শিক্ষকতার মহান পেশার সাথে জড়িত থেকে একজন বাংলাদেশি আমেরিকান নারী ব্যক্তিত্ব থেকে ব্যক্তিত্বে পরিণত হবার গৌরব অর্জন করেছেন নাঈমা খান। তিনি নিউ ইয়র্কের আলোকিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘খান টিউটরিয়াল’এর চেয়ারপার্সন। অমিয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই শিক্ষাবিদ। ইমিগ্র্যোন্ট কমিউনিটিতে শিক্ষার উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছেন। তার সাফল্যের ঝুড়িতে যুক্ত হয়েছে অনেক পদক, অনেক সম্মাননা। ২০১৮ সালে ন্যাশনাল এ্যাকশন নেটওয়ার্কের অনুষ্ঠানে কংগ্রেসম্যানসহ স্টেট সিনেট, এসেম্বলি, নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিল এবং লং আইল্যান্ডের ন্যাসাউ কাউন্টি এক্সিকিউটিভদের কাছ থেকে এক ডজনেরও বেশি প্রোক্লেমেশন, সাইটেশন, সার্টিফিকেট, ক্রেস্ট ও ট্রফি পেয়ে শুধু নিজে নন, বাংলাদেশকেও সম্মানিত করেছেন নাঈমা খান। কারণ, তার শেকড়সূত্রতো বাংলাদেশ। এধরনের কৃতিত্বপূর্ণ কার্যক্রমের স্বীকৃতিতেই বাংলাদেশ কমিউনিটি থেকে একজন মাত্র জাতিসংঘের শুভেচ্ছা দূত হওয়ার গৌরব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি এই নাঈমা খান।

২০১৮ সালে তাকে শিক্ষার প্রসারে ভূমিকা রাখার জন্যে এই অবৈতনিক কিন্তু প্রেস্টিজিয়াস পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এ বছর তিনি আরও একটি সম্মানজনক পুরস্কার ক্রিস্টাল ট্রফি লাভ করেন আমেরিকার উল্লেখযোগ্য মানবাধিকার সংগঠন ন্যাশনাল এ্যাকশন নেটওয়ার্ক থেকে। এই অনুষ্ঠানে ফেডারেল স্টেট, সিটি ও কাউন্টি থেকে তাকে ১২টি প্রোক্লেমেশন দেয়া হয়। এবং তিনি ইউনেস্কো সম্মাননা লাভ করেন। এই অ্যাওয়ার্ড এবং স্বীকৃতি বাংলাদেশ কমিউনিটি থেকে এর আগে কেউ পাননি।
বাংলাদেশের এক শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষা ক্ষেত্রে যারা মশাল জ্বালিয়ে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে জাতিকে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করছেন তেমনি একটি পরিবারে জন্ম নিয়েছেন নাঈমা খান। বিয়েও হয়েছে তেমনি একটি আলোকিত পরিবারে। তার শ্বশুর খানে আলম খান চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষা প্রসারে তাঁর ভূমিকা অনেক। তাঁর পুত্র ড. মনসুর খান এবং পৌত্র ডা. ইভান খান, অর্থাৎ নাঈমা খানের পুত্র সেই শিক্ষার আলো বহন করে চলেছেন। নাঈমা খানের ছোট বোন ঢাকার প্রতিষ্ঠিত একটি সংগীত স্কুলের শিক্ষক এবং বড় বোন বিখ্যাত স্কলাস্টিকা স্কুলের ডিরেক্টর এবং শিক্ষক। আর নাঈমা খান নিজেও সংগীত চর্চা করেন।

তিনি স্বামী ড. মনসুর খানের সাথে আমেরিকায় এসে নিজেকে গুণী গানের শিল্পী হিসেবে যতোটা না তুলে ধরেছেন তার চেয়েও বেশি ভূমিকা রেখেছেন শিক্ষা বিস্তারে। তিনি উপলব্ধি করেছেন, আমেরিকার মতো একটি দেশে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ছেলে ও মেয়েরা যদি মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণ না করে তবে মূলধারা থেকে পিছিয়ে যাবে। তাই তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছেন প্রবাসী শিশুদের শিক্ষা বিস্তারে।
নাঈমা খানের অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ারও বেশ উল্লেখযোগ্য। তিনি এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর সোভিয়েত ইউনিয়নে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। বাংলাদেশে থাকাকালীন গান গাইতেন, রেডিওতে উপস্থাপনা করতেন সুললিত কণ্ঠে। তার বিয়ে হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপনার সাথে যুক্ত মনসুর খানের সাথে। তরুণ অধ্যাপক মনসুর খান পিএইচডি করার জন্যে নিউইয়র্ক এলে তিনিও ১৯৮৫ সালে তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এবং বসে না থেকে এখানকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সাথে জড়িত হন। তিনি নিজেই শুধু সংস্কৃতি চর্চা করেননি, আশপাশের ছেলে-মেয়েদেরও গানের চর্চায় যুক্ত করেন। নিউ ইয়র্কে বাঙালি সংস্কৃতি চর্চায় তার অবদান অনেক। তার এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতাতেই ১৯৮৫ সালে নিউ ইয়র্কে সিটি স্কুলে এলিমেন্টারি ক্লাসের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি চলতে থাকে পড়াশোনা। নিউ স্কুল ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৯২ সালে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন নাঈমা খান। নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনায় উদ্যোগী করতে স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে ঘরে ঘরে গিয়ে বন্ধু-বান্ধবদের ছেলেমেয়েদের হোমওয়ার্ক করতে সহায়তা করতেন মনসুর খান। পিএইচডির পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে তিনি অনেকটা নিয়মিতই এই কাজটি করতেন। তিনি তখন একটি স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপালের দায়িত্বেও নিয়োজিত ছিলেন। ড. মনসুর খান নিউ ইয়র্ক সিটির এডুকেশন সিস্টেম সম্পর্কে বেশ জানতেন, ফলে তার পক্ষে ছাত্রছাত্রীদের সঠিকভাবে শিক্ষার বিষয়বস্তু তুলে ধরা ছিল বেশ সহজ। এর ফলে তার একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। এই গ্রহণযোগ্যতা ও আত্মবিশ্বাস থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন খান’স টিউটোরিয়াল। এ ব্যাপারে নাঈমা খান স্বামী ড. মনসুর খানকে যথেষ্ট অনুপ্রাণিত করেন। খান’স টিউটোরিয়ালে ছাত্রছাত্রী বৃদ্ধি পেতে থাকলে নাঈমা খান এ প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ড. মনসুর খান প্রতিষ্ঠিত খান’স টিউটোরিয়াল এর এখন ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। এতে ১১টি শাখায় ৩০০০ এর অধিক ছাত্রছাত্রী অধ্যয়ন করে। পড়াশোনার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয় বলে প্রতিষ্ঠানটি নিউ ইয়র্কের সেরা স্কুলের একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
নাঈমা খানের সুযোগ হয়েছে বিভিন্ন সেমিনারে শিশুদের শিক্ষা ও যথাযথ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কার্যক্রম নিয়ে। জাতিসংঘের কয়েকটি সেমিনারেও তিনি তার মূল্যবান অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি কংগ্রেসম্যান জোসেফ ক্রাউলির কাছ থেকে ‘কংগ্রেসনাল অনার’ লাভ করেছেন। এছাড়া এনওয়াইপিডি মুসলিম অফিসার্স সোসাইটির অ্যাওয়ার্ড, ড্যানি গ্লোভার পাওয়ার অব ড্রিমস অ্যাওয়ার্ডসহ আরও অনেক সম্মাননা তিনি লাভ করেছেন। নাঈমা খান বর্তমানে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ‘খান ফাউন্ডেশনে’র একজন ডিরেক্টর।
তার একমাত্র পুত্র ডা. ইভান একজন চিকিৎসক এবং খান ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর।
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক


