প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আজকের দিনটি শুধু বাংলাদেশের জন্য, আমার ব্যক্তিগত জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ। আমি খুব আনন্দিত হতাম যদি স্বশরীরে উপস্থিত থাকতে পারতাম। করোনা মহামারির কারণে সেটি সম্ভব হলো না। তবে দ্রুতই আমি এখানে আসবো। রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের ফলে বিশ্বে পারমাণবিক যুগে বেশ শক্ত অবস্থানে এলাম আমরা। আর সেটি কিন্তু আমরা পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার করে।’ ১০ অক্টোবর দুপুর পৌনে ১২টার দিকে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পাবনার রূপপুরে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল যন্ত্র রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেল বা পরমাণু চুল্লিপাত্রের প্রথম ইউনিট স্থাপন কাজের উদ্বোধন শেষে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গেও পাকিস্তান আমলের বঞ্চনার ইতিহাস জড়িত। তারা ধোঁকাবাজি করেছে। তারা শুধু জমি বরাদ্দ করে। আর প্রকল্পটি পশ্চিম পাকিস্তানে সরিয়ে নেয়। জাতির পিতা স্বাধীনতার পরপরই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন। এর ফলে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি এজেন্সি-আইএইএ’র অনেক নির্দেশনা মেনে চলতে হচ্ছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০১৩ সালে রাশিয়া সফরে প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে আমার আলোচনা হয়। বিশেষ করে পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জননিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই আমরা এই প্রকল্প শুরু করি। এই পারমাণবিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানীরাও নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। সবকিছু ভালোভাবে পরিচালনা করতে আমরা তাঁদেরকে রাশিয়া ও ভারতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান ও বিশেষ অতিথি ছিলেন রাশিয়ার পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জিয়াউল হাসান।
ইয়াফেস ওসমান বলেন, ‘আজ জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিন। পারমাণবিক প্রকল্প বাস্তবায়নে জাতির পিতা ও তাঁর কন্যার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। রাশিয়া বাংলাদেশের দুখের দিনের বন্ধু। রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের কারণে বিশ্ব সভ্যতায় অনন্য অবস্থায় উন্নীত হলো বাংলাদেশ। রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় নির্মিত হচ্ছে রূপপুর প্রকল্প।’
রুশ পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক এলেক্সি লিখাচেভ বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎ নির্মাণ বেশ জটিল একটি বিষয়। রুশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের প্রমাণ ভিভিইআর রিঅ্যাক্টর। যেটি রূপপুরে নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণের পর এটি পরিচালনার জনশক্তিকেও প্রশিক্ষিত করে দিচ্ছে বাংলাদেশ। পারমাণবিক প্রযুক্তি ক্লিন এনার্জির একটি উত্তম দৃষ্টান্ত। এছাড়া রূপপুরের কারণে ২০ হাজার কর্মসংস্থান হবে। এটি শুধু স্থানীয় জীবনমানই পরিবর্তন করবে না বরং জিডিপি বৃদ্ধিতেও অবদান রাখবে। বাংলাদেশের পারমাণবিক প্রকল্প নির্মাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে রোসাটম। সময়মতো এটির নির্মাণ শেষ করতে রাশিয়া সম্ভাব্য সবকিছু করবে।’
প্রকল্প পরিচালক ও পরমাণু বিজ্ঞানী ড. মো. শৌকত আকবর বলেন, আইএইএ’র গাইডলাইন অনুযায়ী সব নির্দেশনা মেনেই আজকে রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপন করা হচ্ছে। রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের পরপরই আগামী নভেম্বরে স্থাপন করা হবে স্টিম জেনারেটর। এর মাধ্যমে প্রথম ইউনিটে সব ধরনের নিউক্লিয়ার যন্ত্রপাতি বসানো শেষ হবে।
প্রকল্প পরিচালক বলেন, প্রতিটি যন্ত্র সর্বোচ্চ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে নকশা অনুযায়ী বসানো হচ্ছে। এজন্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সনদ নিতে হয়েছে এবং কাজের মান দেখে তারা সন্তোষ প্রকাশও করেছে।
প্রসঙ্গত, ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচের এই প্রকল্পে নব্বই ভাগ টাকা ঋণ দিয়েছে রাশিয়া। একই সঙ্গে আন্তঃরাষ্ট্রীয় কয়েকটি চুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে রূশ ঠিকাদার এটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩-এ প্রথম ইউনিট থেকে ১২০০ মেগাওয়াট এবং একই পরিমাণ বিদ্যুৎ দ্বিতীয় ইউনিট থেকে পাওয়া যাবে ২০২৪ সালে।
দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিপাত্র উদ্বোধন
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল যন্ত্র পারমাণবিক চুল্লিপাত্র (রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল-আরএনপিপি) স্থাপন কাজের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ১০ অক্টোবর গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এটি উদ্বোধন করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পারমাণবিক চুল্লিপাত্র বসানো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর ফলে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েই এগিয়ে যাবে। ওই কেন্দ্রের যে যন্ত্রে নিউক্লিয়ার ফুয়েল (পারমাণবিক জ্বালানি) ইউরেনিয়াম থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়, তার মূল কাঠামো হচ্ছে এই বিশেষ যন্ত্র, পরমাণু চুল্লি)। এটিকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের হৃদপি- বলা হয়।
রূপপুর প্রকল্প দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিট থেকে ১২শ মেগাওয়াট এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয় ইউনিট থেকেও ১২শ মেগাওয়াট অর্থাৎ মোট ২ হাজার ৪শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান। উদ্বোধনি অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব জিয়াউল হাসান স্বাগত বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়।
পারমাণবিক প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক অ্যানার্জি অ্যাসোসিয়েশন (আইএইএ) গাইড লাইন অনুযায়ী এবং সংস্থাটির কড়া নজরদারির মধ্য দিয়েই রূপপুর প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (আরএনপিপি) প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন।
ইউনিট-১ এর ভৌত কাঠামোর ভেতরে রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় সব ধরনের পারমাণবিক যন্ত্রাংশ স্থাপন সম্পন্ন হবে। এর ফলে এই ইউনিটের রিঅ্যাক্টর ভবনের ভেতরের কাজ প্রায় শেষ হবে। ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।
রূপপুর প্রকল্পের রিঅ্যাক্টরসহ যাবতীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করা হয়েছে রাশিয়াতে। সেখানকার বিভিন্ন কারখানায় এই যন্ত্রগুলো তৈরি করে সমুদ্রপথে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। প্রথম ইউনিটের ভারী যন্ত্র ৪টি স্টিম জেনারেটর, প্রেসারাইজার, হাইড্রো একমোডেটর ইতিমধ্যেই রূপপুরে এসে পৌঁছেছে। এই ইউনিটের রিঅ্যাক্টর গত বছর অক্টোবরে রাশিয়া থেকে দেশে এসে পৌঁছায় এবং নভেম্বরে সেটি রূপপুরে নেওয়া হয়। এ বছর আগস্টে দ্বিতীয় ইউনিটের রিঅ্যাক্টর এসেছে। এই ভারী যন্ত্রগুলো রাশিয়ার ভলগা নদী থেকে প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার সামুদ্রিক পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের মোংলা বন্দর দিয়ে রূপপুরের কাছে পদ্মায় এসে পৌঁছায়। এ রিঅ্যাক্টর ভেসেলের ওজন ৩৩৩ দশমিক ৬ টন। এ রিঅ্যাক্টর বানাতে দুই বছরের বেশি সময় লাগে।
অর্থকণ্ঠ ডেস্ক


