প্রচ্ছদ প্রতিবেদনপ্রচ্ছদ সাক্ষাৎকার

স্কটল্যান্ড ও বাংলাদেশের আর্কিটেক্টদের দ্বারা সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে নির্মাণ করা হচ্ছে ব্রিটানিয়া স্কটিশ ভিলেজ

আবদুর রউফ জেপি চেয়ারম্যান, ব্রিটানিয়া প্রোপার্টিজ লিমিটেড

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : এনামুল হক এনাম

এদেশে তিনি যতোটা না পরিচিত তার চেয়ে বেশি পরিচিত ব্রিটেনের শিল্প-বাণিজ্য অঙ্গনে। বিশেষ করে স্কটল্যান্ডের অর্থনীতিতে একজন বাংলাদেশি ব্রিটিশ হিসেবে তিনি রেখে চলেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা; এই কৃতী উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীর নাম আবদুর রউফ জেপি। জন্ম বাংলাদেশের ঢাকায়। এক সময় রাজধানীর গুলশান-বনানী এলাকাতেও তাদের বাড়ি, জমি ছিল; কিন্তু সরকার ঢাকা সিটির জন্যে তা অ্যাকোয়ার করে নিলে পিতৃপুরুষের ভিটে ডুমনিতেই তার পিতা আব্দুস সামাদ বেপারী পুনরায় থাকার ব্যবস্থা করেন। মরহুম আব্দুস সামাদ বেপারী ছিলেন একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং গুলশান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। খিলক্ষেত থেকে ডুমনির যে রাস্তাটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং যা পূর্বাচলকে চিনিয়েছে এবং যে রাস্তাটি ৩০০ ফুট রাস্তার আগেই রূপগঞ্জ নরসিংদীকে সংযোগ করে দিয়েছে সেই সড়ক করার পেছনে সামাদ বেপারীর অবদান অনেকখানি। তাঁরই কৃতী সন্তান আবদুর রউফ জেপি। তিনি ১৯৭১ সালে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চতর ডিগ্রির জন্যে চলে যান স্কটল্যান্ডে। সেখানে তিনি ডিগ্রি অর্জন শেষে প্রথমে চাকরি নিলেও পরে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তিনি ‘বলাকা ফুড লিমিটেড’ এবং DILSE এই দুটি অত্যাধুনিক রেস্টুরেন্টের মালিক। এই রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সুবাদে তিনি বাংলাদেশি উদ্যোক্তা হিসেবে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে আলোচিত এবং ব্যাপক প্রশংসা অর্জনে সক্ষম হয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট ব্যবসাতেও যথেষ্ট উন্নতি করেন। তার প্রতিষ্ঠানের নাম ব্রিটানিয়া প্রোপার্টিজ লিমিটেড। যা এখন বাংলাদেশের আবাসন শিল্পখাতেও শীর্ষ পর্যায়ের একটি নাম। তিনি বারিধারার ৪/৫ মাইল পূর্বে ডুমনিতেও প্রায় ৭৫ বিঘা জমি নিয়ে ‘স্কটিশ ভিলেজ’ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন।
আবদুর রউফ জেপি তার জন্মস্থান ডুমনিতে মা আমিরজানের নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন আমিরজান উচ্চ বিদ্যালয় এবং আমিরজান কলেজ। তার বাবাও ডুমনি উচ্চ বিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। আবদুর রউফ জেপি ব্রিটেনের মতো একটি দেশের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্রিটিশ ট্রেড মিশনের একজন প্রতিনিধি হিসেবে পদ লাভ করেছেন। তিনি ব্রিটানিয়া প্রোপার্টিজ লিমিটেড, ব্রিটানিয়া হোল্ডিংস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, ব্রিটানিয়া ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, ডায়মন্ড প্রোপার্টিজ (বাংলাদেশ) লিমিটেডের চেয়ারম্যান এবং ডায়মন্ড প্রোপার্টিজ (ইউকে) লিমিটেডেরও চেয়ারম্যান। এছাড়াও তিনি টাইপারস ট্যুরস লিমিটেড এবং সোনাটা শিপিং লাইন্সের পরিচালক। তিনি স্কটল্যান্ডের জাস্টিস অব পিস (Justice of Peace) এই সম্মাননায় অধিষ্ঠিত যা বাংলাদেশকেও গৌরবান্বিত করেছে। জনাব আবদুর রউফ ২০০৩ সালে Dundee City Council কর্তৃক মডার্ন পিস অব আর্কিটেকচারে বিশেষ অবদানের জন্যে Civic Trust Awards অর্জন করেন। ভারতীয় উপমহাদেশে একমাত্র তিনিই এ প্রেস্টিজিয়াস অ্যাওয়ার্ড অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।
জনাব আবদুর রউফ জেপি ২০০১ সালে সেন্ট এন্ড্রিউস ইউনিভার্সিটির আজীবন সদস্য হন। তিনি ১৫ বছর যাবত বাংলাদেশ ব্রিটিশ চেম্বার অব কমার্স (বিবিসিসি) ইউকের নির্বাচিত রিজিওনাল প্রেসিডেন্ট। তিনি ওয়ার্ল্ড ডিবেটিং সোসাইটিরও প্রেসিডেন্ট। তিনি ক্রীড়াঙ্গনেও বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। তিনি স্কটিশ ক্রিকেট টিমের চেয়ারম্যান। তিনি সেন্ট এন্ড্রিউস গলফ ক্লাবেরও সদস্য, এটি বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম গলফ ক্লাব।

আত্মবিশ্বাসী, দূরদর্শী ও পরিশ্রমী এই মানুষটি দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম ব্যাংক মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের একজন পরিচালক। নিরহংকারী এই মানুষটি স্বপ্ন দেখেন, একদিন বাংলাদেশও বিশ্বব্যাপী একটি কল্যাণকামী মানবিক উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে তার ভাবমূর্তি অর্জনে সক্ষম হবে।
আবদুর রউফ জেপি অর্থকণ্ঠকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, এখানে তা উপস্থাপন করা হলো-

অর্থকণ্ঠ : বর্তমানে আপনি ব্রিটেনের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। ব্যবসাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার প্রেক্ষাপট জানতে চাইছি।
আবদুর রউফ জেপি : আমার পিতা ছিলেন ঢাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। সে সুবাদে ছোটবেলা থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে আমার বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা শেষে ব্যবসা করব, স্বাধীনভাবে চলব সেই ইচ্ছা তখন থেকেই ছিল। পড়াশোনা শেষে আর দেশে ফিরে আসা হয়নি; তখন মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। মুক্তিযুদ্ধ শেষে ঠিক সেভাবে আসার প্রস্তুতি ছিল না। যখন আসা হলো না তখন একটা চাকরি নিলাম, ৬ বছর চাকরি করেছি। প্রথম বছর সাধারণ পর্যায়ের, এক বছর পর ম্যানেজার এবং এরপর আড়াই বছরে আমি সে প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাই। স্কটল্যান্ডে আমার এই চাকরি ছিল বেশ মর্যাদার। বেতন ভালো হওয়ায় বেশ কিছু টাকা জমাতে পারি। এক পর্যায়ে মনে হলো আর চাকরি নয়, নিজেরই কিছু করা উচিত সেখানে অন্যদের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আমি একটি ব্রিটিশ ফুড কোম্পানিতে কাজ করতাম। তারা বেশ ভালো ব্যবসা করে। আমি ভাবলাম আমাদের দেশের খাবার নিয়েও বেশ কিছু হোটেল ব্রিটেন ও স্কটল্যান্ডে রয়েছে। তখন অবশ্য আমাদের দেশের হোটেল রেস্টুরেন্টগুলো ফার্স্ট মার্কেটে ছিল না; ছিল বটম মার্কেটে। লন্ডনে একটা জোক প্রচলিত রয়েছে= এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছে, ডু ইউ লাইক এ ইন্ডিয়ান ফুড। বন্ধুর উত্তর ‘নো’। আরও বললো হোয়াট ইজ ইট অ্যান্ড হোয়াট ইজ ড্রাগ? এখন কিন্তু তা নয়। বর্তমানে এ খাবার Much more pristigious, and it is an occational menu এখন আমাদের ফুড ভেরি এক্সপেনসিভ। বিদেশিরাও বাংলাদেশি খাবারের ব্যাপারে দারুণ উৎসাহী।
অর্থকণ্ঠ : এই যে আমাদের খাবারের প্রতি বিদেশিরাও আগ্রহী- এটি কীভাবে সম্ভব হলো?
আবদুর রউফ জেপি : আগে বাঙালি যারা হোটেল রেস্টুরেন্টের ব্যবসা করতেন তাদের অধিকাংশই লেখাপড়া জানতেন না। তারা পড়াশোনা করতে ব্রিটেনে যাননি। তারা গিয়েছেন কাজ করতে। উন্নত বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী হোটেল রেস্টুরেন্ট করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমি চিন্তা করলাম, রেস্টুরেন্ট ব্যবসা মোটামুটি মন্দ নয়। আমাদের দেশের খাবার যথেষ্ট সুস্বাদু। তবে একে উন্নত পর্যায়ে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। আমি ৩ জন বন্ধুর সঙ্গে পার্টনারশীপে ‘বলাকা ফুড লিমিটেড’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠা করি। এতে আমাদের ভালো ব্যবসা হতে থাকে। এরপর আমি আরও কয়েকটি রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠা করি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘অনলাইনে’ পার্টনার নিয়েও করি। বলাকা গ্রæপের এসব রেস্টুরেন্টে ১শ’র ওপর লোক কাজ করে। আপনারা যদি কখনো যুক্তরাজ্য কিংবা স্কটল্যান্ডে আসেন তাহলে দেখবেন আমাদের রেস্টুরেন্টে কী পরিমাণ ভিড় লেগে আছে।

অর্থকণ্ঠ : আপনি রিয়েল এস্টেট ব্যবসার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট আলোচিত একটি নাম। স্কটল্যান্ডের পর আপনি বাংলাদেশেও এ ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট হয়েছেন। আবাসন খাতের ব্যবসা শুরুর বিষয়ে জানতে চাইছি।
আবদুর রউফ জেপি : ১৯৮৯-৯০ এর দিকে স্কটল্যান্ডে আমি একটা ফেমাস প্রোপার্টি অকশনে কিনি। মনে আছে, আমি একদিনে এক ডিলে ১১২টি বাড়ি কিনেছি, অনেক টাকায় তবে ব্যাংক সাপোর্টে। ওই সব অকশনে আপনি যখন যাবেন তখন আপনি মাত্র ১০% অর্থ জমা দেবেন। আপনি ৩০ দিন সময় পাবেন। আপনাকে অংশ নেওয়ার জন্যে আরও ৫% অর্থ দিতে হবে। বাকি টাকা ব্যাংক পে করবে। ৩০ দিনের মধ্যে যদি আপনি নিজে অথবা ব্যাংক থেকে টাকা জমা দিতে না পারেন তাহলে আপনার ১৫% টাকা মার যাবে। এটা একটা রিস্কি ডিল কিন্তু লেগে গেলে আপনি ভেরি লাকি। এসব ব্যবসায় বাঙালিরা সাধারণত সংশ্লিষ্ট হয় না; ইতালিয়ানরাই এ ব্যবসা করে। গ্রীক ও স্প্যানিশরাও করে। তবে আমি সত্যি লাকি, ব্যবসাটায় আমার লাক ফেভার করে।
এভাবেই আমার প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট বিজনেসে আসা। এরপর আমি বিল্ডিং করে বিক্রি করি। একই সাথে কোথাও হোটেল নির্মাণ করে ৬ মাস চালিয়ে যখন তা জনপ্রিয় হয়ে যায় তখন তা লিজ দিয়ে দেই বা বিক্রি করি। ক্রেতাও এস্টাবলিস্ট একটা রেস্টুরেন্ট পেয়ে যায়। আমার হয়তো খরচ হয় ১.২ মিলিয়ন পাউন্ড; লিজ বাবদ হয়তো আমি ৩.০৭ মিলিয়ন পাউন্ড পেয়ে যাই। এছাড়া রেন্টও হয়তো বছরে পেয়ে যাই ৭০ হাজার পাউন্ড। এভাবে উঠতে উঠতে ওখানে এসব ব্যবসায় আমাদের কোম্পানি বেশ পপুলার হয়ে গেছে। স্কটল্যান্ডে আমি অনেক প্রোপার্টি কিনেছি। আমার বাড়ি যেহেতু বাংলাদেশে, স্বাভাবিকভাবে মনে হয়েছে দেশেও যদি এ ব্যবসা করি তাহলে দেশের মানুষও মানসম্মত অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়ের সুযোগ পাবেন। আমি এখানে বেশ জমি ক্রয় করেছি এবং বসুন্ধরায় ব্রিটানিয়া গ্রæপের বেশ কিছু অ্যাপার্টমেন্ট করা হয়েছে যা প্রশংসা পেয়েছে।
অর্থকণ্ঠ : একজন বিত্তবান মানুষ হিসেবে সমাজের জন্যে আপনি কতটুকু করতে পেরেছেন এবং ভবিষ্যতে করার ইচ্ছা রাখেন?
আবদুর রউফ জেপি : আমি প্রতি মুহূর্তেই মানুষের বৃহত্তর কল্যাণে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করি। তবে আমার ব্যবসা যেহেতু স্কটল্যান্ডভিত্তিক সেহেতু আমার সোস্যাল রেসপনসিবিলিটি ওখানেই ব্যপ্তি বেশি। ওখানে বিশ্বের পুরনো একটি ডিবেটিং সোসাইটি রয়েছে; ওয়ার্ল্ড ডিবেটিং সোসাইটির আমি প্রেসিডেন্ট। আমি ওখানে একটা ক্রিকেট ক্লাবের প্রেসিডেন্ট প্রায় ১৪/১৫ বছর যাবত। আমার টিম এদেশে এসেছিল- সেই টিম স্কটল্যান্ডে ফিরে জানিয়েছে বাংলাদেশের মতো আতিথেয়তা তারা পৃথিবীর কোথাও পায়নি। এখানে তারা ১৭ জন ২০ দিন ছিল। সেদেশের অনেকেই আশ্চর্য হয়ে গেছেÑ তারা এখানে এতোদিন কীভাবে ছিল! একটি স্কটিশ ক্যান্সার রিসার্চ হাসপাতালের ফিন্যান্সিয়াল ডিরেক্টর আমি। এছাড়া ১৫ বছর যাবত আমি বাংলাদেশ ব্রিটিশ চেম্বার অব কমার্স (বিবিসিসি) ইউকের নির্বাচিত রিজিওনাল প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছি।
অর্থকণ্ঠ : আপনি দেশেও বেশ ক’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং এগুলোর উদ্যোক্তা; এ সব ব্যাপারে জানতে চাইছি।
আবদুর রউফ জেপি : আমার জন্মস্থান ঢাকার গুলশানের ডুমনি এলাকায়। আমার মায়ের নামে এই এলাকায় আমিরজান কলেজ এবং ডুমনি আমিরজান হাই স্কুল করেছি। এখানে অনেক ক্ষেত্রেই ‘ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ড’ মেনটেইন করা হয়। এই স্কুল ও কলেজ থেকে পাস করে অনেক শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যে গিয়েছে। তারা সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করছে। তাদের কেউ কেউ আমার প্রতিষ্ঠানেও কাজ করছে। ডুমনির অনেক ছেলে-মেয়েই আমার সহায়তায় ব্রিটেনে কাজ করছে। এখন এই গ্রামের চেহারায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমি এখানে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার চিন্তাভাবনা করছি।
অর্থকণ্ঠ : বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প খাত সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?
আবদুর রউফ জেপি : এদেশের গার্মেন্ট শিল্প অনেক ভালো করছে। এর মাধ্যমে শুধু বৈদেশিক মুদ্রাই অর্জিত হচ্ছে না, আমরা তাদের জন্যে বিদেশের মাটিতেও গর্ব অনুভব করি। তাদের বলি আমাদের দেশের জন্যেই তোমরা সস্তায় কাপড় কিনতে পারছো। উদ্যোক্তাদের খুব বেশি ভাবতে হয় না। বিদেশ থেকে মডেল আসে, ডিজাইন আসে আমাদের কর্মীরা দক্ষতার সাথে তা তৈরি করে। ইউকেতে পনের বছর আগে যে মূল্যের কাপড় কিনতো এখন মনে হয় তার চেয়ে সস্তায় তা ক্রয় করা যায়। আমি তাদের বলি দেখো, আমরা তোমাদের এ ক্ষেত্রে কত সহায়তা দিচ্ছি।
অর্থকণ্ঠ : এদেশের প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ লোক বিদেশে কাজ করছেন এবং তাদের প্রেরিত অর্থই দেশের অর্থনৈতিক খাতকে সমৃদ্ধ করছে তাদের ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি?
আবদুর রউফ জেপি : এ প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য হচ্ছে চীনের নন্দিত নেতা মাও সেতুং বলেছিলেন ‘ওয়ান হ্যান্ড ওনলি সাফিশিয়েন্ট টু ফিড ওয়ান মাউথ বাট ওয়ান ব্রেন ক্যান ফিড মিলিয়ন’। আমাদের দেশের অধিকাংশ যুবকই অদক্ষ জনশক্তি হিসেবে বিদেশে যাচ্ছে; এতে করে তারা মর্যাদাবান কোনো কাজ থেকে যেমন বঞ্চিত হচ্ছে তেমনি উপার্জনও কম করছে। আমি মনে করি, তাদেরকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। ৪০ বছর আগে চীনের অনেক লোককেই না খেয়ে থাকতে হতো। তারা তাদের অবস্থার অনেক পরিবর্তন ঘটাতে পেরেছে। আমরা যেমন ইউরোপের লোককে সস্তায় কাপড় পরাচ্ছি, চায়না ইউরোপকে সস্তায় ইলেকট্রনিক্স পণ্য ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে।
এক সময় চায়নার সাথে আমার ব্যবসা ছিল। স্কটল্যান্ড থেকে আমি চায়নায় বিশেষ করে সাংহাইয়ে অ্যালকোহল সরবরাহ করতাম। পুরো সাংহাইয়ে আমার এক্সপোর্ট ছিল। তারা কর্মঠ এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে। আমি মনে করি, আমাদের লোকদের যে দেশে পাঠানো হচ্ছে সেখান থেকে লোক এনে ট্রেনিং দিতে হবে। এতে করে তাদের বেতন হবে ৫/১০ গুণ বেশি।
অর্থকণ্ঠ : আপনি বারিধারার পরে ডুমনি এলাকায় ‘স্কটিশ ভিলেজ’ নির্মাণের চিন্তাভাবনা করছেন; এটি কী ধরনের হবে?
আবদুর রউফ জেপি : একটি সুন্দর মনোরম পরিবেশে নির্মিত হচ্ছে ‘স্কটিশ ভিলেজ’। স্কটল্যান্ড ও বাংলাদেশের আর্কিটেক্টদের দ্বারা এই ভিলেজের প্রতিটি বাড়ির ডিজাইন হবে একই রকম। স্কটিশ ভিলেজ হবে পর্যটকদের জন্যেও আকর্ষণীয়।
অর্থকণ্ঠ : বাংলাদেশে আবাসন শিল্প খাত সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?
আবদুর রউফ জেপি : অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই খাতে বেসরকারি উদ্যোক্তারাই প্রায় ৯০ ভাগ উন্নয়ন এনেছেন। এ জন্যে বেসরকারি খাতকে ধন্যবাদ দেওয়া প্রয়োজন। ঢাকা শহরের এই যে বিস্তৃতি এর মূলেও তারাই। আমি মনে করি, এ খাতের ‘ফরমালিন’ শ্রেণীর উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা হারিয়ে যাবে এবং প্রকৃত উদ্যোক্তারাই টিকে থাকবেন।
আমাদের দেশের বিল্ডিংয়ের নির্মাণ অনেক ক্ষেত্রে ওয়ার্ল্ডের যে কোনো স্থানের চেয়ে ভালো এমনকি ইউরোপিয়ানদের চেয়ে ভালো। কারণ, ওখানে ইট ফ্যাক্টরি থেকে বানিয়ে এনে জয়েন্ট করে দেওয়া হয়। আর এখানে মাটির সাথে সংযুক্ত ইট তৈরি হয়। ম্যাটারিয়াল কমোডিটি অর্থাৎ সিমেন্ট, রড, ব্রিকস ইত্যাদির মান উন্নীত করতে হবে। সেই সাথে যারা বিল্ডিং নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট তাদেরকে পরিপূর্ণ ট্রেনিং দিতে হবে। মানুষ এখন জায়গার দিকে নয়, ফ্ল্যাট ক্রয়েই বেশি আগ্রহী।
অর্থকণ্ঠ : এদেশের শিল্প সম্ভাবনা নিয়ে অনেকেই উচ্চাকাক্সক্ষী, আপনিও। কোনো শিল্প স্থাপনে উদ্যোগ নেবেন কি?
আবদুর রউফ জেপি : দেখুন, চীন কিভাবে এতোটা এগোতে পেরেছে সেই মূল্যায়ন আমাদের করতে হবে; তারা তাদের লোকদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্যতাসম্পন্ন করেছে এবং তারা এই জনশক্তিকে দেশের সম্পদে এবং বর্তমান বিশ্বে নিজেদেরকে অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে। আমাদেরও এভাবে এগোতে হবে।
অর্থকণ্ঠ : একজন সফল মানুষ হিসেবে আপনি কোন বিষয়টিকে বেশি প্রাধান্য দেন?
আবদুর রউফ জেপি : আমি বিশ্বাস করি, মানুষের মধ্যে স্বপ্ন থাকলে এবং তা পূরণের প্রচেষ্টা থাকলে তার বাস্তবায়ন ঘটবেই। আমি যেখানে যে উদ্যোগই নেই না কেন আমার মধ্যে প্রচুর আত্মবিশ্বাস জন্মে এটি বাস্তবায়িত হবেই। এর পেছনে আরো একটি বিষয় কাজ করে সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের সম্মান। আমি মনে করি, আমি বিশ্বব্যাপী যেখানেই যাই না কেন আমি বাংলাদেশের সন্তান, যে দেশটি মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে স্বাধীন হয়েছে, সেই দেশের জন্যে সম্মান বয়ে আনতে হবে। সেই ইচ্ছাই আমাকে প্রতিটি কাজে সফলতার অনুপ্রেরণা এনে দেয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button