কমন্স ও সিনেট সদস্যসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন- বাংলাদেশকে অনন্য এক উঁচুতে নিয়ে গেছেন- সে খবরইবা ক’জন রাখেন।
এ ক্ষেত্রে আমেরিকায় বাংলাদেশি লিডিং ম্যাগাজিন ‘বিজনেস আমেরিকা’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং এই ধারা অব্যাহত রেখেছে। এই ম্যাগাজিনে শত শত বাংলাদেশি বাঙালির নানা উদ্যোগ ও ব্যবসার চালচিত্র উঠে এসেছে। জাপান, হংকং, সিংগাপুর, মালয়েশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরব আমিরাত, দুবাই, বাহরাইন, কাতার, কুয়েতসহ অনেক দেশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা ব্যবসা ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছেন। এ ছাড়া আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালিসহ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত অনেক দেশেই খ্যাতিমান তারকা ব্যবসায়ী হিসেবে রীতিমতো বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছেন বাংলাদেশিরা। এই উদ্যোক্তা- ব্যবসায়ীদের অনেকেই বাংলাদেশে এনআরবি ব্যংক প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পায়নে অংশ নিয়েছেন। অনেকেই পাঁচতারকা হোটেলসহ শিল্পখাতে বিনিয়োগ করেছেন কোটি কোটি ডলার। এছাড়া তারা শিক্ষার বিস্তারসহ সেবামূলক কার্যক্রমেও অবদান রেখে চলেছেন। তারা চান বাংলাদেশ উন্নত দেশের কাতারে উঠে আসুক। এটি তাদের হৃদয় থেকে চাওয়া। কারণ, প্রতিটি মানুষই তার শেকড়কে গভীরভাবে আটকে রাখতে চায়। চায় তার পরিচিতিকে উজ্জ্বল করে তুলতে। একসময় যে মানুষটি দরিদ্রতাকে সাথে নিয়ে বিদেশে গিয়েছেন, কিংবা ভাগ্যের সন্ধানে আমেরিকায় গিয়ে অডজব করতে বাধ্য হয়েছেন- তিনি এখন সফল উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী কিংবা সেখানকার রাজনীতির মূলধারায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছেন। তিনিও চান তার জন্মভূমি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে। এছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নত অবকাঠামো দেখেও বিশ্ববাসী হতবাক। এখন অনেকেই পদ্মা সেতুর মতো বিশাল স্থাপনা দেখছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেখছে- তারা বিস্মিত হচ্ছে।
স্বাভাবিকভাবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যকার দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনার আলোকেই ‘2nd Global Business Summit DUBAI-2021’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এতে শুধু প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরাই নন বাংলাদেশেরও অনেক উদ্যোক্তা অংশগ্রহণ করবেন। প্রত্যেকেরই স্বপ্ন- উন্নত বাংলাদেশ।
আজকের ভারত দু’দশক আগেও শিল্পে অনেক পিছিয়ে ছিল। তাদের দেশের বিদেশে অবস্থানকারী ‘নন- রেসিডেন্ট ইন্ডিয়ানরা (NRI)’ নিজেরা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভারতে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলেই তার সুফল এখন ভারতের অর্থনীতি পাচ্ছে। বাংলাদেশের যে সব এনআরবি (নন- রেসিডেন্ট বাংলাদেশি) দেশকে এগিয়ে নিতে একটি যোগসূত্র সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছেন নিঃসন্দেহে তারা দেশপ্রেমিক। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়েই তারা এ উদ্যোগ নিয়েছেন। এ ধরনের একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বিশ্বের অন্যরাও বাংলাদেশের শিল্প ও পণ্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে। তারা জানতে পারবে- এ দেশে কোন কোন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা বিদ্যমান। একই সাথে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীরাও প্রবাসে পারস্পরিকভাবে একে অপরের সাথে পরিচিত হবেন- নিজেদের মধ্যে বন্ধন তৈরির সুযোগ পাবেন। এতে বাংলাদেশ উন্নয়নের দিকে যাবার অপার সুযোগ খুঁজে পাবে। এনআরবি সিআইপিদের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের গতিশীল উন্নয়ন এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে- একথা নিশ্চিত করে বলা যায়।


