প্রতিবেদন

বৈদ্যুতিক গ্রিড আধুনিকীকরণে দেশে প্রথম স্মার্ট গ্রিড আনলো এনকেসফট

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : এনামুল হক এনাম 

তার এই উদ্যোগের সাফল্য বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যোগ করবে কয়েক বিলিয়ন ডলার। আজ যেমন গার্মেন্টস খাত, জনশক্তি রপ্তানি খাত এবং ক্রিকেট এর জন্যে বাংলাদেশকে সবাই চেনে, জানে তেমনি- আইটি খাতের জন্যেও বাংলাদেশের পরিচিতির সীমানা আরো বৃদ্ধি পাবে। 

মেধাবী ও প্রতিভাবান আইটি বিশেষজ্ঞ  জন সাখাওয়াত  চৌধুরীর (তামান্না) জন্ম লক্ষ্মীপুরের মন্দারী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত পরিবারে। তার পিতার নাম মরহুম আলহাজ্ব সুজায়েত উল্লাহ্ চৌধুরী, মা মরহুমা আলহাজ্ব মোবাশ্বেরা বেগম চৌধুরী। তার পিতা ব্যবসার কারণে পরিবার পরিজন নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে আসেন। তিনি ট্রান্সপোর্ট ও কনস্ট্রাকশন খাতের ব্যবসা করতেন। একই সাথে তিনি নিজ এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন। জন চৌধুরী চট্টগ্রামের বিখ্যাত কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৭৯ সালে এসএসসি এবং চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৮১ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেন। সে সময়ের স্মার্ট তরুণ জন চৌধুরীর ইচ্ছা ছিল পেশাজীবনে পাইলট হবেন, আর বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলে ব্যারিস্টার হবে, এতে রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশব্যাপী সুনাম অর্জন করতে পারবে। বিধাতা যাকে বিশ্বের অন্যতম আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন তাকে কি ঐ সামান্য পরিচয়ের গ-িতে আবদ্ধ থাকলে চলে? 

এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের পরই তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে যুক্তরাষ্ট্র যান। প্রথমে পিতার ইচ্ছা পূরণের লক্ষ্যে  চৎব খধি পড়েন। সে সময় আইটি অর্থাৎ কম্পিউটার সায়েন্স ছিল নতুন সাবজেক্ট। সিদ্ধান্ত পাল্টালেন জন। তিনি আইটি বিষয়ে ভর্তি হলেন। ১৯৮৮ সালে তিনি ওকলাহোমা তলসা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইনফরমেশন টেকনোলজিতে গ্র্যাজুয়েশন করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি  ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, ডালাস থেকে বিজনেস ফিন্যান্সে এমবিএ ডিগ্রি এবং ২০০৫ সালে আমেরিকার প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট থেকে পিএমপি ডিগ্রি অর্জন করেন। 

তারুণ্যে উদ্দীপ্ত জন চৌধুরী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এনকেসফট কর্পোরেশন ইউএসএ এবং এনকেসফট লিমিটেড বিডির প্রতিষ্ঠাতা ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর। তিনি আমেরিকার রিয়েল এসেস্ট কোম্পানি নর্থ আটলান্টিক ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির ডিরেক্টর এবং টেক্সাস এর ডালাস ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান Frisk Green Energy এর চেয়ারম্যান। 

কলেজ জীবনে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। বিদেশেও অসংখ্য সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত। তিনি ইউটিসি নেটওয়ার্ক অব দ্য ফিউচার কাউন্সিল, Nareka Technology Council for Responsive Design এবং তলসা ইউনিভার্সিটি’র বোর্ড মেম্বার। তিনি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ারস অ্যান্ড আর্কিটেক্ট এবং ইউএসএ বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ টেক্সাস-এর সাবেক প্রেসিডেন্ট। তিনি সাউথ এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স আন্ডার ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট, ওয়াশিংটন ডিসি-এর প্রাক্তন ভাইস চেয়ারম্যান। বর্তমানে তিনি লক্ষ্মীপুরে সাজ্জাদ মেমোরিয়াল স্কুল পরিচালনা বোর্ডের সভাপতি।

বাংলাদেশি এই তরুণ সত্যিই ভাগ্যবান- একদিন তিনি যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছিলেন এখন তিনি সে প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বোর্ডের সদস্য। 

এক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী জন সাখাওয়াত  চৌধুরীর পেশা জীবন নানা অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। তিনি এনকে সফটওয়্যার, ডালাস টিএক্স প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৯৭ সালে। তিনি ২০১২-১৬ পর্যন্ত ডালাসের ফুজিৎসু আমেরিকা’র পরিচালক, ২০০৮-১২ পর্যন্ত KEMA Censuring inc. এর ভাইস প্রেসিডেন্ট, ২০০০-২০০৮ পর্যন্ত আইবিএম গ্লোবাল সার্ভিসেস ডালাসের ভাইস প্রেসিডেন্ট, ১৯৯২-১৯৯৭ পর্যন্ত Ernst & Young এর সিনিয়র ম্যানেজার ১৯৮৯-১৯৯২ পর্যন্ত Price Watshouse এর সিনিয়র কনসালট্যান্ট এবং ১৯৮৭-১৯৮৯ পর্যন্ত উইলিয়ামস ন্যাশনাল গ্যাসল টেলিকম-এর প্রোগ্রাম অ্যানালিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 

একজন আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে ইউএসএ গভর্নমেন্টসহ ২০ দেশের ৩০টিরও অধিক সরকারি সংগঠনের কার্যক্রমে তিনি দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ইউএসএ গভর্নমেন্ট ছাড়াও ব্রাজিল, পেরু, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ সরকারের ইলেকট্রিক ইউলিটি খাতসহ দেশের স্কয়ার গ্রুপ ও বেক্সিমকো গ্রুপের ইলেকট্রিক পাওয়ার প্ল্যান্ট, ইলেকট্রিক প্রিপেইড মিটার, সোলার প্ল্যান্ট, এনপিজি, জেভি কর্টিনারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছেন। 

তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শত শত হেলথ কেয়ার ইন্ডাস্ট্রি, এয়ারলাইনস সেক্টর, হসপিটালিটি সেক্টর, ফাইন্যান্সিয়াল ইন্ডাস্ট্রি, ইউটিলিটি অ্যান্ড টেলিকম ইন্ডাস্ট্রি, স্টেট অ্যান্ড লোকাল গভর্নমেন্ট এবং স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে আইটি ব্যবহারে কনসালট্যান্টের এর দায়িত্ব পালন করেছেন। জন সাখাওয়াত চৌধুরী বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, স্প্যানিস, ব্রাজিলিয়ান ও পতুর্গীজ ভাষা বলতে পারেন।

কথাবার্তা, আচার-আচরণে অত্যন্ত ভদ্র এবং অমায়িক জন সাখাওয়াত  চৌধুরী অর্থকণ্ঠকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে যা বলেন তা এখানে উপস্থাপন করা হলো: 

 

অর্থকণ্ঠ : আপনি পাইলট হবার ইচ্ছা পোষণ করতেন, আপনার পিতা চেয়েছিলেন ব্যারিস্টার হয়ে রাজনীতি করুন। আপনি কেন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে আইটি বিষয়ে পড়াশোনা করলেন? 

জন চৌধুরী : দেখলাম এ বিশ্ব প্রযুক্তির বিশ্ব। নতুন সাবজেক্ট বিশ্বব্যাপী এর চাহিদা বাড়বে। প্রচুর কাজের সুযোগ পাবো, নিজের দেশকেও এগিয়ে নিতে পারবো। আমার সেই ভাবনার বাস্তবায়ন ঘটছে। 

অর্থকণ্ঠ : আপনি  Tulsa University -তে পড়াকালীন অবসর মুহূর্তে কি ধরনের কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন- তার কিছু অভিজ্ঞতা-

জন চৌধুরী : আমি একটা হোটেলে ওয়েটার হিসেবে কাজ করতাম। ঐ ইউনিভার্সিটিতে আমি এবং আমার বড় ভাই এ দুজনেই ছিলাম বাংলাদেশি। আমি দেখেছি বিদেশিরা প্রচুর কৌতূহলী ছিল, ওরা দেশের নাম জিজ্ঞেস করতো- বাংলাদেশ চিনতে পারতো না- ইন্ডিয়া, চীন-হিমালয় ইত্যাদি বলে চিনাতাম। সেই রেস্টুরেন্টে আসা এক ভদ্রলোক আমাকে বেশ স্নেহ করতেন। তিনি আমাকে তার অফিসে ছাত্রাবস্থাতেই জুনিয়র প্রোগ্রামারের কাজ দেন।  প্রতিষ্ঠানটি ছিল উইলিয়ামস ন্যাশনাল গ্যাসল কোম্পানি। ভদ্রলোক এখানে ডিরেক্টর পদে ছিলেন। এখানে আমি বছরে ১৪,৫০০ ডলার পেতাম। বাঙালি ছাত্র হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমিই প্রথম আইটিতে গ্র্যাজুয়েশন করার সুযোগ পেয়েছি। আমার সত্যি ভালো লাগে- আমি এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড মেম্বার। এখানে কাজ করার সময় আমি ইতালিয়ান ভাষা রপ্ত করি। একবার এ প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রতিষ্ঠানটি ভিজিট করেন- আমি তাকে ইতালিয়ান ভাষায় সম্ভাষণ করি। কথা বলি। তিনি খুব বিমোহিত হয়ে আমাকে গুরুত্বপূর্র্ণ পদে দায়িত্ব দেন। 

অর্থকণ্ঠ : আপনি এদেশেরই সন্তান। বিশ্বের উন্নত দেশে বসবাস করেন। আপনি আগেও দেশে এসেছেন- এখনকার সাথে সে সময়ের পার্থক্য কতোটা? 

জন চৌধুরী : বিশাল পার্থক্য; ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে বাংলাদেশের। এক সময় এ দেশে শিল্প-কারখানা ছিল হাতে গোনা। এখন দেশব্যাপী প্রচুর শিল্প-কারখানা। কয়েক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ১৭ কোটি মানুষের রাষ্ট্র- অতি ছোট দেশ- তারপরও ইনশাআল্লাহ মানুষকে না খেয়ে মরতে হয় না। আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পেরেছি, আমাদের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে অসংখ্য নারী শ্রমিক কাজের সুযোগ পেয়েছেন। আমাদের জনশক্তির এক বিশাল অংশ বিদেশে কাজ করছেন। রপ্তানি এবং রেমিটেন্সের মাধ্যমে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। আমরা এখন উন্নয়নশীল আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি এবং আশা করা যায়, এই উন্নয়নধারা অব্যাহত থাকলে অচিরেই মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হতে সক্ষম হবো। 

অর্থকণ্ঠ :  বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির কতোটা উন্নয়ন ঘটেছে বলে মনে করেন? 

জন চৌধুরী : এক সময় বাংলাদেশকে তাচ্ছিল্য করা হতো ‘বটমলেস বাস্কেট’ বলে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে এদেশে অনেক মানুষ না খেয়ে মারা যেতো। এখন সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। আমরা এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এক সময়  বিদেশে আমরা সেভাবে সম্মান পেতাম না, কিন্তু এখন যে কোনো দেশই বাংলাদেশি হিসেবে সম্মানের চোখে দেখে। অনেকেই বাংলাদেশের উন্নয়নকে রোল মডেল হিসেবে বিশ্লেষণ করে। এসব শুনে বেশ অভিভূত হই। আমরা যেমন মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি- তেমনি চেষ্টা করে জাতির ভাগ্যেরও পরিবর্তন ঘটাতে পারছি। তবে এখন পর্যন্ত প্রযুক্তিগতভাবে আমরা বেশিদূর এগোতে পারিনি। তবে সরকারি এবং বেসরকারিভাবে আমরা সেই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। 

ক্রীড়াক্ষেত্রে আমরা বেশ এগিয়েছি। ক্রিকেটের সাফল্যও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ইতিবাচক অবস্থানে নিয়ে এসেছে। 

অর্থকণ্ঠ :  বাংলাদেশের বর্তমান শেখ হাসিনার সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমকে আপনি কি ভাবে দেখছেন? 

জন চৌধুরী : জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের মধ্যে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি আমাদের উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, তিরিশ লাখ মানুষের প্রাণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আমরা দেশ স্বাধীন করতে সক্ষম হয়েছি। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সুদৃঢ় নেতৃত্বে দেশ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে চলেছে। হরতাল ও ধ্বংসাত্মক রাজনীতিতে এদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। এখন তার অবসান ঘটছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে কোনো কাজে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তিনি যথেষ্ট সাহসী ও স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করেন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন আমরা পারি। মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন বাংলাদেশ মানবিক রাষ্ট্র। এ সব কারণে তাঁকে বিশেষভাবে শ্রদ্ধা করি। তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করি। 

অর্থকণ্ঠ : আমাদের সম্ভাবনার পাশাপাশি সমস্যারও অন্ত নেই। আপনার বিবেচনায় মূল সমস্যাগুলো কি কি?  

জন চৌধুরী : আমি অন্য দিকে যাবো না- শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরছি। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে হবে। শিক্ষার হার বাড়লেই শিক্ষিত জাতি বলা যায় না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সেই কেরানী সৃষ্টির শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। এদেশের এক কোটিরও বেশি মানুষ বিদেশে চাকুরি কিংবা ব্যবসা করার জন্য যায়। কিন্তু অন্য দেশের তুলনায় আমাদের শ্রমিকরা এখনো অদক্ষ। ফলে তাদের পারিশ্রমিক কম। যদি শিক্ষা ব্যবস্থায় এই দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়- তাহলে অনেকেই  ‘আত্মকর্মসংস্থান’ গড়ে তুলতে পারবে। চাকুরি করবে না বরং অন্যদের চাকুরি দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। 

এ ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোয়ালিটিসম্পন্ন ছাত্র-ছাত্রী বেরিয়ে আসছে না। অনেকে শুধু সার্টিফিকেট লাভেই সন্তুষ্ট হচ্ছে। কেউ কেউ ভাবে সার্টিফিকেট মানেই যোগ্যতা। কিন্তু কাজে নেয়ার পর দেখা যায়- তাদের অযোগ্যতা কত। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্ববানদের এ ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে। 

অর্থকণ্ঠ : এ প্রসঙ্গে আপনার কোনো অভিজ্ঞতার কথা বলবেন কি?

জন চৌধুরী : দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে সকল ছাত্র-ছাত্রী আইটিতে পাস করছে  তাদের অধিকাংশই নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারছে না। আমরা যখন ইন্টার্ন হিসেবে বা কাউকে নিয়োগ দিচ্ছি, দেখা যায় তারা সেভাবে রেসপন্স করতে পারে না। অর্থাৎ  যেভাবে শিক্ষা নেয়া উচিত ছিল- সেভাবে মনোযোগ দিয়ে শিক্ষা নেয়নি। ফলে অনেককেই কাজে নেয়া যায় না। প্রযুক্তি কখনো কাজে এসে শেখানোর বিষয় নয়। কাজ তাকে দক্ষ করে গড়ে তুলবে- ছাত্রাবস্থায়ই তাকে শিখতে হবে। আমার মনে হয়, এদের অনেকেই শিক্ষা নয়, সার্টিফিকেটের প্রতিই বেশি আগ্রহী। 

অর্থকণ্ঠ :  এ ক্ষেত্রে যোগ্য ছাত্র-ছাত্রী প্রস্তুতির জন্যে আপনার প্রস্তাবনা কি? 

জন চৌধুরী : এ জন্যে ‘বুট ক্যাম্প’ করা যায়। ছাত্র-ছাত্রীরা এখানে ৩ মাস পড়বে- প্রশিক্ষণ নেবে। এতে করে নিজেদের যোগ্যতা অর্জিত হবে। যে কোনো প্রতিষ্ঠানে তারা মেধার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হবে। এটি ঠিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ। আমরা সরকারকে এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব দিয়েছি। সরকারের সহযোগিতা পেলে আমরা তার বাস্তবায়ন করতে পারব। 

অর্থকণ্ঠ : আপনারা বেসরকারি আইসিটি পার্ক গড়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন- এটা দেশের জন্যে অর্থনৈতিকভাবে কতোটা সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে মনে করেন? 

জন চৌধুরী : এদেশে আইসিটি পার্ক গড়ে উঠলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চেহারা পাল্টে যাবে। আজ যেমন গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি করে প্রচুর আয় পাচ্ছি- তখন আউট সোর্সিংয়ের কাজ করে বাংলাদেশে কয়েক বিলিয়ন ডলার আয়ের সুযোগ পাবে। কিন্ত আইসিটি পার্ক প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না- এটা চালাতে গেলে দক্ষ আইটি কর্মী দরকার- তা আমদের নেই।  আগেই বলেছি, এখানে সবাই সার্টিফিকেট প্রাপ্তির শিক্ষাকেই গুরুত্ব দেয়- প্রকৃত শিক্ষা নয়। ফলে আইসিটি পার্ক গড়ে উঠলেও দক্ষ আইটি কর্মীর অভাবে দেশ খুব লাভবান  হতে পারবে না এবং উদ্যোক্তারাও বিপদে পড়বেন। 

অর্থকণ্ঠ : সরকার একটি গ্রুপকে বেসরকারি আইসিটি পার্ক করার জন্যে বিশাল জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে তা কতোদূর এবিষয়ে বলবেন কি?

জন চৌধুরী : এ ব্যাপারে আমার কিছু বলা ঠিক হবে না। তবে অনেকেই বলেন- তারা খুব গুরুত্ব নিয়ে কাজ করছেন না। ফলে আইসিটি পার্ক সেই তিমিরেই আছে। আমি মনে করি, এক্ষেত্রে সরকারের যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া দরকার। কারণ, সরকার যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে- তার বাস্তবায়নে আইটি খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  

অর্থকণ্ঠ :  দেশে অনিয়ম, ঘুস, দুর্নীতির পরিমাণ কিছুতেই কমছে না- আপনার পরামর্শ কি? 

জন চৌধুরী : আমি যেহেতু আইটি নিয়ে কাজ করি সে ক্ষেত্রে বলবো- আইটির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সরকারি সকল কাজ যখন আইটিভুক্ত হবে তখন আর দুর্নীতির সুুযোগ থাকবে না। তবে এক্ষেত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা জোরদার করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে।

অর্থকণ্ঠ : আমরা এগিয়ে যাচ্ছি কিন্তু একই সঙ্গে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় বেড়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম ঘুস, দুর্নীতি বেড়েছে এসব কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়? 

জন চৌধুরী : আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিরো টলারেন্স এর কথা বলেছেন, সেটির সূত্র ধরে বলছি- এক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স অনুযায়ী যারা কাজ করতে ব্যর্থ হবে- তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।  এজন্যে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। পারিবারিকভাবেও সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি। কারণ সন্তানদের শিক্ষা শুরু পরিবার থেকে। তাদের মধ্যে নৈতিকতাবোধ জাগ্রত করে দিতে হবে। আমাদের শৈশব সময়ে আমরা বাবা-মা ও পরিবার থেকে যে নৈতিকতা শিখেছি- এখন তার যথেষ্ট অভাব। 

অর্থকণ্ঠ : বাংলাদেশকে অনেকেই অমিত সম্ভাবনার দেশ হিসেবে বলে থাকেন; আপনিও নিশ্চয় তা বিশ্বাস করেন। এর জন্যে আমাদের করণীয় কি?

জন চৌধুরী : এ জন্যে আমাদের সময়োপযোগী  সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এই পরিকল্পনা হতে হবে একশ বছরের। আমাদের লোকসংখ্যা বাড়বে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। দেশে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে সরকার পরিকল্পিতভাবে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা বিদ্যুৎ সঞ্চালন নিয়ে কাজ করছি। এনকেসফট বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নের সহযোগী হিসেবে অনন্য ভূমিকা রাখছে। বৈদ্যুতিক গ্রিড আধুনিকীকরণে দেশে প্রথম স্মার্ট গ্রিড এনেছি আমরা।

অর্থকণ্ঠ :  আপনার জীবনের কোনো বেদনাময় ঘটনা! 

জন চৌধুরী :  বাবা-মা’র মৃত্যুতে অনেক কষ্ট পেয়েছি। তবে আমার এক ছোট ভাই সাজ্জাদ, সে বিইউটি তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল- বোনের বাসায় বেড়াতে গিয়ে পুকুরের পানিতে ডুবে মৃত্যু ঘটে। সত্যি সেটি ছিল আমাদের পরিবারের জন্যে অসহনীয় শোকাহত ঘটনা। সে সাঁতার জানতো। ভগ্নিপতি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। উপজেলা ভবনের পুকুরে গোসল করতে নামে আমার ভাই। ও যখন ডুবতে থাকে তখন পাড়ের লোকজন ভেবেছে ও পানিতে খেলা করছে- আমরা তার স্মৃতি রক্ষার্থেই এলাকায় ‘সাজ্জাদ মেমোরিয়াল স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেছি। আমি সে স্কুল পরিচালনা পরিষদের সভাপতি।

অর্থকণ্ঠ :  আপনাদের এনকেসফট এর মূল  বৈশিষ্ট্য কি?

জন চৌধুরী : আমাদের কাজ বহুমাত্রিক। তবে কনসাল্টিং সার্ভিসের ক্ষেত্রে আমাদের সেবার মান অনেক উন্নত। Innovation, Integrity, Intensity এর ক্ষেত্রে আমরা অনন্য। আমরা বিশ্বাস করি দক্ষতা ও আন্তরিকতার সাথে কাজ করলে ভুল হবার আশঙ্কা নেই। আমরা সেভাবেই দক্ষ কর্মীদের দ্বারা কাজ করি। ১৯৯৭ সাল থেকে আমরা বিশ্বব্যাপী ২০টিরও বেশি দেশে মানসম্পন্ন কাজ উপহার দিয়েছি। 

বর্তমানে আমরা রোগীদের মেডিক্যাল রেকর্ড-এর কাজ করছি। 

অর্থকণ্ঠ : ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন- আপনার প্রস্তাবনা কি? 

জন চৌধুরী : যে সময়ে দেখবো সরকারের প্রতিটি সেক্টরই আইটি খাত দ্বারা আবৃত হয়েছে- তখন এর যথার্থ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। আমি বিশ্বাস করি সরকারের সাথে সরকারি ও বেসরকারি সকলকেই উদ্যোগী হতে হবে। 

অর্থকণ্ঠ :  এদেশের একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার জীবনের প্রত্যাশা কি? 

জন চৌধুরী : দেশের উন্নতি হলেই হবে না- দেশের মানুষের মানবিক গুণাবলিরও বিকাশ হতে হবে। আমি সেই দিনের আশায় রয়েছি যেদিন আমাদের বাংলাদেশ সুখী সমৃদ্ধ এক মানবিক রাষ্ট্রে হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভে সক্ষম হবে। আমরা হতে পারবো মহান মুক্তিযুদ্ধের গর্বিত অহঙ্কার। অর্থকন্ঠ ডেস্ক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button