
দেশের মঙ্গলের জন্য সবাই মিলে কাজ করতে চাই : এম এ মান্নান
চরবাসীদের জীবন মান উন্নয়নে চারটি বিষয় নিয়ে কাজ করছে ফ্রেন্ডশিপ : রুনা খান
ফ্রেন্ডশিপ পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে চমকপ্রদ কাজ করছে : ইয়োহানেস ভন ডার ক্লাও
চরের মানুষের জীবন-জীবিকা নিয়ে ‘ফ্রেন্ডশিপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রুনা খান বলেছেন, দেশের চরঞ্চলের বিভিন্ন সমস্যায় থাকা মানুষ, যারা অনেক কষ্টে থাকে তাদের কি ভাবে একটুখানি ভালো রাখা যায় তার জন্য অনেক ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ফ্রেন্ডশিপ। এর মধ্যে চারটি প্রমিস নিয়ে তিনি বলেন, যেমন সেভিং লাইফ, ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন, পোভার্টি ইভিলিয়েশন, এমপাওয়ারমেন্ট- এই চারটি বিষয় তুলে ধরেছে, যা মানুষের জীবনে একান্ত প্রয়োজন। মানুষ যেন সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে পারে- দেশে এই চারটি বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করে ফ্রেন্ডশিপ।

দেশের বিভিন্ন চর এলাকার নান সংকট ও সম্ভাবনা বিষয়ে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আরটিভির ভিন্নধর্মী আয়োজন ‘চরে জীবন যেমন’ সম্প্রতি এ আয়োজনে আলোচনায় অংশ নেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এবং বেসরকারি সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রুনা খান। ইউএনএইচসিআর-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ইয়োহানেস ভন ডার ক্লাও বিডিও কনপারেন্সে অংশ নেন।
সরকার তার প্রত্যেকটি অঞ্চলের জন্যে নাগরিক সুবিধাগুলো দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যারা চরে বসবাস করে, চর অঞ্চলের মানুষের জন্য সরকার কী ধরনের পরিকল্পনা নিয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, আমরা গোটাদেশ নিয়ে পরিকল্পনা নিয়েছি; তবে এই পরিকল্পনার মধ্যেও বিভিন্ন অধ্যায় থাকে কারণ সকল মানুষকেতো আর সমানভাবে দেখা যাবে না। সেখানে তিনি গ্রাম এবং শহর আলাদাভাবে বিভক্ত করে বলেন, গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র বা নিম্নবিত্ত। গ্রামের নাগরিকগণ সুযোগ সুবিধা শহরের তুলনায় কম পায়। যদিও আমরা ইদানীং বৈষম্য অনেকটা কমিয়ে এনেছি। তিনি চরবাসীদের নিয়ে বলেন, মানুষের জীবনটাই সাময়িক। তিনি পুরো বাংলাদেশকে চরের সাথে তুলনা করে বলেন, শুধু বর্তমানের চর- মেঘনা, যমুনা, পদ্মা, তিস্তা, সুরমাই নয়- আমরা সবাই মূলত চরের বাসিন্দা। আমাদের জীবনই তৈরি হয়েছে মূলত চর থেকে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কুশলী নানা পদক্ষেপ এবং তাঁর প্রজ্ঞাময় কর্মসূচির ফলে আমাদের জীবনে বিশাল বাস্তব পরিবর্তন এসেছে। তবে আমি স্বীকার করবো- সবাই সমান সুযোগ পান না। চরের বর্তমান বাসিন্দা যারা আছেন তারা সমান সুযোগ সুবিধা পান না কারণ, তাদের ঐখানে যাওয়ার এক্সেস যেটা সেটা ডিফিক্যাল্ট। তাদের জন্য সরকার থেকে মিত্র বা বন্ধু কেউ হতে পারে না। তবে তিনি সেখানে ফ্রেন্ডশিপ-এর মতো সংস্থার কথা বলেছেন। যা অস্বীকার করা অন্যায়। তিনি বলেন, বিভিন্ন এনজিও যারা সেখানে কাজ করেছে তাদের থেকে শতগুণ বেশি কাজ করেছে সরকার। কিন্তু সেটাও সার্বিক প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। দেশের মঙ্গলের জন্য আমাদের আরো অনেক কাজ করতে হবে।

চরের মানুষদের জন্যে ফ্রেন্ডশিপ যে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে সে প্রসঙ্গে রুনা খান বলেন, আমরা যখন চরের মানুষদের নিয়ে কথা বলি, তাদের মধ্যে বুঝায়- পদ্মা, মেঘনা, যমুনা চরাঞ্চলের মিলিয়ন মানুষ, কয়েক লক্ষ মানুষ। সেখানে তিনি তুলে ধরেছেন যে চরের মানুষ সঠিক এক্সেস পান না। কারণ সেখানে যানবাহনের অভাব এবং এমন অনেক অঞ্চল আছে সেখানে একটা নৌকাও পাওয়া যায় না। মানুষের ছোট ছোট সমস্যা যেমন চিকিৎসার জন্যেও সঠিক সময় কোনো কিছুই তারা পাচ্ছে না। সেখানে আরো অনেক সমস্যা আছে যার মধ্যে বাল্য বিবাহ, মেয়েদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া যা নিত্যদিন লেগেই রয়েছে।
রুনা খান বলেন, মানুষের সকল সমস্যা দেখতে হবে, শুধু একটি সমস্যা নিয়ে পড়ে থাকলে তা সমাধান করা সম্ভব হবে না। একটি সমস্যা সমাধান করলে তাদের জীবন মানের তেমন কোন পরিবর্তন হবে না কারণ তাদের নিত্যদিন হাজারো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এব্যাপারে তিনি বলেন, সবাই মিলে একটা সিস্টেম নিয়ে একত্রে কাজ করতে হবে। মানুষের এসব সমস্যার জন্য ফ্রেন্ডশিপ প্রথমে ঐবধষঃয ঈধৎব ঝুংঃবসং চালু করে। যার মধ্যে জাহাজ সেবা, ৬৮০টি মোবাইল ক্লিনিক; কিছু ল্যান্ড হসপিটাল আছে। আমরা যেটা করি কমিউনিটি থেকে কমিউনিটি-বেজড এক্সেস তৈরি করি আর ওদের মোবাইল সকল স্বাস্থ্য কেয়ারে লিংক করে দিয়ে থাকি। কিন্তু আমি এটাকে পর্যাপ্ত মনে করি না।
রুনা খান বলেন, চরের অধিবাসীরা সবচেয়ে বেশি যে সমস্যার মাঝে পড়ে থাকে তার মধ্যে সব থেকে বড় সমস্যা হলো ক্লাইমেট। আমরা এখন ১০০% ক্লাইমেট নিয়ে কাজ করছি। কারণ, ক্লাইমেটের প্রবণতা এখন আগের তুলনায় অনেক গুণ বেড়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, চরের মানুষের যখন যে সমস্যা হয়- আমরা তাদের সমস্যা সমাধানে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকি। এটা সরকারের একটা বড়ো দায়িত্ব তাদের সমস্যার সমাধান করা। আমরা মানুষের সমস্যা হলে তার সমাধান দিয়ে থাকি। কিন্তু আমাদের প্রধান কাজ হলো সরকারের সিস্টেমের সাথে লিংক করে দেওয়া। নাগরিক যে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া দরকার আমরা সরকারের সিস্টেমের সাথে লিংক দিয়ে থাকি। কারণ, সাধারণ মানুষের জন্য এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
চর অঞ্চলের অসহায়, দরিদ্র মানুষের জন্য বেসরকারি এনজিওরা যেভাবে কাজ করছে, তাদের এই সহযোগিতা সম্পর্কে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, কেউ একা কিছু করতে পারে না, সমগ্র জাতিকে সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। তাদের সবাইকে নিয়েই আমরা কাজ করতে চাই।
ফ্রেন্ডশিপ নিয়ে ইউএনএইচসিআর-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ইয়োহানেস ভন ডার ক্লাও বলেন, ফেন্ডশিপ পিছিয়ে পড়া মানুষকে সাহায্যের জন্য নতুন ও চমকপ্রদ সব উপায় নিয়ে এসেছে এবং কমিউনিটিরও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছে। ফ্রেন্ডশিপ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রুনা খান রোহিঙ্গা নিয়ে জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তিনি বলেন, আমি একজন বিদেশি, কিন্তু আমি এখানে এসে শিখেছি কীভাবে চরে বসবাস করেও মূল ভূখ-ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব। আর ফ্রেন্ডশিপ আমাদেরকেও বুঝতে সাহায্য করছে, কীভাবে আমরা ভাসানচরের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সত্যিকার চাহিদাসমূহ চিহ্নিত করতে পারি। আর সেই সাথে কীভাবে চরসমূহ এবং মূল ভূখন্ডের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ রক্ষা করতে পারি। ফলে, সকলকে একসাথে নিয়ে বসবাসের একটি সুন্দর পরিবেশ আমরা তৈরি করতে পারবো বলে আশা করি।
চরবাসীর জন্য ফ্রেন্ডশিপ-এর জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে রুনা খান বলেন, আমি গর্বিত এই বছর কারণ আমাদের তিনটি মেয়ে তিনটি বাচ্চা, যে একটি কুড়েঘরে থাকতো এবং সে ঘরে পিতা-মাতা এবং গরু-ছাগল নিয়ে এক সাথে বসবাস করতো। এমন অবস্থায় আমাদের স্কুলে পড়াশোনা করলো এবং তিনটা মেয়ে স্কলারশিপ পেয়ে এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে অ্যাডমিশন নিয়েছে। আমি সরকারকে অনুরোধ করবো, ইনোভেশন, এক্সেলিটি এসব বিষয় দেখতে এবং অতিরিক্ত বাজেট করতে হবে। বাংলাদেশকে মধ্যআয়ের দেশে রূপান্তর করতে হলে সকল মানুষকে নিয়ে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি পরিকল্পনামন্ত্রীর কথা উল্লেখ করে বলেন, আমরা সবাই এক সাথে কাজ করে এসব সমস্যা সমাধান করতে পারবো।
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, গ্রাম হবে শহর, গ্রাম এবং শহরের মধ্যে অন্যায়ভাবে তফাৎ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা গ্রাম এবং শহরের মানুষ যেন সমান সুযোগ-সুবিধা পায় তা নিয়ে কাজ করবো। গ্রামের স্কুল, কলেজ, রাস্তাঘাট এবং কমিউনিটি ক্লিনিক নিয়ে কাজ করবো যাতে সাধারণ মানুষ স্বল্প মূল্যে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সেবা পেতে পারে। গ্রামে বিশুদ্ধ পানি শতভাগ নিশ্চিত করা জরুরি। ওভার হেড ওয়াটার নিশ্চিত করা হবে সারা বাংলাদেশে। ইতোমধ্যে দেখেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গ্রাম জনপদে প্রধান যে সমস্যা সেটা হলো বিদ্যুৎ- তা ১০০% নিশ্চিত করেছেন। এখন দেশে এমন কোনো ঘর পাওয়া যাবে না যেখানে বিদ্যুৎ নেই।
এম এ মান্নান ফ্রেন্ডশিপ-এর কার্যক্রম এবং এর কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আমরা তাদের কাছ থেকে শিখছি এবং তারাও আমাদের কাছ থেকে শিখছেন। জনকল্যাণে একই কাজ আমরা করছি।
অর্থকন্ঠ প্রতিবেদক


